বর্ষা এলেই নদীভাঙনের আতঙ্কে দিন কাটত নদীতীরবর্তী মানুষের। কখন নদীগর্ভে বিলীন হবে বসতভিটা, কখন হারিয়ে যাবে ফসলি জমি—এমন শঙ্কা ছিল তাদের নিত্যসঙ্গী। সেই আতঙ্ক কমাতে এবার নদীর তীরে গড়ে উঠছে প্রতিরক্ষার দেয়াল। নীলফামারীর সৈয়দপুর ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় নদীভাঙন রোধ, পানি নিষ্কাশন ও সেচ ব্যবস্থার উন্নয়নে নেওয়া হয়েছে একাধিক উদ্যোগ।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে নদী উন্নয়ন ও পুনর্বাসন (এনডিআর) বাজেটের আওতায় এসব কাজে ব্যয় হয়েছে মোট ৪ কোটি ৫ লাখ ৮৪ হাজার টাকা। এর মধ্যে প্রায় এক কিলোমিটার নদীতীর সংরক্ষণ, সাতটি সাইফুন নির্মাণ, একটি সাইফুন মেরামত এবং বিভিন্ন অবকাঠামোর সংস্কার করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, সৈয়দপুর পানি উন্নয়ন বিভাগের তত্ত্বাবধানে এনডিআর বাজেটের আওতায় মোট ৯৯৩ দশমিক ৬০ মিটার নদীতীর রক্ষা ও প্রতিরক্ষা বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে। এসব কাজে ব্যয় হয়েছে ২ কোটি ৯৬ লাখ ২০ হাজার টাকা।
বোতলাগাড়ী ইউনিয়নের কাঠারীপাড়ায় খড়খড়িয়া নদীর বাম তীরে ৯০ মিটার, বুড়িরহাট রহিমাপুর মণ্ডলপাড়া এলাকায় যমুনাশ্বরী নদীর ডান তীরে ১৯০ মিটার এবং বেলতলী বাজার ব্রিজের অ্যাপ্রোচ ও সংযোগ সড়ক রক্ষায় চাড়ালকাঠা নদীতে ১০০ মিটার সতর্কতামূলক বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে।
এ ছাড়া বাহাগিলী ইউনিয়নের সন্ন্যাসীপাড়ার গুচ্ছগ্রাম রক্ষায় যমুনাশ্বরী নদীর ডান তীরে ৭৫ মিটার এবং চাড়ালকাঠা নদীর উত্তর দুরাকুঠি এলাকায় ডান তীরে ১০০ মিটার প্রতিরক্ষা ও মেরামত কাজ করা হয়েছে।
বেলাইচণ্ডী ইউনিয়নের কাঠারীপাড়া এলাকায় খড়খড়িয়া নদীর বাম তীরে ১৬৬ দশমিক ৬০ মিটার, ময়নাকুড়ি এলাকায় যমুনাশ্বরী নদীর ডান তীরে ৮০ মিটার এবং মধুপুর ইউনিয়নের রাজারামপুর গ্রামের গোবরাগাড়ী এলাকায় নদীর বাম তীরে ১৯২ মিটার প্রতিরক্ষা বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে।
সরেজমিনে কয়েকটি এলাকা ঘুরে দেখা যায়, বাঁধ নির্মাণের পর মাটি যথাযথভাবে কমপ্যাক্ট করে তার ওপর জিও-টেক্সটাইল ফেব্রিক ও ঘানিব্যাগ বিছানো হয়েছে। পরে নির্ধারিত ওজনের ৭৫ কেজি জিও ব্যাগ স্থাপন করা হয়েছে। নদীতীরের ভাঙনপ্রবণ এলাকাগুলোতে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে ওঠায় স্থানীয় মানুষের মধ্যেও স্বস্তি ফিরেছে।
বাহাগিলী ইউনিয়নের সন্ন্যাসীপাড়ার কৃষক নুর হোসেন ও আব্দুল আজিজ, বোতলাগাড়ী কাঠারীপাড়ার বাসিন্দা জুলফিকার রহমান ও বাবুল হোসেন এবং বেলাইচণ্ডী কাঠারীপাড়ার ইলিয়াস ও ফজলুর জানান, আগে বর্ষা এলেই নদীভাঙনের আতঙ্কে থাকতে হতো। পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বসতবাড়ি, ফসলি জমি, রাস্তা ও বিভিন্ন স্থাপনা নিয়ে শঙ্কা তৈরি হতো। প্রতিরক্ষা বাঁধ নির্মাণের পর পরিস্থিতির অনেকটাই পরিবর্তন হয়েছে।
নদীতীর রক্ষার পাশাপাশি কৃষির জন্য সেচ ও পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থাপনা উন্নত করতেও এনডিআর বাজেটের আওতায় কাজ হয়েছে। সাতটি সাইফুন নির্মাণ ও একটি সাইফুন মেরামতে ব্যয় হয়েছে ৮৪ লাখ ৭০ হাজার টাকা।
টি১এস৯ডি সেচখালে একটি, টি১এসডি সেচখালে একটি (দুই ডেন্ট), টিএ১বি সেচখালে তিনটি এবং এস৫আর সেচখালে একটি সাইফুন নির্মাণ করা হয়েছে। পাশাপাশি টি২এস৫আর সেচখালে একটি সাইফুন মেরামত করা হয়েছে।
স্থানীয়দের মতে, এসব অবকাঠামোর উন্নয়নের ফলে পানি নিষ্কাশন ও সেচ ব্যবস্থাপনায় ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। বিশেষ করে সাইফুন সংস্কারের কারণে কয়েকটি এলাকায় জলাবদ্ধতা কমেছে।
এনডিআর বাজেটের আওতায় সৈয়দপুর পানি উন্নয়ন বিভাগের দুটি আবাসিক কলোনির বিভিন্ন সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণ কাজও করা হয়েছে। আবাসিক ভবন মেরামত, বিদ্যুৎ লাইনের খুঁটি পরিবর্তন ও লাইন মেরামত, স্যানিটারি সামগ্রী সরবরাহ, পানি সরবরাহের বৈদ্যুতিক পাম্প ও পাইপ মেরামতসহ বিভিন্ন কাজে অর্থ ব্যয় করা হয়েছে।
এ ছাড়া বিভিন্ন অবকাঠামোর সাব-সয়েল টেস্ট, কলোনির মসজিদ মেরামত এবং পানি উন্নয়ন বিভাগের অধিগ্রহণ করা জমির নামজারি বাবদও অর্থ ব্যয় হয়েছে। এসব খাতে মোট ব্যয় হয়েছে ২৪ লাখ ৯৪ হাজার টাকা।
সৈয়দপুর পানি উন্নয়ন বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আখিনুজ্জামান বলেন, এনডিআর বাজেটের আওতায় বাস্তবায়িত কাজগুলো সরেজমিন পরিদর্শন ও যথাযথ তদারকির মাধ্যমে করা হয়েছে। কোথাও কাজের সমস্যা দেখা দিলে ঠিকাদারের মাধ্যমে তা পুনরায় সমাধান করা হয়।
তিনি বলেন, সাইফুন সংস্কারের কারণে অনেক এলাকায় জলাবদ্ধতাও কমেছে। এরপরও কোনো অনিয়ম চোখে পড়লে ঠিকাদারের জামানত কেটে নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
নদীভাঙন উত্তর জনপদের মানুষের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ। সেই ভাঙন ঠেকাতে নদীতীরে প্রতিরক্ষা বাঁধ, সাইফুন ও পানি ব্যবস্থাপনার অবকাঠামো নির্মাণে নেওয়া এসব উদ্যোগ স্থানীয় মানুষের মধ্যে নতুন আশার সৃষ্টি করেছে। সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, এসব কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে নদীতীরবর্তী মানুষের বসতভিটা ও কৃষিজমি আরও সুরক্ষিত হবে। একই সঙ্গে কৃষি উৎপাদন ও গ্রামীণ অর্থনীতিতেও এর ইতিবাচক প্রভাব পরবে।

মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
বর্ষা এলেই নদীভাঙনের আতঙ্কে দিন কাটত নদীতীরবর্তী মানুষের। কখন নদীগর্ভে বিলীন হবে বসতভিটা, কখন হারিয়ে যাবে ফসলি জমি—এমন শঙ্কা ছিল তাদের নিত্যসঙ্গী। সেই আতঙ্ক কমাতে এবার নদীর তীরে গড়ে উঠছে প্রতিরক্ষার দেয়াল। নীলফামারীর সৈয়দপুর ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় নদীভাঙন রোধ, পানি নিষ্কাশন ও সেচ ব্যবস্থার উন্নয়নে নেওয়া হয়েছে একাধিক উদ্যোগ।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে নদী উন্নয়ন ও পুনর্বাসন (এনডিআর) বাজেটের আওতায় এসব কাজে ব্যয় হয়েছে মোট ৪ কোটি ৫ লাখ ৮৪ হাজার টাকা। এর মধ্যে প্রায় এক কিলোমিটার নদীতীর সংরক্ষণ, সাতটি সাইফুন নির্মাণ, একটি সাইফুন মেরামত এবং বিভিন্ন অবকাঠামোর সংস্কার করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, সৈয়দপুর পানি উন্নয়ন বিভাগের তত্ত্বাবধানে এনডিআর বাজেটের আওতায় মোট ৯৯৩ দশমিক ৬০ মিটার নদীতীর রক্ষা ও প্রতিরক্ষা বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে। এসব কাজে ব্যয় হয়েছে ২ কোটি ৯৬ লাখ ২০ হাজার টাকা।
বোতলাগাড়ী ইউনিয়নের কাঠারীপাড়ায় খড়খড়িয়া নদীর বাম তীরে ৯০ মিটার, বুড়িরহাট রহিমাপুর মণ্ডলপাড়া এলাকায় যমুনাশ্বরী নদীর ডান তীরে ১৯০ মিটার এবং বেলতলী বাজার ব্রিজের অ্যাপ্রোচ ও সংযোগ সড়ক রক্ষায় চাড়ালকাঠা নদীতে ১০০ মিটার সতর্কতামূলক বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে।
এ ছাড়া বাহাগিলী ইউনিয়নের সন্ন্যাসীপাড়ার গুচ্ছগ্রাম রক্ষায় যমুনাশ্বরী নদীর ডান তীরে ৭৫ মিটার এবং চাড়ালকাঠা নদীর উত্তর দুরাকুঠি এলাকায় ডান তীরে ১০০ মিটার প্রতিরক্ষা ও মেরামত কাজ করা হয়েছে।
বেলাইচণ্ডী ইউনিয়নের কাঠারীপাড়া এলাকায় খড়খড়িয়া নদীর বাম তীরে ১৬৬ দশমিক ৬০ মিটার, ময়নাকুড়ি এলাকায় যমুনাশ্বরী নদীর ডান তীরে ৮০ মিটার এবং মধুপুর ইউনিয়নের রাজারামপুর গ্রামের গোবরাগাড়ী এলাকায় নদীর বাম তীরে ১৯২ মিটার প্রতিরক্ষা বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে।
সরেজমিনে কয়েকটি এলাকা ঘুরে দেখা যায়, বাঁধ নির্মাণের পর মাটি যথাযথভাবে কমপ্যাক্ট করে তার ওপর জিও-টেক্সটাইল ফেব্রিক ও ঘানিব্যাগ বিছানো হয়েছে। পরে নির্ধারিত ওজনের ৭৫ কেজি জিও ব্যাগ স্থাপন করা হয়েছে। নদীতীরের ভাঙনপ্রবণ এলাকাগুলোতে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে ওঠায় স্থানীয় মানুষের মধ্যেও স্বস্তি ফিরেছে।
বাহাগিলী ইউনিয়নের সন্ন্যাসীপাড়ার কৃষক নুর হোসেন ও আব্দুল আজিজ, বোতলাগাড়ী কাঠারীপাড়ার বাসিন্দা জুলফিকার রহমান ও বাবুল হোসেন এবং বেলাইচণ্ডী কাঠারীপাড়ার ইলিয়াস ও ফজলুর জানান, আগে বর্ষা এলেই নদীভাঙনের আতঙ্কে থাকতে হতো। পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বসতবাড়ি, ফসলি জমি, রাস্তা ও বিভিন্ন স্থাপনা নিয়ে শঙ্কা তৈরি হতো। প্রতিরক্ষা বাঁধ নির্মাণের পর পরিস্থিতির অনেকটাই পরিবর্তন হয়েছে।
নদীতীর রক্ষার পাশাপাশি কৃষির জন্য সেচ ও পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থাপনা উন্নত করতেও এনডিআর বাজেটের আওতায় কাজ হয়েছে। সাতটি সাইফুন নির্মাণ ও একটি সাইফুন মেরামতে ব্যয় হয়েছে ৮৪ লাখ ৭০ হাজার টাকা।
টি১এস৯ডি সেচখালে একটি, টি১এসডি সেচখালে একটি (দুই ডেন্ট), টিএ১বি সেচখালে তিনটি এবং এস৫আর সেচখালে একটি সাইফুন নির্মাণ করা হয়েছে। পাশাপাশি টি২এস৫আর সেচখালে একটি সাইফুন মেরামত করা হয়েছে।
স্থানীয়দের মতে, এসব অবকাঠামোর উন্নয়নের ফলে পানি নিষ্কাশন ও সেচ ব্যবস্থাপনায় ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। বিশেষ করে সাইফুন সংস্কারের কারণে কয়েকটি এলাকায় জলাবদ্ধতা কমেছে।
এনডিআর বাজেটের আওতায় সৈয়দপুর পানি উন্নয়ন বিভাগের দুটি আবাসিক কলোনির বিভিন্ন সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণ কাজও করা হয়েছে। আবাসিক ভবন মেরামত, বিদ্যুৎ লাইনের খুঁটি পরিবর্তন ও লাইন মেরামত, স্যানিটারি সামগ্রী সরবরাহ, পানি সরবরাহের বৈদ্যুতিক পাম্প ও পাইপ মেরামতসহ বিভিন্ন কাজে অর্থ ব্যয় করা হয়েছে।
এ ছাড়া বিভিন্ন অবকাঠামোর সাব-সয়েল টেস্ট, কলোনির মসজিদ মেরামত এবং পানি উন্নয়ন বিভাগের অধিগ্রহণ করা জমির নামজারি বাবদও অর্থ ব্যয় হয়েছে। এসব খাতে মোট ব্যয় হয়েছে ২৪ লাখ ৯৪ হাজার টাকা।
সৈয়দপুর পানি উন্নয়ন বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আখিনুজ্জামান বলেন, এনডিআর বাজেটের আওতায় বাস্তবায়িত কাজগুলো সরেজমিন পরিদর্শন ও যথাযথ তদারকির মাধ্যমে করা হয়েছে। কোথাও কাজের সমস্যা দেখা দিলে ঠিকাদারের মাধ্যমে তা পুনরায় সমাধান করা হয়।
তিনি বলেন, সাইফুন সংস্কারের কারণে অনেক এলাকায় জলাবদ্ধতাও কমেছে। এরপরও কোনো অনিয়ম চোখে পড়লে ঠিকাদারের জামানত কেটে নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
নদীভাঙন উত্তর জনপদের মানুষের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ। সেই ভাঙন ঠেকাতে নদীতীরে প্রতিরক্ষা বাঁধ, সাইফুন ও পানি ব্যবস্থাপনার অবকাঠামো নির্মাণে নেওয়া এসব উদ্যোগ স্থানীয় মানুষের মধ্যে নতুন আশার সৃষ্টি করেছে। সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, এসব কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে নদীতীরবর্তী মানুষের বসতভিটা ও কৃষিজমি আরও সুরক্ষিত হবে। একই সঙ্গে কৃষি উৎপাদন ও গ্রামীণ অর্থনীতিতেও এর ইতিবাচক প্রভাব পরবে।

আপনার মতামত লিখুন