অভিভাবকদের মূল আকাঙ্ক্ষা হলো মানসম্মত শিক্ষা এবং যোগ্য শিক্ষক নিয়োগ,যাতে তাঁদের সন্তানরা সঠিক শিক্ষায় দীক্ষিত হয়ে গড়ে উঠতে পারে। এই লক্ষ্য পূরণের জন্য একটি স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়ার কোনো বিকল্প নেই। এই স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতেই পুরোনো ও ত্রুটিপূর্ণ শিক্ষক নিয়োগ ব্যবস্থা দূরে ঠেলে চালু হয়েছিল বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ (এনটিআরসিএ) মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া।এর মাধ্যমে মেধার ভিত্তিতে বেসরকারি স্কুল-কলেজে শিক্ষক নিয়োগে একটি বড় পরিবর্তন আসে। তবে দীর্ঘ সময় পর আবারও সেই পুরোনো শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।ম্যানেজিং কমিটির মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগে শিক্ষার মান নিয়ে শঙ্কা:এমপিওভুক্ত প্রায় ৩৯ হাজার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগের সুপারিশের কর্তৃত্ব হারাতে যাচ্ছে বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ (এনটিআরসিএ)। আগের মতো প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় গঠিত ম্যানেজিং কমিটির মাধ্যমে বেসরকারি স্কুল-কলেজে প্রবেশ পর্যায়ে শিক্ষক নিয়োগ দেওয়ার চিন্তা-ভাবনা চলছে বলে জানা গেছে।শিক্ষাবিদ ও বিশ্লেষকদের মতে, অতীতে যখন ম্যানেজিং কমিটির হাতে শিক্ষক নিয়োগের পূর্ণ ক্ষমতা ছিল, তখন অনেক ক্ষেত্রে মেধা ও যোগ্যতাকে পাশ কাটিয়ে ঘুষ বা আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগের অভিযোগ উঠেছিল। দেশের ৩৯ হাজার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, স্বজনপ্রীতি ও ঘুষ বাণিজ্য বাড়ার শঙ্কা রয়েছে।সম্প্রতি ৯৭৩ প্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন বিষয়ের শিক্ষকদের জাল সার্টিফিকেটের অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। এই শিক্ষকদের বেশির ভাগই রাজনৈতিক বিবেচনায় কিংবা অর্থের বিনিময়ে চাকরিতে প্রবেশ করেছিলেন। জাল সার্টিফিকেটধারী চিহ্নিত ওই শিক্ষকদের বেতনভাতার সমুদয় টাকা ফেরত দেওয়ার বিষয়ে নির্দেশ দিয়েছে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি)। শিক্ষাবিদ ও বিশ্লেষকদের মতে, পুরোনো সেই শিক্ষক নিয়োগের ব্যবস্থা আবার চালু করা হলে, শিক্ষার মান ও পাসের হার আরও কমবে।২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হয়েছে। প্রকাশিত ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায় ২০২৬ সালে এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় দেশের সব শিক্ষা বোর্ডের ৩১২টি প্রতিষ্ঠানের কোনো শিক্ষার্থীই পাস করতে পারেনি। অর্থাৎ শূন্য পাসের প্রতিষ্ঠান ৩১২টি। ২০২৫ সালের তুলনায় বেশি। এর মধ্যে সাধারণ শিক্ষা বোর্ড, মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড এবং কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। ২০২৫ সালে শূন্য পাসের প্রতিষ্ঠান ছিল ১৩৪টি। এবার শূন্য পাসের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বেড়েছে ১৭৮টি।দেশে এমপিওভুক্ত বেসরকারি স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও কারিগরি প্রতিষ্ঠান মিলিয়ে মোট শিক্ষক-কর্মচারী আছেন প্রায় ৫ লাখ থেকে সাড়ে ৫ লাখ। অন্যান্য বেসরকারি প্রতিষ্ঠান: এর বাইরে নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কিন্ডারগার্টেনের শিক্ষকদের হিসাব করলে এই সংখ্যা আরও অনেক বড়।সরকারি খাত: সারা দেশে মোট ৭০২টি সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় রয়েছে। এসব বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক-শিক্ষিকার অনুমোদিত পদ আছে ১৫,২৯৩টি।বেতন প্রাপ্তিতে দেরি: অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বেসরকারি শিক্ষকেরা সময় মতো বেতন পান না। মাসের শুরুতে বেতন পাওয়ার কথা থাকলেও, অনেক সময় তা পরের মাসের ১০ থেকে ১৫ তারিখ পর্যন্ত পিছিয়ে যায়।শিক্ষক নিয়োগে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা একটি মেধাভিত্তিক, দুর্নীতিমুক্ত এবং উন্নত শিক্ষাব্যবস্থা গড়ার প্রধান শর্ত। "কে কী বলল" তা বিবেচনা না করে, দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থে শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক এবং নিরপেক্ষ হওয়া জরুরি ।