ঢাকা   মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬
BD State News

সারাদেশ

অভাবের ঘরে জিপিএ-৫-এর আলো: এক খাটে সাতজনের সংসার

অভাবের ঘরে জিপিএ-৫-এর আলো: এক খাটে সাতজনের সংসার

একটি মাত্র খাট। সেই খাটেই বাবা-মাসহ পরিবারের সাত সদস্যের রাত কাটে। ১০ বাই ১০ ফুটের ছোট্ট একটি ঘরই তাদের পৃথিবী। কখনো খাবার জোটে, কখনো জোটে না। বাবার কাঁধে ঋণের বোঝা, শরীরে অসুস্থতা; মাও অসুস্থ হয়ে কাজ করতে পারছেন না। তবু এসব কোনো কিছুই থামাতে পারেনি শাবনাজ খাতুন রানীর স্বপ্নকে।

এই অন্ধকার সংসারেই জ্বলে উঠেছে সাফল্যের আলো। ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষায় বিজ্ঞান বিভাগ থেকে জিপিএ-৫ পেয়েছে শাবনাজ। সৈয়দপুর শহরের আল ফারুক একাডেমি থেকে পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিল সে।

নীলফামারীর সৈয়দপুর শহরের বাঁশবাড়ি মহল্লার বস্তিতে বসবাস শাবনাজদের। একটি ছোট্ট ঘরে সাতজনের বসবাস। পড়ার জন্য আলাদা কোনো কক্ষ নেই। সংসারের কোলাহল, অভাব আর অনিশ্চয়তার মধ্যেই বই-খাতা নিয়ে বসতে হয়েছে তাকে।

শাবনাজ বলে, “আমার ভালো ফলাফলের জন্য বাবা-মায়ের অবদান সবচেয়ে বেশি। এরপর শিক্ষকদের সহযোগিতা। কত রাত যে না খেয়ে পড়তে হয়েছে, তার হিসাব নেই।”

তার বাবা ইসমাইল একসময় হোটেলে কাজ করতেন। পারিশ্রমিক কম হওয়ায় এখন রিকশা চালান। প্রতিদিন ভোর ৫টা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত সৈয়দপুর শহরের রাস্তায় রিকশা চালিয়ে যা আয় করেন, তা দিয়েই সংসার চলে। বাড়ি ফেরার সময় বাজার করেন। এরপর গভীর রাতে চুলায় আগুন জ্বলে। অসুস্থ মা লাডলি বেগম রান্না করেন। খাবার শেষে শুরু হয় পরদিনের অনিশ্চয়তার অপেক্ষা।

শাবনাজদের চার বোন ও এক ভাই। বড় বোন রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিজ্ঞানে সম্মান শেষ বর্ষে পড়ছেন। মেজ বোনের বিয়ে হয়েছে। ছোট বোন সৈয়দপুর পাইলট বালিকা বিদ্যালয় ও কলেজের অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী।

সংসারের প্রধান উপার্জনকারী ইসমাইলের বয়স প্রায় ৬০ বছর। শারীরিক অসুস্থতার কারণে স্বাভাবিকভাবে চলাফেরাতেও কষ্ট হয়। তবু সংসারের দায়ে প্রতিদিন রিকশার প্যাডেলে পা রাখতে হয় তাকে। অন্যদিকে মা লাডলি বেগম কয়েক দিন আগেও মানুষের বাসাবাড়িতে কাজ করতেন। অসুস্থ হয়ে পড়ায় এখন আর কাজে যেতে পারেন না।

পরিবারটির ওপর রয়েছে ঋণের চাপও। শাবনাজের মা জানান, প্রায় দুই বছর আগে একটি এনজিও থেকে ৮০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে ইসমাইলের জন্য ব্যাটারিচালিত রিকশা কেনা হয়। কিস্তি পরিশোধের পর যে অর্থ থাকে, তা দিয়েই চলে সাত সদস্যের সংসার।

শাবনাজের কথায়, “এমনিতেই সারা দিনে একবেলা খাবার জোটে আমাদের। এখন কীভাবে পড়াশোনা চালিয়ে যাব, বুঝতে পারছি না।”

উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন দেখলেও অর্থের অভাব তাকে আতঙ্কিত করছে। শাবনাজ চায় পড়াশোনা চালিয়ে গিয়ে নিজের পায়ে দাঁড়াতে। তার আকুতি—সরকার কিংবা সমাজের সামর্থ্যবান মানুষ যদি পাশে দাঁড়ান, তাহলে তার স্বপ্নটি বেঁচে থাকতে পারে।

মেয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন বাবা ইসমাইল। সারাদিন রিকশা চালানোর পর ক্লান্ত শরীরে বাড়ি ফিরলেও মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে আবার স্বপ্ন দেখেন তিনি।

ইসমাইল বলেন, “সারাদিন রিকশা চালিয়ে শরীরে আর শক্তি পাই না। আমার বয়সও প্রায় ৬০ বছর। মৃত্যুর আগে মেয়েটাকে প্রতিষ্ঠিত করে যেতে চাই। কিন্তু আমার তো সামর্থ্য নেই।”

শাবনাজের মা লাডলি বেগম জানান, মেয়ের সাফল্যের পেছনে আল ফারুক একাডেমির প্রধান শিক্ষক শফিকুল ইসলাম এবং শিক্ষক জালাল উদ্দিন ও মতিউর রহমানের গুরুত্বপূর্ণ সহযোগিতা রয়েছে। বিদ্যালয়ে শাবনাজকে প্রায় অর্ধেক খরচে পড়াশোনার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। তাদের সহযোগিতার জন্য শিক্ষকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান তিনি।

আল ফারুক একাডেমির প্রধান শিক্ষক শফিকুল ইসলাম বলেন, শাবনাজ অত্যন্ত মেধাবী ও একাগ্র ছাত্রী। বাবা-মায়ের কষ্টকে সে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছে। নিজের অধ্যবসায় সে এই ফল অর্জন করেছে। ভবিষ্যতে শাবনাজ অনেক দূর এগিয়ে যাবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

এক খাটে সাতজনের জীবন। অভাবের সংসারে অনিশ্চিত খাবার। অসুস্থ বাবা-মা। ঋণের কিস্তি। আর সেই বাস্তবতার মাঝেই একটি জিপিএ-৫—শাবনাজের এই সাফল্য যেন দারিদ্র্যের অন্ধকার ঘরে জ্বলে ওঠা এক টুকরো আলো।

এই আলো নিভে যাবে, নাকি আরও উজ্জ্বল হয়ে পথ দেখাবে—তা এখন নির্ভর করছে শাবনাজের পাশে দাঁড়ানোর মতো একটি হাত বাড়িয়ে দেওয়ার ওপর।

চাইলে এর জন্য **�⁠২ লাইনের আরও শক্তিশালী সাবহেডলাইন ও ছবির ক্যাপশন**ও তৈরি করে দিতে পারি।

আপনার মতামত লিখুন

BD State News

মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬


অভাবের ঘরে জিপিএ-৫-এর আলো: এক খাটে সাতজনের সংসার

প্রকাশের তারিখ : ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

featured Image

একটি মাত্র খাট। সেই খাটেই বাবা-মাসহ পরিবারের সাত সদস্যের রাত কাটে। ১০ বাই ১০ ফুটের ছোট্ট একটি ঘরই তাদের পৃথিবী। কখনো খাবার জোটে, কখনো জোটে না। বাবার কাঁধে ঋণের বোঝা, শরীরে অসুস্থতা; মাও অসুস্থ হয়ে কাজ করতে পারছেন না। তবু এসব কোনো কিছুই থামাতে পারেনি শাবনাজ খাতুন রানীর স্বপ্নকে।

এই অন্ধকার সংসারেই জ্বলে উঠেছে সাফল্যের আলো। ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষায় বিজ্ঞান বিভাগ থেকে জিপিএ-৫ পেয়েছে শাবনাজ। সৈয়দপুর শহরের আল ফারুক একাডেমি থেকে পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিল সে।

নীলফামারীর সৈয়দপুর শহরের বাঁশবাড়ি মহল্লার বস্তিতে বসবাস শাবনাজদের। একটি ছোট্ট ঘরে সাতজনের বসবাস। পড়ার জন্য আলাদা কোনো কক্ষ নেই। সংসারের কোলাহল, অভাব আর অনিশ্চয়তার মধ্যেই বই-খাতা নিয়ে বসতে হয়েছে তাকে।

শাবনাজ বলে, “আমার ভালো ফলাফলের জন্য বাবা-মায়ের অবদান সবচেয়ে বেশি। এরপর শিক্ষকদের সহযোগিতা। কত রাত যে না খেয়ে পড়তে হয়েছে, তার হিসাব নেই।”

তার বাবা ইসমাইল একসময় হোটেলে কাজ করতেন। পারিশ্রমিক কম হওয়ায় এখন রিকশা চালান। প্রতিদিন ভোর ৫টা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত সৈয়দপুর শহরের রাস্তায় রিকশা চালিয়ে যা আয় করেন, তা দিয়েই সংসার চলে। বাড়ি ফেরার সময় বাজার করেন। এরপর গভীর রাতে চুলায় আগুন জ্বলে। অসুস্থ মা লাডলি বেগম রান্না করেন। খাবার শেষে শুরু হয় পরদিনের অনিশ্চয়তার অপেক্ষা।

শাবনাজদের চার বোন ও এক ভাই। বড় বোন রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিজ্ঞানে সম্মান শেষ বর্ষে পড়ছেন। মেজ বোনের বিয়ে হয়েছে। ছোট বোন সৈয়দপুর পাইলট বালিকা বিদ্যালয় ও কলেজের অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী।

সংসারের প্রধান উপার্জনকারী ইসমাইলের বয়স প্রায় ৬০ বছর। শারীরিক অসুস্থতার কারণে স্বাভাবিকভাবে চলাফেরাতেও কষ্ট হয়। তবু সংসারের দায়ে প্রতিদিন রিকশার প্যাডেলে পা রাখতে হয় তাকে। অন্যদিকে মা লাডলি বেগম কয়েক দিন আগেও মানুষের বাসাবাড়িতে কাজ করতেন। অসুস্থ হয়ে পড়ায় এখন আর কাজে যেতে পারেন না।

পরিবারটির ওপর রয়েছে ঋণের চাপও। শাবনাজের মা জানান, প্রায় দুই বছর আগে একটি এনজিও থেকে ৮০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে ইসমাইলের জন্য ব্যাটারিচালিত রিকশা কেনা হয়। কিস্তি পরিশোধের পর যে অর্থ থাকে, তা দিয়েই চলে সাত সদস্যের সংসার।

শাবনাজের কথায়, “এমনিতেই সারা দিনে একবেলা খাবার জোটে আমাদের। এখন কীভাবে পড়াশোনা চালিয়ে যাব, বুঝতে পারছি না।”

উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন দেখলেও অর্থের অভাব তাকে আতঙ্কিত করছে। শাবনাজ চায় পড়াশোনা চালিয়ে গিয়ে নিজের পায়ে দাঁড়াতে। তার আকুতি—সরকার কিংবা সমাজের সামর্থ্যবান মানুষ যদি পাশে দাঁড়ান, তাহলে তার স্বপ্নটি বেঁচে থাকতে পারে।

মেয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন বাবা ইসমাইল। সারাদিন রিকশা চালানোর পর ক্লান্ত শরীরে বাড়ি ফিরলেও মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে আবার স্বপ্ন দেখেন তিনি।

ইসমাইল বলেন, “সারাদিন রিকশা চালিয়ে শরীরে আর শক্তি পাই না। আমার বয়সও প্রায় ৬০ বছর। মৃত্যুর আগে মেয়েটাকে প্রতিষ্ঠিত করে যেতে চাই। কিন্তু আমার তো সামর্থ্য নেই।”

শাবনাজের মা লাডলি বেগম জানান, মেয়ের সাফল্যের পেছনে আল ফারুক একাডেমির প্রধান শিক্ষক শফিকুল ইসলাম এবং শিক্ষক জালাল উদ্দিন ও মতিউর রহমানের গুরুত্বপূর্ণ সহযোগিতা রয়েছে। বিদ্যালয়ে শাবনাজকে প্রায় অর্ধেক খরচে পড়াশোনার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। তাদের সহযোগিতার জন্য শিক্ষকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান তিনি।

আল ফারুক একাডেমির প্রধান শিক্ষক শফিকুল ইসলাম বলেন, শাবনাজ অত্যন্ত মেধাবী ও একাগ্র ছাত্রী। বাবা-মায়ের কষ্টকে সে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছে। নিজের অধ্যবসায় সে এই ফল অর্জন করেছে। ভবিষ্যতে শাবনাজ অনেক দূর এগিয়ে যাবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

এক খাটে সাতজনের জীবন। অভাবের সংসারে অনিশ্চিত খাবার। অসুস্থ বাবা-মা। ঋণের কিস্তি। আর সেই বাস্তবতার মাঝেই একটি জিপিএ-৫—শাবনাজের এই সাফল্য যেন দারিদ্র্যের অন্ধকার ঘরে জ্বলে ওঠা এক টুকরো আলো।

এই আলো নিভে যাবে, নাকি আরও উজ্জ্বল হয়ে পথ দেখাবে—তা এখন নির্ভর করছে শাবনাজের পাশে দাঁড়ানোর মতো একটি হাত বাড়িয়ে দেওয়ার ওপর।

চাইলে এর জন্য **�⁠২ লাইনের আরও শক্তিশালী সাবহেডলাইন ও ছবির ক্যাপশন**ও তৈরি করে দিতে পারি।


BD State News

সম্পাদক: আবদুর রাকিব

কপিরাইট © ২০২৬ BD State News । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত