ঢাকা   মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬
BD State News

মতামত

আমার দেখা গণঅভ্যুত্থান

আমার দেখা গণঅভ্যুত্থান

ছাত্রদের কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে গণঅভ্যুত্থান ঘটায়ে সরকার পতন। তা আগে কেউ কল্পনাও করেনি। বাংলাদেশে সবচেয়ে জনপ্রিয় ও সাধারণ জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণমূলক অভ্যুত্থান হচ্ছে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান। ২০১৮ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে সরকারি চাকরিতে ৫৬ শতাংশ কোটা প্রচলিত ছিল। এর মধ্যে ৩০ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা কোটা, ১০ শতাংশ নারী কোটা, অনগ্রসর জেলার বাসিন্দাদের জন্য ১০ শতাংশ কোটা, ক্ষুদ্র জাতিসত্তার মানুষের জন্য ৫ শতাংশ আর প্রতিবন্ধীদের জন্য ১ শতাংশ আসন সংরক্ষিত ছিল।

২০১৮ সালের আন্দোলনের মুখে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কোন কোটা থাকবে না বলে ঘোষণা দিয়ে একটি পরিপত্র জারি করলে, তা ২০২৪ সালের আন্দোলনের আগ পর্যন্ত বহাল ছিল। কিন্তু বিপত্তি ঘটে হাইকোর্ট কর্তৃক ওই পরিপত্রটি বাতিল ঘোষণার মাধ্যমে। ফলে সরকারি চাকরিতে কোটা ব্যবস্থা সংস্কারের দাবিতে ১ জুলাই থেকে আন্দোলনে নামে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। আন্দোলনে ছাত্ররা একের পর এক 'অবরোধ', 'বাংলা ব্লকেড', 'কমপ্লিট শাটডাউন', 'মার্চ ফর জাস্টিস’ ও 'মার্চ  টু  ঢাকা'  নামক কর্মসূচিতে দিতে থাকেন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ছাত্রদের সহজ সমাধানযোগ্য আন্দোলনকে তেমন গুরুত্ব না দিয়ে ছাত্রদের ক্ষুব্ধ করে তোলেন। অহিংস আন্দোলন চলাকালীন শিক্ষার্থীদের উপর নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগ, যুবলীগ, আওয়ামীলীগ ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দমন-পীড়ন, সশস্ত্র ও সহিংস হামলায় আন্দোলনের মোড় ঘুরে যায়।

১ জুলাই: সকাল ১১টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গ্রন্থাগারের সামনে অবস্থান নেন বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী ও চাকরি প্রত্যাশী। সেখান থেকে শিক্ষার্থীরা মিছিল নিয়ে কলাভবন, শ্যাডো ও মল চত্বর হয়ে মাস্টারদা সূর্য সেন হল, হাজী মুহম্মদ মুহসীন হল ও বসুনিয়া তোরণ হয়ে আবার টিএসসির রাজু ভাস্কর্যে ফিরে যান। সমাবেশে তিন দিনের কর্মসূচি ঘোষণা দেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম। কোটা বাতিলের পরিপত্র পুনর্বহালের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের অন্য দাবিগুলো হলো- পরবর্তী সময়ে সরকার কোটা ব্যবস্থা নিয়ে কোনো পদক্ষেপ নিতে চাইলে ২০১৮ সালের পরিপত্র বহাল সাপেক্ষে কমিশন গঠন করে দ্রুত সময়ের মধ্যে সরকারি চাকরিতে সব গ্রেডে অযৌক্তিক ও বৈষম্যমূলক কোটা বাদ দেওয়া, সংবিধান অনুযায়ী অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর কথা বিবেচনা করা, চাকরির নিয়োগ পরীক্ষায় কোটা–সুবিধা একাধিকবার ব্যবহারের সুযোগ বন্ধ করা, কোটায় যোগ্য প্রার্থী না পাওয়া গেলে শূন্য পদগুলোয় মেধা অনুযায়ী নিয়োগ দেওয়া এবং দুর্নীতিমুক্ত, নিরপেক্ষ ও মেধাভিত্তিক আমলাতন্ত্র নিশ্চিত করতে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া।

গত ৫ জুন সরকারি দপ্তর, স্বায়ত্তশাসিত বা আধা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন করপোরেশনের চাকরিতে সরাসরি নিয়োগের ক্ষেত্রে (৯ম থেকে ১৩তম গ্রেড) মুক্তিযোদ্ধা কোটা বাতিলের পরিপত্র অবৈধ ঘোষণা করে রায় দেন উচ্চ আদালত। ওই দিন থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর আন্দোলন শুরু হয়। আদালতের ওই রায় স্থগিত চেয়ে রাষ্ট্রপক্ষ আপিল বিভাগে আবেদন করে। পরে আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চে আবেদনটির শুনানির জন্য ৪ জুলাই তারিখ নির্ধারণ করে। ঈদের ছুটি শুরুর পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস ফাঁকা হয়ে পড়ায় ১০ জুন দাবি মানতে সরকারকে ৩০ জুন পর্যন্ত সময় বেঁধে (আলটিমেটাম) দিয়ে আন্দোলনে বিরতি টানা হয়। সেই সময়সীমা গতকাল শেষ হয়।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম বলেছিলেন, ‘৪ জুলাইয়ের মধ্যে আইনিভাবে আমাদের দাবির বিষয়ে চূড়ান্ত সুরাহা করতে হবে। আমাদের আশ্বস্ত করতে হবে, যাতে কোটাব্যবস্থার চূড়ান্ত ফয়সালা করা হয়।’ তিনি আরও বলেছিলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে গ্রন্থাগার খোলা থাকতে হবে এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে শিক্ষার্থীদের হলসহ সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। কোনো হল বন্ধ করা যাবে না, গ্রন্থাগারও বন্ধ করা যাবে না।  তিনি আগামীকাল বেলা আড়াইটায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার থেকে গণপদযাত্রা শুরু ও দেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের শিক্ষার্থীদের একই সময়ে একই কর্মসূচি পালনে আহ্বান জানান। এ ছাড়া ৩ ও ৪ জুলাই জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত সাত সরকারি কলেজ এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন ঢাকার অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা রাজু ভাস্কর্যে একত্রিত হবার কথা  জানান। আন্দোলনের সমন্বয়ক সারজিস আলম বলেছিলেন, ‘বীর মুক্তিযোদ্ধাদের আমরা জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান মনে করি। তাঁদের সুযোগ-সুবিধা প্রয়োজনে আরও বৃদ্ধি করা হোক। কিন্তু কোটা বৈষম্য দূর হওয়া প্রয়োজন। আমরা বৈষম্য মেনে নিতে পারি না।’

২ জুলাই: রাজধানীতে দুপুরে সাড়ে চার কিলোমিটার সড়কে গণপদযাত্রা করে শাহবাগ মোড় অবরোধ করেন বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী ও চাকরি প্রত্যাশী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে থেকে শুরু হওয়া পদযাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ সড়কের চতুর্দিকে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। বিকেলে এক ঘণ্টা শাহবাগ মোড় অবরোধ করে রাখেন তারা। এ সময় শিক্ষার্থীরা ‘কোটা না মেধা, মেধা মেধা’, ‘কোটা প্রথা নিপাত যাক, মেধাবীরা মুক্তি পাক’, ‘ছাত্রসমাজ গড়বে দেশ, মেধাভিত্তিক বাংলাদেশ’ ইত্যাদি স্লোগান দেন এবং প্ল্যাকার্ড প্রদর্শন করেন।

শাহবাগে অবস্থান কর্মসূচিতে সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম বলেছিলেন, আমরা শুধু মুক্তিযোদ্ধা কোটার বিরুদ্ধে বলছি না; আমরা পোষ্য কোটাসহ সব অযৌক্তিক কোটার বিরুদ্ধে বলছি। মনে রাখতে হবে, মুক্তিযোদ্ধা কোটা আর মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এক জিনিস নয়। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা কোনো গোষ্ঠী বা বংশপরম্পরার জিনিস নয়। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা একটি রাষ্ট্রীয় আদর্শ। দেশের নাগরিক হিসেবে আমরা সেই আদর্শ ধারণ করি। সেই আদর্শ ধারণ করে মুক্তিযোদ্ধারা যে বৈষম্যের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছিলেন; আমরা সে বৈষম্যের বিরুদ্ধেই আবার আন্দোলন শুরু করেছি। সমন্বয়ক সারজিস আলম বলেন, বাংলাদেশ গড়তে হলে মেধাবীদের নিয়েই গড়তে হবে। স্বাধীনতার ৫৩ বছর পর কোটা প্রথার কোনো প্রয়োজন নেই। কোটা প্রথা পুনর্বহাল শিক্ষার্থীদের সঙ্গে প্রহসন। ২০১৮ সালের পরিপত্র যতক্ষণ না বহাল হচ্ছে, ততক্ষণ ছাত্রসমাজ রাজপথে থাকবে।

একই দাবিতে বিকেলে বিক্ষোভ করেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। বিকেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক অবরোধ করে রাখেন। দাবি মানা না হলে আগামীকাল বুধবার বিকেলে ফের দুই ঘণ্টার মহাসড়ক অবরোধের ঘোষণা দিয়েছিলেন তারা। কোটা পুনর্বহালের প্রতিবাদে বিক্ষোভ হয়েছে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়েও। এ দিন বেলা সাড়ে ১১টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ঝালচত্বর থেকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে বিক্ষোভ শুরু করেন শিক্ষার্থীরা।

৩ জুলাই: কোটা সংস্কার চলমান আন্দোলনের অংশ হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েক হাজার বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থী রাজধানীর শাহবাগে সড়ক অবরোধ করেন, দুপুর থেকে ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’ ব্যানারে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে জড়ো হতে থাকেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, অধিভুক্ত সাত কলেজসহ রাজধানীর বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা। মিছিল নিয়ে শিক্ষার্থীরা বিকেল সাড়ে ৩টায় শাহবাগ অবরোধ করেন। এ সময় সড়কে দুই ঘণ্টা অবস্থানের পর বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে রাজু ভাস্কর্যে এসে কর্মসূচি শেষ হয়। অবরোধকালে শিক্ষার্থীরা কোটাবিরোধী স্লোগান, প্ল্যাকার্ড প্রদর্শন ও গান পরিবেশন করেন।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়: ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক অবরোধ করেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। বিকেল ৩টা থেকে ৫টা পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনের সমবেত হন তারা। দুপুরে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভ করেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। শিক্ষার্থীরা বলেছিলেন, চাকরিতে কোটা পুনর্বহাল করার সিদ্ধান্ত সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে প্রহসনের নামান্তর। শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়: শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভে উত্তাল ছিল রাজধানীর শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়। চাকরিতে মেধাভিত্তিক নিয়োগের দাবিতে শতাধিক শিক্ষার্থী আগারগাঁও-খামারবাড়ি সড়ক অবরোধ করেন। তারা ‘সারাবাংলায় খবর দে, কোটা প্রথার কবর দে’, ‘দেশের মেধা দেশে থাক, কোটা প্রথা নিপাত যাক’ স্লোগান দেন। বরিশাল: বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বেলা ১১টার ক্যাম্পাস সংলগ্ন বরিশাল-কুয়াকাটা মহাসড়ক তিন ঘণ্টা অবরোধ করেন। তারা কোটা প্রথা বাতিল করে চাকরিতে মেধাভিত্তিক নিয়োগের দাবি জানিয়েছিলেন। রংপুর: রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীরা বেলা ১১টায় কেন্দ্রীয় লাইব্রেরি থেকে পদযাত্রা বের করে সমাবেশ করেছিলেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। ঢাকার শেরেবাংলা কৃষি বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ মিছিল ও সড়ক অবরোধ করেন। শিক্ষার্থীরা ২০১৮ সালের পরিপত্র বহাল করে তা আইনে পরিণত করাসহ চার দফা দাবি জানিয়েছিলেন।

৪ জুলাই: বৃষ্টি উপেক্ষা করে শিক্ষার্থীরা মেধার মূল্যায়ন চেয়ে একযোগে সড়ক-মহাসড়ক অবরোধ করেছিলেন। এ সময় ঢাকা, জাহাঙ্গীরনগর, জগন্নাথ, রাজশাহী, চট্টগ্রাম, বরিশাল, কুমিল্লা, খুলনাসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা রাজপথে দাবি আদায়ের শপথ নেন।

বেলা ১১টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে জড়ো হন বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী ও চাকরি প্রত্যাশী। মিছিল নিয়ে তারা মাস্টারদা সূর্য সেন হল, হাজী মুহম্মদ মুহসীন হলের গেট হয়ে ভিসি চত্বর, টিএসসির রাজু ভাস্কর্য ঘুরে শাহবাগ মোড় অবরোধ করেন। সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম জানান, শুক্রবার সারাদেশে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে অনলাইন-অফলাইনে জনসংযোগ ও সমন্বয়, শনিবার বেলা ৩টায় দেশজুড়ে বিক্ষোভ এবং রোববার সব বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ক্লাস-পরীক্ষা বর্জনের মাধ্যমে ছাত্র ধর্মঘট পালন করা হবে। শনিবারের বিক্ষোভ থেকে রোববারের মাঠের কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে বলেও জানান তিনি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কেন্দ্রীয়ভাবে আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়া হচ্ছে। সারাদেশে ‘কোটা পুনর্বহাল করা চলবে না’ শীর্ষক ফেসবুক গ্রুপে সবাই যুক্ত ছিলেন। গ্রুপ থেকেই যাবতীয় বিষয় আপডেট দিয়েছিলেন। একই নামে টেলিগ্রাম গ্রুপও ছিল আন্দোলনকারীদের। নাহিদ ছাড়াও আন্দোলনের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে যুক্ত আছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের শিক্ষার্থী সারজিস আলম, ইংরেজি বিভাগের হাসনাত আব্দুল্লাহ, রাফিয়া রেহনুমা হৃদি, মোহাম্মদ মাহিন, আব্দুল হান্নান মাসউদ, রাশিদুল ইসলাম রিফাত সহ আরো অনেক।

নাহিদ ইসলাম বলেছিলেন, ২০১৮ সালে নির্বাহী বিভাগ পরিপত্রের মাধ্যমে কোটা বাতিল করল। বিচার বিভাগ দিয়ে কোটা আবার পুনবর্হাল করা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে প্রহসন। এটা রাষ্ট্রযন্ত্রের মধ্যে সমন্বয়হীনতার উদাহরণ। নির্বাহী বিভাগ আদেশ দিচ্ছে তো বিচার বিভাগ বাতিল করছে। রাষ্ট্রযন্ত্রের অন্তঃদ্বন্দ্বে শিক্ষার্থীদের সম্পর্ক নেই। নিজেদের মধ্যে সমন্বয় করে শিক্ষার্থীদের দাবি পূরণ করুক– এটাই আমরা চাই। হাসনাত আব্দুল্লাহ বলেছিলেন, ‘আমরা একই প্রশ্নে ভর্তি পরীক্ষা দেব, একই প্রশ্নে হবে লিখিত এবং ভাইভার মুখোমুখিও হবো। কিন্তু তারা কোটা সুবিধার কারণে একাই শতভাগ সুবিধা পাবে। তাহলে আমরা ধরে নেব, জন্মই আমার আজন্ম পাপ ?’ সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত অবরোধ কর্মসূচি শেষে রাজু ভাস্কর্যে গিয়ে নতুন করে তিন দিনের কর্মসূচি ঘোষণা করেছিলেন।

আন্দোলনে ছাত্রলীগের বাধা, হল গেটে তালা: আন্দোলনে যেতে শিক্ষার্থীদের বাধা দেয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হল ছাত্রলীগের নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে। একাধিক হলের গেটে তালা ঝুলিয়ে দেয় তারা। সরেজমিন মাস্টারদা সূর্য সেন ও কবি জসীম উদ্‌দীন হলগেটে তালা দেখা যায়। এ সময় শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হলেও শিক্ষার্থীদের গেস্টরুমে আটকে রাখার অভিযোগ পাওয়া গেছে। পরে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা মিছিল নিয়ে হলে গিয়ে তালা খুলতে বাধ্য করেন। এর পরও বেশির ভাগ শিক্ষার্থীকে আন্দোলনে অংশ নিতে দেয়নি ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা।

একইভাবে পুরান ঢাকার রায় সাহেব বাজার মোড় অবরোধ করেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। এ ছাড়া শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শেকৃবি) শিক্ষার্থীরা রাজধানীর আগারগাঁও মোড়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) শিক্ষার্থীরা চট্টগ্রাম-খাগড়াছড়ি মহাসড়ক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) শিক্ষার্থীরা ঢাকা-রাজশাহী মহাসড়ক, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের (খুবি) শিক্ষার্থীরা খুলনার জিরো পয়েন্ট, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) শিক্ষার্থীরা কুষ্টিয়া-খুলনা মহাসড়ক এবং কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) শিক্ষার্থীরা ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ করেন।

৫ জুলাই: ২০১৮ সালে সরকারের জারি করা পরিপত্র পুনর্বহালের দাবিতে ঢাকাসহ দেশের বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয়ে লাগাতার কর্মসূচি পালন করেন । সর্বশেষ ক্লাস-পরীক্ষা বর্জনের কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। ফলে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় গভীর সংকটে পড়ে। দীর্ঘস্থায়ী সেশন জটের শঙ্কাও দেখা দেয়। তাই দ্রুত কোটা পদ্ধতি বিষয়ে আলোচনা করতে সরকারকে উদ্যোগ নিতে বলেন শিক্ষাবিদ ও আমলারা। আলোচনার টেবিলেই যৌক্তিক সমাধান হওয়া উচিত বলে মনে করছেন তারা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বলেছিলেন, কোটা পদ্ধতি নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে আলোচনার উদ্যোগ নিতে হবে। আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বসলে সমাধান আসবেই। দুনিয়ায় এমন কোনো সংকট নেই, যা আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা যায় না। সে কারণে কোটা পদ্ধতি নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে আলোচনার উদ্যোগ নিতে হবে। আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বসলে সমাধান আসবেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. এ কে আজাদ চৌধুরী বলেন, সব জায়গায় মেধাকে প্রাধান্য দিতে হবে। আমার মনে হয়, পুরো কোটা পদ্ধতি তুলে দেওয়া যাবে না। সব মিলিয়ে ৫-১০ শতাংশ কোটা রাখা যায়। তিনি বলেছিলেন, একটা সময় পর্যন্ত কোটা পদ্ধতির যৌক্তিকতা ছিল। তবে নারীরা এখন অনেক এগিয়েছে। মুক্তিযোদ্ধার সন্তান ও নাতি-নাতনিরা অনেক বছর চাকরিতে কোটা সুবিধা পেয়েছে। তবে অনগ্রসর জাতিকে সমতায় আনা যেহেতু রাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্ব, সেক্ষেত্রে কোটার দরকার আছে। সেজন্য ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী, নারী এবং শ্রদ্ধাবোধ রেখে কয়েক শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা কোটা রাখা যায়; কিন্তু সেটি ৫৬ শতাংশ নয়। এতে মেধাবী অনেকে চাকরিবঞ্চিত হবে। শিক্ষার্থীদের এ আন্দোলন যৌক্তিক দাবি করে তিনি বলেছিলেন আন্দোলনের যৌক্তিকতা রয়েছে। তবে আদালত যেহেতু এ বিষয়ে রায় দিয়েছেন, সমাধানও আদালতের মাধ্যমেই আসতে হবে।

৬ জুলাই: দেশের বিভিন্ন স্থানে সড়ক-মহাসড়ক অবরোধ করেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের শিক্ষার্থীরা। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বেলা ১১টা থেকে ১২টা পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের ঢাকা-রাজশাহী মহাসড়ক অবরোধ করেন। বিকেলে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের হাজারও শিক্ষার্থী পুলিশের বাধা উপেক্ষা করে নগরীর ষোলশহর ও দুই নম্বর গেট এলাকায় বিক্ষোভ করেন। এ সময় শিক্ষার্থীরা দুই নম্বর গেট এলাকায় সড়ক অবরোধ করেন। খুলনা নগরীর শিববাড়ী মোড়ের ৭টি পয়েন্টে অবস্থান নিয়ে এক ঘণ্টা সড়ক অবরোধ করেন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবি) শিক্ষার্থীরা সিলেট-সুনামগঞ্জ সড়ক, পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ঢাকা-পাবনা মহাসড়ক এবং মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ঢাকা-টাঙ্গাইল ও বঙ্গবন্ধু সেতু মহাসড়ক অবরোধ এবং বিক্ষোভ করেন।

পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (পবিপ্রবি) বাবুগঞ্জ ক্যাম্পাসের শিক্ষার্থীরা বঙ্গবন্ধু চত্বরে, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা রংপুর-ঢাকা মহাসড়ক অবরোধ করেন। এ ছাড়া ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রেস ক্লাব চত্বর এবং ময়মনসিংহে বিভিন্ন কলেজের শিক্ষার্থীরা টাউন হল মোড়ে বিক্ষোভ করেন। বিকেল ৩টায় শিক্ষার্থীরা কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে মাথায় পতাকা বেঁধে মিছিল নিয়ে আন্দোলন স্থলে আসেন। ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা আন্দোলনে আসতে বাধা দেয়। রোববারের মধ্যে সরকারের প্রতিক্রিয়া না পেলে হরতাল কর্মসূচিতেও যাওয়ার হুঁশিয়ারি দেন আন্দোলনের সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, ‘আগামীকাল (রোববার) বিকেল ৩টা থেকে বাংলা ব্লকেড কর্মসূচি হবে।

৭ জুলাই: কোটা ব্যবস্থা সংস্কার দাবিতে তীব্র আন্দোলন অব্যাহত রাখে বাংলাদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। রোববারের এই কর্মসূচিতে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সড়ক ও মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছিলেন শিক্ষার্থীরা। চলমান চার দফা দাবিতে কোটা সংস্কার আন্দোলনকে এক দফা দাবিতে নামিয়ে সারা দেশে “বাংলা ব্লকেড” কর্মসূচি ঘোষণা করেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। রাতে শাহবাগে অবরোধ কর্মসূচির শেষে নতুন এ কর্মসূচি ঘোষণা করেন আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, ৮ জুলাই বিকাল সাড়ে ৩টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরির সামনে থেকে মূল ব্লকেড আন্দোলন শুরু হবে। তা ছাড়া একই সময়ে সারা দেশের সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে এই “বাংলা ব্লকেড” কর্মসূচি শুরুর কথা জানান।

৮ জুলাই: কোটা সংস্কার আন্দোলনে এক দফা দাবিতে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ব্লকেড কর্মসূচি পালন করলেও বুধবার থেকে সারাদেশে পুরো বেলা সর্বাত্মক ব্লকেড কর্মসূচি পালন করার হুঁশিয়ারি দেন শিক্ষার্থীরা। সেজন্য তারা মঙ্গলবার প্রস্তুতি নেবেন এবং একইদিন বিকেলে বুধবারের চূড়ান্ত কর্মসূচির বিষয়ে সংবাদ সম্মেলন করবেন। শাহবাগে রাতে এ কর্মসূচি ঘোষণা করে আন্দোলনের সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম বলেছিলেন, আমরা নিয়মতান্ত্রিকভাবে আমাদের কর্মসূচি পালন করছি। আমরা বাধ্য হয়েই আজ রাজপথে নেমে এসেছি। ছাত্ররা সহজে মাঠ ছাড়বে না। আমাদের আহ্বান থাকবে আপনারা দায়িত্বশীল আচরণ করুন। তা না হলে আমরা আরও কঠোর কর্মসূচিতে যেতে বাধ্য হব।

৯ জুলাই: মঙ্গলবার ছিল না বড় কোনো কর্মসূচি। তবে ছাত্র ধর্মঘট, ক্লাস বর্জনের পাশাপাশি কোটার বিরুদ্ধে অনলাইন ও অফলাইনে গণসংযোগ করেছিলেন শিক্ষার্থীরা।

১০ জুলাই: আন্দোলন চলাকালে আদালত স্থিতাবস্থা জারি করলেও সংসদে আইন পাস করে কোটা ব্যবস্থার ‘যৌক্তিক’ সংস্কার না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন শিক্ষার্থী ও চাকরি প্রত্যাশীরা। শুধু পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জন্য সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ কোটা রেখে সরকারি চাকরির সব গ্রেডে কোটা বাতিল করার দাবি করেন তারা। সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের স্থিতাবস্থা জারির আদেশের প্রতিক্রিয়ায় দুপুরে শাহবাগ মোড়ে অবরোধ কর্মসূচি থেকে এ ঘোষণা দিয়েছিলেন আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক হাসনাত আব্দুল্লাহ।

সন্ধ্যায় শাহবাগ মোড়ে নতুন কর্মসূচির ঘোষণা দিয়েছিলেন আন্দোলনের সমন্বয়ক আসিফ মাহমুদ। এ সময় আরেক সমন্বয়ক সারজিস আলম বলেছিলেন, নির্বাহী বিভাগ চাইলে আজকেই আমাদের শেষ কর্মসূচি। রাজপথ আমাদের জায়গা না, আমরা পড়ার টেবিলে ফিরব। যদি নির্বাহী বিভাগের শীর্ষ পর্যায়ের কেউ এটি ঘোষণা করে অথবা নির্বাহী বিভাগ আদেশ জারি করে কিংবা ত্রুটিহীন পরিপত্র জারি হয়, তাহলে আমাদের আর রাজপথে দেখা যাবে না। তিনি আরো বলেছিলেন, ২০১৮ সালের পরিপত্রে কোন কোটাই নেই। এখন সংবিধান-স্বীকৃত নৃগোষ্ঠী, প্রতিবন্ধীরা যদি আবার হাইকোর্টে যায়, তাহলে আবার এ পরিপত্র বাতিল করতে পারে।

১১ জুলাই: আপিল বিভাগের স্থিতাবস্থা বজায় রাখার আদেশের পরও আন্দোলন অব্যাহত রেখেছেন শিক্ষার্থী ও চাকরি প্রত্যাশীরা। বিভিন্ন স্থানে শিক্ষার্থীদের ওপর লাঠিচার্জ করলে অনেক শিক্ষার্থী ও সাংবাদিক আহত হন। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এবং জনপ্রশাসন মন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আন্দোলন বিষয়ে তাদের জোড়ালো মতামত ব্যক্ত করেন। কোটাবিরোধী আন্দোলনকারীরা জনজীবনকে জিম্মি করে, আদালতের প্রতি কোনো ধরনের সম্মান প্রদর্শন না করে তথাকথিত বাংলা ব্লকেডের কর্মসূচি দিয়ে মানুষের জীবনযাত্রা ব্যাহত করার চেষ্টা করছে বলে মন্তব্য করেছেন ওবায়দুল কাদের। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা সীমা অতিক্রম করে যাচ্ছে উল্লেখ করে তাদের অযথা রাস্তায় ভিড় না করতে এবং নিজ নিজ শিক্ষাঙ্গনে ফিরে যাওয়ার অনুরোধ করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান। আন্দোলনকারীদের রাস্তা অবরোধ করে জনদুর্ভোগ সৃষ্টি না করে আদালতের দ্বারস্থ হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন জনপ্রশাসনমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন।

১২ জুলাই: কোটা সংস্কারের দাবিতে শুক্রবার ছুটির দিনেও দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ করেছেন শিক্ষার্থীরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মিছিল শেষে শিক্ষার্থীরা শাহবাগ মোড় অবরোধ করেন। রেলপথ অবরোধ করেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। বৃহস্পতিবার ‘বাংলা ব্লকেড’ নামের অবরোধ কর্মসূচিতে পুলিশের হামলার প্রতিবাদ ও বিচারের দাবিতে সারা দেশে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেন শিক্ষার্থীরা। দুটি স্থানে শিক্ষার্থীরা পুলিশ ও ছাত্রলীগের বাধার কারণে পূর্বঘোষিত কর্মসূচি পালন করতে পারেননি। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভ মিছিল কলাভবনের সামনে থেকে মিছিল শুরু হয়।

ঢাকা-রাজশাহী রেলপথ অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। বিকেলে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টেশন বাজার সংলগ্ন ঢাকা-রাজশাহী রেললাইন অবরোধ করেন তাঁরা। বিক্ষোভে অংশ নেন রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং রাজশাহী মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীরাও।

চট্টগ্রাম নগরের ষোলশহর রেলস্টেশন থেকে বিকেলে বিক্ষোভ মিছিল বের করেন শিক্ষার্থীরা। এতে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও অধিভুক্ত কলেজ ছাড়াও চট্টগ্রামের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী ও চাকরিপ্রত্যাশীরা অংশ নেন। মিছিলটি ষোলশহর থেকে ২ নম্বর গেট, চকবাজার, জামালখান, কাজীর দেউড়ি হয়ে নগরের আলমাস মোড়ে গিয়ে শেষ হয়।জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে মশাল মিছিল করেন শিক্ষার্থীরা। সন্ধ্যা পৌনে সাতটায় বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে থেকে বিক্ষোভ মিছিল বের করেন শিক্ষার্থীরা । মশাল মিছিল করেন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও। সন্ধ্যায় ক্যাম্পাসে এ কর্মসূচি পালন করেন তাঁরা।

রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ সমাবেশ করেন শিক্ষার্থীরা। সন্ধ্যা ছয়টার দিকে শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে ক্যাম্পাসের বাইরে সড়কে অবস্থান নিতে চাইলে পুলিশি বাধায় যেতে পারেননি। পরে শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১ নম্বর ফটকে অবস্থান নেন। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনের সড়কে বিক্ষোভ মিছিল করেন শিক্ষার্থীরা। মিছিলটি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বাসভবনের সামনে গিয়ে থামে। সেখানে শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন স্লোগান দেন। পরে মিছিলটি আনসার ক্যাম্পের সামনে যায়। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা স্থানটিকে ছাত্র আন্দোলন চত্বর নামে ঘোষণা দিয়ে সাইনবোর্ড টাঙান।কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী ও চাকরি প্রত্যাশীরা ময়মনসিংহে বিক্ষোভ করেন। বিকেলে শিক্ষার্থীরা নগরের আনন্দ মোহন কলেজে জমায়েত হয়ে সমাবেশ শেষে মিছিল নিয়ে শহরের গাঙ্গিনারপাড় ট্রাফিক মোড় এলাকায় সড়কে অবস্থান নেন তাঁরা। এ ছাড়া ময়মনসিংহে আনন্দ মোহন কলেজ, নাসিরাবাদ কলেজ, মুমিনুন্নেছা কলেজসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী ও চাকরিপ্রত্যাশীরা বিক্ষোভ করেন। ময়মনসিংহের বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেন শিক্ষার্থীরা।বিকেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্তমঞ্চ থেকে বিক্ষোভ মিছিল শুরু করে আব্দুল জব্বার মোড়ে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ সমাবেশ করেন শিক্ষার্থীরা। পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভ মিছিল বের করেন শিক্ষার্থীরা। বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছিলেন কুষ্টিয়ায় অবস্থিত ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় এবং গোপালগঞ্জে অবস্থিত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা।

নীলফামারীর সৈয়দপুরে মানববন্ধন করেছিলেন বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা। বগুড়ায় সাধারণ শিক্ষার্থীদের ব্যানারে বিকেলে শহরের সাতমাথা থেকে বিক্ষোভ মিছিল বের করেছিলেন আন্দোলনকারীরা। নোয়াখালীর জেলা শহর মাইজদীতে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছিলেন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা। বিকেলে মিছিলটি শহরের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে এক সমাবেশের মাধ্যমে শেষ হয়। কর্মসূচিতে নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং নোয়াখালী সরকারি কলেজসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা অংশ নেন।

১৩ জুলাই: কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন বিষয়ে গভীর পর্যবেক্ষণে সরকার। এরই মধ্যে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোও এ বিষয়ে নজরদারি শুরু করে। আন্দোলন ঘিরে যে কোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়াতে সর্বোচ্চ ধৈর্য ও সতর্ক অবস্থায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

এ দিকে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের নামে মামলা করার ঘটনায় নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে মামলা তুলে নিতে ২৪ ঘণ্টার আল‌টিমেটাম দেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। এ ছাড়া এক দফা কর্মসূচি বাস্তবায়নে নতুন কর্মসূচি হিসেবে গণপদযাত্রা ও রাষ্ট্রপতি বরাবর স্মারকলিপি দেওয়ার কর্মসূচি ঘোষণা দেন। সন্ধ্যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে কর্মসূচি ঘোষণার সময় এ আলটিমেটাম দিয়েছিলেন। অন্যতম সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম বলেছিলেন, ‘সরকার আন্দোলন দমনের পরিকল্পনা ও প্রস্তুতি নিচ্ছে। সরকারের উচিত ছিল প্রথম থেকেই শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনা করা এবং দৃশ্যমান পদক্ষেপের মাধ্যমে কোটা সংস্কার করা। কিন্তু সরকার সেটি না করে আন্দোলনকে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, ক্ষমতাসীন ছাত্রসংগঠন দিয়ে দমনের পরিকল্পনা বা প্রস্তুতি গ্রহণ করছে। আমরা বলে দিতে চাই সরকারের এ ধরনের পরিকল্পনা সরকারের জন্যই বুমেরাং হয়ে দাঁড়াবে।’ তিনি আরো বলেছিলেন,  ‘পুলিশ বক্তব্য দিয়ে বলেছে কোনো ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হয়নি ৷ কিন্তু আজকে হঠাৎ করে অজ্ঞাত মামলা দেওয়া হলো সে বিষয়ে আমরা পুলিশের কাছে আমরা জবাবদিহি চাইছি। ছাত্রসমাজকে এ রকম মামলা-হামলার ভয় দেখিয়ে লাভ হবে?  আমরা আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে এই মামলা প্রত্যাহারের দাবি জানাচ্ছি। যারা বাংলা ব্লকেড কর্মসূচিতে বিভিন্ন জায়গায় হামলার সঙ্গে জড়িত ছিল পুলিশ বাহিনীসহ সরকার দলীয় ছাত্র সংগঠন তাদের আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বিচারের আওতায় আনতে হবে।’
সংবাদ সম্মেলনে আরেক সমন্বয়ক হাসনাত আবদুল্লাহ বলেছিলেন,  ‘আমাদের এত দিন বাংলা ব্লকেড কার্যক্রম ছিল এবং অনেকে এটিকে জনদুর্ভোগ হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করেছে। আমাদের ক্লাস পরীক্ষা বর্জন করে যে ছাত্র ধর্মঘট চলছে সেটির পাশাপাশি আমাদের কর্মসূচি থাকবে জাতীয় সংসদে জরুরি অধিবেশন ডেকে সরকারি সব চাকরিতে সব গ্রেডে কোটার যৌক্তিক সংস্কারের লক্ষ্যে রাষ্ট্রপতি বরাবর স্মারকলিপি প্রদান এবং গণপদযাত্রা। সকাল ১১টায় গণপদযাত্রা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে থেকে শুরু হবে। সারা বাংলাদেশের অন্যান্য যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গণপদযাত্রা করে নিজ নিজ জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি বরাবর স্মারকলিপি প্রদান করবে।’ আরেক সমন্বয়ক সার্জিস আলম বলেছিলেন, ‘আমাদের এই আন্দোলন প্রতিনিয়ত দীর্ঘ করতে হচ্ছে, তীব্র থেকে তীব্রতর করতে হচ্ছে। কিন্তু এর দায় পুরোপুরি নির্ভর করে সরকারের ওপর। কারণ সরকার যদি যৌক্তিক দাবি মেনে নেয় তাহলে কিন্তু আমাদের রাজপথে থাকতে হয় না।’

১৪ জুলাই সংবাদ সম্মেলনে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এক পর্যায়ে বলেছিলেন, কোটা মুক্তিযুদ্ধাদের ছেলেমেয়ে ও নাতি-পুতিরা পাবে না তো রাজাকারের বাচ্চারা পাবে? মুক্তিযুদ্ধাদের সন্তান-নাতিপুতিরা কি মেধাবী না; যত রাজাকারের বাচ্চা-নাতিপুতিরা মেধাবী? শেখ হাসিনার এ ধরণের ঔদ্বত্যপূর্ণ বক্তব্য ছাত্র-জনতার আন্দোলন যেন তেলে বেগুনে জ্বলে উঠল। এসময় তাদের আন্দোলনের স্লোগানে যোগ হয় ভিন্ন মাত্রা। যেমন- 'চেয়েছিলাম অধিকার, হয়ে গেলাম রাজাকার; হয়ে গেলাম রাজাকার, চেয়েছিলাম অধিকার।' জুলাইয়ে আন্দোলন শুরু হলেও তা ১৪ তারিখের পর থেকে ভয়াবহ আকারে রুপ নেয়।

১৪ জুলাই: কোটা সংস্কারের দাবিতে সরকারকে ২৪ ঘণ্টা সময় বেঁধে দেন আন্দোলনকারীরা। এর মধ্যে সরকারের দৃশ্যমান পদক্ষেপ চান তারা। দাবি মানা না হলে আরও কঠোর কর্মসূচির হুঁশিয়ারি দেন। ১৪ জুলাই বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতির প্রতিনিধির কাছে স্মারকলিপি দেওয়ার পর এ ঘোষণা দেন শিক্ষার্থীরা। স্মারকলিপি দিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস থেকে প্রায় ১০ হাজার শিক্ষার্থীর একটি মিছিল বঙ্গভবনের দিকে রওনা হলে পুলিশের বাধার মুখে গুলিস্তান মোড়ে অবস্থান নেয়। পরে ১২ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল স্মারকলিপি দেন। চট্টগ্রামে স্মারকলিপি ও গণপদযাত্রা কর্মসূচি পালন করেন শিক্ষার্থীরা। বেলা ১১টায় নগরীর ষোলশহর স্টেশন থেকে এ কর্মসূচি শুরু করেন তারা। পুলিশের বাধা পেরিয়ে দুপুরে শিক্ষার্থীরা ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) আবদুল মালেকের হাতে স্মারকলিপি দেন। সিলেট জেলা প্রশাসক শেখ রাসেল হাসানের হাতে স্মারকলিপি তুলে দেন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (শাবি), সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, এমসি কলেজ, মদন মোহন কলেজসহ অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। খুলনা জেলা প্রশাসক খন্দকার ইয়াসির আরেফীনের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি বরাবর স্মারকলিপি দেন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের (খুবি) শিক্ষার্থীরা। রংপুরে পদযাত্রা কর্মসূচি পালন করেন বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, কারমাইকেল কলেজ, রংপুর সরকারি কলেজ ও সরকারি বেগম রোকেয়া কলেজের শিক্ষার্থীরা। স্মারকলিপিতে শিক্ষার্থীরা বলেছিলেন, সরকারি চাকরিতে সব গ্রেডে বৈষম্যমূলক কোটা বাতিল করতে হবে। শুধু অনগ্রসর গোষ্ঠী ও বিশেষ চাহিদা সম্পন্নদের জন্য ন্যায্যতার ভিত্তিতে সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ কোটা রেখে সংসদে আইন পাস করে কোটা পদ্ধতিতে সংস্কার আনতে হবে। এতে বলা হয়, তারা দীর্ঘদিন ধরে ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন করে রাজপথে আন্দোলন করে যাচ্ছেন। অথচ সরকার তাদের দাবির বিষয়ে কোনো উদ্যোগ নেয়নি। আন্দোলনকারীরা দ্রুত পড়ার টেবিলে ফিরতে চান। তারা আশা করেন, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সংসদে জরুরি অধিবেশন ডেকে কোটার যৌক্তিক সংস্কার করা হবে।

১৫ জুলাই: সোমবার দুপুরে ধানমণ্ডিতে জরুরি সংবাদ সম্মেলনে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, যে সব শিক্ষার্থী নিজেদের ‘রাজাকার’ বলে স্লোগান তুলেছে, তাদেরকে মোকাবেলায় বাংলাদেশ ছাত্রলীগই যথেষ্ট বলে মন্তব্য করেন । এরপর কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের ওপর ছাত্রলীগের হামলায় ছাত্রীসহ তিন শতাধিক শিক্ষার্থী আহত হন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজয় একাত্তর হলের সামনে প্রথমে দুই পক্ষের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া হয়। পরে দফায় দফায় ক্যাম্পাস জুড়ে সংঘর্ষ ও পাল্টাপাল্টি ইটপাটকেল ছোড়ার ঘটনা ঘটে। পরে ছাত্রলীগ নেতাকর্মী একজোট হয়ে আন্দোলনকারীদের ওপর ধারালো অস্ত্র, রড ও লাঠিসোটা দিয়ে হামলা চালিয়ে ক্যাম্পাস দখলে নেয়।এদিকে রাতে নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করে সারাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালনের ঘোষনা দেন আন্দোলনকারীরা। তারা শেখ হাসিনার বক্তব্যের প্রতিবাদে রোববার মধ্যরাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন ক্যাম্পাসে মিছিল করেন । অন্যদিকে শিক্ষার্থীদের দাবি, সাবেক প্রধানমন্ত্রী তাদের 'রাজাকার' বলায় তারা এমন শ্লোগান দিয়েছেন। সাবেক প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের প্রশ্নে কোটাবিরোধীরা রাজু ভাস্কর্যে বিকেলে কর্মসূচির ডাক দেন। একই স্থানে একই সময়ে ছাত্রলীগও প্রতিবাদ কর্মসূচি ঘোষণা করে। ১৫ জুলাই রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে হলে এবং রাজপথে কিছু মনোক্ষুদ্ধমূলক স্লোগান উচ্চারিত হতে থাকে- 'আমি কে? তুমি কে? রাজাকার, রাজাকার, কে বলেছে? কে বলেছে? স্বৈরাচার, স্বৈরাচার।''কোটা প্রথা নিপাত যাক, মেধাবীরা মুক্তি পাক।''হলে হলে খবর দে, কোটা প্রথার কবর দে, সারা বাংলায় খবর দে, কোটা প্রথার কবর দে।'

১৬ জুলাই: আন্দোলনকারীদের ওপর ছাত্রলীগের হামলার বিচার দাবিতে দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ- সমাবেশ করেন বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা। এ সময় বিভিন্ন স্থানে হামলা, সংঘর্ষ ও ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। চট্টগ্রামে কোটা আন্দোলনকারীদের সঙ্গে ছাত্রলীগ-যুবলীগের নেতাকর্মীর রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে তিনজন প্রাণ হারান। চট্টগ্রামে নগরীর মুরাদপুরে পুলিশ ও ছাত্রলীগের সঙ্গে সংঘর্ষে চট্টগ্রাম কলেজের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অনার্স তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী শহীদ ওয়াসিম শহিদ হন। তিনি কক্সবাজারের পেকুয়ার ইউনিয়নের বাসিন্দা ছিলেন। ঘটনায় আহত হন অর্ধশতাধিক ছাত্র-জনতা। গুলিবিদ্ধ আটজন চমেক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। বিকেল ৩টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত নগরীর মুরাদপুর থেকে ২ নম্বর গেট পর্যন্ত দফায় দফায় ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া, হামলা-পাল্টা হামলা, মুহুর্মুহু ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটে। সংঘর্ষে মোহাম্মদপুর এলাকার বেলাল মসজিদের পাশে একটি সাত তলা ভবনের ওপর অবস্থান নেন ছাত্রলীগের নেতাকর্মী। সেখান থেকে তারা আন্দোলনকারীদের লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করলে কয়েকজন আহত হন। বিকেলে নগরীর মুরাদপুরে কোটা সংস্কার আন্দোলনের সমাবেশে ছাত্রলীগ-যুবলীগের নেতাকর্মী হামলা চালালে সংঘর্ষের সূত্রপাত। এ সময় ছাত্রলীগ- যুবলীগের কয়েকজন নেতাকর্মীকে শিক্ষার্থীদের লক্ষ্য করে গুলি চালায়। সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার পর শিক্ষার্থীরা সরে যাওয়া শুরু করলে পরিস্থিতি শান্ত হয়ে আসে। রংপুরে পুলিশের গুলিতে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, আবু সাঈদ নিহত হন। সাধারণ মানুষ, পুলিশসহ আহত হন দুই শতাধিক। কোথাও কোথাও মারধরের শিকার হন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরাও। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সরকার মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজগুলোও বন্ধ ঘোষণা করতে বাধ্য হয়।

১৭ জুলাই: বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকা সর্বাত্মক শাটডাউনে কার্যত অচল ছিল সারা দেশ। এ সময় রাজধানীর বাইরে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পুলিশ ও ছাত্রলীগ-যুবলীগের পৃথক সংঘর্ষ-হামলায় অনেক নিহত শতাধিক গুলিবিদ্ধসহ সহস্রাধিক আহত হয়। দুপুর ১২টা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত ঢাকার সঙ্গে বিচ্ছিন্ন দেশের অধিকাংশ এলাকার রেল যোগাযোগ। সন্ধ্যায় শেখ হাসিনা দেওয়া ভাষণে আন্দোলনকারীদের সর্বোচ্চ আদালতের রায় আসা পর্যন্ত ধৈর্য ধরার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, 'আমার বিশ্বাস, আমাদের ছাত্রসমাজ উচ্চ আদালত থেকে ন্যায়বিচারই পাবে, তাদের হতাশ হতে হবে না।' আন্দোলনকারী ছাত্ররা তাঁর ভাষানের কোন গুরুত্ব দিতে রাজী নয়। 

১৮ জুলাই: কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের 'কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি ঘিরে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ব্যাপক সহিংসতায় সাংবাদিকসহ অন্তত ৩১ জন নিহত হন। নিহতদের মধ্যে ১১ জন ছাত্র। আহত হয়েছেন কয়েকশ মানুষ। এ আন্দোলনে এ পর্যন্ত ৩৭ জন প্রাণ হারান। বিক্ষোভ চলাকালে রাজধানীর রামপুরায় বিটিভি ভবন এবং মহাখালীতে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর ও সেতু ভবনে অগ্নিসংযোগ করে দূষ্কৃতকারীরা। এতে বিটিভির সম্প্রচার বন্ধ হয়ে যায়। কর্মসূচি চলাকালে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ করেন আন্দোলনকারীরা। মেয়র হানিফ ফ্লাইওভারের টোল প্লাজায় আগুন দেওয়া হয়। পুলিশ, র‍্যাব, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ, আনসারসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করছিলেন। বিকেলে জাতীয় সংসদ ভবনে এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেন, 'আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আলোচনায় বসতে রাজি সরকার। শিক্ষার্থীর সঙ্গে আলোচনার জন্য আমাকে ও শিক্ষামন্ত্রীকে দায়িত্ব দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।'  তবে সরকারের সঙ্গে আলোচনায় যাবে না বলে জানিয়েছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন।সন্ধ্যায় বক্তব্যে অন্যতম সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম বলেছিলেন, শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে সহিংসতা চালিয়ে সরকার উদ্ভূত পরিস্থিতি তৈরি করেছে এর দায় সরকারেরই। শহীদের রক্তের ওপর কোনো সংলাপ হবে না। সরকারকেই সমাধানের পথ বের করতে হবে। শাটডাউন কর্মসূচি আজ শুক্রবার বহাল থাকবে। জুমার নামাজের পর গায়েবানা জানাজা পড়ানোর ঘোষণা দেওয়া হয়।এদিকে গতকাল সন্ধ্যায় কোটা পদ্ধতি বাতিলের পরিপত্র অবৈধ ঘোষণা করে হাইকোর্টের দেওয়া রায়ের বিরুদ্ধে লিভ টু আপিলের শুনানির জন্য রোববার দিন ঠিক করেন চেম্বার আদালত। আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চে ওই দিন এ বিষয়ে শুনানি হবে।ঢাকা মেডিক্যাল হাসপাতালে, গতকাল বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা ১৭৩ জনকে আনা হয়। ফায়ার সার্ভিস নিয়ন্ত্রণ কক্ষ জানান বুধবার থেকে গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত সহিংসতায় দেশের বিভিন্ন এলাকায় ২৫টি আগুনের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ঢাকা মহানগরীতেই ১৫টি। ছয়টি বাস, দুটি মাইক্রোবাস, ২০টি মোটরসাইকেল, রাজনৈতিক দলের দুটি কার্যালয়, টোল প্লাজা, থানা, পুলিশ বক্স, একটি পুলিশের গাড়ি ও দুটি সরকারি অফিস ক্ষতিগ্রস্ত হয়। রাত ৯টার পর থেকে ইন্টারনেট সেবা পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হয়। তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস গতকাল ছিল সুনসান। 

১৯ জুলাই: রক্তক্ষয়ী সহিংসতা ও সংঘাতে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় প্রাণ গেছে আরও ৫৬ জনের। ঢাকায় ৪৪ জন। রাজধানীর বাইরে রয়েছেন ১২ জন। আহত হয়েছেন কয়েকশ। এ নিয়ে কোটা সংস্কার দাবিতে চলমান আন্দোলন কর্মসূচিতে অন্তত ১০০ জন মারা গেছেন। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে গতকাল মধ্যরাত থেকে কারফিউ জারি হয়। শেখ হাসিনা তাঁর পূর্বনির্ধারিত স্পেন সফর বাতিল করে ১৪ দলীয় জোটের শীর্ষ নেতাদের নিয়ে বৈঠক করেন। আকাশ থেকে হামলা: কোটা সংস্কার আন্দোলন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে আকাশ থেকে আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা করা হয়েছিল। ৩-৪টি হেলিকপ্টার থেকে আন্দোলনকারীদের ওপর সাউন্ড গ্রেনেড ও গুলিবর্ষণ করা হয়েছিল। এ সময় তিনজন নিহত হলে আন্দোলনকারীদের একটি অংশ ছত্রভঙ্গ হয়ে বিভিন্ন হাউজিংয়ের অলিগলিতে ঢুকে পড়েন। এ সময় হেলিকপ্টারগুলো আরও একটু নিচে নেমে এসে হাউজিংগুলোতে আশ্রয় নেওয়া আন্দোলনকারীদের সাউন্ড গ্রেনেড ও গুলি করতে থাকে। ওপর থেকে একের পর এক সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপে পুরো এলাকা প্রকম্পিত হলে হাউজিংয়ের বাসিন্দারা আতঙ্কিত হয়ে দিগ্বিদিক ছোটাছুটি করতে থাকেন। মিরপুরে ইনডোর স্টেডিয়াম, মৌচাক পুলিশ বক্স, উত্তরায় পুলিশের ডিসি কার্যালয়, টিঅ্যান্ডটির আঞ্চলিক অফিস ও পলওয়েল মার্কেটে অগ্নিসংযোগ করা হয়। মিরপুর ১০ নম্বরে মেট্রোরেলের চলন্ত সিঁড়িতে আগুন দেওয়া হয়। পাল্টাপাল্টি সংঘর্ষে রণক্ষেত্রে পরিণত হয় বহু এলাকা। বিজয়নগর এলাকায়ও ব্যাপক তাণ্ডব চালানো হয়েছে। সড়ক বিভাজকের ওপর কেটে ফেলা হয় গাছ। এদিকে নরসিংদীতে জেলা কারাগারসহ আরও কয়েকটি স্থাপনায় হামলা চালায় দুর্বৃত্তরা। এর পর বেশ কয়েকজন কয়েদি কারাগার থেকে পালিয়ে যান। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে কারাগারসহ দেশের সব সরকারি স্থাপনার নিরাপত্তা আরও জোরদার করা হয়। ঢাকায় মোতায়েন করা হয় বিজিবির ৭৫ প্লাটুন সদস্য। সন্ধ্যার পর ধানমন্ডির একটি গলি থেকে নিখোঁজ হন সমন্বয়ক আবু বাকের মজুমদার। রাত ১১টায় হাতিরঝিলের মহানগর আবাসিক এলাকা থেকে সমন্বয়ক আসিফ মাহমুদকে তুলে নিয়ে আন্দোলন স্থগিত ঘোষণা করার জন্য চাপ দেওয়া হয়। ১৯ জুলাই মধ্যরাতে খিলগাঁওয়ের নন্দীপাড়া এলাকা থেকে প্রধান সমন্বয়ক নাহিদ ইসলামকে তুলে নেওয়া হয়েছিল। একই দিন আসিফ মাহমুদ ও আবু বাকের মজুমদারকেও তুলে নিয়েছিল ।

২০ জুলাই: রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সংঘাতের ঘটনায় দুই পুলিশ, এক আনসার সদস্যসহ ৩৮ জন নিহত হন। রাজধানীর বাইরে নিহতদের মধ্যে নরসিংদীতে সাত, নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে ছয়, ময়মনসিংহে চার, সাভারে চার ও গাজীপুরে চারজন রয়েছেন। রাজধানীর রামপুরা, বাড্ডা, যাত্রাবাড়ী, মোহাম্মদপুর ও বছিলায় ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া এবং সংঘর্ষ হয়েছে। গাজীপুরের টঙ্গীতে বেশ কিছু পোশাক কারখানায় ভাঙচুর করা হয়, দেওয়া হয় আগুন।রাত ১২টা থেকে কারফিউ জারি করার পাশাপাশি নামানো হয় সেনাবাহিনী। এর পর মধ্যরাতে কারফিউর সময়সীমা অনির্দিষ্টকালের জন্য বর্ধিত করা হয়। বিকেল ৩টা থেকে ৫টা পর্যন্ত দুই ঘণ্টা বিরতি থাকবে। এর পর থেকে অনির্দিষ্টকাল কারফিউ চলমান থাকবে বলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়। নির্বাহী আদেশে দুইদিনের সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে সরকার। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে কড়া বার্তা দিয়ে বলা হয়, আন্দোলনের নামে জনগণ ও সরকারি স্থাপনার ক্ষতিসাধন এবং আগুন দেওয়া হলে গুলি করার নির্দেশ দেওয়া হয়। কারফিউ উপেক্ষা করে বিভিন্ন জেলায় সংঘর্ষ, আগুন ও ভাঙচুর, সংঘর্ষ ও পুলিশের গুলিতে বিভিন্ন জেলায় প্রাণ গেছে আরও ২৩ জনের। আহত হয়েছেন পাঁচ শতাধিক মানুষ আহতদের মধ্যে আন্দোলনকারী ছাড়াও পুলিশ এবং সাধারণ মানুষ রয়েছেন। সহিংসতার ঘটনায় বিভিন্ন জেলায় আটক ও গ্রেপ্তার হয় পাঁচ শতাধিক। কারফিউর মধ্যে চট্টগ্রামে কোনো সহিংসতা না ঘটলেও শহরে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছিল। নগরীর গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোয় সেনাবাহিনী ছিল। তিন দিনে সাত মামলায় ১০ হাজার জনকে আসামি করা হয়েছে। গ্রেপ্তার করা হয়েছে আড়াই শতাধিক বিএনপি- জামায়াত নেতাকর্মী ও আন্দোলনকারীকে। এর মধ্যে গত ২৪ ঘণ্টায় বিএনপি- জামায়াতের অর্ধশত নেতাকর্মী গ্রেপ্তার ও সব রুটের ট্রেন ও দূরপাল্লার যানবাহন বন্ধ ছিল ।

২১ জুলাই: ইন্টারনেট না থাকায় অনলাইনভিত্তিক শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ ও শঙ্কিত প্রযুক্তি ব্যবসায়ীরা। ভোগান্তিতে পড়ে দেশের মানুষ। নেটওয়ার্ক জটিলতায় প্রিপেইড মিটারের ব্যালান্স শেষ হলে তারা টাকা রিচার্জ করতে পারছিল না। বিদ্যুৎ না থাকায় পানি সংকট দেখা দিয়েছিল, গ্যাসের প্রিপেইড গ্রাহকরাও দুর্ভোগে পড়েছিলেন। অনলাইন ভিত্তিক আর্থিক কার্যক্রম থমকে গেছিল। কয়েক লাখ ফ্রিল্যান্সার কাজ হারানো ঝুঁকিতে পড়েছেন। বিমানের টিকিট বিক্রি বাধাগ্রস্ত হয়েছিল। দ্রুত সংবাদ আদান-প্রদান ও তথ্য যাচাই ব্যাহত ও বন্ধ ছিল অনলাইন সংবাদ মাধ্যমের প্রকাশনা। ১৯ জুলাই মধ্যরাতে খিলগাঁওয়ের নন্দীপাড়া এলাকা থেকে তুলে নেওয়া প্রধান সমন্বয়ক নাহিদ ইসলামকে ২১ জুলাই ভোরে ফেলে যাওয়া হয় পূর্বাচল এলাকায়।

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের যাত্রাবাড়ীর রায়েরবাগ এলাকা, রামপুরা ও বাড্ডায় বিক্ষিপ্ত ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া এবং সংঘর্ষ হলে এতে আরও চারজন নিহত হয়। এ ছাড়া ঢাকা মেডিকেল কলেজে (ঢামেক) চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও পাঁচজন মারা যান। এ ছাড়া ঢাকার বাইরে নরসিংদীতে চার, সাভারে একজন নিহত হয়। ঢাকায় পথে পথে চেকপোস্ট বসিয়ে তল্লাশি করা হয় । সেনাবাহিনীকে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় টহল দিতে দেখা যায়। এর মধ্যেই ঢাকার দু-তিনটি এলাকায় অলিগলি থেকে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে বিক্ষোভকারীরা। বিকেল ৩টা থেকে ৫টা পর্যন্ত কারফিউ শিথিল করে পরবর্তী ঘোষণা না দেওয়া পর্যন্ত অনির্দিষ্টকাল বলবৎ থাকার কথা জানানো হয়। আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম রাতে সাংবাদিকদের বলেছিলেন, কারফিউ চলমান থাকায় আগামী ৪৮ ঘন্টার জন্য আন্দোলনের সব কর্মসূচি স্থগিত করা হয়েছে। ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে কারফিউ তুলে নিতে হবে এবং ইন্টারনেট চালু করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দিতে হবে। শিক্ষার পরিবেশ স্বাভাবিক করার দাবি জানান তিনি। কোটা নিয়ে হাইকোর্টের দেওয়া রায় বাতিল করে দিয়ে আপিল বিভাগের দেওয়া রায়ের পর্যবেক্ষণে চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে ৯৩ শতাংশ নিয়োগ মেধার ভিত্তিতে, মুক্তিযোদ্ধা, শহীদ মুক্তিযোদ্ধা ও বীরাঙ্গনার সন্তানদের জন্য ৫ শতাংশ, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জন্য ১ শতাংশ এবং প্রতিবন্ধী ও তৃতীয় লিঙ্গের জন্য ১ শতাংশ কোটা সংরক্ষণ করা হয়। তবে সরকারের নির্বাহী বিভাগ চাইলে এই কোটা পুনর্বিন্যাসসহ যে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারবে। অন্যদিকে এ আন্দোলনের ৫৯ সমন্বয়ক ও সহসমন্বয়কের পক্ষে সন্ধ্যায়  আবদুল কাদেরের পাঠানো বিবৃতিতে বলা হয়, সর্বোচ্চ আদালতের রায় অস্পষ্ট। এতে বিভ্রান্তির সুযোগ রয়েছে। সব কোটার বিষয়ে সুস্পষ্ট সমাধান নেই। কোটা নিয়ে সরকারের যথেচ্ছ ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে। তিনি এক সপ্তাহের মধ্যে সংসদের বিশেষ অধিবেশন ডেকে আইন পাসের দাবি জানান। বিবৃতিতে বলা হয়, গণআন্দোলন দমন করতে ইন্টারনেট সেবা বন্ধ করে পরিস্থিতি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে। আবদুল কাদের তাদের দাবি মেনে নেওয়া ও ছাত্র-জনতার ওপর গুলি চালানো বন্ধ করার জন্য সরকারের প্রতি আহবান জানান।

২২ জুলাই: সারাদেশে চিরুনি অভিযান ও সংঘর্ষ অব্যাহত থাকে। ১৮ থেকে ২২ জুলাই-পাঁচ দিনে সংঘর্ষে হতাহত কয়েক হাজার ব্যক্তিকে নেওয়া হয়েছিল রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতালে। তাদের মধ্যে নারী, শিশুসহ সব বয়সী মানুষ ছিলেন। অধিকাংশ ছিলেন ছররা এবং বুলেট দুই ধরনের গুলিই ছিল আহতদের শরীরে। নিহত ব্যক্তিদের বড় অংশই ছিলেন বুলেটবিদ্ধ। ১৯ এবং ২০ জুলাই চিকিৎসা নিতে আসা আহত বেশির ভাগ বুলেট বিদ্ধ। আগের দুই দিনের আহতরা ছিলেন ছররা গুলিবিদ্ধ।এদিকে শেখ হাসিনা আন্দোলনকারী ছাত্রদের দমাতে ব্যর্থ হয়ে তাদের সংলাপে বসার আহ্বান জানান। সাবেক প্রধানমন্ত্রীর এই প্রস্তাবের ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যেই আন্দোলনকারীরা প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাব সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে ছাত্ররা বলেছিলেন, দুই শতাধিক ছাত্র-জনতার শহীদ হওয়ার পর আন্দোলন আর কোটার মধ্যে সীমাবদ্ধ নাই। তাদের দাবী গড়িয়েছিল এক দফায়। আর সেটা হলো, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং তার সমস্ত মন্ত্রীসভার পদত্যাগ।

২৩ জুলাই: কোটা সংস্কার আন্দোলন ঘিরে ঢাকাসহ দেশজুড়ে গ্রেপ্তারে সাঁড়াশি অভিযান অব্যাহত থাকে। নাশকতার স্পটের আশপাশ এলাকাসহ বিভিন্ন স্থানের অলিগলি, এমনকি বাড়ি বাড়ি গিয়ে সন্দেহ হলে মোবাইল ফোন যাচাই করে কোনো আলামত পেলেই আটক করতে থাকে। এ প্রেক্ষিতে চার দফা দাবি জানিয়ে সরকারকে ৪৮ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দিয়েছিল কোটা সংস্কার আন্দোলনের এই প্লাটফর্ম। কোটা পুনর্বহাল করে হাইকোর্টের রায় বাতিল করে কোটা ব্যবস্থার সংস্কার করে আদেশ দিয়েছিল আপিল বিভাগ। মঙ্গলবার একটি সংবাদ সম্মেলনে আইনমন্ত্রী জানান, সুপ্রিম কোর্টের রায়ের আলোকে কোটা সংস্কার করে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। এরপর নিজেদের প্রতিক্রিয়া জানাতে মঙ্গলবার বিকেলে রাজধানীর ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে সংবাদ সম্মেলন করেন। সংবাদ সম্মেলনে তাঁরা, কোটা আন্দোলন ঘিরে যে রক্তপাত ও হত্যাকাণ্ড ঘটেছে তার দায় সরকার এড়াতে পারে না। যে কারণে সারাদেশে কারফিউ প্রত্যাহার, ইন্টারনেট সংযোগ চালু, বন্ধ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়া ও সারা দেশের সমন্বয়ক ও আন্দোলনকারীদের নিরাপত্তার দাবি জানানো হয়। এই চার দফা দাবি বাস্তবায়নে সরকারকে ৪৮ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দিয়েছিলেন শিক্ষার্থীরা।

২৪ জুলাই: শেখ হাসিনা বিভিন্ন গণমাধ্যম ব্যক্তিদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে বলেছিলেন, আমি জানতাম যে নির্বাচন করতে দেবে না। তারপরও আমরা নির্বাচন করে ফেলেছি। পরে বলা হলো, নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হবে না, সেটাও গ্রহণযোগ্য করতে পেরেছি। সরকার গঠন করতে পেরেছি। আমার ধারণা ছিল, এই ধরনের একটা আঘাত আবার আসবে। কোটা আন্দোলন কেন্দ্র করে সহিংস পরিস্থিতি সৃষ্টির পেছনে অনেক বড় ষড়যন্ত্র ছিল জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, এটা যে একটা বিরাট চক্রান্ত- সেটা বোঝাই যাচ্ছিল। এবার আমরা কিন্তু আগে থেকে খবর পেয়েছি, ঢাকায় লোক ঢুকবে। ১৯ জুলাই তুলে নেওয়া আসিফ মাহমুদ ও আবু বাকের মজুমদারকে ২৪ জুলাই আসিফকে হাতিরঝিল ও বাকেরকে ধানমন্ডি এলাকায় ফেলে যাওয়া হয়। টানা তিন কার্যদিবস বন্ধ থাকার পর আজ  ১১টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত ব্যাংকগুলো খোলা হয়েছিলেন। ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতি গ্রেফতারের তীব্র নিন্দা: ছাত্র শিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি মঞ্জুরুল ইসলাম ও সেক্রেটারি জেনারেল জাহিদুল ইসলাম এক যৌথ বিবৃতিতে ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহেরকে গ্রেফতারে নিন্দা ও প্রতিবাদ জানান। তারা বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের আন্দোলনকে দমাতে ব্যর্থ হয়ে সরকার দমনপীড়নের পথ বেছে নিয়েছে। চিরুনি অভিযানের নামে সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে বিরোধী দলের শীর্ষ নেতাদের গ্রেফতার করা হচ্ছে। এরই ধারাবহিকতায় রাতে বাংলাদেশের অত্যন্ত সুপরিচিত ও ক্লিন ইমেজের রাজনীতিবীদ, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহেরকে (সাবেক এমপি) অন্যায়ভাবে গ্রেফতার করা হয়। আজ আদালতে হাজির করে অন্যায়ভাবে পাঁচ দিনের রিমান্ড দেয়। আমরা এই গ্রেফতার ও রিমান্ডের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি।’

২৫ জুলাই: চলমান চিরুনি অভিযানে গত ২৪ ঘণ্টায় বিএনপি-জামায়াতের ঢাকায় আরও ৪৫১ জনকে গ্রেপ্তার করে। এ নিয়ে ঢাকায় মোট ২ হাজার ২০৯ জনকে গ্রেপ্তার করা হলো। মামলার সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২০১টি। এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন স্থানে আরও ১৭১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। রাতে মোহাম্মদুপর সূচনা কমিউনিটি সেন্টারে মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের ঢাকা-১৩ আসনের তিন থানা ও ওয়ার্ড নেতাদের বৈঠকে মোহাম্মদপুর, আদাবর ও শেরেবাংলা নগর থানার ২৭টি ইউনিটের দায়িত্বপ্রাপ্ত সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকরা আন্দোলন মোকাবিলায় সরাসরি অংশ নেননি বলে অভিযোগ ওঠে। অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে এসব ইউনিটের কমিটি ভেঙে ফেলা হয়েছে। 

২৬ জুলাই: শেখ হাসিনা বাংলাদেশ টেলিভিশন ভবনে (বিটিভি) চালানো ধ্বংসযজ্ঞ পরিদর্শন কালে বরাবরের মত  তিনি বিএনপি-জামায়াত ও শিবিরকে দায়ী করেন। ধ্বংসযজ্ঞে জড়িতদের গ্রেপ্তার করে বিচারের আওতায় আনতে আহ্বান জানান তিনি।এদিকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম, আসিফ মাহমুদ ও আব্দুল বাকের মজুমদারকে বিকেলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ঢাকার গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র থেকে নিরাপত্তার অজুহাত দেখিয়ে ডিবি কার্যালয়ে বন্দি করা হয়। গণস্বাস্থ্য হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক আনোয়ারা বেগম লাকী গণমাধ্যমকে বলেছিলেন, 'বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের তিন সমন্বয়ক আমাদের হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। তারা এখনও পুরোপুরি সুস্থ নন। তাদের হাসপাতাল থেকে রিলিজও দেওয়া হয়নি। তবে সবাই নিজেদের ডিবি পুলিশ পরিচয় দিয়েছেন।'

২৭ জুলাই: চলমান চিরুনি অভিযানে সন্ধ্যায় সমন্বয়ক সারজিস আলম ও হাসনাত আবদুল্লাহকে ডিবি কার্যালয়ে বন্দি করা হয়। তাঁরা গণস্বাস্থ্য নগর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। ‘বাংলাদেশ প্রতিদিন’ মিথ্যা ও বানোয়াট প্রচারে নিন্দা: বাংলাদেশ প্রতিদিন পত্রিকা ছাত্রশিবিরকে নিয়ে মিথ্যা ও বানোয়াট খবর প্রচার করায় তীব্র নিন্দা জানান। কেন্দ্রীয় সভাপতি মঞ্জুরুল ইসলাম ও সেক্রেটারি জেনারেল জাহিদুল ইসলাম বলেন,‘অবৈধ আওয়ামী লীগ সরকারের চালানো গণহত্যার প্রসঙ্গকে পাশ কাটিয়ে জনগণের দৃষ্টি ভিন্নখাতে প্রবাহিত করতে আওয়ামী বাহিনী জামায়াত-শিবিরসহ বিরোধী দলের ওপর মিথ্যা ও মনগড়া বয়ান তৈরি করার মিশনে নেমেছে। তার সুরে সুর মিলিয়ে জাতীয় দৈনিক ‘বাংলাদেশ প্রতিদিন' আজকের সংখায় (২৭ জুলাই) ‘যুবলীগ কর্মীকে হত্যার পর গাছে ঝুলিয়ে রাখে জামায়াত-শিবির' শিরোনামে যে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, তা জাতির জন্য সত্যিই দুর্ভাগ্যজনক! মিডিয়া তো জনগণের কথা বলবে, কিন্তু, বাংলাদেশ প্রতিদিন কর্তৃপক্ষ কেন সরকারের মূখপাত্রের ভূমিকা পালন করছে তা আমাদেরও বোধগম্য নয়। নেতৃবৃন্দ বলেন, উল্লিখিত ঘটনার সাথে ছাত্রশিবিরের দূরতম কোনো সম্পর্ক নেই। আমরা এই উদ্দেশ্যমূলক, মিথ্যা ও বানোয়াট প্রতিবেদনের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি এবং অবিলম্বে এ প্রতিবেদন প্রত্যাহারের জোর দাবি জানাচ্ছি। নেতারা বলেন, প্রতিবেদন দেখে মনে হয়েছে তাদের ওপর সরকারের অপশক্তি ভর করেছে। তাই তারা নীতিবোধ ভুলে গিয়ে একটা নিয়মতান্ত্রিক ছাত্রসংগঠনের ওপর অপবাদ ছড়াচ্ছে। এটা জাতির জন্য খুবই হতাশাজনক। এ ধরনের একপেশে আচরণ থেকে আপনারা বের হয়ে না এলে জনগণ থেকে আরো বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবেন। সেইসাথে জাতীয় দৈনিক পত্রিকা হিসেবে পেশাদার ভূমিকা পালন করার পরামর্শ দেন।সন্ধ্যায় অনলাইনে সংবাদ সম্মেলনে দেয়াল দেয়ালে গ্রাফিতি ও দেয়াললিখন কর্মসূচির ঘোষণা দেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক আবদুল হান্নান মাসউদ, মাহিন সরকার ও সহসমন্বয়ক রিফাত রশীদ। আগামীকালের (রোববার) মধ্যে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়কসহ সব শিক্ষার্থীর মুক্তি, ‘মিথ্যা মামলা’ প্রত্যাহার ও শিক্ষার্থীদের হত্যার সঙ্গে জড়িত সব দোষী ব্যক্তির বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা নিতে হবে। তা না হলে পরশুদিন (কাল) থেকে তাঁরা কঠিন কর্মসূচি নিতে বাধ্য হবেন।

২৮ জুলাই: ডিবি কার্যালয়ে থাকা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ছয় সমন্বয়ক আন্দোলন প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়েছেন মর্মে জোরপূর্বক ঘোষনা পত্রে স্বাক্ষর নেওয়া হয়। যা রবিবার রাতে এ সংক্রান্ত একটি ঘোষণাপত্রে ছয় সমন্বয়ক স্বাক্ষর করেছেন। এরা হলেন নাহিদ ইসলাম, সারজিস আলম, হাসনাত আব্দুল্লাহ, আবু বাকের মজুমদার, আসিফ মাহমুদ ও নুসরাত তাবাসসুম। তবে আত্মগোপনে থাকা অন্য সমন্বয়করা জানিয়েছেন, ডিবি কার্যালয়ে থাকা নেতাদের অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে আন্দোলন প্রত্যাহারের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে ডিবি কার্যালয় থেকে নাহিদ ইসলামের আন্দোলন প্রত্যাহারের ঘোষণাকে 'জোরপূর্বক স্ক্রিপ্টেড বিবৃতি' আখ্যা দিয়ে তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানানো হয়।বিবৃতিতে বলা হয়, গত ২৬ জুলাই ঢাকার গণস্বাস্থ্য নগর হাসপাতাল থেকে তিন সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম, আসিফ মাহমুদ ও আবু বাকের মজুমদারকে ডিবি জোর করে তুলে মিন্টো রোডের কার্যালয়ে নিয়ে যায়। নাহিদ ও আসিফ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। পরদিন ২৭ জুলাই সারজিস ও হাসনাতকে সায়েন্স ল্যাব এলাকা থেকে জোর করে তুলে ডিবি কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। ২৮ জুলাই ভোররাতে বাসা ভেঙে জোর করে নুসরাতকে ডিবি কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। মূলত আন্দোলন ও নেতৃত্বকে ছত্রভঙ্গ করতেই ১৯ জুলাই থেকে সমন্বয়কদের গুম, গ্রেপ্তার, নির্যাতন ও হয়রানি করা হচ্ছে। এর ধারাবাহিকতায় নিরাপত্তার নামে ছয় সমন্বয়ককে ডিবি হেফাজতে জোর করে আটকে রাখা হয়।আন্দোলন প্রত্যাহারের ঘোষণা-সংক্রান্ত ডিবি কার্যালয় থেকে প্রচারিত ছয় সমন্বয়কের ভিডিও বিবৃতিটি তাঁরা স্বেচ্ছায় দেননি বলে যৌথ বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়। এতে বলা হয়, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কোনো সিদ্ধান্ত ডিবি কার্যালয় থেকে আসতে পারে না। সারা দেশের সব সমন্বয়ক ও আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ ছাড়া কোনো সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত বলে গৃহীত হবে না। ডিবি কার্যালয়ে তাঁদের জোর করে খাবার টেবিলে বসিয়ে ভিডিও করা হয়। তাঁদের ছেড়ে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে পরিবারকে ডেকে ১৩ ঘণ্টা বসিয়ে রাখা হয়।অন্যায়ভাবে সমন্বয়কদের আটক, সারা দেশে শিক্ষার্থীদের গ্রেপ্তার ও নির্যাতনের প্রতিবাদে ৩০ জুলাই রাত থেকে সমন্বয়ক নাহিদ, আসিফ ও আবু বাকের ডিবি কার্যালয়ে আটক অবস্থায় অনশন শুরু করেন। এ খবর জানামাত্র সারজিস, হাসনাত ও নুসরাতও অনশন শুরু করেন। বিবৃতিতে আরও বলা হয়, অনশনের কথা পরিবার ও গণমাধ্যমের কাছ থেকে গোপন করা হয়। ৩২ ঘণ্টার বেশি সময় অনশনের পর ডিবিপ্রধান ছয় সমন্বয়ককে মুক্তির চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেন। তখন অনশন ভাঙা হয়। ১ আগস্ট দুপুর দেড়টায় পরিবারের জিম্মায় তাঁদের ছেড়ে দেওয়া হয়। ডিবি কার্যালয়ে তাঁদের ও পরিবারের সঙ্গে নানা হয়রানি, নির্যাতন ও নাটক মঞ্চস্থ করা হয়েছে। তাঁরা এর তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নির্দেশেই তাঁদের অন্যায়ভাবে আটকে রাখা হয়েছিল। প্রতিবাদে পরদিন সোমবার বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন সারাদেশে ছাত্র-জনতার বিক্ষোভ কর্মসূচি এবং প্রতিবাদ সমাবেশ করার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। ফেসবুক, হোয়াটসআপ, ইউটিউব ও টিকটক বন্ধ রেখে ১০ দিন পর চালু হয় মোবাইল ইন্টারনেট।সারাদেশে গণগ্রেফতার রিমান্ডে নিয়ে জুলুম-নির্যাতন ও শতশত ছাত্রদের কান্নার আওয়াজে আকাশ বাতাস ভারি হয়ে যায়। আর সরকার কঠোর থেকে আরো কঠোরে যাচ্ছে। সরকার ছাত্রদের যৌক্তিক আন্দোলনকে স্তব্ধ করে দিতে চাচ্ছেন বলে অভিযোগ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের।

গণগ্রেফতার বন্ধে জামায়াতে ইসলামীর বিবৃতি : বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা এটিএম মা’ছুম এক বিবৃতিতে বলেন, বৈষম্যবিরোধী শান্তিপূর্ণ ছাত্র আন্দোলন নস্যাৎ করে দেয়ার জন্য সরকার ছাত্রদের বুকে গুলি চালিয়ে দেশে গণহত্যা করেছে। ছাত্রদের অরাজনৈতিক আন্দোলনকে দমন করতে গিয়ে রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করে দেশে রক্তের বন্যা বয়ে দিয়েছে সরকার। দেশের ছাত্রসমাজ, শিক্ষকসমাজ, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবীসহ সর্বস্তরের জনগণ সরকারের এই গণহত্যার বিরুদ্ধে যখন ঐক্যবদ্ধ তখন সরকার গণরোষ থেকে বাঁচার জন্য এ আন্দোলনকে রাজনৈতিক রূপ দিয়ে দলীয় নেতা-কর্মীদের গণহারে গ্রেফতার করছে। গত ১১ দিনে সারাদেশে কোমলমতি শিক্ষার্থীসহ ১০ সহস্রাধিক লোককে গ্রেফতার করা হয়েছে। অনেককে বাড়িঘর থেকে তুলে নিয়ে গুম করা হচ্ছে। গ্রেফতারকৃতদের অনেককে রিমান্ডে নিয়ে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হচ্ছে।বিবৃতিতে তিনি বলেন, বৈষম্যবিরোধী শান্তিপূর্ণ ছাত্র আন্দোলন নস্যাৎ করে দেয়ার জন্য সরকার ছাত্রদের বুকে গুলি চালিয়ে দেশে গণহত্যা করেছে। ছাত্রদের অরাজনৈতিক আন্দোলনকে দমন করতে গিয়ে রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করে দেশে রক্তের বন্যা বয়ে দিয়েছে সরকার। দেশের ছাত্রসমাজ, শিক্ষকসমাজ, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবীসহ সর্বস্তরের জনগণ সরকারের এই গণহত্যার বিরুদ্ধে যখন ঐক্যবদ্ধ তখন সরকার গণরোষ থেকে বাঁচার জন্য এ আন্দোলনকে রাজনৈতিক রূপ দিয়ে দলীয় নেতা-কর্মীদের গণহারে গ্রেফতার করছে। গত ১১ দিনে সারাদেশে কোমলমতি শিক্ষার্থীসহ ১০ সহস্রাধিক লোককে গ্রেফতার করা হয়েছে। অনেককে বাড়িঘর থেকে তুলে নিয়ে গুম করা হচ্ছে। গ্রেফতারকৃতদের অনেককে রিমান্ডে নিয়ে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হচ্ছে।বিবৃতিতে তিনি আরো বলেন, আদালতের আদেশ অবজ্ঞা করে রিমান্ডে নিয়ে রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদেরকে পঙ্গু করে দেয়া হচ্ছে। ডাকসুর সাবেক ভিপি নূরুল হক নূরের স্ত্রী তার সাথে সাক্ষাতের পর সাংবাদিকদের জানান, নূরের ওপর সীমাহীন নির্যাতন করা হয়েছে। যাদেরকে সুস্থ অবস্থায় গ্রেফতার করা হয়েছে তাদেরকে নির্যাতন চালিয়ে অসুস্থ অবস্থায় আদালতে হাজির করা হয়েছে। শিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি হাফেজ রাশেদুল ইসলামকে ৮ দিন আটক রেখে সরকার একটা নাটক সাজিয়ে তাকে মিথ্যা মামলায় গ্রেফতার দেখিয়েছে।গণগ্রেফতার, গণনির্যাতন বন্ধ করে ও গ্রেফতারকৃতদের অবিলম্বে মুক্তি দিয়ে এবং ছাত্রদের দাবিসমূহ মেনে নিয়ে কারফিউ প্রত্যাহার করে দেশে স্বস্তির পরিবেশ ফিরিয়ে আনার জন্য আহ্বান জানানো হয়। 

২৯ জুলাই: ১৪ দলের বৈঠকে জামায়াত-শিবিরের রাজনীতি নিষিদ্ধ করার সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে। গণভবনে অনুষ্ঠিত ১৪ দলের বৈঠকে এই সিদ্ধান্ত গৃহীত হওয়ার পরপরই জামায়াত-শিবিরের রাজনীতি নিষিদ্ধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে স্বরাষ্টমন্ত্রী ও আইনমন্ত্রীকে নির্দেশ দেন শেখ হাসিনা। বৈঠক শেষে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের সাংবাদিকদের বলেন, ১৪ দলীয় জোটের নেতৃবৃন্দ মনে করেন বিএনপি, জামায়াত, ছাত্রদল, শিবির এবং তাদের দোসর উগ্রবাদী জঙ্গি গোষ্ঠী বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব নস্যাৎ করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। তারা সন্ত্রাস, নৈরাজ্য, হত্যাকান্ডের মাধ্যমে দেশকে অকার্যকর করার ষড়যন্ত্র করছে। অতি সম্প্রতি চোরা-গোপ্তা হামলা করে এবং গুলি বর্ষন করে সরকারের উপর দায় চাপাতে তারা দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে। পুলিশ বাহিনীর সদস্যসহ মানুষ হত্যা করে লাশ পর্যন্ত ঝুলিয়ে রেখেছে। এই সন্ত্রাসী গোষ্ঠী যে প্রক্রিয়ায় হত্যাকান্ড ঘটিয়েছে তা ইতিহাসে নজিরবিহীন। জাতীয় স্বার্থে দেশবিরোধী এ অপশক্তিকে নির্মূল করা প্রয়োজন। এদিকে ছয় সমন্বয়ককে ডিবি হেফাজতে রাখার আইনগত বৈধতার প্রশ্নে দায়েরকৃত রিটের শুনানিকালে রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলির বক্তব্যের প্রেক্ষিতে আদালত বলেন, "যাকে খুশি তাকে ধরে নিয়ে গিয়ে খাবার টেবিলে বসিয়ে দেন, ছবি তুলে আবার সেটি প্রচারও করেন। জাতিকে নিয়ে মশকরা করবেন না। "রিটকারীর পক্ষে ব্যারিস্টার সারা হোসেন বলেন, 'ডিবি দাবি করেছে নিরাপত্তার জন্যই ছয় সমন্বয়ককে তুলে নেওয়া হয়েছে। এদের গ্রেফতার বা আটক করা হয়নি। কিন্তু সংবিধানে এভাবে কাউকে তুলে নিয়ে হেফাজতে রাখার কোনো সুযোগ নেই। এমনকি কোনো আইনেও নেই। তাহলে তাদের কেন ছেড়ে দেওয়া কিংবা কোনো আদালতে হাজির করা হচ্ছে না। তাহলে এভাবে আটক রাখার ক্ষমতা ডিবি কোথায় পেল? নিরাপত্তার স্বার্থে কাউকে তুলে নেওয়া যায়, এটা কোথায় আছে? গ্রেফতারি পরোয়ানা ছাড়া কাউকে তুলে নেওয়ার কথা কোথায় আছে? আমরা কখনো এই ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হইনি। এই ছয় জনের মুক্তি চাই।' রিটকারীর পক্ষে অ্যাডভোকেট জেড আই খান পান্না বলেন, 'আজকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার নামে যা হচ্ছে, তা মেনে নেওয়া যায় না। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীনাগরিকের মোবাইল পরীক্ষা করছে, এতে তো ব্যক্তির গোপনীয়তা লঙ্ঘন হচ্ছে।' শুনানী শেষে পরদিন মঙ্গলবার আদেশের জন্য দিন ধার্য্য করে হাইকোর্ট। কোটা সংস্কার আন্দোলনকে ঘিরে যেভাবে গ্রেফতারের হিড়িক শুরু হয়েছে, সেটিকে ‘গণগ্রেফতার’ ও ‘নির্বিচারে আটক’ হিসেবে উল্লেখ করেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। সোমবার একটি বিবৃতিতে ছাত্রনেতা ও আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীদেরকে ‘নির্বিচারে আটক’ বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি। বিবৃতিতে বিভিন্ন প্রতিবেদনের ভিত্তিতে বলা হয়েছে যে বাংলাদেশে সপ্তাহজুড়ে নয় হাজারের বেশি মানুষকে গ্রেফতার করা হয়েছে, যা সম্পূর্ণ ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ বলেন সংগঠনের দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের পরিচালক স্মৃতি সিং।

রাষ্ট্রীয় শোক পালন কর্মসূচি প্রত্যাখ্যান করে মঙ্গলবার লাল কাপড় মুখে ও চোখে বেঁধে ছবি তোলা এবং অনলাইনে ব্যাপক প্রচার কর্মসূচি পালনের আহ্বান জানিয়েছে কোটাসংস্কার আন্দোলনকারীরা। সোমবার রাতে পাঠানো এক বিবৃতির মাধ্যমে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক মাহিন সরকার এ কর্মসূচি ঘোষণা করেন।বিবৃতিতে, চলমান কোটাসংস্কার আন্দোলনে দেশজুড়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক দাবিকে কেন্দ্র করে নির্বিচারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গুলিতে শত শত শিক্ষার্থীর মৃত্যু ও হাজার হাজার ছাত্র-জনতা আহত হয়ে যখন মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছে, তখনও শিক্ষার্থীদের দাবি মেনে না নিয়ে একাত্তরের হানাদার বাহিনীর মতো মধ্য রাতে বাসাবাড়িতে রেইড ব্লকের মাধ্যমে নিরপরাধ শিক্ষার্থীদের তুলে নিয়ে রিমান্ডের নামে বর্বর নির্যাতন চালানো হচ্ছে।

এ ছাড়া একই বিবৃতিতে আন্দোলনকারীদের পক্ষ থেকে ৯ দফা দাবি সম্পর্কে জানানো হয়েছে। 

দাবিগুলো হলো: ১. শেখ হাসিনাকে ছাত্র-নাগরিক হত্যার দায় নিয়ে জাতির কাছে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইতে হবে ।  ২. আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও দলীয় ক্যাডার এবং সন্ত্রাসী কর্তৃক ছাত্র-নাগরিক হত্যার দায় নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল, আইনমন্ত্রী আনিসুল হককে মন্ত্রিপরিষদ থেকে পদত্যাগ করতে হবে। ইন্টারনেট শাটডাউন করে দেশে ডিজিটাল ক্র্যাকডাউন করায় তথ্য প্রতিমন্ত্রী জুনায়েদ আহমেদ পলককে পদত্যাগ করতে হবে। আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় শহীদ শিক্ষার্থী এবং আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদেরকে ড্রাগ এডিক্ট বলে কুরুচিপূর্ণ ও মিথ্যা বক্তব্য দিয়ে এবং আন্দোলনকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করায় তথ্য প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ এ আরাফাতকে পদত্যাগ করতে হবে। ৩. ঢাকাসহ যত জায়গায় ছাত্র-নাগরিক শহীদ হয়েছেন সেখানকার ডিআইজি, পুলিশ কমিশনার ও পুলিশ সুপারদের চাকরি থেকে বরখাস্ত করতে হবে। ৪. ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়সহ সারা দেশের প্রত্যেকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে যেখানে ক্যাম্পাসে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কর্তৃক শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে হামলা হয়েছে, প্রত্যেকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি এবং প্রক্টরদেরকে পদত্যাগ করতে হবে। ৫. যে পুলিশ-বিজিবি- র্যাবের সদস্যরা শিক্ষার্থীদের ওপর গুলি করেছে, ছাত্রলীগ-যুবলীগসহ যে সব সন্ত্রাসী শিক্ষার্থীদের ওপর নৃশংস হামলা পরিচালনা করেছে এবং যেসব নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ছাত্র-নাগরিকদের ওপর গুলি করার নির্দেশ দিয়েছে তাদেরকে আটক করে হত্যা মামলা দায়ের করতে হবে ও দ্রুততম সময়ের মধ্যে গ্রেফতার করতে হবে। ৬. দেশব্যাপী যেসব ছাত্র-নাগরিক শহীদ এবং আহত হয়েছেন তাদের পরিবারকে অতি দ্রুত সময়ের মধ্যে যথাযথ ক্ষতিপূরণ প্রদান করতে হবে। ৭. ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়সহ সারা দেশের প্রত্যেকটি বিশ্ববিদ্যালয় এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রলীগ নামক সন্ত্রাসী সংগঠনসহ সব দলীয় লেজুড়বৃত্তিক ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করে দ্রুততম সময়ে নিয়মতান্ত্রিকভাবে ছাত্র সংসদ কার্যকর করতে হবে। ৮. অবিলম্বে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও হলগুলো খুলে দিতে হবে। কারফিউ তুলে নিয়ে সারা দেশের সব ক্যাম্পাসে মোতায়েনকৃত পুলিশ, র্যাব, বিজিবি, সোয়াট এবং আর্মি তুলে নিতে হবে। ৯. বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাথে সম্পৃক্ত শিক্ষার্থীদের একাডেমিক ও প্রশাসনিক কোনো ধরনের হয়রানি করা হবে না এই মর্মে অঙ্গীকার করতে হবে। ইতোমধ্যে গণগ্রেফতার ও পুলিশি হয়রানির শিকার সমন্বয়কবৃন্দ ও ছাত্র-নাগরিকদের অবিলম্বে মুক্তি দিতে হবে ও সব মামলা প্রত্যাহার করতে হবে।

৩০জুলাই: প্রোফাইল পিকচার লাল করে প্রতিবাদ: সরকার দেশব্যাপী গণহত্যা চালিয়ে তারপর ছাত্রদের আন্দোলনকে ‘সহিংসতা’ হিসেবে উল্লেখ করে নিহতদের স্মরণে শোক দিবস ঘোষণা করেছে। যা ‘শহীদদের সঙ্গে তামাশা’ বলে তারা মনে করেন কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীরা। এর প্রতিবাদে প্রোফাইল পিকচার লাল তাদের এই অবস্থান। ফেসবুক জুড়ে বাংলাদেশ কিংবা প্রবাসে যারা কোটা আন্দোলনে সৃষ্ট সহিংসতায় নিহতদের স্মরণ করেন, তারা মঙ্গলবার (৩০ জুলাই) প্রোফাইল পিকচার লাল করেন। ফেসবুকের প্রোফাইল লাল রঙের ফ্রেমে রাঙান অনেকে। অন্যদিকে সরকার–সমর্থকদের অনেকে ফেসবুক প্রোফাইলে কালো রঙের ফ্রেম জুড়েছেন।তাদের সেই আহ্বানে দেশের সাধারণ শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে শিক্ষক, সাংবাদিকসহ সব পেশার লোকদের তাদের ফেসবুক প্রোফাইল পিকচার পরিবর্তন করে ‘লাল রঙ’ দেন। রাষ্ট্রীয় শোক পালনে কালো প্রোফাইল ছবি দিচ্ছেন যারা, তাদের সঙ্গে অনলাইন যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে দেখা গেছে অনেক লালকে। চলছে পাল্টাপাল্টি তর্ক-বিতর্ক, আনফ্রেন্ড-আনফলোর দ্বন্দ্বও। রাতে টেলিগ্রাম অ্যাপে কোটা সংস্কার আন্দোলনের কেন্দ্রীয় সমন্বয়কদের মুক্তি, শিক্ষার্থী হত্যা, গ্রেপ্তার শিক্ষার্থীদের মুক্তিসহ ৯ দফা দাবিতে 'মার্চ ফর জাস্টিস' কর্মসূচির ঘোষণা দেন অন্যতম সমন্বয়ক আবদুল কাদের। ঘোষণায় দেশের সব আদালত, ক্যাম্পাস ও রাজপথে এ কর্মসূচি পালন করা হবে জানানো হয়।

জামায়াত নিষিদ্ধের প্রতিবাদে বিবৃতি: জামায়াত নিষিদ্ধের প্রতিবাদে বিবৃতিতে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘২৯ জুলাই ১৪ দলের বৈঠকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধের যে বেআইনি, এখতিয়ার বহির্ভূত ও সংবিধান পরিপন্থী সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে তার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি। ১৪ দলীয় জোট একটি রাজনৈতিক প্লাটফর্ম। একটি রাজনৈতিক দল বা জোট অন্য একটি রাজনৈতিক দলের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। বাংলাদেশের আইন ও সংবিংধান কাউকে এ এখতিয়ার দেয়নি। কোনো দল বা জোট অন্য কোনো দলকে নিষিদ্ধ করার ধারা চালু হলে এক দল অন্য দলকে নিষিদ্ধ করতে থাকবে। তখন রাষ্ট্রের শৃঙ্খলা বলে কিছু থাকবে না।’ বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করার ১৪ দলীয় জোট বৈঠকের দাবি জনগণ গ্রহণ করবে না বলে মন্তব্য করেছেন জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান। তিনি এ সিদ্ধান্তের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানান। জামায়াত আমির বলেন, ‘জামায়াতে ইসলামী একটি প্রতিষ্ঠিত গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংগঠন, যা বাংলাদেশের সকল গ্রহণযোগ্য নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে জাতীয় সংসদে প্রতিনিধিত্ব করেছে। প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনে ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছে। তিনি বলেন, ‘সম্প্রতি ছাত্রদের বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন ব্যাপক রূপ লাভ করলে সরকারের কয়েকজন মন্ত্রী আক্রমণাত্মক ও উস্কানিমূলক বক্তব্য রাখার পর ছাত্রলীগ বৈষম্যবিরোধী ছাত্রসমাজের ওপর হামলা চালায়। পরবর্তীতে রাষ্ট্রের বিভিন্ন বাহিনী দিয়ে দেশে গণহত্যা চালানো হয়। বাংলাদেশের ইতিহাসে অতীতে কোনো আন্দোলন দমনের জন্য এভাবে নির্বিচারে গণহত্যা চালানো হয়নি। পুরো জাতি ও বিশ্ব বিবেক এই গণহত্যার জন্য সরকারকে ধিক্কার দিচ্ছে। পুরো জাতি এ গণহত্যার বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ।তিনি উল্লেখ করেন, অতীতে যত অঘটন ঘটেছে কোনো রকম তদন্ত ছাড়াই তার জন্য জামায়াতকে দোষারোপ করা হয়েছে। কিন্তু পরবর্তীতে প্রমাণিত হয়েছে যে জামায়াত কোনো ঘটনার সাথেই জড়িত নয়। এবারও সরকারের সকল অপপ্রচার মিথ্যা প্রমাণিত হবে, ইনশাআল্লাহ।’ গণহত্যার প্রতিবাদে সোচ্চার হওয়ার জন্য উদাত্ত আহ্বান জানাচ্ছি।

ছাত্রশিবিরকে নিষিদ্ধের সিদ্ধান্তে বিবৃতি :সংগঠনটির কেন্দ্রীয় সভাপতি মঞ্জরুল ইসলাম ও সেক্রেটারি জেনারেল জাহিদুল ইসলাম এ সিদ্ধান্তের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদও জানিয়েছেন। এক যৌথ বিবৃতিতে বলেন, বাংলাদেশের ছাত্র রাজনীতিতে একটি আদর্শিক, সুসংগঠিত ও নিয়মতান্ত্রিক ছাত্রসংগঠন বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই দেশের প্রচলিত সংবিধান মেনে শান্তিপূর্ণ উপায়ে কার্যক্রম পরিচালনা করে যাচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও করে যাবে, ইনশাআল্লাহ।জাতীয় উন্নয়ন-অগ্রগতি ও ছাত্রবান্ধব সংগঠন হিসেবে দেশের ছাত্রসমাজ ও আপামর জনগণের আস্থার প্রতীকে পরিণত হয়েছে এ সংগঠন। একই সাথে এটা ছাত্রসমাজের সাথে স্রেফ প্রহসন ছাড়া আর কিছুই নয়। তাঁরা শেখ হাসিনার এই হঠকারি ও এখতিয়ার বহির্ভূত সিদ্ধান্তের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি। তাদের এই অপপ্রচার জনগণের কাছে বিশ্বাসযোগ্যতা না পেলে তারা এবার ইসলামী ছাত্রশিবিরকে নিষিদ্ধ করার আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে। তাদের হঠকারি সিদ্ধান্ত গণমানুষের ইচ্ছার প্রতিফলন নয়। এটা দেশকে পর্যায়ক্রমে একনায়কতান্ত্রিক ব্যবস্থার দিকে ঠেলে দেওয়ার শামিল।নেতারা আরো বলেন, গণভবন কোনো রাজনৈতিক কার্যালয় নয়। এটি জনগণের টেক্সের অর্থে পরিচালিত প্রতিষ্ঠান। অথচ সেটাকে রাজনৈতিক কার্যালয়ে পরিণত করে সেখানে বসে আওয়ামী নেতৃত্বাধীন ১৪ দল অন্য একটি বৈধ ও নিয়মতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করার যে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, এটা নিতান্তই হাস্যকর। কোনো রাজনৈতিক দল অন্য কোনো রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করতে পারে না। এটা সংবিধান পরিপন্থী। একটি দল আর একটি রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করার সংস্কৃতি কোনো গণতান্ত্রিক দেশের নিয়ম হতে পারে না।নেতারা ছাত্রশিবিরকে নিয়ে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের ষড়যন্ত্র মোকাবেলায় ছাত্রসমাজসহ দেশের সকলের এগিয়ে আসবেন বলে আশা প্রকাশ করেন।

ছাত্রশিবিরের প্যাড নকল করে গুজব ছড়ানো : ছাত্রশিবিরের প্যাড নকল করে গুজব ছড়ানোর অভিযোগ করে বিবৃতি দেন বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির। তারা অভিযোগ করে বলেন, গণহত্যার পর আবার সরকার আজকের শোক প্রকাশের কর্মসূচি দিলে শহীদদের নিয়ে এমন তামাশার এই রাষ্ট্রীয় শোককে শিক্ষার্থীরা প্রত্যাখান করে লাল কাপড় মুখে ও চোখে বেঁধে ছবি তোলা এবং অনলাইনে ব্যাপক প্রচারের কর্মসূচি পালন করছে। ছাত্রশিবির ইতিমধ্যে শিক্ষার্থীদের কর্মসূচির সাথে একাত্মতা পোষণ করে সকল সোশ্যাল মিডিয়া প্লাটফর্মে প্রোফাইল পিকচার পরিবর্তন করেছে।খুবই বিষ্ময়ের সাথে লক্ষ্য করা গেছে যে আওয়ামী গুজব সেল খ্যাত  CRI  পরিচালিত একটি ফেসবুক পেইজ থেকে ছাত্রশিবিরের প্যাড ব্যবহার করে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো হচ্ছে। উল্লেখ্য, তাদের ৫০টির অধিক পেইজ কিছুদিন পূর্বেই মেটা কর্তৃক গুজব ছড়ানোর দায়ে বন্ধ করে দেওয়া হয়।অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় যে, এই গুজব ছড়াতে রাসূলুল্লাহ (সা.) এর একটি হাদিসকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে। হাদিসটির সাথে শিক্ষার্থীদের চলমান কর্মসূচির কোনো সম্পর্ক নেই। তাদের জন্য আফসোস হয় যে তারা এহেন ঘৃণ্য কাজ করে আল্লাহ ও রাসূলের লানত কুড়িয়েছে। গুজব থেকে সবাইকে সচেতন থাকার আহ্বান জানাচ্ছি।

৩১ জুলাই: ছাত্র আন্দোলনের 'মার্চ ফর জাস্টিস' কর্মসূচিতে রাজধানীসহ দেশের কয়েকটি স্থানে পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষ, ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও ধস্তাধস্তি হয়। অনেক এলাকায় কর্মসূচি পালনে বাধা দিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, বরিশাল, রাজশাহী, সিলেটসহ বিভিন্ন স্থানে কর্মসূচি পালন করেন শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও আইনজীবীরা। কোনো কোনো স্থানে লাঠিপেটা, সাউন্ড গ্রেনেড ও কাঁদানে গ্যাস ছুড়ে তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেয় পুলিশ। শতাধিক বিক্ষোভকারীকে আটক ও সাংবাদিকসহ বিভিন্ন স্থানে আহত হন অন্তত ৯০ জন। সাবেক ছাত্রলীগ নেতাদের তোপের মুখে কাদের: সাবেক ছাত্রলীগ নেতাদের মতবিনিময় সভার কথা বলে সংবাদ সম্মেলন শুরু করায় তোপের মুখে পড়েন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। ৩১ জুলাই আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে শতাধিক সাবেক ছাত্রলীগ নেতা এবং আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ অন্যান্য নেতারা উপস্থিত হলেও মতবিনিময় সভা হয়নি।সকাল সাড়ে ১০টায় দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য ড. আব্দুর রাজ্জাককে সভাস্থলে দেখে সাবেক ছাত্রলীগ নেতারা চিৎকার দিয়ে উঠেন। তিনি এখানে কেন? তার ছেলে কেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে সরকারবিরোধী পোস্ট করেছেন? সেটি জানতে চান সাবেক ছাত্র নেতারা।এরপর সোয়া ১১টায় সভাস্থলে দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের এসেই গণমাধ্যমের সাথে কথা বলা শুরু করেন।এসময় পেছন থেকে সাবেক ছাত্রলীগ নেতারা ওবায়দুল কাদেরকে উদ্দেশ্য করে বলেন, ডাকছেন আমাদের সাথে মতবিনিময় করবেন বলে আপনি করছেন সংবাদ সম্মেলন। কিছুক্ষণ কথা বললে ওবায়দুল কাদের এতে নেতাকর্মীদের সাথে হট্টগোল লাগে। এক পর্যায়ে নেতাকর্মীরা কার্যালয়ে “ভুয়া ভুয়া” স্লোগান দিলে ওবায়দুল কাদের মিটিং শেষ না করে তার অফিস ছেড়ে চলে যান ।

১ আগস্ট: বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আটকে রাখা ৬ সমন্বয়ককে অবশেষে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) অফিস থেকে ছেড়ে দেওয়া হয় । এর আগে তারা টানা ৩২ ঘণ্টা ডিবি কার্যালয়ে অনশনে ছিলেন। ডিবি থেকে ছাড়া পাওয়া সমন্বয়ক নুসরাত তাবাসসুম ৩২ ঘণ্টা অনশনে থাকার পর ১ আগস্ট পরিবারের সদস্যরা গিয়ে অনশন ভাঙান। তিনি বলেন ‘আমরা মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছি।' ছাড়া পাওয়া অন্য পাঁচ সমন্বয়ক হলেন- নাহিদ ইসলাম, আসিফ মাহমুদ, আবু বাকের মজুমদার, সারজিস আলম ও হাসনাত আবদুল্লাহ। তারা সবাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। ছাড়া পেয়ে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে সারজিস আলম ও হাসনাত আবদুল্লাহ লড়াই অব্যাহত রাখার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। সারজিস আলম লিখেন, 'কথা দিয়েছিলেন আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের থেকে কাউকে গ্রেপ্তার করবেন না, মামলা দিয়ে হয়রানি করবেন না। আপনারা কথা রাখেননি।' আরও লিখেন, 'ছয় দিনের ডিবি হেফাজত দিয়ে ছয়জনকে আটকে রাখা যায়, কিন্তু এই বাংলাদেশের পুরো তরুণ প্রজন্মকে কীভাবে আটকে রাখবেন? দুর্নীতি, লুটপাট, অর্থ পাচার, ক্ষমতার অপব্যবহার করে যে ক্ষোভ সৃষ্টি করেছেন, প্রতিনিয়ত সেগুলো কীভাবে নিবৃত করবেন?' হাসনাত আবদুল্লাহ লিখেন, 'এই আন্দোলনে গ্রেপ্তার হওয়া শেষ ব্যক্তিটি মুক্ত না হওয়া পর্যন্ত আমরা কেউই মুক্ত নই। গণগ্রেপ্তার গণঘৃণার নামান্তর।' এই স্ট্যাটাস দেওয়ার পর রাতেই তাদের দু'জনের ফেসবুক আইডিই উধাও হয়ে যায়।অন্যদিকে ১ আগস্ট দুপুরে দেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করলেন ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকার।সেই সাথে বিপ্লবী ছাত্র সংগঠন “বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরকে” ও নিষিদ্ধ করা হলো। দুপুরে এ বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হক জানিয়েছিলেন, সন্ত্রাসবিরোধী আইন, ২০০৯-এর ধারা ১৮(১)-এ প্রদত্ত ক্ষমতা বলে জামায়াতে ইসলামী এবং এর অঙ্গসংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবিরসহ সব অঙ্গসংগঠনকে রাজনৈতিক দল ও সংগঠন হিসেবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

২ আগস্ট: বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকা 'প্রার্থনা ও ছাত্র- জনতার গণমিছিল' কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ব্যাপক সংঘর্ষ হয়েছে। হবিগঞ্জে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীর সঙ্গে সংঘর্ষের এক পর্যায়ে স্থানীয় এমপির বাড়িতে হামলা ও জেলা আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে অগ্নিসংযোগ করা হয়। এ সময় সংঘর্ষের মধ্য পড়ে গুলিতে মোস্তাক আহমেদ নামে এক যুবক নিহত হন। রাজধানীসহ কয়েকটি জেলায় আন্দোলনকারীদের সঙ্গে পুলিশ ও ক্ষমতাসীনদের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া এবং সংঘর্ষ হয়। এর মধ্যে ঢাকার উত্তরায় শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পুলিশ ও আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীর ত্রিমুখী সংঘর্ষ হয়। আওয়ামী লীগ কর্মীদের গুলি ছুড়তে দেখা যায়। বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ সাউন্ড গ্রেনেড ও কাঁদানে গ্যাসের শেল নিক্ষেপ করে। সারাদেশে এসব সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধসহ দুই শতাধিক মানুষ আহত হয়েছেন। আটক করা হয় অন্তত ৩০ জনকে। এ ছাড়া কোটা সংস্কার আন্দোলনে ১৮ জুলাই দক্ষিণ বাড্ডায় গুলিবিদ্ধ শিক্ষার্থী সেলিম তালুকদার চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।

৩ আগস্ট: সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকারুজ্জামান ঢাকা, সাভার, মিরপুরসহ ক্যান্টনমেন্টের সিনিয়র অফিসারদের সাথে মতবিনিময়ে বৈঠক করেন। ঢাকার বাইরের অন্যান্য ক্যান্টনমেন্টের সিনিয়র অফিসারদেরকেও এই সভায় ভার্চুয়ালে যুক্ত হওয়ার অনুরোধ করা হয়। সেই বৈঠকে বিস্তারিত কী আলোচনা হয়েছিল তা জানা না গেলেও পত্রপত্রিকায় এটুকু এসেছে যে, ঐ মিটিংয়ে এই সিদ্ধান্ত হয়েছে যে, সেনাবাহিনী ছাত্র-জনতার ওপরে গুলি চালাবে না। তবে তারা সরকারের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাসমূহের হেফাজত করবে।চারিদিকে রাজনৈতিক দৃশ্যপট আমূল পাল্টে যায়। কারণ, বৈষম্য বিরোধী আন্দোলনের ৬ সমন্বয়ককে ডিবি আটকে রাখায় এবং ডিবি কর্তৃক তাদের জোর করে আন্দোলন প্রত্যাহারের ঘোষণায় স্বাক্ষর আদায়ের পর খবরটি যখন গণমাধ্যমে প্রচারিত হয় তখন জনগণের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়। কিন্তু তারা ডিবির হেফাজত থেকে মুক্ত হওয়ার পরপরই পরিস্থিতি সম্পূর্ণ পাল্টে যায়। ৩ আগস্ট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে জমায়েত লক্ষ লক্ষ মানুষের সামনে সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম ঘোষণা করেছিলেন যে, সব দাবি এখন এসে মিলিত হয়েছে এক দাবিতে। আর সেটি হলো প্রধানমন্ত্রীসহ সরকারের সমস্ত মন্ত্রীদের পদত্যাগ। ঢাকাসহ সমগ্র বাংলাদেশ ছিল কোটি জনতার পদভারে প্রকম্পিত। আন্দোলনকারীরা আলোচনার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করায় সরকার হার্ড লাইন বেঁচে নিয়ে ছিল। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের দলীয় কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগের সমস্ত সিনিয়র কর্মীকে পরদিন অর্থাৎ ৪ আগস্ট ঢাকার মোড়ে মোড়ে, প্রতিটি ওয়ার্ডে সমাবেশের ডাক দেন। তিনি স্পষ্টভাবে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের কর্মীদেরকে কোটা আন্দোলনকারীদের প্রতিহতের আহ্বান জানান। এই আহ্বানের ফলেই ৪ আগস্ট থেকে ঢাকাসহ সারাদেশে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের কর্মীরা বৈষম্য বিরোধীদের আন্দোলন প্রতিহত করার জন্য অবস্থান গ্রহণ করে। বলতে গেলে এটা বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও আওয়ামী লীগকে মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড় করায়। এর ফলে সংঘর্ষ দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দেয়। রাতে ঢাকা ও চট্টগ্রামে বিরোধী নেতার বাসায় অগ্নি সংযোগ এবং গাড়ি ও বাডি ভাঙচুর করা হয়। 

৪ আগস্ট: সাবেক প্রধানমন্ত্রী সশস্ত্র বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তাদের সাথে বৈঠকে মিলিত হন। ঐ বৈঠকে ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা উপদেষ্টা এবং সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনীর প্রধানগণ। সেখানে কী আলোচনা হয়েছে সেটি আইএসপিআর থেকে কোনো সংবাদ বিজ্ঞপ্তি না দিলে জানা সম্ভব নয়। ঐদিকে ৪ আগস্ট চট্টগ্রামে উত্তাল ছাত্র-জনতা নিউ মার্কেট মোড়ে জমায়েত হলে তাদেরকে ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও পুলিশ অতর্কিতে গুলি ও টিয়ার গ্যাস চালিয়ে আন্দোলন ছত্রভঙ্গ করে দেয়। হামলায় আমিসহ (মোহাম্মদ ইউছুফ) অনেক ছাত্র-জনতা গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হন। অত:পর চট্টগ্রামের সমন্বয়ক ‘ খান তালাত মাহমুদ রাফী’ সবাইকে পূনরায় বিক্ষোভের জন্য চট্টগ্রাম নগরীর ওয়াসা মোড়ে জড়ো হতে বলেন। ওয়াসায় জড়ো হলে দেখি সেনাবাহিনীর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছে একের পর এক ফোন আসতে থাকে। ফোনের আলাপ জানতে না পারলেও পরবর্তীতে বিভিন্ন মাধ্যমে জানতে পারি ঐদিক থেকে শেখ হাসিনা আন্দোলন দমাতে আরো কঠোর হওয়ার জন্য সেনাবাহিনীর সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দিয়েছিলেন। ঢাকার সায়েন্সল্যাবে ছাত্র-জনতা ও আওয়ামী লীগের মধ্যে ধাওয়া ও পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। বিক্ষোভে উত্তাল হয় আফতাব নগর, উত্তরা, ধানমন্ডি ও জাতীয় প্রেসক্লাব। বিকাল ৩টা পর্যন্ত জেলায় জেলায় সংঘর্ষে অনেক নিহত ও আহত হন। ছাত্র-জনতার হামলায় আওয়ামী বাহিনী পিজি হাসপাতালের অভ্যন্তরে আশ্রয় নেয়। উত্তেজিত ছাত্র-জনতা পিজি হাসপাতালের বাইরে রাখা কয়েকটি মোটরগাড়ি এবং মোটরসাইকেলে আগুন ধরিয়ে দেয়। বৈষম্য বিরোধী আন্দোলন তখন প্রতিটি জেলা সদর এবং ক্ষেত্র বিশেষে উপজেলা এবং ইউনিয়ন পর্যায়ে ছড়িয়ে পড়ে।আন্দোলন চলাকালে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যেন সরাসরি গুলি না করে তেমন নির্দেশনা চেয়ে আদালতে একটি রিট করা হয়। ঐ রিটে ডিবি কর্তৃক আটক বৈষম্য বিরোধী প্ল্যাটফর্মের ৬ জনের মুক্তিও চাওয়া হয়। যেখানে রিটের শুনানির পরদিন রায় দেওয়ার কথা ছিল, সেই রায় অন্তত ৫ দিন বিলম্বিত হয়। সংশ্লিষ্ট হাইকোর্ট বেঞ্চের একজন বিচারপতি অসুস্থ হয়েছেন বলে খবর বের হয়। পর আলোচ্য রিট পিটিশনটি খারিজ করা হয়। এর অর্থ এই দাঁড়ায় যে, পুলিশ সরাসরি গুলি করতে পারবে।৪ আগস্ট সারাদেশে অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দিয়ে রাজধানী ঢাকাসহ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অসহযোগ কর্মসূচি চলতে থাকে। সরকার পতনের এক দফা দাবিতে ছাত্র-জনতার আন্দোলনে বিস্ফোরণোন্মুখ সারাদেশ। অসহযোগ আন্দোলনের রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে রক্ত ঝরেছে। অসহযোগ আন্দোলনে অংশ নেয়া শিক্ষার্থী-জনতার সঙ্গে আইনশৃংখলা বাহিনী ও ছাত্রলীগ-যুবলীগ- আওয়ামী লীগের কোথাও দ্বিমুখী, কোথাও ত্রিমুখী সংঘাত-সংঘর্ষে শতাধিক মানুষ শহীদ হন।এর মধ্যে আন্দোলনে অংশ নেয়া অর্ধশত ছাত্র-জনতা শহীদ হন। ১৩ জন পুলিশ সদস্যসহ কয়েকজন নিহত হন। আন্দোলনকারীরা ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে লাশ নিয়ে মিছিল করে শাহবাগ হয়ে বাংলা মোটরের দিকে গেলে মিছিলকারীদের লক্ষ্য করে পুলিশ গুলি, রাবার বুলেট, সাউন্ড গ্রেনেড, টিয়ারশেল ছোড়ে। এ সময় পুলিশের সঙ্গে লাঠিসোঁটা, হকিস্টিক, রামদা হাতে আওয়ামী লীগের লোকেরাও যোগ দেয়।শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে পুলিশের বেপারোয়া গুলি এবং আইনশৃংখলা বাহিনী ও ক্ষমতাসীন দলের কর্মী সমর্থকদের প্রতিরোধের মুখে দেশে ব্যাপক নৈরাজ্য সৃষ্টি হলে পরিস্থিতি সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। সরকার বাধ্য হয়েই অফিস-আদালত বন্ধের ঘোষণা দিয়ে সন্ধ্যা থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য কারফিউ জারি করেন।অন্যদিকে আন্দোলনকারীরা কারফিউ প্রত্যাখ্যান করে ছাত্র-জনতার ওপর হামলা, গুলি ও হত্যার প্রতিবাদে পূর্ব ঘোষিত ‘লং মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি একদিন এগিয়ে এনে ৫ আগস্ট করার ঘোষণা দেন অন্যতম সমন্বয়ক আসিফ মাহমুদ। তিনি বলেন, “ইতিহাসের অংশ হতে ঢাকায় আসুন সকলে। যে যে ভাবে পারেন ঢাকায় কালকের মধ্যে (সোমবার) ঢাকায় চলে আসুন। ছাত্র-জনতা এক নতুন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটাবো”। ফেসবুকে ভিডিও বার্তায় এ ঘোষণা দিয়ে সেনাবাহিনীকে জনগণের মুখোমুখী না দাঁড়ানোর আহবানও জানান তিনি। 

৪ আগস্ট গভীর রাত পর্যন্ত গণভবনে বসে শেখ হাসিনা তাঁর সরকারের ঘনিষ্ঠ কয়েকজন মন্ত্রী ও কর্মকর্তার সঙ্গে একাধিক বৈঠক করেন। এরপরও পরিস্থিতি তাঁদের নিয়ন্ত্রণে থাকবে বলে তাঁরা ধারণা করেছিলেন। কিন্তু চাপ আরও বাড়তে থাকে। ৫ আগস্ট সকালেই তাঁরা বুঝতে পারেন, তাঁদের সময় শেষ হয়ে গেছে। এরপর শেখ হাসিনাকে ক্ষমতা ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিতে হয়। একক কর্তৃত্বের শাসনে শেখ হাসিনার সরকার সম্পূর্ণভাবে জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল। অবশেষে গণ–আন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনা ৫ আগস্ট দুপুরের আগে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করেন। পদত্যাগের আগমূহুর্তে তিনি জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সেই সুযোগ ও সময় তাঁকে দেওয়া হয়নি। শেখ হাসিনা দুপুরের আগে বঙ্গভবনে গিয়ে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের কাছে পদত্যাগ করেন। এরপর দুপুর আড়াইটার বঙ্গভবন থেকেই শেখ হাসিনা একটি সামরিক হেলিকপ্টারে করে ভারতের উদ্দেশে বাংলাদেশ ছাড়েন। তাঁর ছোট বোন শেখ রেহানা সঙ্গে ছিলেন।

৫ আগস্ট ২০২৪, বাংলাদেশের ইতিহাসে রচিত হলো এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়। কোটা সংস্কারের দাবীতে ছাত্রদের আন্দোলন গণআন্দোলনে পরিণত হয়ে শেষ পর্যন্ত নাড়িয়ে দিল এক রুদ্ধশ্বাস লৌহশাসনের তখতে তাউস। দেশ ছেড়ে পালিয়ে বাঁচলেন টানা পনের বছরের প্রতাপশালী স্বৈরশাসক শেখ হাসিনা। চোখের পলকে পট পরিবর্তনের এক অবিশ্বাস্য দৃশ্য দেখল বাংলাদেশ। গত পনের বছর ধরে যারা ছিলেন মহা দাপুটে সংহারী প্রশাসক, মুহূর্তে হয়ে গেলেন গর্তে লুকানো থরহরিকম্প ইঁদুর। আর ক্ষণকাল পূর্বেও যারা ছিল ক্লান্ত, শ্রান্ত, বিধ্বস্ত, আশ্রয়হারা নিঃসহায়, হঠাৎ তারাই হয়ে উঠল একেকজন অতিকায় জান্তব, হারকিউলিস। সকালে যারা ছিলেন মহামান্য রাজাধিরাজ, বিকালে তারা হলেন মহাধিকৃত পলায়নপর স্বৈরাচার। এ বিজয় অবশ্যই ছাত্র-জনতার।

অত:পর ৮ আগস্ট ২০২৪ তারিখে গঠিত হলো নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনুছের নেতৃত্বে অন্তর্রতীকালিন সরকার। প্রবীণেরা বলছেন, তারা ১৯৬৯ সালে আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে গণঅভ্যুত্থান দেখেছেন। তারা ১৯৯০ সালে এরশাদের বিরুদ্ধে গণঅভ্যুত্থান দেখেছেন। কিন্তু ২০২৪ সালের এই ব্যাপক গণঅভ্যুত্থান যা আগের সবগুলিকে ছাড়িয়ে গেছে।তাদের বিগত ১৫ বছরের শাসনকে জনগণ মেনে নেয়নি। বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, অপহরণ, গুম, খুন, লক্ষ কোটি টাকা বিদেশে পাচার, লক্ষ কোটি টাকার দুর্নীতি, তিন তিনটি নির্বাচনে নির্বাচনের নামে তামাশা, বিরোধী দলের কণ্ঠরোধ, দ্রব্যমূল্যের ৫ থেকে ৬ গুণ বৃদ্ধি ইত্যাদিকে মানুষ শাসন নয়, অপশাসন বলে বিবেচনা করছে। বুদ্ধিজীবীরা বলছেন, এই ১৫ বছরের শাসন হলো রাজনৈতিকভাবে স্বৈরাচার এবং অর্থনৈতিকভাবে ক্লেপ্টোক্র্যাসি, অর্থাৎ চৌর্যবৃত্তি। আন্দোলনে ছাত্রদের সাথে লক্ষ লক্ষ মানুষের স্বতস্ফুর্ত অংশগ্রহণ ঐ অপশাসনের বিরুদ্ধে মানুষের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ।এই আন্দোলন অপশাসনের অবসান ঘটিয়ে খাঁটি গণতন্ত্র ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা করে একটি আদর্শ বাংলাদেশ বিনির্মাণের সংগ্রাম। এটি একটি ব্যাপক বিশাল গণঅভ্যুত্থান।

লেখক:- মোহাম্মদ ইউছুফ (গণমাধ্যম ও মানবাধিকার কর্মী),E-mail: yusufm.news@gmail.com

আপনার মতামত লিখুন

BD State News

মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬


আমার দেখা গণঅভ্যুত্থান

প্রকাশের তারিখ : ০৫ আগস্ট ২০২৬

featured Image

ছাত্রদের কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে গণঅভ্যুত্থান ঘটায়ে সরকার পতন। তা আগে কেউ কল্পনাও করেনি। বাংলাদেশে সবচেয়ে জনপ্রিয় ও সাধারণ জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণমূলক অভ্যুত্থান হচ্ছে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান। ২০১৮ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে সরকারি চাকরিতে ৫৬ শতাংশ কোটা প্রচলিত ছিল। এর মধ্যে ৩০ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা কোটা, ১০ শতাংশ নারী কোটা, অনগ্রসর জেলার বাসিন্দাদের জন্য ১০ শতাংশ কোটা, ক্ষুদ্র জাতিসত্তার মানুষের জন্য ৫ শতাংশ আর প্রতিবন্ধীদের জন্য ১ শতাংশ আসন সংরক্ষিত ছিল।

২০১৮ সালের আন্দোলনের মুখে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কোন কোটা থাকবে না বলে ঘোষণা দিয়ে একটি পরিপত্র জারি করলে, তা ২০২৪ সালের আন্দোলনের আগ পর্যন্ত বহাল ছিল। কিন্তু বিপত্তি ঘটে হাইকোর্ট কর্তৃক ওই পরিপত্রটি বাতিল ঘোষণার মাধ্যমে। ফলে সরকারি চাকরিতে কোটা ব্যবস্থা সংস্কারের দাবিতে ১ জুলাই থেকে আন্দোলনে নামে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। আন্দোলনে ছাত্ররা একের পর এক 'অবরোধ', 'বাংলা ব্লকেড', 'কমপ্লিট শাটডাউন', 'মার্চ ফর জাস্টিস’ ও 'মার্চ  টু  ঢাকা'  নামক কর্মসূচিতে দিতে থাকেন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ছাত্রদের সহজ সমাধানযোগ্য আন্দোলনকে তেমন গুরুত্ব না দিয়ে ছাত্রদের ক্ষুব্ধ করে তোলেন। অহিংস আন্দোলন চলাকালীন শিক্ষার্থীদের উপর নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগ, যুবলীগ, আওয়ামীলীগ ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দমন-পীড়ন, সশস্ত্র ও সহিংস হামলায় আন্দোলনের মোড় ঘুরে যায়।

১ জুলাই: সকাল ১১টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গ্রন্থাগারের সামনে অবস্থান নেন বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী ও চাকরি প্রত্যাশী। সেখান থেকে শিক্ষার্থীরা মিছিল নিয়ে কলাভবন, শ্যাডো ও মল চত্বর হয়ে মাস্টারদা সূর্য সেন হল, হাজী মুহম্মদ মুহসীন হল ও বসুনিয়া তোরণ হয়ে আবার টিএসসির রাজু ভাস্কর্যে ফিরে যান। সমাবেশে তিন দিনের কর্মসূচি ঘোষণা দেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম। কোটা বাতিলের পরিপত্র পুনর্বহালের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের অন্য দাবিগুলো হলো- পরবর্তী সময়ে সরকার কোটা ব্যবস্থা নিয়ে কোনো পদক্ষেপ নিতে চাইলে ২০১৮ সালের পরিপত্র বহাল সাপেক্ষে কমিশন গঠন করে দ্রুত সময়ের মধ্যে সরকারি চাকরিতে সব গ্রেডে অযৌক্তিক ও বৈষম্যমূলক কোটা বাদ দেওয়া, সংবিধান অনুযায়ী অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর কথা বিবেচনা করা, চাকরির নিয়োগ পরীক্ষায় কোটা–সুবিধা একাধিকবার ব্যবহারের সুযোগ বন্ধ করা, কোটায় যোগ্য প্রার্থী না পাওয়া গেলে শূন্য পদগুলোয় মেধা অনুযায়ী নিয়োগ দেওয়া এবং দুর্নীতিমুক্ত, নিরপেক্ষ ও মেধাভিত্তিক আমলাতন্ত্র নিশ্চিত করতে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া।

গত ৫ জুন সরকারি দপ্তর, স্বায়ত্তশাসিত বা আধা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন করপোরেশনের চাকরিতে সরাসরি নিয়োগের ক্ষেত্রে (৯ম থেকে ১৩তম গ্রেড) মুক্তিযোদ্ধা কোটা বাতিলের পরিপত্র অবৈধ ঘোষণা করে রায় দেন উচ্চ আদালত। ওই দিন থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর আন্দোলন শুরু হয়। আদালতের ওই রায় স্থগিত চেয়ে রাষ্ট্রপক্ষ আপিল বিভাগে আবেদন করে। পরে আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চে আবেদনটির শুনানির জন্য ৪ জুলাই তারিখ নির্ধারণ করে। ঈদের ছুটি শুরুর পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস ফাঁকা হয়ে পড়ায় ১০ জুন দাবি মানতে সরকারকে ৩০ জুন পর্যন্ত সময় বেঁধে (আলটিমেটাম) দিয়ে আন্দোলনে বিরতি টানা হয়। সেই সময়সীমা গতকাল শেষ হয়।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম বলেছিলেন, ‘৪ জুলাইয়ের মধ্যে আইনিভাবে আমাদের দাবির বিষয়ে চূড়ান্ত সুরাহা করতে হবে। আমাদের আশ্বস্ত করতে হবে, যাতে কোটাব্যবস্থার চূড়ান্ত ফয়সালা করা হয়।’ তিনি আরও বলেছিলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে গ্রন্থাগার খোলা থাকতে হবে এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে শিক্ষার্থীদের হলসহ সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। কোনো হল বন্ধ করা যাবে না, গ্রন্থাগারও বন্ধ করা যাবে না।  তিনি আগামীকাল বেলা আড়াইটায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার থেকে গণপদযাত্রা শুরু ও দেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের শিক্ষার্থীদের একই সময়ে একই কর্মসূচি পালনে আহ্বান জানান। এ ছাড়া ৩ ও ৪ জুলাই জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত সাত সরকারি কলেজ এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন ঢাকার অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা রাজু ভাস্কর্যে একত্রিত হবার কথা  জানান। আন্দোলনের সমন্বয়ক সারজিস আলম বলেছিলেন, ‘বীর মুক্তিযোদ্ধাদের আমরা জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান মনে করি। তাঁদের সুযোগ-সুবিধা প্রয়োজনে আরও বৃদ্ধি করা হোক। কিন্তু কোটা বৈষম্য দূর হওয়া প্রয়োজন। আমরা বৈষম্য মেনে নিতে পারি না।’

২ জুলাই: রাজধানীতে দুপুরে সাড়ে চার কিলোমিটার সড়কে গণপদযাত্রা করে শাহবাগ মোড় অবরোধ করেন বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী ও চাকরি প্রত্যাশী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে থেকে শুরু হওয়া পদযাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ সড়কের চতুর্দিকে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। বিকেলে এক ঘণ্টা শাহবাগ মোড় অবরোধ করে রাখেন তারা। এ সময় শিক্ষার্থীরা ‘কোটা না মেধা, মেধা মেধা’, ‘কোটা প্রথা নিপাত যাক, মেধাবীরা মুক্তি পাক’, ‘ছাত্রসমাজ গড়বে দেশ, মেধাভিত্তিক বাংলাদেশ’ ইত্যাদি স্লোগান দেন এবং প্ল্যাকার্ড প্রদর্শন করেন।

শাহবাগে অবস্থান কর্মসূচিতে সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম বলেছিলেন, আমরা শুধু মুক্তিযোদ্ধা কোটার বিরুদ্ধে বলছি না; আমরা পোষ্য কোটাসহ সব অযৌক্তিক কোটার বিরুদ্ধে বলছি। মনে রাখতে হবে, মুক্তিযোদ্ধা কোটা আর মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এক জিনিস নয়। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা কোনো গোষ্ঠী বা বংশপরম্পরার জিনিস নয়। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা একটি রাষ্ট্রীয় আদর্শ। দেশের নাগরিক হিসেবে আমরা সেই আদর্শ ধারণ করি। সেই আদর্শ ধারণ করে মুক্তিযোদ্ধারা যে বৈষম্যের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছিলেন; আমরা সে বৈষম্যের বিরুদ্ধেই আবার আন্দোলন শুরু করেছি। সমন্বয়ক সারজিস আলম বলেন, বাংলাদেশ গড়তে হলে মেধাবীদের নিয়েই গড়তে হবে। স্বাধীনতার ৫৩ বছর পর কোটা প্রথার কোনো প্রয়োজন নেই। কোটা প্রথা পুনর্বহাল শিক্ষার্থীদের সঙ্গে প্রহসন। ২০১৮ সালের পরিপত্র যতক্ষণ না বহাল হচ্ছে, ততক্ষণ ছাত্রসমাজ রাজপথে থাকবে।

একই দাবিতে বিকেলে বিক্ষোভ করেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। বিকেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক অবরোধ করে রাখেন। দাবি মানা না হলে আগামীকাল বুধবার বিকেলে ফের দুই ঘণ্টার মহাসড়ক অবরোধের ঘোষণা দিয়েছিলেন তারা। কোটা পুনর্বহালের প্রতিবাদে বিক্ষোভ হয়েছে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়েও। এ দিন বেলা সাড়ে ১১টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ঝালচত্বর থেকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে বিক্ষোভ শুরু করেন শিক্ষার্থীরা।

৩ জুলাই: কোটা সংস্কার চলমান আন্দোলনের অংশ হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েক হাজার বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থী রাজধানীর শাহবাগে সড়ক অবরোধ করেন, দুপুর থেকে ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’ ব্যানারে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে জড়ো হতে থাকেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, অধিভুক্ত সাত কলেজসহ রাজধানীর বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা। মিছিল নিয়ে শিক্ষার্থীরা বিকেল সাড়ে ৩টায় শাহবাগ অবরোধ করেন। এ সময় সড়কে দুই ঘণ্টা অবস্থানের পর বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে রাজু ভাস্কর্যে এসে কর্মসূচি শেষ হয়। অবরোধকালে শিক্ষার্থীরা কোটাবিরোধী স্লোগান, প্ল্যাকার্ড প্রদর্শন ও গান পরিবেশন করেন।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়: ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক অবরোধ করেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। বিকেল ৩টা থেকে ৫টা পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনের সমবেত হন তারা। দুপুরে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভ করেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। শিক্ষার্থীরা বলেছিলেন, চাকরিতে কোটা পুনর্বহাল করার সিদ্ধান্ত সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে প্রহসনের নামান্তর। শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়: শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভে উত্তাল ছিল রাজধানীর শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়। চাকরিতে মেধাভিত্তিক নিয়োগের দাবিতে শতাধিক শিক্ষার্থী আগারগাঁও-খামারবাড়ি সড়ক অবরোধ করেন। তারা ‘সারাবাংলায় খবর দে, কোটা প্রথার কবর দে’, ‘দেশের মেধা দেশে থাক, কোটা প্রথা নিপাত যাক’ স্লোগান দেন। বরিশাল: বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বেলা ১১টার ক্যাম্পাস সংলগ্ন বরিশাল-কুয়াকাটা মহাসড়ক তিন ঘণ্টা অবরোধ করেন। তারা কোটা প্রথা বাতিল করে চাকরিতে মেধাভিত্তিক নিয়োগের দাবি জানিয়েছিলেন। রংপুর: রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীরা বেলা ১১টায় কেন্দ্রীয় লাইব্রেরি থেকে পদযাত্রা বের করে সমাবেশ করেছিলেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। ঢাকার শেরেবাংলা কৃষি বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ মিছিল ও সড়ক অবরোধ করেন। শিক্ষার্থীরা ২০১৮ সালের পরিপত্র বহাল করে তা আইনে পরিণত করাসহ চার দফা দাবি জানিয়েছিলেন।

৪ জুলাই: বৃষ্টি উপেক্ষা করে শিক্ষার্থীরা মেধার মূল্যায়ন চেয়ে একযোগে সড়ক-মহাসড়ক অবরোধ করেছিলেন। এ সময় ঢাকা, জাহাঙ্গীরনগর, জগন্নাথ, রাজশাহী, চট্টগ্রাম, বরিশাল, কুমিল্লা, খুলনাসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা রাজপথে দাবি আদায়ের শপথ নেন।

বেলা ১১টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে জড়ো হন বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী ও চাকরি প্রত্যাশী। মিছিল নিয়ে তারা মাস্টারদা সূর্য সেন হল, হাজী মুহম্মদ মুহসীন হলের গেট হয়ে ভিসি চত্বর, টিএসসির রাজু ভাস্কর্য ঘুরে শাহবাগ মোড় অবরোধ করেন। সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম জানান, শুক্রবার সারাদেশে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে অনলাইন-অফলাইনে জনসংযোগ ও সমন্বয়, শনিবার বেলা ৩টায় দেশজুড়ে বিক্ষোভ এবং রোববার সব বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ক্লাস-পরীক্ষা বর্জনের মাধ্যমে ছাত্র ধর্মঘট পালন করা হবে। শনিবারের বিক্ষোভ থেকে রোববারের মাঠের কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে বলেও জানান তিনি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কেন্দ্রীয়ভাবে আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়া হচ্ছে। সারাদেশে ‘কোটা পুনর্বহাল করা চলবে না’ শীর্ষক ফেসবুক গ্রুপে সবাই যুক্ত ছিলেন। গ্রুপ থেকেই যাবতীয় বিষয় আপডেট দিয়েছিলেন। একই নামে টেলিগ্রাম গ্রুপও ছিল আন্দোলনকারীদের। নাহিদ ছাড়াও আন্দোলনের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে যুক্ত আছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের শিক্ষার্থী সারজিস আলম, ইংরেজি বিভাগের হাসনাত আব্দুল্লাহ, রাফিয়া রেহনুমা হৃদি, মোহাম্মদ মাহিন, আব্দুল হান্নান মাসউদ, রাশিদুল ইসলাম রিফাত সহ আরো অনেক।

নাহিদ ইসলাম বলেছিলেন, ২০১৮ সালে নির্বাহী বিভাগ পরিপত্রের মাধ্যমে কোটা বাতিল করল। বিচার বিভাগ দিয়ে কোটা আবার পুনবর্হাল করা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে প্রহসন। এটা রাষ্ট্রযন্ত্রের মধ্যে সমন্বয়হীনতার উদাহরণ। নির্বাহী বিভাগ আদেশ দিচ্ছে তো বিচার বিভাগ বাতিল করছে। রাষ্ট্রযন্ত্রের অন্তঃদ্বন্দ্বে শিক্ষার্থীদের সম্পর্ক নেই। নিজেদের মধ্যে সমন্বয় করে শিক্ষার্থীদের দাবি পূরণ করুক– এটাই আমরা চাই। হাসনাত আব্দুল্লাহ বলেছিলেন, ‘আমরা একই প্রশ্নে ভর্তি পরীক্ষা দেব, একই প্রশ্নে হবে লিখিত এবং ভাইভার মুখোমুখিও হবো। কিন্তু তারা কোটা সুবিধার কারণে একাই শতভাগ সুবিধা পাবে। তাহলে আমরা ধরে নেব, জন্মই আমার আজন্ম পাপ ?’ সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত অবরোধ কর্মসূচি শেষে রাজু ভাস্কর্যে গিয়ে নতুন করে তিন দিনের কর্মসূচি ঘোষণা করেছিলেন।

আন্দোলনে ছাত্রলীগের বাধা, হল গেটে তালা: আন্দোলনে যেতে শিক্ষার্থীদের বাধা দেয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হল ছাত্রলীগের নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে। একাধিক হলের গেটে তালা ঝুলিয়ে দেয় তারা। সরেজমিন মাস্টারদা সূর্য সেন ও কবি জসীম উদ্‌দীন হলগেটে তালা দেখা যায়। এ সময় শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হলেও শিক্ষার্থীদের গেস্টরুমে আটকে রাখার অভিযোগ পাওয়া গেছে। পরে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা মিছিল নিয়ে হলে গিয়ে তালা খুলতে বাধ্য করেন। এর পরও বেশির ভাগ শিক্ষার্থীকে আন্দোলনে অংশ নিতে দেয়নি ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা।

একইভাবে পুরান ঢাকার রায় সাহেব বাজার মোড় অবরোধ করেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। এ ছাড়া শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শেকৃবি) শিক্ষার্থীরা রাজধানীর আগারগাঁও মোড়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) শিক্ষার্থীরা চট্টগ্রাম-খাগড়াছড়ি মহাসড়ক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) শিক্ষার্থীরা ঢাকা-রাজশাহী মহাসড়ক, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের (খুবি) শিক্ষার্থীরা খুলনার জিরো পয়েন্ট, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) শিক্ষার্থীরা কুষ্টিয়া-খুলনা মহাসড়ক এবং কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) শিক্ষার্থীরা ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ করেন।

৫ জুলাই: ২০১৮ সালে সরকারের জারি করা পরিপত্র পুনর্বহালের দাবিতে ঢাকাসহ দেশের বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয়ে লাগাতার কর্মসূচি পালন করেন । সর্বশেষ ক্লাস-পরীক্ষা বর্জনের কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। ফলে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় গভীর সংকটে পড়ে। দীর্ঘস্থায়ী সেশন জটের শঙ্কাও দেখা দেয়। তাই দ্রুত কোটা পদ্ধতি বিষয়ে আলোচনা করতে সরকারকে উদ্যোগ নিতে বলেন শিক্ষাবিদ ও আমলারা। আলোচনার টেবিলেই যৌক্তিক সমাধান হওয়া উচিত বলে মনে করছেন তারা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বলেছিলেন, কোটা পদ্ধতি নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে আলোচনার উদ্যোগ নিতে হবে। আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বসলে সমাধান আসবেই। দুনিয়ায় এমন কোনো সংকট নেই, যা আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা যায় না। সে কারণে কোটা পদ্ধতি নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে আলোচনার উদ্যোগ নিতে হবে। আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বসলে সমাধান আসবেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. এ কে আজাদ চৌধুরী বলেন, সব জায়গায় মেধাকে প্রাধান্য দিতে হবে। আমার মনে হয়, পুরো কোটা পদ্ধতি তুলে দেওয়া যাবে না। সব মিলিয়ে ৫-১০ শতাংশ কোটা রাখা যায়। তিনি বলেছিলেন, একটা সময় পর্যন্ত কোটা পদ্ধতির যৌক্তিকতা ছিল। তবে নারীরা এখন অনেক এগিয়েছে। মুক্তিযোদ্ধার সন্তান ও নাতি-নাতনিরা অনেক বছর চাকরিতে কোটা সুবিধা পেয়েছে। তবে অনগ্রসর জাতিকে সমতায় আনা যেহেতু রাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্ব, সেক্ষেত্রে কোটার দরকার আছে। সেজন্য ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী, নারী এবং শ্রদ্ধাবোধ রেখে কয়েক শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা কোটা রাখা যায়; কিন্তু সেটি ৫৬ শতাংশ নয়। এতে মেধাবী অনেকে চাকরিবঞ্চিত হবে। শিক্ষার্থীদের এ আন্দোলন যৌক্তিক দাবি করে তিনি বলেছিলেন আন্দোলনের যৌক্তিকতা রয়েছে। তবে আদালত যেহেতু এ বিষয়ে রায় দিয়েছেন, সমাধানও আদালতের মাধ্যমেই আসতে হবে।

৬ জুলাই: দেশের বিভিন্ন স্থানে সড়ক-মহাসড়ক অবরোধ করেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের শিক্ষার্থীরা। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বেলা ১১টা থেকে ১২টা পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের ঢাকা-রাজশাহী মহাসড়ক অবরোধ করেন। বিকেলে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের হাজারও শিক্ষার্থী পুলিশের বাধা উপেক্ষা করে নগরীর ষোলশহর ও দুই নম্বর গেট এলাকায় বিক্ষোভ করেন। এ সময় শিক্ষার্থীরা দুই নম্বর গেট এলাকায় সড়ক অবরোধ করেন। খুলনা নগরীর শিববাড়ী মোড়ের ৭টি পয়েন্টে অবস্থান নিয়ে এক ঘণ্টা সড়ক অবরোধ করেন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবি) শিক্ষার্থীরা সিলেট-সুনামগঞ্জ সড়ক, পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ঢাকা-পাবনা মহাসড়ক এবং মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ঢাকা-টাঙ্গাইল ও বঙ্গবন্ধু সেতু মহাসড়ক অবরোধ এবং বিক্ষোভ করেন।

পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (পবিপ্রবি) বাবুগঞ্জ ক্যাম্পাসের শিক্ষার্থীরা বঙ্গবন্ধু চত্বরে, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা রংপুর-ঢাকা মহাসড়ক অবরোধ করেন। এ ছাড়া ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রেস ক্লাব চত্বর এবং ময়মনসিংহে বিভিন্ন কলেজের শিক্ষার্থীরা টাউন হল মোড়ে বিক্ষোভ করেন। বিকেল ৩টায় শিক্ষার্থীরা কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে মাথায় পতাকা বেঁধে মিছিল নিয়ে আন্দোলন স্থলে আসেন। ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা আন্দোলনে আসতে বাধা দেয়। রোববারের মধ্যে সরকারের প্রতিক্রিয়া না পেলে হরতাল কর্মসূচিতেও যাওয়ার হুঁশিয়ারি দেন আন্দোলনের সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, ‘আগামীকাল (রোববার) বিকেল ৩টা থেকে বাংলা ব্লকেড কর্মসূচি হবে।

৭ জুলাই: কোটা ব্যবস্থা সংস্কার দাবিতে তীব্র আন্দোলন অব্যাহত রাখে বাংলাদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। রোববারের এই কর্মসূচিতে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সড়ক ও মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছিলেন শিক্ষার্থীরা। চলমান চার দফা দাবিতে কোটা সংস্কার আন্দোলনকে এক দফা দাবিতে নামিয়ে সারা দেশে “বাংলা ব্লকেড” কর্মসূচি ঘোষণা করেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। রাতে শাহবাগে অবরোধ কর্মসূচির শেষে নতুন এ কর্মসূচি ঘোষণা করেন আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, ৮ জুলাই বিকাল সাড়ে ৩টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরির সামনে থেকে মূল ব্লকেড আন্দোলন শুরু হবে। তা ছাড়া একই সময়ে সারা দেশের সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে এই “বাংলা ব্লকেড” কর্মসূচি শুরুর কথা জানান।

৮ জুলাই: কোটা সংস্কার আন্দোলনে এক দফা দাবিতে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ব্লকেড কর্মসূচি পালন করলেও বুধবার থেকে সারাদেশে পুরো বেলা সর্বাত্মক ব্লকেড কর্মসূচি পালন করার হুঁশিয়ারি দেন শিক্ষার্থীরা। সেজন্য তারা মঙ্গলবার প্রস্তুতি নেবেন এবং একইদিন বিকেলে বুধবারের চূড়ান্ত কর্মসূচির বিষয়ে সংবাদ সম্মেলন করবেন। শাহবাগে রাতে এ কর্মসূচি ঘোষণা করে আন্দোলনের সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম বলেছিলেন, আমরা নিয়মতান্ত্রিকভাবে আমাদের কর্মসূচি পালন করছি। আমরা বাধ্য হয়েই আজ রাজপথে নেমে এসেছি। ছাত্ররা সহজে মাঠ ছাড়বে না। আমাদের আহ্বান থাকবে আপনারা দায়িত্বশীল আচরণ করুন। তা না হলে আমরা আরও কঠোর কর্মসূচিতে যেতে বাধ্য হব।

৯ জুলাই: মঙ্গলবার ছিল না বড় কোনো কর্মসূচি। তবে ছাত্র ধর্মঘট, ক্লাস বর্জনের পাশাপাশি কোটার বিরুদ্ধে অনলাইন ও অফলাইনে গণসংযোগ করেছিলেন শিক্ষার্থীরা।

১০ জুলাই: আন্দোলন চলাকালে আদালত স্থিতাবস্থা জারি করলেও সংসদে আইন পাস করে কোটা ব্যবস্থার ‘যৌক্তিক’ সংস্কার না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন শিক্ষার্থী ও চাকরি প্রত্যাশীরা। শুধু পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জন্য সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ কোটা রেখে সরকারি চাকরির সব গ্রেডে কোটা বাতিল করার দাবি করেন তারা। সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের স্থিতাবস্থা জারির আদেশের প্রতিক্রিয়ায় দুপুরে শাহবাগ মোড়ে অবরোধ কর্মসূচি থেকে এ ঘোষণা দিয়েছিলেন আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক হাসনাত আব্দুল্লাহ।

সন্ধ্যায় শাহবাগ মোড়ে নতুন কর্মসূচির ঘোষণা দিয়েছিলেন আন্দোলনের সমন্বয়ক আসিফ মাহমুদ। এ সময় আরেক সমন্বয়ক সারজিস আলম বলেছিলেন, নির্বাহী বিভাগ চাইলে আজকেই আমাদের শেষ কর্মসূচি। রাজপথ আমাদের জায়গা না, আমরা পড়ার টেবিলে ফিরব। যদি নির্বাহী বিভাগের শীর্ষ পর্যায়ের কেউ এটি ঘোষণা করে অথবা নির্বাহী বিভাগ আদেশ জারি করে কিংবা ত্রুটিহীন পরিপত্র জারি হয়, তাহলে আমাদের আর রাজপথে দেখা যাবে না। তিনি আরো বলেছিলেন, ২০১৮ সালের পরিপত্রে কোন কোটাই নেই। এখন সংবিধান-স্বীকৃত নৃগোষ্ঠী, প্রতিবন্ধীরা যদি আবার হাইকোর্টে যায়, তাহলে আবার এ পরিপত্র বাতিল করতে পারে।

১১ জুলাই: আপিল বিভাগের স্থিতাবস্থা বজায় রাখার আদেশের পরও আন্দোলন অব্যাহত রেখেছেন শিক্ষার্থী ও চাকরি প্রত্যাশীরা। বিভিন্ন স্থানে শিক্ষার্থীদের ওপর লাঠিচার্জ করলে অনেক শিক্ষার্থী ও সাংবাদিক আহত হন। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এবং জনপ্রশাসন মন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আন্দোলন বিষয়ে তাদের জোড়ালো মতামত ব্যক্ত করেন। কোটাবিরোধী আন্দোলনকারীরা জনজীবনকে জিম্মি করে, আদালতের প্রতি কোনো ধরনের সম্মান প্রদর্শন না করে তথাকথিত বাংলা ব্লকেডের কর্মসূচি দিয়ে মানুষের জীবনযাত্রা ব্যাহত করার চেষ্টা করছে বলে মন্তব্য করেছেন ওবায়দুল কাদের। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা সীমা অতিক্রম করে যাচ্ছে উল্লেখ করে তাদের অযথা রাস্তায় ভিড় না করতে এবং নিজ নিজ শিক্ষাঙ্গনে ফিরে যাওয়ার অনুরোধ করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান। আন্দোলনকারীদের রাস্তা অবরোধ করে জনদুর্ভোগ সৃষ্টি না করে আদালতের দ্বারস্থ হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন জনপ্রশাসনমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন।

১২ জুলাই: কোটা সংস্কারের দাবিতে শুক্রবার ছুটির দিনেও দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ করেছেন শিক্ষার্থীরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মিছিল শেষে শিক্ষার্থীরা শাহবাগ মোড় অবরোধ করেন। রেলপথ অবরোধ করেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। বৃহস্পতিবার ‘বাংলা ব্লকেড’ নামের অবরোধ কর্মসূচিতে পুলিশের হামলার প্রতিবাদ ও বিচারের দাবিতে সারা দেশে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেন শিক্ষার্থীরা। দুটি স্থানে শিক্ষার্থীরা পুলিশ ও ছাত্রলীগের বাধার কারণে পূর্বঘোষিত কর্মসূচি পালন করতে পারেননি। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভ মিছিল কলাভবনের সামনে থেকে মিছিল শুরু হয়।

ঢাকা-রাজশাহী রেলপথ অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। বিকেলে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টেশন বাজার সংলগ্ন ঢাকা-রাজশাহী রেললাইন অবরোধ করেন তাঁরা। বিক্ষোভে অংশ নেন রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং রাজশাহী মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীরাও।

চট্টগ্রাম নগরের ষোলশহর রেলস্টেশন থেকে বিকেলে বিক্ষোভ মিছিল বের করেন শিক্ষার্থীরা। এতে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও অধিভুক্ত কলেজ ছাড়াও চট্টগ্রামের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী ও চাকরিপ্রত্যাশীরা অংশ নেন। মিছিলটি ষোলশহর থেকে ২ নম্বর গেট, চকবাজার, জামালখান, কাজীর দেউড়ি হয়ে নগরের আলমাস মোড়ে গিয়ে শেষ হয়।জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে মশাল মিছিল করেন শিক্ষার্থীরা। সন্ধ্যা পৌনে সাতটায় বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে থেকে বিক্ষোভ মিছিল বের করেন শিক্ষার্থীরা । মশাল মিছিল করেন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও। সন্ধ্যায় ক্যাম্পাসে এ কর্মসূচি পালন করেন তাঁরা।

রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ সমাবেশ করেন শিক্ষার্থীরা। সন্ধ্যা ছয়টার দিকে শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে ক্যাম্পাসের বাইরে সড়কে অবস্থান নিতে চাইলে পুলিশি বাধায় যেতে পারেননি। পরে শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১ নম্বর ফটকে অবস্থান নেন। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনের সড়কে বিক্ষোভ মিছিল করেন শিক্ষার্থীরা। মিছিলটি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বাসভবনের সামনে গিয়ে থামে। সেখানে শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন স্লোগান দেন। পরে মিছিলটি আনসার ক্যাম্পের সামনে যায়। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা স্থানটিকে ছাত্র আন্দোলন চত্বর নামে ঘোষণা দিয়ে সাইনবোর্ড টাঙান।কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী ও চাকরি প্রত্যাশীরা ময়মনসিংহে বিক্ষোভ করেন। বিকেলে শিক্ষার্থীরা নগরের আনন্দ মোহন কলেজে জমায়েত হয়ে সমাবেশ শেষে মিছিল নিয়ে শহরের গাঙ্গিনারপাড় ট্রাফিক মোড় এলাকায় সড়কে অবস্থান নেন তাঁরা। এ ছাড়া ময়মনসিংহে আনন্দ মোহন কলেজ, নাসিরাবাদ কলেজ, মুমিনুন্নেছা কলেজসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী ও চাকরিপ্রত্যাশীরা বিক্ষোভ করেন। ময়মনসিংহের বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেন শিক্ষার্থীরা।বিকেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্তমঞ্চ থেকে বিক্ষোভ মিছিল শুরু করে আব্দুল জব্বার মোড়ে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ সমাবেশ করেন শিক্ষার্থীরা। পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভ মিছিল বের করেন শিক্ষার্থীরা। বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছিলেন কুষ্টিয়ায় অবস্থিত ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় এবং গোপালগঞ্জে অবস্থিত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা।

নীলফামারীর সৈয়দপুরে মানববন্ধন করেছিলেন বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা। বগুড়ায় সাধারণ শিক্ষার্থীদের ব্যানারে বিকেলে শহরের সাতমাথা থেকে বিক্ষোভ মিছিল বের করেছিলেন আন্দোলনকারীরা। নোয়াখালীর জেলা শহর মাইজদীতে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছিলেন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা। বিকেলে মিছিলটি শহরের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে এক সমাবেশের মাধ্যমে শেষ হয়। কর্মসূচিতে নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং নোয়াখালী সরকারি কলেজসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা অংশ নেন।

১৩ জুলাই: কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন বিষয়ে গভীর পর্যবেক্ষণে সরকার। এরই মধ্যে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোও এ বিষয়ে নজরদারি শুরু করে। আন্দোলন ঘিরে যে কোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়াতে সর্বোচ্চ ধৈর্য ও সতর্ক অবস্থায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

এ দিকে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের নামে মামলা করার ঘটনায় নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে মামলা তুলে নিতে ২৪ ঘণ্টার আল‌টিমেটাম দেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। এ ছাড়া এক দফা কর্মসূচি বাস্তবায়নে নতুন কর্মসূচি হিসেবে গণপদযাত্রা ও রাষ্ট্রপতি বরাবর স্মারকলিপি দেওয়ার কর্মসূচি ঘোষণা দেন। সন্ধ্যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে কর্মসূচি ঘোষণার সময় এ আলটিমেটাম দিয়েছিলেন। অন্যতম সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম বলেছিলেন, ‘সরকার আন্দোলন দমনের পরিকল্পনা ও প্রস্তুতি নিচ্ছে। সরকারের উচিত ছিল প্রথম থেকেই শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনা করা এবং দৃশ্যমান পদক্ষেপের মাধ্যমে কোটা সংস্কার করা। কিন্তু সরকার সেটি না করে আন্দোলনকে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, ক্ষমতাসীন ছাত্রসংগঠন দিয়ে দমনের পরিকল্পনা বা প্রস্তুতি গ্রহণ করছে। আমরা বলে দিতে চাই সরকারের এ ধরনের পরিকল্পনা সরকারের জন্যই বুমেরাং হয়ে দাঁড়াবে।’ তিনি আরো বলেছিলেন,  ‘পুলিশ বক্তব্য দিয়ে বলেছে কোনো ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হয়নি ৷ কিন্তু আজকে হঠাৎ করে অজ্ঞাত মামলা দেওয়া হলো সে বিষয়ে আমরা পুলিশের কাছে আমরা জবাবদিহি চাইছি। ছাত্রসমাজকে এ রকম মামলা-হামলার ভয় দেখিয়ে লাভ হবে?  আমরা আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে এই মামলা প্রত্যাহারের দাবি জানাচ্ছি। যারা বাংলা ব্লকেড কর্মসূচিতে বিভিন্ন জায়গায় হামলার সঙ্গে জড়িত ছিল পুলিশ বাহিনীসহ সরকার দলীয় ছাত্র সংগঠন তাদের আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বিচারের আওতায় আনতে হবে।’
সংবাদ সম্মেলনে আরেক সমন্বয়ক হাসনাত আবদুল্লাহ বলেছিলেন,  ‘আমাদের এত দিন বাংলা ব্লকেড কার্যক্রম ছিল এবং অনেকে এটিকে জনদুর্ভোগ হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করেছে। আমাদের ক্লাস পরীক্ষা বর্জন করে যে ছাত্র ধর্মঘট চলছে সেটির পাশাপাশি আমাদের কর্মসূচি থাকবে জাতীয় সংসদে জরুরি অধিবেশন ডেকে সরকারি সব চাকরিতে সব গ্রেডে কোটার যৌক্তিক সংস্কারের লক্ষ্যে রাষ্ট্রপতি বরাবর স্মারকলিপি প্রদান এবং গণপদযাত্রা। সকাল ১১টায় গণপদযাত্রা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে থেকে শুরু হবে। সারা বাংলাদেশের অন্যান্য যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গণপদযাত্রা করে নিজ নিজ জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি বরাবর স্মারকলিপি প্রদান করবে।’ আরেক সমন্বয়ক সার্জিস আলম বলেছিলেন, ‘আমাদের এই আন্দোলন প্রতিনিয়ত দীর্ঘ করতে হচ্ছে, তীব্র থেকে তীব্রতর করতে হচ্ছে। কিন্তু এর দায় পুরোপুরি নির্ভর করে সরকারের ওপর। কারণ সরকার যদি যৌক্তিক দাবি মেনে নেয় তাহলে কিন্তু আমাদের রাজপথে থাকতে হয় না।’

১৪ জুলাই সংবাদ সম্মেলনে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এক পর্যায়ে বলেছিলেন, কোটা মুক্তিযুদ্ধাদের ছেলেমেয়ে ও নাতি-পুতিরা পাবে না তো রাজাকারের বাচ্চারা পাবে? মুক্তিযুদ্ধাদের সন্তান-নাতিপুতিরা কি মেধাবী না; যত রাজাকারের বাচ্চা-নাতিপুতিরা মেধাবী? শেখ হাসিনার এ ধরণের ঔদ্বত্যপূর্ণ বক্তব্য ছাত্র-জনতার আন্দোলন যেন তেলে বেগুনে জ্বলে উঠল। এসময় তাদের আন্দোলনের স্লোগানে যোগ হয় ভিন্ন মাত্রা। যেমন- 'চেয়েছিলাম অধিকার, হয়ে গেলাম রাজাকার; হয়ে গেলাম রাজাকার, চেয়েছিলাম অধিকার।' জুলাইয়ে আন্দোলন শুরু হলেও তা ১৪ তারিখের পর থেকে ভয়াবহ আকারে রুপ নেয়।

১৪ জুলাই: কোটা সংস্কারের দাবিতে সরকারকে ২৪ ঘণ্টা সময় বেঁধে দেন আন্দোলনকারীরা। এর মধ্যে সরকারের দৃশ্যমান পদক্ষেপ চান তারা। দাবি মানা না হলে আরও কঠোর কর্মসূচির হুঁশিয়ারি দেন। ১৪ জুলাই বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতির প্রতিনিধির কাছে স্মারকলিপি দেওয়ার পর এ ঘোষণা দেন শিক্ষার্থীরা। স্মারকলিপি দিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস থেকে প্রায় ১০ হাজার শিক্ষার্থীর একটি মিছিল বঙ্গভবনের দিকে রওনা হলে পুলিশের বাধার মুখে গুলিস্তান মোড়ে অবস্থান নেয়। পরে ১২ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল স্মারকলিপি দেন। চট্টগ্রামে স্মারকলিপি ও গণপদযাত্রা কর্মসূচি পালন করেন শিক্ষার্থীরা। বেলা ১১টায় নগরীর ষোলশহর স্টেশন থেকে এ কর্মসূচি শুরু করেন তারা। পুলিশের বাধা পেরিয়ে দুপুরে শিক্ষার্থীরা ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) আবদুল মালেকের হাতে স্মারকলিপি দেন। সিলেট জেলা প্রশাসক শেখ রাসেল হাসানের হাতে স্মারকলিপি তুলে দেন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (শাবি), সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, এমসি কলেজ, মদন মোহন কলেজসহ অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। খুলনা জেলা প্রশাসক খন্দকার ইয়াসির আরেফীনের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি বরাবর স্মারকলিপি দেন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের (খুবি) শিক্ষার্থীরা। রংপুরে পদযাত্রা কর্মসূচি পালন করেন বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, কারমাইকেল কলেজ, রংপুর সরকারি কলেজ ও সরকারি বেগম রোকেয়া কলেজের শিক্ষার্থীরা। স্মারকলিপিতে শিক্ষার্থীরা বলেছিলেন, সরকারি চাকরিতে সব গ্রেডে বৈষম্যমূলক কোটা বাতিল করতে হবে। শুধু অনগ্রসর গোষ্ঠী ও বিশেষ চাহিদা সম্পন্নদের জন্য ন্যায্যতার ভিত্তিতে সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ কোটা রেখে সংসদে আইন পাস করে কোটা পদ্ধতিতে সংস্কার আনতে হবে। এতে বলা হয়, তারা দীর্ঘদিন ধরে ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন করে রাজপথে আন্দোলন করে যাচ্ছেন। অথচ সরকার তাদের দাবির বিষয়ে কোনো উদ্যোগ নেয়নি। আন্দোলনকারীরা দ্রুত পড়ার টেবিলে ফিরতে চান। তারা আশা করেন, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সংসদে জরুরি অধিবেশন ডেকে কোটার যৌক্তিক সংস্কার করা হবে।

১৫ জুলাই: সোমবার দুপুরে ধানমণ্ডিতে জরুরি সংবাদ সম্মেলনে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, যে সব শিক্ষার্থী নিজেদের ‘রাজাকার’ বলে স্লোগান তুলেছে, তাদেরকে মোকাবেলায় বাংলাদেশ ছাত্রলীগই যথেষ্ট বলে মন্তব্য করেন । এরপর কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের ওপর ছাত্রলীগের হামলায় ছাত্রীসহ তিন শতাধিক শিক্ষার্থী আহত হন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজয় একাত্তর হলের সামনে প্রথমে দুই পক্ষের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া হয়। পরে দফায় দফায় ক্যাম্পাস জুড়ে সংঘর্ষ ও পাল্টাপাল্টি ইটপাটকেল ছোড়ার ঘটনা ঘটে। পরে ছাত্রলীগ নেতাকর্মী একজোট হয়ে আন্দোলনকারীদের ওপর ধারালো অস্ত্র, রড ও লাঠিসোটা দিয়ে হামলা চালিয়ে ক্যাম্পাস দখলে নেয়।এদিকে রাতে নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করে সারাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালনের ঘোষনা দেন আন্দোলনকারীরা। তারা শেখ হাসিনার বক্তব্যের প্রতিবাদে রোববার মধ্যরাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন ক্যাম্পাসে মিছিল করেন । অন্যদিকে শিক্ষার্থীদের দাবি, সাবেক প্রধানমন্ত্রী তাদের 'রাজাকার' বলায় তারা এমন শ্লোগান দিয়েছেন। সাবেক প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের প্রশ্নে কোটাবিরোধীরা রাজু ভাস্কর্যে বিকেলে কর্মসূচির ডাক দেন। একই স্থানে একই সময়ে ছাত্রলীগও প্রতিবাদ কর্মসূচি ঘোষণা করে। ১৫ জুলাই রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে হলে এবং রাজপথে কিছু মনোক্ষুদ্ধমূলক স্লোগান উচ্চারিত হতে থাকে- 'আমি কে? তুমি কে? রাজাকার, রাজাকার, কে বলেছে? কে বলেছে? স্বৈরাচার, স্বৈরাচার।''কোটা প্রথা নিপাত যাক, মেধাবীরা মুক্তি পাক।''হলে হলে খবর দে, কোটা প্রথার কবর দে, সারা বাংলায় খবর দে, কোটা প্রথার কবর দে।'

১৬ জুলাই: আন্দোলনকারীদের ওপর ছাত্রলীগের হামলার বিচার দাবিতে দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ- সমাবেশ করেন বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা। এ সময় বিভিন্ন স্থানে হামলা, সংঘর্ষ ও ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। চট্টগ্রামে কোটা আন্দোলনকারীদের সঙ্গে ছাত্রলীগ-যুবলীগের নেতাকর্মীর রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে তিনজন প্রাণ হারান। চট্টগ্রামে নগরীর মুরাদপুরে পুলিশ ও ছাত্রলীগের সঙ্গে সংঘর্ষে চট্টগ্রাম কলেজের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অনার্স তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী শহীদ ওয়াসিম শহিদ হন। তিনি কক্সবাজারের পেকুয়ার ইউনিয়নের বাসিন্দা ছিলেন। ঘটনায় আহত হন অর্ধশতাধিক ছাত্র-জনতা। গুলিবিদ্ধ আটজন চমেক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। বিকেল ৩টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত নগরীর মুরাদপুর থেকে ২ নম্বর গেট পর্যন্ত দফায় দফায় ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া, হামলা-পাল্টা হামলা, মুহুর্মুহু ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটে। সংঘর্ষে মোহাম্মদপুর এলাকার বেলাল মসজিদের পাশে একটি সাত তলা ভবনের ওপর অবস্থান নেন ছাত্রলীগের নেতাকর্মী। সেখান থেকে তারা আন্দোলনকারীদের লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করলে কয়েকজন আহত হন। বিকেলে নগরীর মুরাদপুরে কোটা সংস্কার আন্দোলনের সমাবেশে ছাত্রলীগ-যুবলীগের নেতাকর্মী হামলা চালালে সংঘর্ষের সূত্রপাত। এ সময় ছাত্রলীগ- যুবলীগের কয়েকজন নেতাকর্মীকে শিক্ষার্থীদের লক্ষ্য করে গুলি চালায়। সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার পর শিক্ষার্থীরা সরে যাওয়া শুরু করলে পরিস্থিতি শান্ত হয়ে আসে। রংপুরে পুলিশের গুলিতে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, আবু সাঈদ নিহত হন। সাধারণ মানুষ, পুলিশসহ আহত হন দুই শতাধিক। কোথাও কোথাও মারধরের শিকার হন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরাও। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সরকার মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজগুলোও বন্ধ ঘোষণা করতে বাধ্য হয়।

১৭ জুলাই: বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকা সর্বাত্মক শাটডাউনে কার্যত অচল ছিল সারা দেশ। এ সময় রাজধানীর বাইরে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পুলিশ ও ছাত্রলীগ-যুবলীগের পৃথক সংঘর্ষ-হামলায় অনেক নিহত শতাধিক গুলিবিদ্ধসহ সহস্রাধিক আহত হয়। দুপুর ১২টা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত ঢাকার সঙ্গে বিচ্ছিন্ন দেশের অধিকাংশ এলাকার রেল যোগাযোগ। সন্ধ্যায় শেখ হাসিনা দেওয়া ভাষণে আন্দোলনকারীদের সর্বোচ্চ আদালতের রায় আসা পর্যন্ত ধৈর্য ধরার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, 'আমার বিশ্বাস, আমাদের ছাত্রসমাজ উচ্চ আদালত থেকে ন্যায়বিচারই পাবে, তাদের হতাশ হতে হবে না।' আন্দোলনকারী ছাত্ররা তাঁর ভাষানের কোন গুরুত্ব দিতে রাজী নয়। 

১৮ জুলাই: কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের 'কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি ঘিরে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ব্যাপক সহিংসতায় সাংবাদিকসহ অন্তত ৩১ জন নিহত হন। নিহতদের মধ্যে ১১ জন ছাত্র। আহত হয়েছেন কয়েকশ মানুষ। এ আন্দোলনে এ পর্যন্ত ৩৭ জন প্রাণ হারান। বিক্ষোভ চলাকালে রাজধানীর রামপুরায় বিটিভি ভবন এবং মহাখালীতে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর ও সেতু ভবনে অগ্নিসংযোগ করে দূষ্কৃতকারীরা। এতে বিটিভির সম্প্রচার বন্ধ হয়ে যায়। কর্মসূচি চলাকালে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ করেন আন্দোলনকারীরা। মেয়র হানিফ ফ্লাইওভারের টোল প্লাজায় আগুন দেওয়া হয়। পুলিশ, র‍্যাব, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ, আনসারসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করছিলেন। বিকেলে জাতীয় সংসদ ভবনে এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেন, 'আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আলোচনায় বসতে রাজি সরকার। শিক্ষার্থীর সঙ্গে আলোচনার জন্য আমাকে ও শিক্ষামন্ত্রীকে দায়িত্ব দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।'  তবে সরকারের সঙ্গে আলোচনায় যাবে না বলে জানিয়েছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন।সন্ধ্যায় বক্তব্যে অন্যতম সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম বলেছিলেন, শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে সহিংসতা চালিয়ে সরকার উদ্ভূত পরিস্থিতি তৈরি করেছে এর দায় সরকারেরই। শহীদের রক্তের ওপর কোনো সংলাপ হবে না। সরকারকেই সমাধানের পথ বের করতে হবে। শাটডাউন কর্মসূচি আজ শুক্রবার বহাল থাকবে। জুমার নামাজের পর গায়েবানা জানাজা পড়ানোর ঘোষণা দেওয়া হয়।এদিকে গতকাল সন্ধ্যায় কোটা পদ্ধতি বাতিলের পরিপত্র অবৈধ ঘোষণা করে হাইকোর্টের দেওয়া রায়ের বিরুদ্ধে লিভ টু আপিলের শুনানির জন্য রোববার দিন ঠিক করেন চেম্বার আদালত। আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চে ওই দিন এ বিষয়ে শুনানি হবে।ঢাকা মেডিক্যাল হাসপাতালে, গতকাল বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা ১৭৩ জনকে আনা হয়। ফায়ার সার্ভিস নিয়ন্ত্রণ কক্ষ জানান বুধবার থেকে গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত সহিংসতায় দেশের বিভিন্ন এলাকায় ২৫টি আগুনের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ঢাকা মহানগরীতেই ১৫টি। ছয়টি বাস, দুটি মাইক্রোবাস, ২০টি মোটরসাইকেল, রাজনৈতিক দলের দুটি কার্যালয়, টোল প্লাজা, থানা, পুলিশ বক্স, একটি পুলিশের গাড়ি ও দুটি সরকারি অফিস ক্ষতিগ্রস্ত হয়। রাত ৯টার পর থেকে ইন্টারনেট সেবা পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হয়। তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস গতকাল ছিল সুনসান। 

১৯ জুলাই: রক্তক্ষয়ী সহিংসতা ও সংঘাতে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় প্রাণ গেছে আরও ৫৬ জনের। ঢাকায় ৪৪ জন। রাজধানীর বাইরে রয়েছেন ১২ জন। আহত হয়েছেন কয়েকশ। এ নিয়ে কোটা সংস্কার দাবিতে চলমান আন্দোলন কর্মসূচিতে অন্তত ১০০ জন মারা গেছেন। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে গতকাল মধ্যরাত থেকে কারফিউ জারি হয়। শেখ হাসিনা তাঁর পূর্বনির্ধারিত স্পেন সফর বাতিল করে ১৪ দলীয় জোটের শীর্ষ নেতাদের নিয়ে বৈঠক করেন। আকাশ থেকে হামলা: কোটা সংস্কার আন্দোলন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে আকাশ থেকে আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা করা হয়েছিল। ৩-৪টি হেলিকপ্টার থেকে আন্দোলনকারীদের ওপর সাউন্ড গ্রেনেড ও গুলিবর্ষণ করা হয়েছিল। এ সময় তিনজন নিহত হলে আন্দোলনকারীদের একটি অংশ ছত্রভঙ্গ হয়ে বিভিন্ন হাউজিংয়ের অলিগলিতে ঢুকে পড়েন। এ সময় হেলিকপ্টারগুলো আরও একটু নিচে নেমে এসে হাউজিংগুলোতে আশ্রয় নেওয়া আন্দোলনকারীদের সাউন্ড গ্রেনেড ও গুলি করতে থাকে। ওপর থেকে একের পর এক সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপে পুরো এলাকা প্রকম্পিত হলে হাউজিংয়ের বাসিন্দারা আতঙ্কিত হয়ে দিগ্বিদিক ছোটাছুটি করতে থাকেন। মিরপুরে ইনডোর স্টেডিয়াম, মৌচাক পুলিশ বক্স, উত্তরায় পুলিশের ডিসি কার্যালয়, টিঅ্যান্ডটির আঞ্চলিক অফিস ও পলওয়েল মার্কেটে অগ্নিসংযোগ করা হয়। মিরপুর ১০ নম্বরে মেট্রোরেলের চলন্ত সিঁড়িতে আগুন দেওয়া হয়। পাল্টাপাল্টি সংঘর্ষে রণক্ষেত্রে পরিণত হয় বহু এলাকা। বিজয়নগর এলাকায়ও ব্যাপক তাণ্ডব চালানো হয়েছে। সড়ক বিভাজকের ওপর কেটে ফেলা হয় গাছ। এদিকে নরসিংদীতে জেলা কারাগারসহ আরও কয়েকটি স্থাপনায় হামলা চালায় দুর্বৃত্তরা। এর পর বেশ কয়েকজন কয়েদি কারাগার থেকে পালিয়ে যান। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে কারাগারসহ দেশের সব সরকারি স্থাপনার নিরাপত্তা আরও জোরদার করা হয়। ঢাকায় মোতায়েন করা হয় বিজিবির ৭৫ প্লাটুন সদস্য। সন্ধ্যার পর ধানমন্ডির একটি গলি থেকে নিখোঁজ হন সমন্বয়ক আবু বাকের মজুমদার। রাত ১১টায় হাতিরঝিলের মহানগর আবাসিক এলাকা থেকে সমন্বয়ক আসিফ মাহমুদকে তুলে নিয়ে আন্দোলন স্থগিত ঘোষণা করার জন্য চাপ দেওয়া হয়। ১৯ জুলাই মধ্যরাতে খিলগাঁওয়ের নন্দীপাড়া এলাকা থেকে প্রধান সমন্বয়ক নাহিদ ইসলামকে তুলে নেওয়া হয়েছিল। একই দিন আসিফ মাহমুদ ও আবু বাকের মজুমদারকেও তুলে নিয়েছিল ।

২০ জুলাই: রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সংঘাতের ঘটনায় দুই পুলিশ, এক আনসার সদস্যসহ ৩৮ জন নিহত হন। রাজধানীর বাইরে নিহতদের মধ্যে নরসিংদীতে সাত, নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে ছয়, ময়মনসিংহে চার, সাভারে চার ও গাজীপুরে চারজন রয়েছেন। রাজধানীর রামপুরা, বাড্ডা, যাত্রাবাড়ী, মোহাম্মদপুর ও বছিলায় ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া এবং সংঘর্ষ হয়েছে। গাজীপুরের টঙ্গীতে বেশ কিছু পোশাক কারখানায় ভাঙচুর করা হয়, দেওয়া হয় আগুন।রাত ১২টা থেকে কারফিউ জারি করার পাশাপাশি নামানো হয় সেনাবাহিনী। এর পর মধ্যরাতে কারফিউর সময়সীমা অনির্দিষ্টকালের জন্য বর্ধিত করা হয়। বিকেল ৩টা থেকে ৫টা পর্যন্ত দুই ঘণ্টা বিরতি থাকবে। এর পর থেকে অনির্দিষ্টকাল কারফিউ চলমান থাকবে বলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়। নির্বাহী আদেশে দুইদিনের সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে সরকার। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে কড়া বার্তা দিয়ে বলা হয়, আন্দোলনের নামে জনগণ ও সরকারি স্থাপনার ক্ষতিসাধন এবং আগুন দেওয়া হলে গুলি করার নির্দেশ দেওয়া হয়। কারফিউ উপেক্ষা করে বিভিন্ন জেলায় সংঘর্ষ, আগুন ও ভাঙচুর, সংঘর্ষ ও পুলিশের গুলিতে বিভিন্ন জেলায় প্রাণ গেছে আরও ২৩ জনের। আহত হয়েছেন পাঁচ শতাধিক মানুষ আহতদের মধ্যে আন্দোলনকারী ছাড়াও পুলিশ এবং সাধারণ মানুষ রয়েছেন। সহিংসতার ঘটনায় বিভিন্ন জেলায় আটক ও গ্রেপ্তার হয় পাঁচ শতাধিক। কারফিউর মধ্যে চট্টগ্রামে কোনো সহিংসতা না ঘটলেও শহরে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছিল। নগরীর গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোয় সেনাবাহিনী ছিল। তিন দিনে সাত মামলায় ১০ হাজার জনকে আসামি করা হয়েছে। গ্রেপ্তার করা হয়েছে আড়াই শতাধিক বিএনপি- জামায়াত নেতাকর্মী ও আন্দোলনকারীকে। এর মধ্যে গত ২৪ ঘণ্টায় বিএনপি- জামায়াতের অর্ধশত নেতাকর্মী গ্রেপ্তার ও সব রুটের ট্রেন ও দূরপাল্লার যানবাহন বন্ধ ছিল ।

২১ জুলাই: ইন্টারনেট না থাকায় অনলাইনভিত্তিক শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ ও শঙ্কিত প্রযুক্তি ব্যবসায়ীরা। ভোগান্তিতে পড়ে দেশের মানুষ। নেটওয়ার্ক জটিলতায় প্রিপেইড মিটারের ব্যালান্স শেষ হলে তারা টাকা রিচার্জ করতে পারছিল না। বিদ্যুৎ না থাকায় পানি সংকট দেখা দিয়েছিল, গ্যাসের প্রিপেইড গ্রাহকরাও দুর্ভোগে পড়েছিলেন। অনলাইন ভিত্তিক আর্থিক কার্যক্রম থমকে গেছিল। কয়েক লাখ ফ্রিল্যান্সার কাজ হারানো ঝুঁকিতে পড়েছেন। বিমানের টিকিট বিক্রি বাধাগ্রস্ত হয়েছিল। দ্রুত সংবাদ আদান-প্রদান ও তথ্য যাচাই ব্যাহত ও বন্ধ ছিল অনলাইন সংবাদ মাধ্যমের প্রকাশনা। ১৯ জুলাই মধ্যরাতে খিলগাঁওয়ের নন্দীপাড়া এলাকা থেকে তুলে নেওয়া প্রধান সমন্বয়ক নাহিদ ইসলামকে ২১ জুলাই ভোরে ফেলে যাওয়া হয় পূর্বাচল এলাকায়।

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের যাত্রাবাড়ীর রায়েরবাগ এলাকা, রামপুরা ও বাড্ডায় বিক্ষিপ্ত ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া এবং সংঘর্ষ হলে এতে আরও চারজন নিহত হয়। এ ছাড়া ঢাকা মেডিকেল কলেজে (ঢামেক) চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও পাঁচজন মারা যান। এ ছাড়া ঢাকার বাইরে নরসিংদীতে চার, সাভারে একজন নিহত হয়। ঢাকায় পথে পথে চেকপোস্ট বসিয়ে তল্লাশি করা হয় । সেনাবাহিনীকে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় টহল দিতে দেখা যায়। এর মধ্যেই ঢাকার দু-তিনটি এলাকায় অলিগলি থেকে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে বিক্ষোভকারীরা। বিকেল ৩টা থেকে ৫টা পর্যন্ত কারফিউ শিথিল করে পরবর্তী ঘোষণা না দেওয়া পর্যন্ত অনির্দিষ্টকাল বলবৎ থাকার কথা জানানো হয়। আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম রাতে সাংবাদিকদের বলেছিলেন, কারফিউ চলমান থাকায় আগামী ৪৮ ঘন্টার জন্য আন্দোলনের সব কর্মসূচি স্থগিত করা হয়েছে। ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে কারফিউ তুলে নিতে হবে এবং ইন্টারনেট চালু করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দিতে হবে। শিক্ষার পরিবেশ স্বাভাবিক করার দাবি জানান তিনি। কোটা নিয়ে হাইকোর্টের দেওয়া রায় বাতিল করে দিয়ে আপিল বিভাগের দেওয়া রায়ের পর্যবেক্ষণে চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে ৯৩ শতাংশ নিয়োগ মেধার ভিত্তিতে, মুক্তিযোদ্ধা, শহীদ মুক্তিযোদ্ধা ও বীরাঙ্গনার সন্তানদের জন্য ৫ শতাংশ, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জন্য ১ শতাংশ এবং প্রতিবন্ধী ও তৃতীয় লিঙ্গের জন্য ১ শতাংশ কোটা সংরক্ষণ করা হয়। তবে সরকারের নির্বাহী বিভাগ চাইলে এই কোটা পুনর্বিন্যাসসহ যে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারবে। অন্যদিকে এ আন্দোলনের ৫৯ সমন্বয়ক ও সহসমন্বয়কের পক্ষে সন্ধ্যায়  আবদুল কাদেরের পাঠানো বিবৃতিতে বলা হয়, সর্বোচ্চ আদালতের রায় অস্পষ্ট। এতে বিভ্রান্তির সুযোগ রয়েছে। সব কোটার বিষয়ে সুস্পষ্ট সমাধান নেই। কোটা নিয়ে সরকারের যথেচ্ছ ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে। তিনি এক সপ্তাহের মধ্যে সংসদের বিশেষ অধিবেশন ডেকে আইন পাসের দাবি জানান। বিবৃতিতে বলা হয়, গণআন্দোলন দমন করতে ইন্টারনেট সেবা বন্ধ করে পরিস্থিতি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে। আবদুল কাদের তাদের দাবি মেনে নেওয়া ও ছাত্র-জনতার ওপর গুলি চালানো বন্ধ করার জন্য সরকারের প্রতি আহবান জানান।

২২ জুলাই: সারাদেশে চিরুনি অভিযান ও সংঘর্ষ অব্যাহত থাকে। ১৮ থেকে ২২ জুলাই-পাঁচ দিনে সংঘর্ষে হতাহত কয়েক হাজার ব্যক্তিকে নেওয়া হয়েছিল রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতালে। তাদের মধ্যে নারী, শিশুসহ সব বয়সী মানুষ ছিলেন। অধিকাংশ ছিলেন ছররা এবং বুলেট দুই ধরনের গুলিই ছিল আহতদের শরীরে। নিহত ব্যক্তিদের বড় অংশই ছিলেন বুলেটবিদ্ধ। ১৯ এবং ২০ জুলাই চিকিৎসা নিতে আসা আহত বেশির ভাগ বুলেট বিদ্ধ। আগের দুই দিনের আহতরা ছিলেন ছররা গুলিবিদ্ধ।এদিকে শেখ হাসিনা আন্দোলনকারী ছাত্রদের দমাতে ব্যর্থ হয়ে তাদের সংলাপে বসার আহ্বান জানান। সাবেক প্রধানমন্ত্রীর এই প্রস্তাবের ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যেই আন্দোলনকারীরা প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাব সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে ছাত্ররা বলেছিলেন, দুই শতাধিক ছাত্র-জনতার শহীদ হওয়ার পর আন্দোলন আর কোটার মধ্যে সীমাবদ্ধ নাই। তাদের দাবী গড়িয়েছিল এক দফায়। আর সেটা হলো, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং তার সমস্ত মন্ত্রীসভার পদত্যাগ।

