ঢাকা   মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬
BD State News

সারাদেশ

সৈয়দপুরে নিরাপদ খাদ্যের অভিযান নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্ন

সৈয়দপুরে নিরাপদ খাদ্যের অভিযান নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্ন

নীলফামারীর সৈয়দপুরে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের অভিযানে একটি চিপস কারখানাকে এক লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। তবে অভিযানের পর শুধু জরিমানার হিসাবেই থেমে থাকেনি আলোচনা; বরং প্রশাসনের ভূমিকা, অভিযানের স্বচ্ছতা ও সব প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে সমান নজরদারি নিয়ে উঠেছে নানা প্রশ্ন।

মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) বিকেল ৫টার দিকে শহরের কয়া মিস্ত্রিপাড়া হিন্দুপাড়া এলাকায় মেসার্স নাওয়াজ হাসকিং মিলসের চাতালের ভেতরে মেসার্স নাসিম চিপস কারখানায় অভিযান চালানো হয়। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে পরিচালিত অভিযানে ভ্রাম্যমাণ আদালতের ম্যাজিস্ট্রেটের দায়িত্ব পালন করেন সৈয়দপুর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সাব্বির হোসেন।

অভিযানে সঙ্গে ছিলেন নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের নীলফামারী জেলা কর্মকর্তা শিহাব আহমেদ, সৈয়দপুর উপজেলা স্যানিটারি ইন্সপেক্টর আলতাফ হোসেন ও পুলিশ সদস্যরা।

অভিযান সংশ্লিষ্টদের দাবি, কারখানাটিতে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে চিপস তৈরি করা হচ্ছিল। সেখানে ক্ষতিকর রং ও লবণ ব্যবহারের অভিযোগ, খোলা জায়গায় চিপস শুকানো এবং নষ্ট হয়ে যাওয়া চিপস সংরক্ষণের বিষয়ও পাওয়া যায়।

তবে এসব অনিয়মের জন্য কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। শেষ পর্যন্ত চিপস তৈরির উপকরণ কেনার চালান দেখাতে না পারায় কারখানার মালিক নাসিম ওরফে ‘চিপস গুড্ডু’কে এক লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। জরিমানা অনাদায়ে তিন মাসের সশ্রম কারাদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়। পরে তিনি জরিমানার টাকা পরিশোধ করেন।

অভিযানের সময় কারখানার মালিক, শ্রমিক ও স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দেয়। তাদের অভিযোগ, প্রশাসন সব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে সমানভাবে অভিযান পরিচালনা করছে না।

স্থানীয় কয়েকজন দুটি আইসক্রিম কারখানা ও একটি চিপস কারখানার নাম উল্লেখ করে সেখানেও অভিযান চালানোর দাবি জানান। তাদের প্রশ্ন—একই এলাকায় খাদ্যপণ্য উৎপাদনকারী একাধিক প্রতিষ্ঠান থাকলে শুধু একটি প্রতিষ্ঠানে কেন অভিযান হবে?

এ সময় কয়েকজন স্থানীয় ব্যক্তি আরও অভিযোগ করেন, কিছু প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে নিয়মিত অর্থ নেওয়া হয় এবং যারা কথিত ওই অর্থ দিতে অনীহা প্রকাশ করেন, তাদের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হয়। এমনকি স্থানীয় এক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে টাকা সংগ্রহের অভিযোগও তোলা হয়।

তবে এসব অভিযোগের পক্ষে তাৎক্ষণিক কোনো নথি বা প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগগুলো এখনো অভিযোগ হিসেবেই রয়েছে। তবে অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

অভিযানের পর কারখানার মালিক নাসিম ওরফে গুড্ডু অভিযোগ করে বলেন, মাত্র এক মাস আগে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের একজন কর্মকর্তা তার কারখানায় এসে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা হিসেবে নিয়েছেন।

তার দাবি, তখন তাকে চিপসে ফুড কালার ব্যবহারের বিষয়ে বলা হয়েছিল। অথচ এক মাস পরের অভিযানে এসে বলা হচ্ছে, কোনো রং ব্যবহার করা যাবে না।

নাসিম বলেন, “সেদিনও কারখানায় নানা সমস্যা দেখেছিল তারা। কিন্তু কীভাবে সেগুলো ঠিক করতে হবে, সে বিষয়ে কোনো পরামর্শ দেওয়া হয়নি। এভাবে নানা অজুহাতে টাকা দিতে হলে হয় ব্যবসা বন্ধ করতে হবে, নয়তো তাদের দাবি অনুযায়ী টাকা দিয়ে ব্যবসা চালাতে হবে।”

তবে এক মাস আগে ৫০ হাজার টাকা নেওয়ার দাবির পক্ষে কোনো সরকারি রসিদ বা নথি প্রকাশ্যে পাওয়া গেছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

অন্যদিকে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের নীলফামারী জেলা কর্মকর্তা শিহাব আহমেদ বলেন, “আমরা মূলত আমাদের সোর্সের মাধ্যমে তথ্য নিয়ে নিশ্চিত হয়েই এ ধরনের অভিযান চালাই। সোর্স যেখানে নিয়ে যায়, সেখানে যেতে হয়।”

অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে স্থানীয়দের অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে আজ আর কোথাও যাওয়ার সময় নেই। আপনারা যে তথ্য দিয়েছেন, তা যাচাই করে পরে কোনো একদিন সেখানে আসব।”

নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে অভিযান প্রয়োজন, এ নিয়ে কারও দ্বিমত নেই। কিন্তু সেই অভিযানের গ্রহণযোগ্যতা নির্ভর করে স্বচ্ছতা ও সমতার ওপর। একই ধরনের অভিযোগ থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রেও নিয়মিত ও নিরপেক্ষভাবে অভিযান পরিচালনা করা হবে কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

কারণ প্রশ্নটি শুধু এক লাখ টাকা জরিমানার নয়। প্রশ্নটি মানুষের খাবারের নিরাপত্তার পাশাপাশি প্রশাসনের প্রতি মানুষের আস্থারও।

সৈয়দপুরের মানুষের প্রত্যাশা—ভেজাল ও অস্বাস্থ্যকর খাদ্যের বিরুদ্ধে অভিযান হবে কঠোর, কিন্তু সেই কঠোরতার দাঁড়িপাল্লা যেন সবার জন্য সমান হয়।

আপনার মতামত লিখুন

BD State News

মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬


সৈয়দপুরে নিরাপদ খাদ্যের অভিযান নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্ন

প্রকাশের তারিখ : ১৮ আগস্ট ২০২৬

featured Image

নীলফামারীর সৈয়দপুরে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের অভিযানে একটি চিপস কারখানাকে এক লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। তবে অভিযানের পর শুধু জরিমানার হিসাবেই থেমে থাকেনি আলোচনা; বরং প্রশাসনের ভূমিকা, অভিযানের স্বচ্ছতা ও সব প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে সমান নজরদারি নিয়ে উঠেছে নানা প্রশ্ন।

মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) বিকেল ৫টার দিকে শহরের কয়া মিস্ত্রিপাড়া হিন্দুপাড়া এলাকায় মেসার্স নাওয়াজ হাসকিং মিলসের চাতালের ভেতরে মেসার্স নাসিম চিপস কারখানায় অভিযান চালানো হয়। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে পরিচালিত অভিযানে ভ্রাম্যমাণ আদালতের ম্যাজিস্ট্রেটের দায়িত্ব পালন করেন সৈয়দপুর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সাব্বির হোসেন।

অভিযানে সঙ্গে ছিলেন নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের নীলফামারী জেলা কর্মকর্তা শিহাব আহমেদ, সৈয়দপুর উপজেলা স্যানিটারি ইন্সপেক্টর আলতাফ হোসেন ও পুলিশ সদস্যরা।

অভিযান সংশ্লিষ্টদের দাবি, কারখানাটিতে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে চিপস তৈরি করা হচ্ছিল। সেখানে ক্ষতিকর রং ও লবণ ব্যবহারের অভিযোগ, খোলা জায়গায় চিপস শুকানো এবং নষ্ট হয়ে যাওয়া চিপস সংরক্ষণের বিষয়ও পাওয়া যায়।

তবে এসব অনিয়মের জন্য কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। শেষ পর্যন্ত চিপস তৈরির উপকরণ কেনার চালান দেখাতে না পারায় কারখানার মালিক নাসিম ওরফে ‘চিপস গুড্ডু’কে এক লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। জরিমানা অনাদায়ে তিন মাসের সশ্রম কারাদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়। পরে তিনি জরিমানার টাকা পরিশোধ করেন।

অভিযানের সময় কারখানার মালিক, শ্রমিক ও স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দেয়। তাদের অভিযোগ, প্রশাসন সব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে সমানভাবে অভিযান পরিচালনা করছে না।

স্থানীয় কয়েকজন দুটি আইসক্রিম কারখানা ও একটি চিপস কারখানার নাম উল্লেখ করে সেখানেও অভিযান চালানোর দাবি জানান। তাদের প্রশ্ন—একই এলাকায় খাদ্যপণ্য উৎপাদনকারী একাধিক প্রতিষ্ঠান থাকলে শুধু একটি প্রতিষ্ঠানে কেন অভিযান হবে?

এ সময় কয়েকজন স্থানীয় ব্যক্তি আরও অভিযোগ করেন, কিছু প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে নিয়মিত অর্থ নেওয়া হয় এবং যারা কথিত ওই অর্থ দিতে অনীহা প্রকাশ করেন, তাদের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হয়। এমনকি স্থানীয় এক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে টাকা সংগ্রহের অভিযোগও তোলা হয়।

তবে এসব অভিযোগের পক্ষে তাৎক্ষণিক কোনো নথি বা প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগগুলো এখনো অভিযোগ হিসেবেই রয়েছে। তবে অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

অভিযানের পর কারখানার মালিক নাসিম ওরফে গুড্ডু অভিযোগ করে বলেন, মাত্র এক মাস আগে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের একজন কর্মকর্তা তার কারখানায় এসে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা হিসেবে নিয়েছেন।

তার দাবি, তখন তাকে চিপসে ফুড কালার ব্যবহারের বিষয়ে বলা হয়েছিল। অথচ এক মাস পরের অভিযানে এসে বলা হচ্ছে, কোনো রং ব্যবহার করা যাবে না।

নাসিম বলেন, “সেদিনও কারখানায় নানা সমস্যা দেখেছিল তারা। কিন্তু কীভাবে সেগুলো ঠিক করতে হবে, সে বিষয়ে কোনো পরামর্শ দেওয়া হয়নি। এভাবে নানা অজুহাতে টাকা দিতে হলে হয় ব্যবসা বন্ধ করতে হবে, নয়তো তাদের দাবি অনুযায়ী টাকা দিয়ে ব্যবসা চালাতে হবে।”

তবে এক মাস আগে ৫০ হাজার টাকা নেওয়ার দাবির পক্ষে কোনো সরকারি রসিদ বা নথি প্রকাশ্যে পাওয়া গেছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

অন্যদিকে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের নীলফামারী জেলা কর্মকর্তা শিহাব আহমেদ বলেন, “আমরা মূলত আমাদের সোর্সের মাধ্যমে তথ্য নিয়ে নিশ্চিত হয়েই এ ধরনের অভিযান চালাই। সোর্স যেখানে নিয়ে যায়, সেখানে যেতে হয়।”

অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে স্থানীয়দের অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে আজ আর কোথাও যাওয়ার সময় নেই। আপনারা যে তথ্য দিয়েছেন, তা যাচাই করে পরে কোনো একদিন সেখানে আসব।”

নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে অভিযান প্রয়োজন, এ নিয়ে কারও দ্বিমত নেই। কিন্তু সেই অভিযানের গ্রহণযোগ্যতা নির্ভর করে স্বচ্ছতা ও সমতার ওপর। একই ধরনের অভিযোগ থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রেও নিয়মিত ও নিরপেক্ষভাবে অভিযান পরিচালনা করা হবে কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

কারণ প্রশ্নটি শুধু এক লাখ টাকা জরিমানার নয়। প্রশ্নটি মানুষের খাবারের নিরাপত্তার পাশাপাশি প্রশাসনের প্রতি মানুষের আস্থারও।

সৈয়দপুরের মানুষের প্রত্যাশা—ভেজাল ও অস্বাস্থ্যকর খাদ্যের বিরুদ্ধে অভিযান হবে কঠোর, কিন্তু সেই কঠোরতার দাঁড়িপাল্লা যেন সবার জন্য সমান হয়।


BD State News

সম্পাদক: আবদুর রাকিব

কপিরাইট © ২০২৬ BD State News । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত