শুধু হত্যা করেই ঘাতকরা পালিয়ে যায়নি, তারা গোসল করেছে, খেজুর খেয়েছে, ফ্রিজ খুলে শসা বের করে খেয়েছে, ইয়াবা সেবন করেছে।
এমনকি একটি অলংকার আগুনে পুড়িয়ে সেটি স্বর্ণ কি না, তা পরীক্ষা করেছে। এরপর হত্যাকাণ্ডকে ডাকাতি হিসেবে দেখাতে ঘরের জিনিসপত্র এলোমেলো করে এবং দুটি মোবাইল ফোন ডিটারজেন্ট মেশানো পানিতে ভিজিয়ে রেখে যায়।
রংপুর মহানগরীর মাছুয়াপাড়ায় অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ একই পরিবারের চারজন হত্যার তদন্তে এমনই চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এনেছে পুলিশ। হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মুগ্ধ দাস (২৩) ও সিদ্ধার্থ দাস (১৯) নামে দুই যুবককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পুলিশ বলছে, তারা পরস্পরের মামাতো ভাই এবং নিহত পরিবারের প্রতিবেশী।
রোববার (২৩ আগস্ট) সংবাদ সম্মেলনে রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ জানান, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে দুই আসামি হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছে। পুলিশের দাবি, বাড়ির ছাদে ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়াকে কেন্দ্র করেই প্রথমে শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীকে হত্যা করা হয়। পরে পরিবারের অন্য তিন সদস্যকেও হত্যা করা হয়।
খুনের পরও বাড়িতে কেন ছিল ঘাতকরা?
সাধারণত হত্যার পর অপরাধীরা দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগের চেষ্টা করে। কিন্তু এই ঘটনায় চিত্র ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, চারজনকে হত্যার পরও দুই যুবক ওই বাড়িতেই বেশ কিছু সময় অবস্থান করে।
এই সময়ই তারা গোসল করে। এরপর ডাইনিং টেবিলে বসে খেজুর ও শসা খায়। ঘটনাস্থলে পাওয়া খেজুরের বিচি এবং অর্ধেক কামড়ানো শসা তদন্তকারীদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ আলামত হিসেবে ধরা দেয়। পুলিশের দাবি, জিজ্ঞাসাবাদে আসামিরা যে বর্ণনা দিয়েছে, ঘটনাস্থলের এসব আলামতের সঙ্গে তার মিল পাওয়া গেছে।
খেজুরের বিচি ইতোমধ্যে ডিএনএ পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন পুলিশ কমিশনার। অর্থাৎ, যে খাবারটি হত্যার পর ঘাতকরা নিশ্চিন্তে খেয়েছিল বলে পুলিশ দাবি করছে, সেই খাবারই এখন তাদের বিরুদ্ধে বৈজ্ঞানিক প্রমাণের একটি সম্ভাব্য সূত্র হয়ে উঠেছে।
‘গোল্ড’ যাচাই করতে আগুনে অলংকার:
তদন্তে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ আরেকটি সূত্র আসে একটি পোড়ানো অলংকার থেকে। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, বাড়িতে পাওয়া একটি অলংকার আগুনে পুড়িয়ে পরীক্ষা করা হয়েছিল। সেটি স্বর্ণ কি না, তা যাচাইয়ের চেষ্টা করা হয়। এই ঘটনাই তদন্তকারীদের মনে প্রশ্ন তোলে—হত্যাকাণ্ডে কি স্বর্ণের কাজ সম্পর্কে অভিজ্ঞ কেউ জড়িত?
পরবর্তী অনুসন্ধানে সেই ধারণার সঙ্গে মিলে যায় সিদ্ধার্থের পরিচয়। পুলিশ জানিয়েছে, সিদ্ধার্থ স্বর্ণের দোকানে কারিগর হিসেবে কাজ করত। ফলে একটি পোড়ানো অলংকার এবং সন্দেহভাজনের পেশাগত দক্ষতার মধ্যে তদন্তকারীরা গুরুত্বপূর্ণ যোগসূত্র খুঁজে পান।
অর্থাৎ, তদন্তে বড় কোনো প্রত্যক্ষদর্শী নয়, একটি খেজুরের বিচি, অর্ধেক কামড়ানো শসা এবং পোড়ানো অলংকারই ধীরে ধীরে সন্দেহের বৃত্ত সংকুচিত করতে সহায়তা করেছে বলে পুলিশের দাবি।
ইয়াবা সেবন থেকে চার খুন?
পুলিশের তদন্তে এখন পর্যন্ত যে চিত্র উঠে এসেছে, তাতে হত্যাকাণ্ডের সূত্রপাত হয়েছিল বাড়ির ছাদে ইয়াবা সেবনকে কেন্দ্র করে।
পুলিশের দাবি, বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ পাশের একটি ভবনের ওপর দিয়ে গণপতি চক্রবর্তীদের বাড়ির ছাদে ওঠে। সেখানে তারা ইয়াবা সেবন করছিল। শব্দ পেয়ে গণপতি চক্রবর্তী ছাদে গিয়ে তাদের জিজ্ঞাসা করেন এবং বাধা দেন।
সেখানেই পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নেয়। নিজেদের পরিচয় প্রকাশ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় প্রথমে গণপতি চক্রবর্তীকে হত্যা করা হয় বলে পুলিশ জানিয়েছে। পরে একে একে তার স্ত্রী, মেয়ে ও ছেলেকেও হত্যা করা হয়।
তবে তদন্তের এই পর্যায়ে পুলিশের দাবির সঙ্গে আদালতে প্রমাণিত সত্যের পার্থক্য মনে রাখা জরুরি। গ্রেপ্তার দুই যুবকের বক্তব্য, ফরেনসিক প্রতিবেদন এবং অন্যান্য সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতেই শেষ পর্যন্ত হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত উদ্দেশ্য ও দায় নির্ধারিত হবে।
ডাকাতির নাটক না-কি অন্য কোনো উদ্দেশ্য?
চারজনকে হত্যার পর ঘাতকরা ঘটনাটিকে ডাকাতি হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করেছিল বলে দাবি পুলিশের।
ঘরের জিনিসপত্র এলোমেলো করে রাখা হয়। বাইরে থেকে দেখলে যেন মনে হয়, কোনো একটি চক্র বাড়িতে ঢুকে লুটপাট চালিয়েছে। কিন্তু তদন্তকারীদের কাছে দৃশ্যটি ধীরে ধীরে ভিন্ন অর্থ বহন করতে শুরু করে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল দুটি মোবাইল ফোন। পুলিশের দাবি, বাড়ি থেকে বের হওয়ার আগে ফোন দুটি ডিটারজেন্ট মেশানো পানিতে বালতির মধ্যে ভিজিয়ে রাখা হয়। উদ্দেশ্য ছিল সম্ভাব্য ফিঙ্গারপ্রিন্ট বা অন্য কোনো আলামত নষ্ট করা। অপরাধের পর আলামত নষ্ট করার এই চেষ্টা তদন্তকারীদের কাছে ঘটনাটিকে আরও পরিকল্পিত করে তুলেছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
স্থানীয় তথ্যেই খুলল রহস্য জট:
ঘটনাস্থলের আলামত বিশ্লেষণের পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়েও অনুসন্ধান শুরু করে পুলিশ। মাদক সেবনের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের সম্পর্কে স্থানীয় সোর্সের কাছ থেকে তথ্য নেওয়া হয়। এরপর সেই তথ্য মিলিয়ে দেখা হয় নিহত পরিবারের স্বজনদের দেওয়া তথ্যের সঙ্গে।
রংপুর কোতোয়ালি থানার ওসি এ কে এম নাজমুল কাদেরের ভাষ্য, ঘটনাস্থলের আলামত, স্থানীয় সোর্সের তথ্য এবং ভুক্তভোগী পরিবারের স্বজনদের তথ্য মিলিয়ে সন্দেহভাজনদের শনাক্ত করা হয়। অভিযানের খবর পেয়ে তাদের একজন আত্মগোপনের চেষ্টা করে। পরে দখীগঞ্জ শ্মশান এলাকা থেকে তাকে আটক করা হয় বলে পুলিশ জানিয়েছে।
এখন সবচেয়ে বড় পরীক্ষা ডিএনএ:
দুই আসামির স্বীকারোক্তির পাশাপাশি তদন্তকারীদের জন্য এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে ফরেনসিক প্রমাণ। খেজুরের বিচি ডিএনএ পরীক্ষায় পাঠানো হয়েছে। আসামিদেরও ডিএনএ নমুনা নেওয়া হয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে। পাশাপাশি ঘটনাস্থলের অন্যান্য আলামতও পরীক্ষা করা হচ্ছে।
বিচি বা অন্য কোনো আলামত কি সত্যিই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে গ্রেপ্তার দুই যুবকের সরাসরি যোগসূত্র প্রমাণ করবে? তাদের বক্তব্যের সঙ্গে ফরেনসিক পরীক্ষার ফল কতটা মেলে? আর ডাকাতির সাজানো দৃশ্যের আড়ালে কি শুধু হত্যার ঘটনা, নাকি আরও কোনো উদ্দেশ্য ছিল?এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই তদন্তের পরবর্তী ধাপ নির্ধারণ করবে।
যে পরিবারটি এক রাতেই নিঃশেষ:
নিহতরা হলেন রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী জুয়েল (৬৫), তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী বালা (৫০), মেয়ে আগামী চক্রবর্তী (২৫) এবং ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তী (১২)।
গণপতি চক্রবর্তী গত বছরের ডিসেম্বরে রংপুর জিলা স্কুল থেকে অবসর নেন। অবসরের পর তিনি রংপুর সমবায় মার্কেটে একটি হোমিওপ্যাথি চেম্বারে চিকিৎসাসেবা দিতেন। তার মেয়ে আগামী চক্রবর্তী কারমাইকেল কলেজের ইংরেজি বিভাগের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী ছিলেন এবং সম্প্রতি পড়াশোনা শেষ করেন। আর ১২ বছর বয়সী আয়ুশ চক্রবর্তী ছিল রংপুর জিলা স্কুলের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী।
একটি পরিবারের চারটি জীবন থেমে গেছে এক রাতেই। অথচ হত্যার পর সেই বাড়িতেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা অবস্থান, গোসল, খাবার খাওয়া এবং আলামত মুছে ফেলার চেষ্টা—ঘটনার নির্মমতার পাশাপাশি অপরাধীদের মানসিকতা নিয়েও তৈরি করেছে নতুন প্রশ্ন।
তদন্তে এখন খেজুরের বিচি, কামড়ানো শসা, পোড়ানো অলংকার, মোবাইল ফোন, ডিএনএ এবং আসামিদের জবানবন্দি—সবগুলো সূত্রকে একই সুতোয় গাঁথার চেষ্টা চলছে। সেই সুতো কোথায় গিয়ে শেষ হয়, সেটিই এখন রংপুরের বহুল আলোচিত চার খুনের মামলার সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৩ আগস্ট ২০২৬
শুধু হত্যা করেই ঘাতকরা পালিয়ে যায়নি, তারা গোসল করেছে, খেজুর খেয়েছে, ফ্রিজ খুলে শসা বের করে খেয়েছে, ইয়াবা সেবন করেছে।
এমনকি একটি অলংকার আগুনে পুড়িয়ে সেটি স্বর্ণ কি না, তা পরীক্ষা করেছে। এরপর হত্যাকাণ্ডকে ডাকাতি হিসেবে দেখাতে ঘরের জিনিসপত্র এলোমেলো করে এবং দুটি মোবাইল ফোন ডিটারজেন্ট মেশানো পানিতে ভিজিয়ে রেখে যায়।
রংপুর মহানগরীর মাছুয়াপাড়ায় অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ একই পরিবারের চারজন হত্যার তদন্তে এমনই চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এনেছে পুলিশ। হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মুগ্ধ দাস (২৩) ও সিদ্ধার্থ দাস (১৯) নামে দুই যুবককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পুলিশ বলছে, তারা পরস্পরের মামাতো ভাই এবং নিহত পরিবারের প্রতিবেশী।
রোববার (২৩ আগস্ট) সংবাদ সম্মেলনে রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ জানান, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে দুই আসামি হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছে। পুলিশের দাবি, বাড়ির ছাদে ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়াকে কেন্দ্র করেই প্রথমে শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীকে হত্যা করা হয়। পরে পরিবারের অন্য তিন সদস্যকেও হত্যা করা হয়।
খুনের পরও বাড়িতে কেন ছিল ঘাতকরা?
সাধারণত হত্যার পর অপরাধীরা দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগের চেষ্টা করে। কিন্তু এই ঘটনায় চিত্র ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, চারজনকে হত্যার পরও দুই যুবক ওই বাড়িতেই বেশ কিছু সময় অবস্থান করে।
এই সময়ই তারা গোসল করে। এরপর ডাইনিং টেবিলে বসে খেজুর ও শসা খায়। ঘটনাস্থলে পাওয়া খেজুরের বিচি এবং অর্ধেক কামড়ানো শসা তদন্তকারীদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ আলামত হিসেবে ধরা দেয়। পুলিশের দাবি, জিজ্ঞাসাবাদে আসামিরা যে বর্ণনা দিয়েছে, ঘটনাস্থলের এসব আলামতের সঙ্গে তার মিল পাওয়া গেছে।
খেজুরের বিচি ইতোমধ্যে ডিএনএ পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন পুলিশ কমিশনার। অর্থাৎ, যে খাবারটি হত্যার পর ঘাতকরা নিশ্চিন্তে খেয়েছিল বলে পুলিশ দাবি করছে, সেই খাবারই এখন তাদের বিরুদ্ধে বৈজ্ঞানিক প্রমাণের একটি সম্ভাব্য সূত্র হয়ে উঠেছে।
‘গোল্ড’ যাচাই করতে আগুনে অলংকার:
তদন্তে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ আরেকটি সূত্র আসে একটি পোড়ানো অলংকার থেকে। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, বাড়িতে পাওয়া একটি অলংকার আগুনে পুড়িয়ে পরীক্ষা করা হয়েছিল। সেটি স্বর্ণ কি না, তা যাচাইয়ের চেষ্টা করা হয়। এই ঘটনাই তদন্তকারীদের মনে প্রশ্ন তোলে—হত্যাকাণ্ডে কি স্বর্ণের কাজ সম্পর্কে অভিজ্ঞ কেউ জড়িত?
পরবর্তী অনুসন্ধানে সেই ধারণার সঙ্গে মিলে যায় সিদ্ধার্থের পরিচয়। পুলিশ জানিয়েছে, সিদ্ধার্থ স্বর্ণের দোকানে কারিগর হিসেবে কাজ করত। ফলে একটি পোড়ানো অলংকার এবং সন্দেহভাজনের পেশাগত দক্ষতার মধ্যে তদন্তকারীরা গুরুত্বপূর্ণ যোগসূত্র খুঁজে পান।
অর্থাৎ, তদন্তে বড় কোনো প্রত্যক্ষদর্শী নয়, একটি খেজুরের বিচি, অর্ধেক কামড়ানো শসা এবং পোড়ানো অলংকারই ধীরে ধীরে সন্দেহের বৃত্ত সংকুচিত করতে সহায়তা করেছে বলে পুলিশের দাবি।
ইয়াবা সেবন থেকে চার খুন?
পুলিশের তদন্তে এখন পর্যন্ত যে চিত্র উঠে এসেছে, তাতে হত্যাকাণ্ডের সূত্রপাত হয়েছিল বাড়ির ছাদে ইয়াবা সেবনকে কেন্দ্র করে।
পুলিশের দাবি, বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ পাশের একটি ভবনের ওপর দিয়ে গণপতি চক্রবর্তীদের বাড়ির ছাদে ওঠে। সেখানে তারা ইয়াবা সেবন করছিল। শব্দ পেয়ে গণপতি চক্রবর্তী ছাদে গিয়ে তাদের জিজ্ঞাসা করেন এবং বাধা দেন।
সেখানেই পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নেয়। নিজেদের পরিচয় প্রকাশ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় প্রথমে গণপতি চক্রবর্তীকে হত্যা করা হয় বলে পুলিশ জানিয়েছে। পরে একে একে তার স্ত্রী, মেয়ে ও ছেলেকেও হত্যা করা হয়।
তবে তদন্তের এই পর্যায়ে পুলিশের দাবির সঙ্গে আদালতে প্রমাণিত সত্যের পার্থক্য মনে রাখা জরুরি। গ্রেপ্তার দুই যুবকের বক্তব্য, ফরেনসিক প্রতিবেদন এবং অন্যান্য সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতেই শেষ পর্যন্ত হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত উদ্দেশ্য ও দায় নির্ধারিত হবে।
ডাকাতির নাটক না-কি অন্য কোনো উদ্দেশ্য?
চারজনকে হত্যার পর ঘাতকরা ঘটনাটিকে ডাকাতি হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করেছিল বলে দাবি পুলিশের।
ঘরের জিনিসপত্র এলোমেলো করে রাখা হয়। বাইরে থেকে দেখলে যেন মনে হয়, কোনো একটি চক্র বাড়িতে ঢুকে লুটপাট চালিয়েছে। কিন্তু তদন্তকারীদের কাছে দৃশ্যটি ধীরে ধীরে ভিন্ন অর্থ বহন করতে শুরু করে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল দুটি মোবাইল ফোন। পুলিশের দাবি, বাড়ি থেকে বের হওয়ার আগে ফোন দুটি ডিটারজেন্ট মেশানো পানিতে বালতির মধ্যে ভিজিয়ে রাখা হয়। উদ্দেশ্য ছিল সম্ভাব্য ফিঙ্গারপ্রিন্ট বা অন্য কোনো আলামত নষ্ট করা। অপরাধের পর আলামত নষ্ট করার এই চেষ্টা তদন্তকারীদের কাছে ঘটনাটিকে আরও পরিকল্পিত করে তুলেছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
স্থানীয় তথ্যেই খুলল রহস্য জট:
ঘটনাস্থলের আলামত বিশ্লেষণের পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়েও অনুসন্ধান শুরু করে পুলিশ। মাদক সেবনের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের সম্পর্কে স্থানীয় সোর্সের কাছ থেকে তথ্য নেওয়া হয়। এরপর সেই তথ্য মিলিয়ে দেখা হয় নিহত পরিবারের স্বজনদের দেওয়া তথ্যের সঙ্গে।
রংপুর কোতোয়ালি থানার ওসি এ কে এম নাজমুল কাদেরের ভাষ্য, ঘটনাস্থলের আলামত, স্থানীয় সোর্সের তথ্য এবং ভুক্তভোগী পরিবারের স্বজনদের তথ্য মিলিয়ে সন্দেহভাজনদের শনাক্ত করা হয়। অভিযানের খবর পেয়ে তাদের একজন আত্মগোপনের চেষ্টা করে। পরে দখীগঞ্জ শ্মশান এলাকা থেকে তাকে আটক করা হয় বলে পুলিশ জানিয়েছে।
এখন সবচেয়ে বড় পরীক্ষা ডিএনএ:
দুই আসামির স্বীকারোক্তির পাশাপাশি তদন্তকারীদের জন্য এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে ফরেনসিক প্রমাণ। খেজুরের বিচি ডিএনএ পরীক্ষায় পাঠানো হয়েছে। আসামিদেরও ডিএনএ নমুনা নেওয়া হয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে। পাশাপাশি ঘটনাস্থলের অন্যান্য আলামতও পরীক্ষা করা হচ্ছে।
বিচি বা অন্য কোনো আলামত কি সত্যিই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে গ্রেপ্তার দুই যুবকের সরাসরি যোগসূত্র প্রমাণ করবে? তাদের বক্তব্যের সঙ্গে ফরেনসিক পরীক্ষার ফল কতটা মেলে? আর ডাকাতির সাজানো দৃশ্যের আড়ালে কি শুধু হত্যার ঘটনা, নাকি আরও কোনো উদ্দেশ্য ছিল?এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই তদন্তের পরবর্তী ধাপ নির্ধারণ করবে।
যে পরিবারটি এক রাতেই নিঃশেষ:
নিহতরা হলেন রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী জুয়েল (৬৫), তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী বালা (৫০), মেয়ে আগামী চক্রবর্তী (২৫) এবং ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তী (১২)।
গণপতি চক্রবর্তী গত বছরের ডিসেম্বরে রংপুর জিলা স্কুল থেকে অবসর নেন। অবসরের পর তিনি রংপুর সমবায় মার্কেটে একটি হোমিওপ্যাথি চেম্বারে চিকিৎসাসেবা দিতেন। তার মেয়ে আগামী চক্রবর্তী কারমাইকেল কলেজের ইংরেজি বিভাগের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী ছিলেন এবং সম্প্রতি পড়াশোনা শেষ করেন। আর ১২ বছর বয়সী আয়ুশ চক্রবর্তী ছিল রংপুর জিলা স্কুলের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী।
একটি পরিবারের চারটি জীবন থেমে গেছে এক রাতেই। অথচ হত্যার পর সেই বাড়িতেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা অবস্থান, গোসল, খাবার খাওয়া এবং আলামত মুছে ফেলার চেষ্টা—ঘটনার নির্মমতার পাশাপাশি অপরাধীদের মানসিকতা নিয়েও তৈরি করেছে নতুন প্রশ্ন।
তদন্তে এখন খেজুরের বিচি, কামড়ানো শসা, পোড়ানো অলংকার, মোবাইল ফোন, ডিএনএ এবং আসামিদের জবানবন্দি—সবগুলো সূত্রকে একই সুতোয় গাঁথার চেষ্টা চলছে। সেই সুতো কোথায় গিয়ে শেষ হয়, সেটিই এখন রংপুরের বহুল আলোচিত চার খুনের মামলার সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

আপনার মতামত লিখুন