২৩ জুলাই: কোটা সংস্কার আন্দোলন ঘিরে ঢাকাসহ দেশজুড়ে গ্রেপ্তারে সাঁড়াশি অভিযান অব্যাহত থাকে। নাশকতার স্পটের আশপাশ এলাকাসহ বিভিন্ন স্থানের অলিগলি, এমনকি বাড়ি বাড়ি গিয়ে সন্দেহ হলে মোবাইল ফোন যাচাই করে কোনো আলামত পেলেই আটক করতে থাকে। এ প্রেক্ষিতে চার দফা দাবি জানিয়ে সরকারকে ৪৮ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দিয়েছিল কোটা সংস্কার আন্দোলনের এই প্লাটফর্ম। কোটা পুনর্বহাল করে হাইকোর্টের রায় বাতিল করে কোটা ব্যবস্থার সংস্কার করে আদেশ দিয়েছিল আপিল বিভাগ। মঙ্গলবার একটি সংবাদ সম্মেলনে আইনমন্ত্রী জানান, সুপ্রিম কোর্টের রায়ের আলোকে কোটা সংস্কার করে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। এরপর নিজেদের প্রতিক্রিয়া জানাতে মঙ্গলবার বিকেলে রাজধানীর ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে সংবাদ সম্মেলন করেন। সংবাদ সম্মেলনে তাঁরা, কোটা আন্দোলন ঘিরে যে রক্তপাত ও হত্যাকাণ্ড ঘটেছে তার দায় সরকার এড়াতে পারে না। যে কারণে সারাদেশে কারফিউ প্রত্যাহার, ইন্টারনেট সংযোগ চালু, বন্ধ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়া ও সারা দেশের সমন্বয়ক ও আন্দোলনকারীদের নিরাপত্তার দাবি জানানো হয়। এই চার দফা দাবি বাস্তবায়নে সরকারকে ৪৮ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দিয়েছিলেন শিক্ষার্থীরা।

২৪ জুলাই: শেখ হাসিনা বিভিন্ন গণমাধ্যম ব্যক্তিদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে বলেছিলেন, আমি জানতাম যে নির্বাচন করতে দেবে না। তারপরও আমরা নির্বাচন করে ফেলেছি। পরে বলা হলো, নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হবে না, সেটাও গ্রহণযোগ্য করতে পেরেছি। সরকার গঠন করতে পেরেছি। আমার ধারণা ছিল, এই ধরনের একটা আঘাত আবার আসবে। কোটা আন্দোলন কেন্দ্র করে সহিংস পরিস্থিতি সৃষ্টির পেছনে অনেক বড় ষড়যন্ত্র ছিল জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, এটা যে একটা বিরাট চক্রান্ত- সেটা বোঝাই যাচ্ছিল। এবার আমরা কিন্তু আগে থেকে খবর পেয়েছি, ঢাকায় লোক ঢুকবে। ১৯ জুলাই তুলে নেওয়া আসিফ মাহমুদ ও আবু বাকের মজুমদারকে ২৪ জুলাই আসিফকে হাতিরঝিল ও বাকেরকে ধানমন্ডি এলাকায় ফেলে যাওয়া হয়। টানা তিন কার্যদিবস বন্ধ থাকার পর আজ  ১১টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত ব্যাংকগুলো খোলা হয়েছিলেন। ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতি গ্রেফতারের তীব্র নিন্দা: ছাত্র শিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি মঞ্জুরুল ইসলাম ও সেক্রেটারি জেনারেল জাহিদুল ইসলাম এক যৌথ বিবৃতিতে ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহেরকে গ্রেফতারে নিন্দা ও প্রতিবাদ জানান। তারা বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের আন্দোলনকে দমাতে ব্যর্থ হয়ে সরকার দমনপীড়নের পথ বেছে নিয়েছে। চিরুনি অভিযানের নামে সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে বিরোধী দলের শীর্ষ নেতাদের গ্রেফতার করা হচ্ছে। এরই ধারাবহিকতায় রাতে বাংলাদেশের অত্যন্ত সুপরিচিত ও ক্লিন ইমেজের রাজনীতিবীদ, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহেরকে (সাবেক এমপি) অন্যায়ভাবে গ্রেফতার করা হয়। আজ আদালতে হাজির করে অন্যায়ভাবে পাঁচ দিনের রিমান্ড দেয়। আমরা এই গ্রেফতার ও রিমান্ডের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি।’

২৫ জুলাই: চলমান চিরুনি অভিযানে গত ২৪ ঘণ্টায় বিএনপি-জামায়াতের ঢাকায় আরও ৪৫১ জনকে গ্রেপ্তার করে। এ নিয়ে ঢাকায় মোট ২ হাজার ২০৯ জনকে গ্রেপ্তার করা হলো। মামলার সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২০১টি। এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন স্থানে আরও ১৭১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। রাতে মোহাম্মদুপর সূচনা কমিউনিটি সেন্টারে মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের ঢাকা-১৩ আসনের তিন থানা ও ওয়ার্ড নেতাদের বৈঠকে মোহাম্মদপুর, আদাবর ও শেরেবাংলা নগর থানার ২৭টি ইউনিটের দায়িত্বপ্রাপ্ত সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকরা আন্দোলন মোকাবিলায় সরাসরি অংশ নেননি বলে অভিযোগ ওঠে। অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে এসব ইউনিটের কমিটি ভেঙে ফেলা হয়েছে। 

২৬ জুলাই: শেখ হাসিনা বাংলাদেশ টেলিভিশন ভবনে (বিটিভি) চালানো ধ্বংসযজ্ঞ পরিদর্শন কালে বরাবরের মত  তিনি বিএনপি-জামায়াত ও শিবিরকে দায়ী করেন। ধ্বংসযজ্ঞে জড়িতদের গ্রেপ্তার করে বিচারের আওতায় আনতে আহ্বান জানান তিনি।এদিকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম, আসিফ মাহমুদ ও আব্দুল বাকের মজুমদারকে বিকেলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ঢাকার গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র থেকে নিরাপত্তার অজুহাত দেখিয়ে ডিবি কার্যালয়ে বন্দি করা হয়। গণস্বাস্থ্য হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক আনোয়ারা বেগম লাকী গণমাধ্যমকে বলেছিলেন, 'বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের তিন সমন্বয়ক আমাদের হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। তারা এখনও পুরোপুরি সুস্থ নন। তাদের হাসপাতাল থেকে রিলিজও দেওয়া হয়নি। তবে সবাই নিজেদের ডিবি পুলিশ পরিচয় দিয়েছেন।'

২৭ জুলাই: চলমান চিরুনি অভিযানে সন্ধ্যায় সমন্বয়ক সারজিস আলম ও হাসনাত আবদুল্লাহকে ডিবি কার্যালয়ে বন্দি করা হয়। তাঁরা গণস্বাস্থ্য নগর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। ‘বাংলাদেশ প্রতিদিন’ মিথ্যা ও বানোয়াট প্রচারে নিন্দা: বাংলাদেশ প্রতিদিন পত্রিকা ছাত্রশিবিরকে নিয়ে মিথ্যা ও বানোয়াট খবর প্রচার করায় তীব্র নিন্দা জানান। কেন্দ্রীয় সভাপতি মঞ্জুরুল ইসলাম ও সেক্রেটারি জেনারেল জাহিদুল ইসলাম বলেন,‘অবৈধ আওয়ামী লীগ সরকারের চালানো গণহত্যার প্রসঙ্গকে পাশ কাটিয়ে জনগণের দৃষ্টি ভিন্নখাতে প্রবাহিত করতে আওয়ামী বাহিনী জামায়াত-শিবিরসহ বিরোধী দলের ওপর মিথ্যা ও মনগড়া বয়ান তৈরি করার মিশনে নেমেছে। তার সুরে সুর মিলিয়ে জাতীয় দৈনিক ‘বাংলাদেশ প্রতিদিন' আজকের সংখায় (২৭ জুলাই) ‘যুবলীগ কর্মীকে হত্যার পর গাছে ঝুলিয়ে রাখে জামায়াত-শিবির' শিরোনামে যে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, তা জাতির জন্য সত্যিই দুর্ভাগ্যজনক! মিডিয়া তো জনগণের কথা বলবে, কিন্তু, বাংলাদেশ প্রতিদিন কর্তৃপক্ষ কেন সরকারের মূখপাত্রের ভূমিকা পালন করছে তা আমাদেরও বোধগম্য নয়। নেতৃবৃন্দ বলেন, উল্লিখিত ঘটনার সাথে ছাত্রশিবিরের দূরতম কোনো সম্পর্ক নেই। আমরা এই উদ্দেশ্যমূলক, মিথ্যা ও বানোয়াট প্রতিবেদনের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি এবং অবিলম্বে এ প্রতিবেদন প্রত্যাহারের জোর দাবি জানাচ্ছি। নেতারা বলেন, প্রতিবেদন দেখে মনে হয়েছে তাদের ওপর সরকারের অপশক্তি ভর করেছে। তাই তারা নীতিবোধ ভুলে গিয়ে একটা নিয়মতান্ত্রিক ছাত্রসংগঠনের ওপর অপবাদ ছড়াচ্ছে। এটা জাতির জন্য খুবই হতাশাজনক। এ ধরনের একপেশে আচরণ থেকে আপনারা বের হয়ে না এলে জনগণ থেকে আরো বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবেন। সেইসাথে জাতীয় দৈনিক পত্রিকা হিসেবে পেশাদার ভূমিকা পালন করার পরামর্শ দেন।সন্ধ্যায় অনলাইনে সংবাদ সম্মেলনে দেয়াল দেয়ালে গ্রাফিতি ও দেয়াললিখন কর্মসূচির ঘোষণা দেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক আবদুল হান্নান মাসউদ, মাহিন সরকার ও সহসমন্বয়ক রিফাত রশীদ। আগামীকালের (রোববার) মধ্যে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়কসহ সব শিক্ষার্থীর মুক্তি, ‘মিথ্যা মামলা’ প্রত্যাহার ও শিক্ষার্থীদের হত্যার সঙ্গে জড়িত সব দোষী ব্যক্তির বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা নিতে হবে। তা না হলে পরশুদিন (কাল) থেকে তাঁরা কঠিন কর্মসূচি নিতে বাধ্য হবেন।

২৮ জুলাই: ডিবি কার্যালয়ে থাকা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ছয় সমন্বয়ক আন্দোলন প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়েছেন মর্মে জোরপূর্বক ঘোষনা পত্রে স্বাক্ষর নেওয়া হয়। যা রবিবার রাতে এ সংক্রান্ত একটি ঘোষণাপত্রে ছয় সমন্বয়ক স্বাক্ষর করেছেন। এরা হলেন নাহিদ ইসলাম, সারজিস আলম, হাসনাত আব্দুল্লাহ, আবু বাকের মজুমদার, আসিফ মাহমুদ ও নুসরাত তাবাসসুম। তবে আত্মগোপনে থাকা অন্য সমন্বয়করা জানিয়েছেন, ডিবি কার্যালয়ে থাকা নেতাদের অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে আন্দোলন প্রত্যাহারের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে ডিবি কার্যালয় থেকে নাহিদ ইসলামের আন্দোলন প্রত্যাহারের ঘোষণাকে 'জোরপূর্বক স্ক্রিপ্টেড বিবৃতি' আখ্যা দিয়ে তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানানো হয়।বিবৃতিতে বলা হয়, গত ২৬ জুলাই ঢাকার গণস্বাস্থ্য নগর হাসপাতাল থেকে তিন সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম, আসিফ মাহমুদ ও আবু বাকের মজুমদারকে ডিবি জোর করে তুলে মিন্টো রোডের কার্যালয়ে নিয়ে যায়। নাহিদ ও আসিফ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। পরদিন ২৭ জুলাই সারজিস ও হাসনাতকে সায়েন্স ল্যাব এলাকা থেকে জোর করে তুলে ডিবি কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। ২৮ জুলাই ভোররাতে বাসা ভেঙে জোর করে নুসরাতকে ডিবি কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। মূলত আন্দোলন ও নেতৃত্বকে ছত্রভঙ্গ করতেই ১৯ জুলাই থেকে সমন্বয়কদের গুম, গ্রেপ্তার, নির্যাতন ও হয়রানি করা হচ্ছে। এর ধারাবাহিকতায় নিরাপত্তার নামে ছয় সমন্বয়ককে ডিবি হেফাজতে জোর করে আটকে রাখা হয়।আন্দোলন প্রত্যাহারের ঘোষণা-সংক্রান্ত ডিবি কার্যালয় থেকে প্রচারিত ছয় সমন্বয়কের ভিডিও বিবৃতিটি তাঁরা স্বেচ্ছায় দেননি বলে যৌথ বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়। এতে বলা হয়, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কোনো সিদ্ধান্ত ডিবি কার্যালয় থেকে আসতে পারে না। সারা দেশের সব সমন্বয়ক ও আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ ছাড়া কোনো সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত বলে গৃহীত হবে না। ডিবি কার্যালয়ে তাঁদের জোর করে খাবার টেবিলে বসিয়ে ভিডিও করা হয়। তাঁদের ছেড়ে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে পরিবারকে ডেকে ১৩ ঘণ্টা বসিয়ে রাখা হয়।অন্যায়ভাবে সমন্বয়কদের আটক, সারা দেশে শিক্ষার্থীদের গ্রেপ্তার ও নির্যাতনের প্রতিবাদে ৩০ জুলাই রাত থেকে সমন্বয়ক নাহিদ, আসিফ ও আবু বাকের ডিবি কার্যালয়ে আটক অবস্থায় অনশন শুরু করেন। এ খবর জানামাত্র সারজিস, হাসনাত ও নুসরাতও অনশন শুরু করেন। বিবৃতিতে আরও বলা হয়, অনশনের কথা পরিবার ও গণমাধ্যমের কাছ থেকে গোপন করা হয়। ৩২ ঘণ্টার বেশি সময় অনশনের পর ডিবিপ্রধান ছয় সমন্বয়ককে মুক্তির চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেন। তখন অনশন ভাঙা হয়। ১ আগস্ট দুপুর দেড়টায় পরিবারের জিম্মায় তাঁদের ছেড়ে দেওয়া হয়। ডিবি কার্যালয়ে তাঁদের ও পরিবারের সঙ্গে নানা হয়রানি, নির্যাতন ও নাটক মঞ্চস্থ করা হয়েছে। তাঁরা এর তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নির্দেশেই তাঁদের অন্যায়ভাবে আটকে রাখা হয়েছিল। প্রতিবাদে পরদিন সোমবার বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন সারাদেশে ছাত্র-জনতার বিক্ষোভ কর্মসূচি এবং প্রতিবাদ সমাবেশ করার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। ফেসবুক, হোয়াটসআপ, ইউটিউব ও টিকটক বন্ধ রেখে ১০ দিন পর চালু হয় মোবাইল ইন্টারনেট।সারাদেশে গণগ্রেফতার রিমান্ডে নিয়ে জুলুম-নির্যাতন ও শতশত ছাত্রদের কান্নার আওয়াজে আকাশ বাতাস ভারি হয়ে যায়। আর সরকার কঠোর থেকে আরো কঠোরে যাচ্ছে। সরকার ছাত্রদের যৌক্তিক আন্দোলনকে স্তব্ধ করে দিতে চাচ্ছেন বলে অভিযোগ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের।

গণগ্রেফতার বন্ধে জামায়াতে ইসলামীর বিবৃতি : বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা এটিএম মা’ছুম এক বিবৃতিতে বলেন, বৈষম্যবিরোধী শান্তিপূর্ণ ছাত্র আন্দোলন নস্যাৎ করে দেয়ার জন্য সরকার ছাত্রদের বুকে গুলি চালিয়ে দেশে গণহত্যা করেছে। ছাত্রদের অরাজনৈতিক আন্দোলনকে দমন করতে গিয়ে রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করে দেশে রক্তের বন্যা বয়ে দিয়েছে সরকার। দেশের ছাত্রসমাজ, শিক্ষকসমাজ, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবীসহ সর্বস্তরের জনগণ সরকারের এই গণহত্যার বিরুদ্ধে যখন ঐক্যবদ্ধ তখন সরকার গণরোষ থেকে বাঁচার জন্য এ আন্দোলনকে রাজনৈতিক রূপ দিয়ে দলীয় নেতা-কর্মীদের গণহারে গ্রেফতার করছে। গত ১১ দিনে সারাদেশে কোমলমতি শিক্ষার্থীসহ ১০ সহস্রাধিক লোককে গ্রেফতার করা হয়েছে। অনেককে বাড়িঘর থেকে তুলে নিয়ে গুম করা হচ্ছে। গ্রেফতারকৃতদের অনেককে রিমান্ডে নিয়ে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হচ্ছে।বিবৃতিতে তিনি বলেন, বৈষম্যবিরোধী শান্তিপূর্ণ ছাত্র আন্দোলন নস্যাৎ করে দেয়ার জন্য সরকার ছাত্রদের বুকে গুলি চালিয়ে দেশে গণহত্যা করেছে। ছাত্রদের অরাজনৈতিক আন্দোলনকে দমন করতে গিয়ে রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করে দেশে রক্তের বন্যা বয়ে দিয়েছে সরকার। দেশের ছাত্রসমাজ, শিক্ষকসমাজ, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবীসহ সর্বস্তরের জনগণ সরকারের এই গণহত্যার বিরুদ্ধে যখন ঐক্যবদ্ধ তখন সরকার গণরোষ থেকে বাঁচার জন্য এ আন্দোলনকে রাজনৈতিক রূপ দিয়ে দলীয় নেতা-কর্মীদের গণহারে গ্রেফতার করছে। গত ১১ দিনে সারাদেশে কোমলমতি শিক্ষার্থীসহ ১০ সহস্রাধিক লোককে গ্রেফতার করা হয়েছে। অনেককে বাড়িঘর থেকে তুলে নিয়ে গুম করা হচ্ছে। গ্রেফতারকৃতদের অনেককে রিমান্ডে নিয়ে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হচ্ছে।বিবৃতিতে তিনি আরো বলেন, আদালতের আদেশ অবজ্ঞা করে রিমান্ডে নিয়ে রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদেরকে পঙ্গু করে দেয়া হচ্ছে। ডাকসুর সাবেক ভিপি নূরুল হক নূরের স্ত্রী তার সাথে সাক্ষাতের পর সাংবাদিকদের জানান, নূরের ওপর সীমাহীন নির্যাতন করা হয়েছে। যাদেরকে সুস্থ অবস্থায় গ্রেফতার করা হয়েছে তাদেরকে নির্যাতন চালিয়ে অসুস্থ অবস্থায় আদালতে হাজির করা হয়েছে। শিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি হাফেজ রাশেদুল ইসলামকে ৮ দিন আটক রেখে সরকার একটা নাটক সাজিয়ে তাকে মিথ্যা মামলায় গ্রেফতার দেখিয়েছে।গণগ্রেফতার, গণনির্যাতন বন্ধ করে ও গ্রেফতারকৃতদের অবিলম্বে মুক্তি দিয়ে এবং ছাত্রদের দাবিসমূহ মেনে নিয়ে কারফিউ প্রত্যাহার করে দেশে স্বস্তির পরিবেশ ফিরিয়ে আনার জন্য আহ্বান জানানো হয়। 

২৯ জুলাই: ১৪ দলের বৈঠকে জামায়াত-শিবিরের রাজনীতি নিষিদ্ধ করার সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে। গণভবনে অনুষ্ঠিত ১৪ দলের বৈঠকে এই সিদ্ধান্ত গৃহীত হওয়ার পরপরই জামায়াত-শিবিরের রাজনীতি নিষিদ্ধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে স্বরাষ্টমন্ত্রী ও আইনমন্ত্রীকে নির্দেশ দেন শেখ হাসিনা। বৈঠক শেষে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের সাংবাদিকদের বলেন, ১৪ দলীয় জোটের নেতৃবৃন্দ মনে করেন বিএনপি, জামায়াত, ছাত্রদল, শিবির এবং তাদের দোসর উগ্রবাদী জঙ্গি গোষ্ঠী বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব নস্যাৎ করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। তারা সন্ত্রাস, নৈরাজ্য, হত্যাকান্ডের মাধ্যমে দেশকে অকার্যকর করার ষড়যন্ত্র করছে। অতি সম্প্রতি চোরা-গোপ্তা হামলা করে এবং গুলি বর্ষন করে সরকারের উপর দায় চাপাতে তারা দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে। পুলিশ বাহিনীর সদস্যসহ মানুষ হত্যা করে লাশ পর্যন্ত ঝুলিয়ে রেখেছে। এই সন্ত্রাসী গোষ্ঠী যে প্রক্রিয়ায় হত্যাকান্ড ঘটিয়েছে তা ইতিহাসে নজিরবিহীন। জাতীয় স্বার্থে দেশবিরোধী এ অপশক্তিকে নির্মূল করা প্রয়োজন। এদিকে ছয় সমন্বয়ককে ডিবি হেফাজতে রাখার আইনগত বৈধতার প্রশ্নে দায়েরকৃত রিটের শুনানিকালে রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলির বক্তব্যের প্রেক্ষিতে আদালত বলেন, "যাকে খুশি তাকে ধরে নিয়ে গিয়ে খাবার টেবিলে বসিয়ে দেন, ছবি তুলে আবার সেটি প্রচারও করেন। জাতিকে নিয়ে মশকরা করবেন না। "রিটকারীর পক্ষে ব্যারিস্টার সারা হোসেন বলেন, 'ডিবি দাবি করেছে নিরাপত্তার জন্যই ছয় সমন্বয়ককে তুলে নেওয়া হয়েছে। এদের গ্রেফতার বা আটক করা হয়নি। কিন্তু সংবিধানে এভাবে কাউকে তুলে নিয়ে হেফাজতে রাখার কোনো সুযোগ নেই। এমনকি কোনো আইনেও নেই। তাহলে তাদের কেন ছেড়ে দেওয়া কিংবা কোনো আদালতে হাজির করা হচ্ছে না। তাহলে এভাবে আটক রাখার ক্ষমতা ডিবি কোথায় পেল? নিরাপত্তার স্বার্থে কাউকে তুলে নেওয়া যায়, এটা কোথায় আছে? গ্রেফতারি পরোয়ানা ছাড়া কাউকে তুলে নেওয়ার কথা কোথায় আছে? আমরা কখনো এই ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হইনি। এই ছয় জনের মুক্তি চাই।' রিটকারীর পক্ষে অ্যাডভোকেট জেড আই খান পান্না বলেন, 'আজকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার নামে যা হচ্ছে, তা মেনে নেওয়া যায় না। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীনাগরিকের মোবাইল পরীক্ষা করছে, এতে তো ব্যক্তির গোপনীয়তা লঙ্ঘন হচ্ছে।' শুনানী শেষে পরদিন মঙ্গলবার আদেশের জন্য দিন ধার্য্য করে হাইকোর্ট। কোটা সংস্কার আন্দোলনকে ঘিরে যেভাবে গ্রেফতারের হিড়িক শুরু হয়েছে, সেটিকে ‘গণগ্রেফতার’ ও ‘নির্বিচারে আটক’ হিসেবে উল্লেখ করেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। সোমবার একটি বিবৃতিতে ছাত্রনেতা ও আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীদেরকে ‘নির্বিচারে আটক’ বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি। বিবৃতিতে বিভিন্ন প্রতিবেদনের ভিত্তিতে বলা হয়েছে যে বাংলাদেশে সপ্তাহজুড়ে নয় হাজারের বেশি মানুষকে গ্রেফতার করা হয়েছে, যা সম্পূর্ণ ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ বলেন সংগঠনের দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের পরিচালক স্মৃতি সিং।

রাষ্ট্রীয় শোক পালন কর্মসূচি প্রত্যাখ্যান করে মঙ্গলবার লাল কাপড় মুখে ও চোখে বেঁধে ছবি তোলা এবং অনলাইনে ব্যাপক প্রচার কর্মসূচি পালনের আহ্বান জানিয়েছে কোটাসংস্কার আন্দোলনকারীরা। সোমবার রাতে পাঠানো এক বিবৃতির মাধ্যমে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক মাহিন সরকার এ কর্মসূচি ঘোষণা করেন।বিবৃতিতে, চলমান কোটাসংস্কার আন্দোলনে দেশজুড়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক দাবিকে কেন্দ্র করে নির্বিচারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গুলিতে শত শত শিক্ষার্থীর মৃত্যু ও হাজার হাজার ছাত্র-জনতা আহত হয়ে যখন মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছে, তখনও শিক্ষার্থীদের দাবি মেনে না নিয়ে একাত্তরের হানাদার বাহিনীর মতো মধ্য রাতে বাসাবাড়িতে রেইড ব্লকের মাধ্যমে নিরপরাধ শিক্ষার্থীদের তুলে নিয়ে রিমান্ডের নামে বর্বর নির্যাতন চালানো হচ্ছে।

এ ছাড়া একই বিবৃতিতে আন্দোলনকারীদের পক্ষ থেকে ৯ দফা দাবি সম্পর্কে জানানো হয়েছে। 

দাবিগুলো হলো: ১. শেখ হাসিনাকে ছাত্র-নাগরিক হত্যার দায় নিয়ে জাতির কাছে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইতে হবে ।  ২. আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও দলীয় ক্যাডার এবং সন্ত্রাসী কর্তৃক ছাত্র-নাগরিক হত্যার দায় নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল, আইনমন্ত্রী আনিসুল হককে মন্ত্রিপরিষদ থেকে পদত্যাগ করতে হবে। ইন্টারনেট শাটডাউন করে দেশে ডিজিটাল ক্র্যাকডাউন করায় তথ্য প্রতিমন্ত্রী জুনায়েদ আহমেদ পলককে পদত্যাগ করতে হবে। আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় শহীদ শিক্ষার্থী এবং আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদেরকে ড্রাগ এডিক্ট বলে কুরুচিপূর্ণ ও মিথ্যা বক্তব্য দিয়ে এবং আন্দোলনকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করায় তথ্য প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ এ আরাফাতকে পদত্যাগ করতে হবে। ৩. ঢাকাসহ যত জায়গায় ছাত্র-নাগরিক শহীদ হয়েছেন সেখানকার ডিআইজি, পুলিশ কমিশনার ও পুলিশ সুপারদের চাকরি থেকে বরখাস্ত করতে হবে। ৪. ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়সহ সারা দেশের প্রত্যেকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে যেখানে ক্যাম্পাসে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কর্তৃক শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে হামলা হয়েছে, প্রত্যেকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি এবং প্রক্টরদেরকে পদত্যাগ করতে হবে। ৫. যে পুলিশ-বিজিবি- র্যাবের সদস্যরা শিক্ষার্থীদের ওপর গুলি করেছে, ছাত্রলীগ-যুবলীগসহ যে সব সন্ত্রাসী শিক্ষার্থীদের ওপর নৃশংস হামলা পরিচালনা করেছে এবং যেসব নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ছাত্র-নাগরিকদের ওপর গুলি করার নির্দেশ দিয়েছে তাদেরকে আটক করে হত্যা মামলা দায়ের করতে হবে ও দ্রুততম সময়ের মধ্যে গ্রেফতার করতে হবে। ৬. দেশব্যাপী যেসব ছাত্র-নাগরিক শহীদ এবং আহত হয়েছেন তাদের পরিবারকে অতি দ্রুত সময়ের মধ্যে যথাযথ ক্ষতিপূরণ প্রদান করতে হবে। ৭. ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়সহ সারা দেশের প্রত্যেকটি বিশ্ববিদ্যালয় এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রলীগ নামক সন্ত্রাসী সংগঠনসহ সব দলীয় লেজুড়বৃত্তিক ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করে দ্রুততম সময়ে নিয়মতান্ত্রিকভাবে ছাত্র সংসদ কার্যকর করতে হবে। ৮. অবিলম্বে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও হলগুলো খুলে দিতে হবে। কারফিউ তুলে নিয়ে সারা দেশের সব ক্যাম্পাসে মোতায়েনকৃত পুলিশ, র্যাব, বিজিবি, সোয়াট এবং আর্মি তুলে নিতে হবে। ৯. বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাথে সম্পৃক্ত শিক্ষার্থীদের একাডেমিক ও প্রশাসনিক কোনো ধরনের হয়রানি করা হবে না এই মর্মে অঙ্গীকার করতে হবে। ইতোমধ্যে গণগ্রেফতার ও পুলিশি হয়রানির শিকার সমন্বয়কবৃন্দ ও ছাত্র-নাগরিকদের অবিলম্বে মুক্তি দিতে হবে ও সব মামলা প্রত্যাহার করতে হবে।

৩০জুলাই: প্রোফাইল পিকচার লাল করে প্রতিবাদ: সরকার দেশব্যাপী গণহত্যা চালিয়ে তারপর ছাত্রদের আন্দোলনকে ‘সহিংসতা’ হিসেবে উল্লেখ করে নিহতদের স্মরণে শোক দিবস ঘোষণা করেছে। যা ‘শহীদদের সঙ্গে তামাশা’ বলে তারা মনে করেন কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীরা। এর প্রতিবাদে প্রোফাইল পিকচার লাল তাদের এই অবস্থান। ফেসবুক জুড়ে বাংলাদেশ কিংবা প্রবাসে যারা কোটা আন্দোলনে সৃষ্ট সহিংসতায় নিহতদের স্মরণ করেন, তারা মঙ্গলবার (৩০ জুলাই) প্রোফাইল পিকচার লাল করেন। ফেসবুকের প্রোফাইল লাল রঙের ফ্রেমে রাঙান অনেকে। অন্যদিকে সরকার–সমর্থকদের অনেকে ফেসবুক প্রোফাইলে কালো রঙের ফ্রেম জুড়েছেন।তাদের সেই আহ্বানে দেশের সাধারণ শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে শিক্ষক, সাংবাদিকসহ সব পেশার লোকদের তাদের ফেসবুক প্রোফাইল পিকচার পরিবর্তন করে ‘লাল রঙ’ দেন। রাষ্ট্রীয় শোক পালনে কালো প্রোফাইল ছবি দিচ্ছেন যারা, তাদের সঙ্গে অনলাইন যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে দেখা গেছে অনেক লালকে। চলছে পাল্টাপাল্টি তর্ক-বিতর্ক, আনফ্রেন্ড-আনফলোর দ্বন্দ্বও। রাতে টেলিগ্রাম অ্যাপে কোটা সংস্কার আন্দোলনের কেন্দ্রীয় সমন্বয়কদের মুক্তি, শিক্ষার্থী হত্যা, গ্রেপ্তার শিক্ষার্থীদের মুক্তিসহ ৯ দফা দাবিতে 'মার্চ ফর জাস্টিস' কর্মসূচির ঘোষণা দেন অন্যতম সমন্বয়ক আবদুল কাদের। ঘোষণায় দেশের সব আদালত, ক্যাম্পাস ও রাজপথে এ কর্মসূচি পালন করা হবে জানানো হয়।

জামায়াত নিষিদ্ধের প্রতিবাদে বিবৃতি: জামায়াত নিষিদ্ধের প্রতিবাদে বিবৃতিতে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘২৯ জুলাই ১৪ দলের বৈঠকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধের যে বেআইনি, এখতিয়ার বহির্ভূত ও সংবিধান পরিপন্থী সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে তার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি। ১৪ দলীয় জোট একটি রাজনৈতিক প্লাটফর্ম। একটি রাজনৈতিক দল বা জোট অন্য একটি রাজনৈতিক দলের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। বাংলাদেশের আইন ও সংবিংধান কাউকে এ এখতিয়ার দেয়নি। কোনো দল বা জোট অন্য কোনো দলকে নিষিদ্ধ করার ধারা চালু হলে এক দল অন্য দলকে নিষিদ্ধ করতে থাকবে। তখন রাষ্ট্রের শৃঙ্খলা বলে কিছু থাকবে না।’ বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করার ১৪ দলীয় জোট বৈঠকের দাবি জনগণ গ্রহণ করবে না বলে মন্তব্য করেছেন জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান। তিনি এ সিদ্ধান্তের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানান। জামায়াত আমির বলেন, ‘জামায়াতে ইসলামী একটি প্রতিষ্ঠিত গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংগঠন, যা বাংলাদেশের সকল গ্রহণযোগ্য নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে জাতীয় সংসদে প্রতিনিধিত্ব করেছে। প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনে ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছে। তিনি বলেন, ‘সম্প্রতি ছাত্রদের বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন ব্যাপক রূপ লাভ করলে সরকারের কয়েকজন মন্ত্রী আক্রমণাত্মক ও উস্কানিমূলক বক্তব্য রাখার পর ছাত্রলীগ বৈষম্যবিরোধী ছাত্রসমাজের ওপর হামলা চালায়। পরবর্তীতে রাষ্ট্রের বিভিন্ন বাহিনী দিয়ে দেশে গণহত্যা চালানো হয়। বাংলাদেশের ইতিহাসে অতীতে কোনো আন্দোলন দমনের জন্য এভাবে নির্বিচারে গণহত্যা চালানো হয়নি। পুরো জাতি ও বিশ্ব বিবেক এই গণহত্যার জন্য সরকারকে ধিক্কার দিচ্ছে। পুরো জাতি এ গণহত্যার বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ।তিনি উল্লেখ করেন, অতীতে যত অঘটন ঘটেছে কোনো রকম তদন্ত ছাড়াই তার জন্য জামায়াতকে দোষারোপ করা হয়েছে। কিন্তু পরবর্তীতে প্রমাণিত হয়েছে যে জামায়াত কোনো ঘটনার সাথেই জড়িত নয়। এবারও সরকারের সকল অপপ্রচার মিথ্যা প্রমাণিত হবে, ইনশাআল্লাহ।’ গণহত্যার প্রতিবাদে সোচ্চার হওয়ার জন্য উদাত্ত আহ্বান জানাচ্ছি।

ছাত্রশিবিরকে নিষিদ্ধের সিদ্ধান্তে বিবৃতি :সংগঠনটির কেন্দ্রীয় সভাপতি মঞ্জরুল ইসলাম ও সেক্রেটারি জেনারেল জাহিদুল ইসলাম এ সিদ্ধান্তের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদও জানিয়েছেন। এক যৌথ বিবৃতিতে বলেন, বাংলাদেশের ছাত্র রাজনীতিতে একটি আদর্শিক, সুসংগঠিত ও নিয়মতান্ত্রিক ছাত্রসংগঠন বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই দেশের প্রচলিত সংবিধান মেনে শান্তিপূর্ণ উপায়ে কার্যক্রম পরিচালনা করে যাচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও করে যাবে, ইনশাআল্লাহ।জাতীয় উন্নয়ন-অগ্রগতি ও ছাত্রবান্ধব সংগঠন হিসেবে দেশের ছাত্রসমাজ ও আপামর জনগণের আস্থার প্রতীকে পরিণত হয়েছে এ সংগঠন। একই সাথে এটা ছাত্রসমাজের সাথে স্রেফ প্রহসন ছাড়া আর কিছুই নয়। তাঁরা শেখ হাসিনার এই হঠকারি ও এখতিয়ার বহির্ভূত সিদ্ধান্তের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি। তাদের এই অপপ্রচার জনগণের কাছে বিশ্বাসযোগ্যতা না পেলে তারা এবার ইসলামী ছাত্রশিবিরকে নিষিদ্ধ করার আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে। তাদের হঠকারি সিদ্ধান্ত গণমানুষের ইচ্ছার প্রতিফলন নয়। এটা দেশকে পর্যায়ক্রমে একনায়কতান্ত্রিক ব্যবস্থার দিকে ঠেলে দেওয়ার শামিল।নেতারা আরো বলেন, গণভবন কোনো রাজনৈতিক কার্যালয় নয়। এটি জনগণের টেক্সের অর্থে পরিচালিত প্রতিষ্ঠান। অথচ সেটাকে রাজনৈতিক কার্যালয়ে পরিণত করে সেখানে বসে আওয়ামী নেতৃত্বাধীন ১৪ দল অন্য একটি বৈধ ও নিয়মতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করার যে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, এটা নিতান্তই হাস্যকর। কোনো রাজনৈতিক দল অন্য কোনো রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করতে পারে না। এটা সংবিধান পরিপন্থী। একটি দল আর একটি রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করার সংস্কৃতি কোনো গণতান্ত্রিক দেশের নিয়ম হতে পারে না।নেতারা ছাত্রশিবিরকে নিয়ে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের ষড়যন্ত্র মোকাবেলায় ছাত্রসমাজসহ দেশের সকলের এগিয়ে আসবেন বলে আশা প্রকাশ করেন।

ছাত্রশিবিরের প্যাড নকল করে গুজব ছড়ানো : ছাত্রশিবিরের প্যাড নকল করে গুজব ছড়ানোর অভিযোগ করে বিবৃতি দেন বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির। তারা অভিযোগ করে বলেন, গণহত্যার পর আবার সরকার আজকের শোক প্রকাশের কর্মসূচি দিলে শহীদদের নিয়ে এমন তামাশার এই রাষ্ট্রীয় শোককে শিক্ষার্থীরা প্রত্যাখান করে লাল কাপড় মুখে ও চোখে বেঁধে ছবি তোলা এবং অনলাইনে ব্যাপক প্রচারের কর্মসূচি পালন করছে। ছাত্রশিবির ইতিমধ্যে শিক্ষার্থীদের কর্মসূচির সাথে একাত্মতা পোষণ করে সকল সোশ্যাল মিডিয়া প্লাটফর্মে প্রোফাইল পিকচার পরিবর্তন করেছে।খুবই বিষ্ময়ের সাথে লক্ষ্য করা গেছে যে আওয়ামী গুজব সেল খ্যাত  CRI  পরিচালিত একটি ফেসবুক পেইজ থেকে ছাত্রশিবিরের প্যাড ব্যবহার করে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো হচ্ছে। উল্লেখ্য, তাদের ৫০টির অধিক পেইজ কিছুদিন পূর্বেই মেটা কর্তৃক গুজব ছড়ানোর দায়ে বন্ধ করে দেওয়া হয়।অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় যে, এই গুজব ছড়াতে রাসূলুল্লাহ (সা.) এর একটি হাদিসকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে। হাদিসটির সাথে শিক্ষার্থীদের চলমান কর্মসূচির কোনো সম্পর্ক নেই। তাদের জন্য আফসোস হয় যে তারা এহেন ঘৃণ্য কাজ করে আল্লাহ ও রাসূলের লানত কুড়িয়েছে। গুজব থেকে সবাইকে সচেতন থাকার আহ্বান জানাচ্ছি।

৩১ জুলাই: ছাত্র আন্দোলনের 'মার্চ ফর জাস্টিস' কর্মসূচিতে রাজধানীসহ দেশের কয়েকটি স্থানে পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষ, ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও ধস্তাধস্তি হয়। অনেক এলাকায় কর্মসূচি পালনে বাধা দিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, বরিশাল, রাজশাহী, সিলেটসহ বিভিন্ন স্থানে কর্মসূচি পালন করেন শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও আইনজীবীরা। কোনো কোনো স্থানে লাঠিপেটা, সাউন্ড গ্রেনেড ও কাঁদানে গ্যাস ছুড়ে তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেয় পুলিশ। শতাধিক বিক্ষোভকারীকে আটক ও সাংবাদিকসহ বিভিন্ন স্থানে আহত হন অন্তত ৯০ জন। সাবেক ছাত্রলীগ নেতাদের তোপের মুখে কাদের: সাবেক ছাত্রলীগ নেতাদের মতবিনিময় সভার কথা বলে সংবাদ সম্মেলন শুরু করায় তোপের মুখে পড়েন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। ৩১ জুলাই আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে শতাধিক সাবেক ছাত্রলীগ নেতা এবং আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ অন্যান্য নেতারা উপস্থিত হলেও মতবিনিময় সভা হয়নি।সকাল সাড়ে ১০টায় দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য ড. আব্দুর রাজ্জাককে সভাস্থলে দেখে সাবেক ছাত্রলীগ নেতারা চিৎকার দিয়ে উঠেন। তিনি এখানে কেন? তার ছেলে কেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে সরকারবিরোধী পোস্ট করেছেন? সেটি জানতে চান সাবেক ছাত্র নেতারা।এরপর সোয়া ১১টায় সভাস্থলে দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের এসেই গণমাধ্যমের সাথে কথা বলা শুরু করেন।এসময় পেছন থেকে সাবেক ছাত্রলীগ নেতারা ওবায়দুল কাদেরকে উদ্দেশ্য করে বলেন, ডাকছেন আমাদের সাথে মতবিনিময় করবেন বলে আপনি করছেন সংবাদ সম্মেলন। কিছুক্ষণ কথা বললে ওবায়দুল কাদের এতে নেতাকর্মীদের সাথে হট্টগোল লাগে। এক পর্যায়ে নেতাকর্মীরা কার্যালয়ে “ভুয়া ভুয়া” স্লোগান দিলে ওবায়দুল কাদের মিটিং শেষ না করে তার অফিস ছেড়ে চলে যান ।

১ আগস্ট: বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আটকে রাখা ৬ সমন্বয়ককে অবশেষে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) অফিস থেকে ছেড়ে দেওয়া হয় । এর আগে তারা টানা ৩২ ঘণ্টা ডিবি কার্যালয়ে অনশনে ছিলেন। ডিবি থেকে ছাড়া পাওয়া সমন্বয়ক নুসরাত তাবাসসুম ৩২ ঘণ্টা অনশনে থাকার পর ১ আগস্ট পরিবারের সদস্যরা গিয়ে অনশন ভাঙান। তিনি বলেন ‘আমরা মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছি।' ছাড়া পাওয়া অন্য পাঁচ সমন্বয়ক হলেন- নাহিদ ইসলাম, আসিফ মাহমুদ, আবু বাকের মজুমদার, সারজিস আলম ও হাসনাত আবদুল্লাহ। তারা সবাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। ছাড়া পেয়ে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে সারজিস আলম ও হাসনাত আবদুল্লাহ লড়াই অব্যাহত রাখার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। সারজিস আলম লিখেন, 'কথা দিয়েছিলেন আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের থেকে কাউকে গ্রেপ্তার করবেন না, মামলা দিয়ে হয়রানি করবেন না। আপনারা কথা রাখেননি।' আরও লিখেন, 'ছয় দিনের ডিবি হেফাজত দিয়ে ছয়জনকে আটকে রাখা যায়, কিন্তু এই বাংলাদেশের পুরো তরুণ প্রজন্মকে কীভাবে আটকে রাখবেন? দুর্নীতি, লুটপাট, অর্থ পাচার, ক্ষমতার অপব্যবহার করে যে ক্ষোভ সৃষ্টি করেছেন, প্রতিনিয়ত সেগুলো কীভাবে নিবৃত করবেন?' হাসনাত আবদুল্লাহ লিখেন, 'এই আন্দোলনে গ্রেপ্তার হওয়া শেষ ব্যক্তিটি মুক্ত না হওয়া পর্যন্ত আমরা কেউই মুক্ত নই। গণগ্রেপ্তার গণঘৃণার নামান্তর।' এই স্ট্যাটাস দেওয়ার পর রাতেই তাদের দু'জনের ফেসবুক আইডিই উধাও হয়ে যায়।অন্যদিকে ১ আগস্ট দুপুরে দেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করলেন ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকার।সেই সাথে বিপ্লবী ছাত্র সংগঠন “বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরকে” ও নিষিদ্ধ করা হলো। দুপুরে এ বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হক জানিয়েছিলেন, সন্ত্রাসবিরোধী আইন, ২০০৯-এর ধারা ১৮(১)-এ প্রদত্ত ক্ষমতা বলে জামায়াতে ইসলামী এবং এর অঙ্গসংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবিরসহ সব অঙ্গসংগঠনকে রাজনৈতিক দল ও সংগঠন হিসেবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

২ আগস্ট: বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকা 'প্রার্থনা ও ছাত্র- জনতার গণমিছিল' কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ব্যাপক সংঘর্ষ হয়েছে। হবিগঞ্জে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীর সঙ্গে সংঘর্ষের এক পর্যায়ে স্থানীয় এমপির বাড়িতে হামলা ও জেলা আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে অগ্নিসংযোগ করা হয়। এ সময় সংঘর্ষের মধ্য পড়ে গুলিতে মোস্তাক আহমেদ নামে এক যুবক নিহত হন। রাজধানীসহ কয়েকটি জেলায় আন্দোলনকারীদের সঙ্গে পুলিশ ও ক্ষমতাসীনদের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া এবং সংঘর্ষ হয়। এর মধ্যে ঢাকার উত্তরায় শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পুলিশ ও আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীর ত্রিমুখী সংঘর্ষ হয়। আওয়ামী লীগ কর্মীদের গুলি ছুড়তে দেখা যায়। বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ সাউন্ড গ্রেনেড ও কাঁদানে গ্যাসের শেল নিক্ষেপ করে। সারাদেশে এসব সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধসহ দুই শতাধিক মানুষ আহত হয়েছেন। আটক করা হয় অন্তত ৩০ জনকে। এ ছাড়া কোটা সংস্কার আন্দোলনে ১৮ জুলাই দক্ষিণ বাড্ডায় গুলিবিদ্ধ শিক্ষার্থী সেলিম তালুকদার চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।

৩ আগস্ট: সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকারুজ্জামান ঢাকা, সাভার, মিরপুরসহ ক্যান্টনমেন্টের সিনিয়র অফিসারদের সাথে মতবিনিময়ে বৈঠক করেন। ঢাকার বাইরের অন্যান্য ক্যান্টনমেন্টের সিনিয়র অফিসারদেরকেও এই সভায় ভার্চুয়ালে যুক্ত হওয়ার অনুরোধ করা হয়। সেই বৈঠকে বিস্তারিত কী আলোচনা হয়েছিল তা জানা না গেলেও পত্রপত্রিকায় এটুকু এসেছে যে, ঐ মিটিংয়ে এই সিদ্ধান্ত হয়েছে যে, সেনাবাহিনী ছাত্র-জনতার ওপরে গুলি চালাবে না। তবে তারা সরকারের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাসমূহের হেফাজত করবে।চারিদিকে রাজনৈতিক দৃশ্যপট আমূল পাল্টে যায়। কারণ, বৈষম্য বিরোধী আন্দোলনের ৬ সমন্বয়ককে ডিবি আটকে রাখায় এবং ডিবি কর্তৃক তাদের জোর করে আন্দোলন প্রত্যাহারের ঘোষণায় স্বাক্ষর আদায়ের পর খবরটি যখন গণমাধ্যমে প্রচারিত হয় তখন জনগণের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়। কিন্তু তারা ডিবির হেফাজত থেকে মুক্ত হওয়ার পরপরই পরিস্থিতি সম্পূর্ণ পাল্টে যায়। ৩ আগস্ট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে জমায়েত লক্ষ লক্ষ মানুষের সামনে সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম ঘোষণা করেছিলেন যে, সব দাবি এখন এসে মিলিত হয়েছে এক দাবিতে। আর সেটি হলো প্রধানমন্ত্রীসহ সরকারের সমস্ত মন্ত্রীদের পদত্যাগ। ঢাকাসহ সমগ্র বাংলাদেশ ছিল কোটি জনতার পদভারে প্রকম্পিত। আন্দোলনকারীরা আলোচনার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করায় সরকার হার্ড লাইন বেঁচে নিয়ে ছিল। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের দলীয় কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগের সমস্ত সিনিয়র কর্মীকে পরদিন অর্থাৎ ৪ আগস্ট ঢাকার মোড়ে মোড়ে, প্রতিটি ওয়ার্ডে সমাবেশের ডাক দেন। তিনি স্পষ্টভাবে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের কর্মীদেরকে কোটা আন্দোলনকারীদের প্রতিহতের আহ্বান জানান। এই আহ্বানের ফলেই ৪ আগস্ট থেকে ঢাকাসহ সারাদেশে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের কর্মীরা বৈষম্য বিরোধীদের আন্দোলন প্রতিহত করার জন্য অবস্থান গ্রহণ করে। বলতে গেলে এটা বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও আওয়ামী লীগকে মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড় করায়। এর ফলে সংঘর্ষ দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দেয়। রাতে ঢাকা ও চট্টগ্রামে বিরোধী নেতার বাসায় অগ্নি সংযোগ এবং গাড়ি ও বাডি ভাঙচুর করা হয়। 

৪ আগস্ট: সাবেক প্রধানমন্ত্রী সশস্ত্র বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তাদের সাথে বৈঠকে মিলিত হন। ঐ বৈঠকে ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা উপদেষ্টা এবং সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনীর প্রধানগণ। সেখানে কী আলোচনা হয়েছে সেটি আইএসপিআর থেকে কোনো সংবাদ বিজ্ঞপ্তি না দিলে জানা সম্ভব নয়। ঐদিকে ৪ আগস্ট চট্টগ্রামে উত্তাল ছাত্র-জনতা নিউ মার্কেট মোড়ে জমায়েত হলে তাদেরকে ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও পুলিশ অতর্কিতে গুলি ও টিয়ার গ্যাস চালিয়ে আন্দোলন ছত্রভঙ্গ করে দেয়। হামলায় আমিসহ (মোহাম্মদ ইউছুফ) অনেক ছাত্র-জনতা গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হন। অত:পর চট্টগ্রামের সমন্বয়ক ‘ খান তালাত মাহমুদ রাফী’ সবাইকে পূনরায় বিক্ষোভের জন্য চট্টগ্রাম নগরীর ওয়াসা মোড়ে জড়ো হতে বলেন। ওয়াসায় জড়ো হলে দেখি সেনাবাহিনীর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছে একের পর এক ফোন আসতে থাকে। ফোনের আলাপ জানতে না পারলেও পরবর্তীতে বিভিন্ন মাধ্যমে জানতে পারি ঐদিক থেকে শেখ হাসিনা আন্দোলন দমাতে আরো কঠোর হওয়ার জন্য সেনাবাহিনীর সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দিয়েছিলেন। ঢাকার সায়েন্সল্যাবে ছাত্র-জনতা ও আওয়ামী লীগের মধ্যে ধাওয়া ও পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। বিক্ষোভে উত্তাল হয় আফতাব নগর, উত্তরা, ধানমন্ডি ও জাতীয় প্রেসক্লাব। বিকাল ৩টা পর্যন্ত জেলায় জেলায় সংঘর্ষে অনেক নিহত ও আহত হন। ছাত্র-জনতার হামলায় আওয়ামী বাহিনী পিজি হাসপাতালের অভ্যন্তরে আশ্রয় নেয়। উত্তেজিত ছাত্র-জনতা পিজি হাসপাতালের বাইরে রাখা কয়েকটি মোটরগাড়ি এবং মোটরসাইকেলে আগুন ধরিয়ে দেয়। বৈষম্য বিরোধী আন্দোলন তখন প্রতিটি জেলা সদর এবং ক্ষেত্র বিশেষে উপজেলা এবং ইউনিয়ন পর্যায়ে ছড়িয়ে পড়ে।আন্দোলন চলাকালে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যেন সরাসরি গুলি না করে তেমন নির্দেশনা চেয়ে আদালতে একটি রিট করা হয়। ঐ রিটে ডিবি কর্তৃক আটক বৈষম্য বিরোধী প্ল্যাটফর্মের ৬ জনের মুক্তিও চাওয়া হয়। যেখানে রিটের শুনানির পরদিন রায় দেওয়ার কথা ছিল, সেই রায় অন্তত ৫ দিন বিলম্বিত হয়। সংশ্লিষ্ট হাইকোর্ট বেঞ্চের একজন বিচারপতি অসুস্থ হয়েছেন বলে খবর বের হয়। পর আলোচ্য রিট পিটিশনটি খারিজ করা হয়। এর অর্থ এই দাঁড়ায় যে, পুলিশ সরাসরি গুলি করতে পারবে।৪ আগস্ট সারাদেশে অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দিয়ে রাজধানী ঢাকাসহ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অসহযোগ কর্মসূচি চলতে থাকে। সরকার পতনের এক দফা দাবিতে ছাত্র-জনতার আন্দোলনে বিস্ফোরণোন্মুখ সারাদেশ। অসহযোগ আন্দোলনের রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে রক্ত ঝরেছে। অসহযোগ আন্দোলনে অংশ নেয়া শিক্ষার্থী-জনতার সঙ্গে আইনশৃংখলা বাহিনী ও ছাত্রলীগ-যুবলীগ- আওয়ামী লীগের কোথাও দ্বিমুখী, কোথাও ত্রিমুখী সংঘাত-সংঘর্ষে শতাধিক মানুষ শহীদ হন।এর মধ্যে আন্দোলনে অংশ নেয়া অর্ধশত ছাত্র-জনতা শহীদ হন। ১৩ জন পুলিশ সদস্যসহ কয়েকজন নিহত হন। আন্দোলনকারীরা ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে লাশ নিয়ে মিছিল করে শাহবাগ হয়ে বাংলা মোটরের দিকে গেলে মিছিলকারীদের লক্ষ্য করে পুলিশ গুলি, রাবার বুলেট, সাউন্ড গ্রেনেড, টিয়ারশেল ছোড়ে। এ সময় পুলিশের সঙ্গে লাঠিসোঁটা, হকিস্টিক, রামদা হাতে আওয়ামী লীগের লোকেরাও যোগ দেয়।শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে পুলিশের বেপারোয়া গুলি এবং আইনশৃংখলা বাহিনী ও ক্ষমতাসীন দলের কর্মী সমর্থকদের প্রতিরোধের মুখে দেশে ব্যাপক নৈরাজ্য সৃষ্টি হলে পরিস্থিতি সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। সরকার বাধ্য হয়েই অফিস-আদালত বন্ধের ঘোষণা দিয়ে সন্ধ্যা থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য কারফিউ জারি করেন।অন্যদিকে আন্দোলনকারীরা কারফিউ প্রত্যাখ্যান করে ছাত্র-জনতার ওপর হামলা, গুলি ও হত্যার প্রতিবাদে পূর্ব ঘোষিত ‘লং মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি একদিন এগিয়ে এনে ৫ আগস্ট করার ঘোষণা দেন অন্যতম সমন্বয়ক আসিফ মাহমুদ। তিনি বলেন, “ইতিহাসের অংশ হতে ঢাকায় আসুন সকলে। যে যে ভাবে পারেন ঢাকায় কালকের মধ্যে (সোমবার) ঢাকায় চলে আসুন। ছাত্র-জনতা এক নতুন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটাবো”। ফেসবুকে ভিডিও বার্তায় এ ঘোষণা দিয়ে সেনাবাহিনীকে জনগণের মুখোমুখী না দাঁড়ানোর আহবানও জানান তিনি। 

৪ আগস্ট গভীর রাত পর্যন্ত গণভবনে বসে শেখ হাসিনা তাঁর সরকারের ঘনিষ্ঠ কয়েকজন মন্ত্রী ও কর্মকর্তার সঙ্গে একাধিক বৈঠক করেন। এরপরও পরিস্থিতি তাঁদের নিয়ন্ত্রণে থাকবে বলে তাঁরা ধারণা করেছিলেন। কিন্তু চাপ আরও বাড়তে থাকে। ৫ আগস্ট সকালেই তাঁরা বুঝতে পারেন, তাঁদের সময় শেষ হয়ে গেছে। এরপর শেখ হাসিনাকে ক্ষমতা ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিতে হয়। একক কর্তৃত্বের শাসনে শেখ হাসিনার সরকার সম্পূর্ণভাবে জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল। অবশেষে গণ–আন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনা ৫ আগস্ট দুপুরের আগে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করেন। পদত্যাগের আগমূহুর্তে তিনি জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সেই সুযোগ ও সময় তাঁকে দেওয়া হয়নি। শেখ হাসিনা দুপুরের আগে বঙ্গভবনে গিয়ে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের কাছে পদত্যাগ করেন। এরপর দুপুর আড়াইটার বঙ্গভবন থেকেই শেখ হাসিনা একটি সামরিক হেলিকপ্টারে করে ভারতের উদ্দেশে বাংলাদেশ ছাড়েন। তাঁর ছোট বোন শেখ রেহানা সঙ্গে ছিলেন।

৫ আগস্ট ২০২৪, বাংলাদেশের ইতিহাসে রচিত হলো এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়। কোটা সংস্কারের দাবীতে ছাত্রদের আন্দোলন গণআন্দোলনে পরিণত হয়ে শেষ পর্যন্ত নাড়িয়ে দিল এক রুদ্ধশ্বাস লৌহশাসনের তখতে তাউস। দেশ ছেড়ে পালিয়ে বাঁচলেন টানা পনের বছরের প্রতাপশালী স্বৈরশাসক শেখ হাসিনা। চোখের পলকে পট পরিবর্তনের এক অবিশ্বাস্য দৃশ্য দেখল বাংলাদেশ। গত পনের বছর ধরে যারা ছিলেন মহা দাপুটে সংহারী প্রশাসক, মুহূর্তে হয়ে গেলেন গর্তে লুকানো থরহরিকম্প ইঁদুর। আর ক্ষণকাল পূর্বেও যারা ছিল ক্লান্ত, শ্রান্ত, বিধ্বস্ত, আশ্রয়হারা নিঃসহায়, হঠাৎ তারাই হয়ে উঠল একেকজন অতিকায় জান্তব, হারকিউলিস। সকালে যারা ছিলেন মহামান্য রাজাধিরাজ, বিকালে তারা হলেন মহাধিকৃত পলায়নপর স্বৈরাচার। এ বিজয় অবশ্যই ছাত্র-জনতার।

অত:পর ৮ আগস্ট ২০২৪ তারিখে গঠিত হলো নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনুছের নেতৃত্বে অন্তর্রতীকালিন সরকার। প্রবীণেরা বলছেন, তারা ১৯৬৯ সালে আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে গণঅভ্যুত্থান দেখেছেন। তারা ১৯৯০ সালে এরশাদের বিরুদ্ধে গণঅভ্যুত্থান দেখেছেন। কিন্তু ২০২৪ সালের এই ব্যাপক গণঅভ্যুত্থান যা আগের সবগুলিকে ছাড়িয়ে গেছে।তাদের বিগত ১৫ বছরের শাসনকে জনগণ মেনে নেয়নি। বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, অপহরণ, গুম, খুন, লক্ষ কোটি টাকা বিদেশে পাচার, লক্ষ কোটি টাকার দুর্নীতি, তিন তিনটি নির্বাচনে নির্বাচনের নামে তামাশা, বিরোধী দলের কণ্ঠরোধ, দ্রব্যমূল্যের ৫ থেকে ৬ গুণ বৃদ্ধি ইত্যাদিকে মানুষ শাসন নয়, অপশাসন বলে বিবেচনা করছে। বুদ্ধিজীবীরা বলছেন, এই ১৫ বছরের শাসন হলো রাজনৈতিকভাবে স্বৈরাচার এবং অর্থনৈতিকভাবে ক্লেপ্টোক্র্যাসি, অর্থাৎ চৌর্যবৃত্তি। আন্দোলনে ছাত্রদের সাথে লক্ষ লক্ষ মানুষের স্বতস্ফুর্ত অংশগ্রহণ ঐ অপশাসনের বিরুদ্ধে মানুষের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ।এই আন্দোলন অপশাসনের অবসান ঘটিয়ে খাঁটি গণতন্ত্র ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা করে একটি আদর্শ বাংলাদেশ বিনির্মাণের সংগ্রাম। এটি একটি ব্যাপক বিশাল গণঅভ্যুত্থান।

লেখক:- মোহাম্মদ ইউছুফ (গণমাধ্যম ও মানবাধিকার কর্মী),E-mail: yusufm.news@gmail.com


BD State News

সম্পাদক: আবদুর রাকিব

কপিরাইট © ২০২৬ BD State News । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত