সীমান্তের কাছে দাঁড়িয়ে থাকা বিশাল ভবনটি দূর থেকেই নজর কাড়ে। আধুনিক স্থাপত্যের ছোঁয়ায় নির্মিত ভবনটির দিকে তাকালে মনে হয়, এখানে নিশ্চয়ই প্রতিদিন মানুষের পদচারণায় মুখর থাকার কথা। ট্রেনের হুইসেল, যাত্রীদের ব্যস্ততা, ব্যবসায়ীদের ছোটাছুটি, পণ্য ওঠানামা আর কাস্টমস-ইমিগ্রেশনের কর্মচাঞ্চল্যে সীমান্তজুড়ে থাকার কথা কর্মব্যস্ততার আবহ।
কাছে গেলেই চোখে পড়ে নীরবতার এক দীর্ঘ ছবি। বারান্দায় সারি সারি ফ্যান, অথচ বহুদিন ধরে সেগুলো ঘোরে না। জানালা দিয়ে দেখা যায় প্যাকেটবন্দী চেয়ার-টেবিল, স্টিলের টুল ও অন্যান্য আসবাব। সময়ের সঙ্গে সেগুলোর গায়ে জমেছে ধুলোর পুরু আস্তরণ। দ্বিতীয় তলায় ব্যাংক ও শুল্ক কর্মকর্তাদের জন্য তৈরি কক্ষগুলো পড়ে আছে খালি। তৃতীয় তলায় রেস্তোরাঁর জন্য রাখা জায়গাটিও নিঃসঙ্গ। পাশে থাকা দোতলা ভিআইপি রেস্টহাউসের দরজায় ঝুলছে তালা।
নীলফামারীর ডোমার উপজেলার চিলাহাটি সীমান্তে প্রায় ১৩০ কোটি টাকা ব্যয়ে গড়ে তোলা রেল অবকাঠামোর বর্তমান চিত্র এমনই। স্থলবন্দরকে কেন্দ্র করে যে বিপুল কর্মযজ্ঞ, ব্যবসা-বাণিজ্য ও যোগাযোগের স্বপ্ন দেখেছিল উত্তরাঞ্চলের মানুষ, সেই স্বপ্ন এখন অনেকটাই থমকে আছে। শুধু ভবন নয়, ওভারব্রিজ, যাত্রীছাউনি, গার্ডরুম এবং সীমান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত রেললাইনও যেন অপেক্ষা করছে ফিরে আসার সেই ব্যস্ত দিনের।
চিলাহাটি থেকে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কোচবিহার জেলার হলদিবাড়ী। দুই ভূখণ্ডকে যুক্ত করা এই রেলপথের ইতিহাস বেশ পুরোনো। ব্রিটিশ আমলে এই পথ ছিল যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। কিন্তু ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধের পর বন্ধ হয়ে যায় রেল যোগাযোগ। এরপর কেটে যায় অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময়।
২০১৩ সালে চিলাহাটিকে স্থলবন্দর ঘোষণা করে বাংলাদেশ সরকার। তবে বাস্তবে বন্দরটির কার্যক্রম শুরু হতে আরও প্রায় এক দশক সময় লাগে। দীর্ঘ অপেক্ষার পর দুই দেশের উদ্যোগে আবারও খুলে যায় পুরোনো রেলপথের দুয়ার।
২০১৯ সালে চিলাহাটি স্টেশন থেকে সীমান্ত পর্যন্ত ব্রডগেজ রেলপথ নির্মাণের কাজ শুরু হয়। অবকাঠামো তৈরির পর ২০২১ সালের ১ আগস্ট ভারত থেকে পণ্যবাহী ট্রেন চলাচল শুরু করে। পরের বছর চালু হয় ঢাকা-নিউ জলপাইগুড়ি রুটের আন্তদেশীয় যাত্রীবাহী ট্রেন ‘মিতালি এক্সপ্রেস’।
সেই সময় চিলাহাটি ও আশপাশের এলাকায় তৈরি হয়েছিল নতুন এক স্বপ্ন। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা ভেবেছিলেন, সীমান্ত দিয়ে পণ্য আসবে, যাবে; নতুন ব্যবসা গড়ে উঠবে; শ্রমিকের কাজ বাড়বে; পরিবহন, হোটেল, রেস্তোরাঁসহ নানা খাতে তৈরি হবে কর্মসংস্থান।
একটি সীমান্ত জনপদ ঘিরে যেন নতুন অর্থনৈতিক ভোরের অপেক্ষা শুরু হয়েছিল।তারপর হঠাৎ থেমে গেল সব, সেই ভোর বেশিদিন স্থায়ী হয়নি।
২০২৪ সালের মে মাসে ভারতে পাথরের দাম বেড়ে যাওয়ায় পণ্য পরিবহন কমতে শুরু করে। একপর্যায়ে পাথরবাহী ট্রেনের চলাচল পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। এরপর ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বন্ধ হয়ে যায় যাত্রীবাহী ট্রেনের চলাচলও।
চিলাহাটি স্টেশন মাস্টার রুহুল আমিনের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২১ সাল থেকে মূলত ভারত থেকে পাথরবোঝাই ট্রেন বাংলাদেশে আসত। মাসে চার থেকে পাঁচটি মালবাহী ট্রেন চলাচল করত। পণ্য পরিবহন বন্ধ হয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে স্থলবন্দরকেন্দ্রিক ব্যস্ততাও কমতে থাকে।
অবশেষে ২০২৫ সালের আগস্টে অবকাঠামো না থাকার যুক্তিতে প্রজ্ঞাপন জারি করে স্থলবন্দরটি বন্ধ ঘোষণা করা হয়।
ফলে যে অবকাঠামো চালু রাখার জন্য কোটি কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছিল, তা ব্যবহারের সুযোগই অনেকটা হারিয়ে যায়।
বাংলাদেশ রেলওয়ের ‘চিলাহাটি ও চিলাহাটি বর্ডার রেলপথ নির্মাণ’ প্রকল্পের ব্যয় শুরুতে ধরা হয়েছিল প্রায় ৮০ কোটি টাকা। পরে বিভিন্ন ধাপে ব্যয় বাড়তে বাড়তে প্রকল্পটি শেষ হয় প্রায় ১২৮ কোটি টাকা ব্যয়ে।
প্রকল্প পরিচালক মো. আবদুর রহিমের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুনে প্রকল্পের কাজ শেষ হয়। রেলের ওয়াগন, রাস্তা, বিদ্যুৎসহ আনুষঙ্গিক খাত যুক্ত করলে মোট ব্যয় প্রায় ২০০ কোটি টাকায় দাঁড়ায়।
এই বিপুল অর্থ ব্যয়ে স্টেশনের রেললাইন বাড়ানো হয়, নির্মাণ করা হয় প্ল্যাটফর্ম ও ফুটওভারব্রিজ। তৈরি হয় রেল কোচ পরিষ্কার ও মেরামতের শেড। নির্মাণ করা হয় বড় বহুমুখী স্টেশন ভবন। ব্যাংক, শুল্ক, ইমিগ্রেশনসহ বিভিন্ন সেবার জন্য প্রস্তুত করা হয় প্রয়োজনীয় অবকাঠামো।
কিন্তু অবকাঠামো প্রস্তুত হওয়ার পরও তার পূর্ণাঙ্গ ব্যবহার নিশ্চিত হয়নি।
আজ সেই ভবনের ভেতরে পড়ে আছে দামি আসবাব। যে কক্ষগুলোতে কর্মকর্তাদের ব্যস্ত থাকার কথা, সেখানে নীরবতা। যে রেস্তোরাঁয় যাত্রীদের ভিড় থাকার কথা, সেখানে ফাঁকা জায়গা। যে রেস্টহাউসে অতিথিদের থাকার কথা, সেটি তালাবদ্ধ। এতে কোটি কোটি টাকার বিনিয়োগ যেন এখন দাঁড়িয়ে আছে প্রশ্নবোধক চিহ্ন হয়ে।
স্থলবন্দর বন্ধ হওয়ার প্রভাব শুধু ব্যবসা-বাণিজনেই পড়েনি, রেলওয়ের আয়েও পড়েছে বড় ধাক্কা।
পণ্য পরিবহনের সময় প্রতিটি চালানে পাথরের পরিমাণ অনুযায়ী রেল কর্তৃপক্ষ ভাড়া বাবদ প্রায় ২০ থেকে ২৬ লাখ টাকা আয় করত। মাসে চার-পাঁচটি ট্রেন চলাচল করায় আয় দাঁড়াত প্রায় এক থেকে দেড় কোটি টাকা। তবে পণ্যবাহী ট্রেন বন্ধ হওয়ার পর সেই আয় আর নেই।
চিলাহাটি স্টেশনের আয়-ব্যয়ের হিসাবেও তার প্রতিফলন দেখা যায়। ২০২৩ সালের জুলাইয়ে স্টেশনটির আয় ছিল প্রায় ৮০ লাখ টাকা। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে সেই আয় কমে দাঁড়ায় প্রায় ৩৫ লাখ টাকায়। অর্থাৎ মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে আয় নেমে এসেছে অর্ধেকেরও নিচে।
স্টেশনে দুজন স্টেশন মাস্টারসহ ৫০ জনের বেশি কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছেন। কিন্তু আন্তর্জাতিক পণ্য ও যাত্রী পরিবহন বন্ধ থাকায় তাঁদের কর্মব্যস্ততাও আগের তুলনায় অনেক কমেছে।
চিলাহাটি স্থলবন্দর যখন সচল ছিল, তখন সীমান্ত এলাকায় দেখা দিয়েছিল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের নতুন সাড়া।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, পণ্য পরিবহনের সময় শ্রমিক, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট, পরিবহনকর্মী ও ব্যবসায়ীদের আনাগোনা ছিল নিয়মিত। তাঁদের ঘিরে স্থানীয়ভাবে ছোট-বড় নানা ব্যবসা গড়ে উঠছিল। বাড়ছিল জমির দাম। অনেকেই বন্দরকেন্দ্রিক ব্যবসা-বাণিজ্যে বিনিয়োগের পরিকল্পনা করেছিলেন। কার্যক্রম বন্ধ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই সম্ভাবনাও ম্লান হয়ে যায়।
স্থানীয় ব্যবসায়ী তোজাম্মেল হোসেনের ভাষায়, পণ্য আনা-নেওয়া শুরু হলে দরিদ্র মানুষের জন্য কিছু কাজের সুযোগ তৈরি হয়েছিল। স্থলবন্দর বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর তাঁদের অনেকেই কাজ হারিয়েছেন।
একটি স্থলবন্দর শুধু কাস্টমসের গেট কিংবা রেললাইন নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একটি এলাকার মানুষের জীবন-জীবিকা। চিলাহাটির ক্ষেত্রে সেই বাস্তবতাই এখন সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান।
স্থানীয় ব্যবসায়ীদের দীর্ঘদিনের দাবি—চিলাহাটি স্থলবন্দর পুনরায় চালু করা হোক। তাঁদের মতে, এটি শুধু ভারত-বাংলাদেশ বাণিজ্যের একটি পথ নয়; উত্তরাঞ্চলের জন্য এটি হতে পারে বহুমাত্রিক বাণিজ্যিক সম্ভাবনার দ্বার।
নীলফামারী চেম্বারের সাবেক সভাপতি মো. আবদুল ওয়াহেদ মনে করেন, চিলাহাটি দিয়ে পাথর সৈয়দপুরসহ উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় তুলনামূলক কম খরচে আনা সম্ভব। বর্তমানে পঞ্চগড় হয়ে ট্রাকে পাথর আনতে পরিবহন ব্যয় বেড়ে যায়।
তাঁর মতে, স্থলবন্দর বন্ধ থাকায় সাধারণ মানুষ, ব্যবসায়ী ও সরকার—সব পক্ষই ক্ষতির মুখে পড়ছে। উত্তরাঞ্চলের মানুষের স্বার্থে দ্রুত বন্দরটি চালু করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশ স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মানজারুল মান্নানের বক্তব্য, আপাতত স্থলবন্দরটি চালু হচ্ছে না। এটি চালু করতে বাংলাদেশ ও ভারত—দুই দেশের সম্মতি প্রয়োজন। এ জন্য উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক হস্তক্ষেপও প্রয়োজন।
অর্থাৎ চিলাহাটি আবার প্রাণ ফিরে পাবে কি না, তা এখন কেবল স্থানীয় মানুষের চাওয়ার ওপর নির্ভর করছে না। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে দুই দেশের নীতিগত সিদ্ধান্ত, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং কূটনৈতিক সমন্বয়।
তবে প্রশ্ন থেকেই যায়—যদি স্থলবন্দরটি দীর্ঘদিন চালু রাখার পরিকল্পনা না থাকে, তাহলে কেন এত বিপুল অর্থ ব্যয়ে এত বড় অবকাঠামো তৈরি করা হলো? আর যদি চালু করার সম্ভাবনা থাকে, তাহলে প্রস্তুত থাকা অবকাঠামোগুলো কেন বছরের পর বছর অব্যবহৃত থাকবে?
চিলাহাটি সীমান্তে আজ তাই শুধু একটি বন্ধ বন্দর পড়ে নেই। পড়ে আছে মানুষের প্রত্যাশা, ব্যবসায়ীদের বিনিয়োগের স্বপ্ন, শ্রমিকের কর্মসংস্থানের আশা এবং রাষ্ট্রের বিপুল অর্থের বিনিয়োগ।
দামি চেয়ার-টেবিলে ধুলো জমছে। তালাবদ্ধ রেস্টহাউস নীরবে দাঁড়িয়ে আছে। সীমান্তের রেললাইনে মরিচা পড়ছে। অথচ এই পথেই একদিন আবার ট্রেনের হুইসেল বাজতে পারে—জাগতে পারে ঘুমিয়ে থাকা জনপদ।
প্রশ্ন শুধু সেটুকুই—চিলাহাটির এই কোটি টাকার স্বপ্ন কি আবার জেগে উঠবে, নাকি ইতিহাসের পাতায় আরেকটি অপূর্ণ প্রকল্পের নাম হয়ে থাকবে?

মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৭ আগস্ট ২০২৬
সীমান্তের কাছে দাঁড়িয়ে থাকা বিশাল ভবনটি দূর থেকেই নজর কাড়ে। আধুনিক স্থাপত্যের ছোঁয়ায় নির্মিত ভবনটির দিকে তাকালে মনে হয়, এখানে নিশ্চয়ই প্রতিদিন মানুষের পদচারণায় মুখর থাকার কথা। ট্রেনের হুইসেল, যাত্রীদের ব্যস্ততা, ব্যবসায়ীদের ছোটাছুটি, পণ্য ওঠানামা আর কাস্টমস-ইমিগ্রেশনের কর্মচাঞ্চল্যে সীমান্তজুড়ে থাকার কথা কর্মব্যস্ততার আবহ।
কাছে গেলেই চোখে পড়ে নীরবতার এক দীর্ঘ ছবি। বারান্দায় সারি সারি ফ্যান, অথচ বহুদিন ধরে সেগুলো ঘোরে না। জানালা দিয়ে দেখা যায় প্যাকেটবন্দী চেয়ার-টেবিল, স্টিলের টুল ও অন্যান্য আসবাব। সময়ের সঙ্গে সেগুলোর গায়ে জমেছে ধুলোর পুরু আস্তরণ। দ্বিতীয় তলায় ব্যাংক ও শুল্ক কর্মকর্তাদের জন্য তৈরি কক্ষগুলো পড়ে আছে খালি। তৃতীয় তলায় রেস্তোরাঁর জন্য রাখা জায়গাটিও নিঃসঙ্গ। পাশে থাকা দোতলা ভিআইপি রেস্টহাউসের দরজায় ঝুলছে তালা।
নীলফামারীর ডোমার উপজেলার চিলাহাটি সীমান্তে প্রায় ১৩০ কোটি টাকা ব্যয়ে গড়ে তোলা রেল অবকাঠামোর বর্তমান চিত্র এমনই। স্থলবন্দরকে কেন্দ্র করে যে বিপুল কর্মযজ্ঞ, ব্যবসা-বাণিজ্য ও যোগাযোগের স্বপ্ন দেখেছিল উত্তরাঞ্চলের মানুষ, সেই স্বপ্ন এখন অনেকটাই থমকে আছে। শুধু ভবন নয়, ওভারব্রিজ, যাত্রীছাউনি, গার্ডরুম এবং সীমান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত রেললাইনও যেন অপেক্ষা করছে ফিরে আসার সেই ব্যস্ত দিনের।
চিলাহাটি থেকে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কোচবিহার জেলার হলদিবাড়ী। দুই ভূখণ্ডকে যুক্ত করা এই রেলপথের ইতিহাস বেশ পুরোনো। ব্রিটিশ আমলে এই পথ ছিল যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। কিন্তু ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধের পর বন্ধ হয়ে যায় রেল যোগাযোগ। এরপর কেটে যায় অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময়।
২০১৩ সালে চিলাহাটিকে স্থলবন্দর ঘোষণা করে বাংলাদেশ সরকার। তবে বাস্তবে বন্দরটির কার্যক্রম শুরু হতে আরও প্রায় এক দশক সময় লাগে। দীর্ঘ অপেক্ষার পর দুই দেশের উদ্যোগে আবারও খুলে যায় পুরোনো রেলপথের দুয়ার।
২০১৯ সালে চিলাহাটি স্টেশন থেকে সীমান্ত পর্যন্ত ব্রডগেজ রেলপথ নির্মাণের কাজ শুরু হয়। অবকাঠামো তৈরির পর ২০২১ সালের ১ আগস্ট ভারত থেকে পণ্যবাহী ট্রেন চলাচল শুরু করে। পরের বছর চালু হয় ঢাকা-নিউ জলপাইগুড়ি রুটের আন্তদেশীয় যাত্রীবাহী ট্রেন ‘মিতালি এক্সপ্রেস’।
সেই সময় চিলাহাটি ও আশপাশের এলাকায় তৈরি হয়েছিল নতুন এক স্বপ্ন। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা ভেবেছিলেন, সীমান্ত দিয়ে পণ্য আসবে, যাবে; নতুন ব্যবসা গড়ে উঠবে; শ্রমিকের কাজ বাড়বে; পরিবহন, হোটেল, রেস্তোরাঁসহ নানা খাতে তৈরি হবে কর্মসংস্থান।
একটি সীমান্ত জনপদ ঘিরে যেন নতুন অর্থনৈতিক ভোরের অপেক্ষা শুরু হয়েছিল।তারপর হঠাৎ থেমে গেল সব, সেই ভোর বেশিদিন স্থায়ী হয়নি।
২০২৪ সালের মে মাসে ভারতে পাথরের দাম বেড়ে যাওয়ায় পণ্য পরিবহন কমতে শুরু করে। একপর্যায়ে পাথরবাহী ট্রেনের চলাচল পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। এরপর ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বন্ধ হয়ে যায় যাত্রীবাহী ট্রেনের চলাচলও।
চিলাহাটি স্টেশন মাস্টার রুহুল আমিনের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২১ সাল থেকে মূলত ভারত থেকে পাথরবোঝাই ট্রেন বাংলাদেশে আসত। মাসে চার থেকে পাঁচটি মালবাহী ট্রেন চলাচল করত। পণ্য পরিবহন বন্ধ হয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে স্থলবন্দরকেন্দ্রিক ব্যস্ততাও কমতে থাকে।
অবশেষে ২০২৫ সালের আগস্টে অবকাঠামো না থাকার যুক্তিতে প্রজ্ঞাপন জারি করে স্থলবন্দরটি বন্ধ ঘোষণা করা হয়।
ফলে যে অবকাঠামো চালু রাখার জন্য কোটি কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছিল, তা ব্যবহারের সুযোগই অনেকটা হারিয়ে যায়।
বাংলাদেশ রেলওয়ের ‘চিলাহাটি ও চিলাহাটি বর্ডার রেলপথ নির্মাণ’ প্রকল্পের ব্যয় শুরুতে ধরা হয়েছিল প্রায় ৮০ কোটি টাকা। পরে বিভিন্ন ধাপে ব্যয় বাড়তে বাড়তে প্রকল্পটি শেষ হয় প্রায় ১২৮ কোটি টাকা ব্যয়ে।
প্রকল্প পরিচালক মো. আবদুর রহিমের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুনে প্রকল্পের কাজ শেষ হয়। রেলের ওয়াগন, রাস্তা, বিদ্যুৎসহ আনুষঙ্গিক খাত যুক্ত করলে মোট ব্যয় প্রায় ২০০ কোটি টাকায় দাঁড়ায়।
এই বিপুল অর্থ ব্যয়ে স্টেশনের রেললাইন বাড়ানো হয়, নির্মাণ করা হয় প্ল্যাটফর্ম ও ফুটওভারব্রিজ। তৈরি হয় রেল কোচ পরিষ্কার ও মেরামতের শেড। নির্মাণ করা হয় বড় বহুমুখী স্টেশন ভবন। ব্যাংক, শুল্ক, ইমিগ্রেশনসহ বিভিন্ন সেবার জন্য প্রস্তুত করা হয় প্রয়োজনীয় অবকাঠামো।
কিন্তু অবকাঠামো প্রস্তুত হওয়ার পরও তার পূর্ণাঙ্গ ব্যবহার নিশ্চিত হয়নি।
আজ সেই ভবনের ভেতরে পড়ে আছে দামি আসবাব। যে কক্ষগুলোতে কর্মকর্তাদের ব্যস্ত থাকার কথা, সেখানে নীরবতা। যে রেস্তোরাঁয় যাত্রীদের ভিড় থাকার কথা, সেখানে ফাঁকা জায়গা। যে রেস্টহাউসে অতিথিদের থাকার কথা, সেটি তালাবদ্ধ। এতে কোটি কোটি টাকার বিনিয়োগ যেন এখন দাঁড়িয়ে আছে প্রশ্নবোধক চিহ্ন হয়ে।
স্থলবন্দর বন্ধ হওয়ার প্রভাব শুধু ব্যবসা-বাণিজনেই পড়েনি, রেলওয়ের আয়েও পড়েছে বড় ধাক্কা।
পণ্য পরিবহনের সময় প্রতিটি চালানে পাথরের পরিমাণ অনুযায়ী রেল কর্তৃপক্ষ ভাড়া বাবদ প্রায় ২০ থেকে ২৬ লাখ টাকা আয় করত। মাসে চার-পাঁচটি ট্রেন চলাচল করায় আয় দাঁড়াত প্রায় এক থেকে দেড় কোটি টাকা। তবে পণ্যবাহী ট্রেন বন্ধ হওয়ার পর সেই আয় আর নেই।
চিলাহাটি স্টেশনের আয়-ব্যয়ের হিসাবেও তার প্রতিফলন দেখা যায়। ২০২৩ সালের জুলাইয়ে স্টেশনটির আয় ছিল প্রায় ৮০ লাখ টাকা। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে সেই আয় কমে দাঁড়ায় প্রায় ৩৫ লাখ টাকায়। অর্থাৎ মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে আয় নেমে এসেছে অর্ধেকেরও নিচে।
স্টেশনে দুজন স্টেশন মাস্টারসহ ৫০ জনের বেশি কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছেন। কিন্তু আন্তর্জাতিক পণ্য ও যাত্রী পরিবহন বন্ধ থাকায় তাঁদের কর্মব্যস্ততাও আগের তুলনায় অনেক কমেছে।
চিলাহাটি স্থলবন্দর যখন সচল ছিল, তখন সীমান্ত এলাকায় দেখা দিয়েছিল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের নতুন সাড়া।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, পণ্য পরিবহনের সময় শ্রমিক, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট, পরিবহনকর্মী ও ব্যবসায়ীদের আনাগোনা ছিল নিয়মিত। তাঁদের ঘিরে স্থানীয়ভাবে ছোট-বড় নানা ব্যবসা গড়ে উঠছিল। বাড়ছিল জমির দাম। অনেকেই বন্দরকেন্দ্রিক ব্যবসা-বাণিজ্যে বিনিয়োগের পরিকল্পনা করেছিলেন। কার্যক্রম বন্ধ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই সম্ভাবনাও ম্লান হয়ে যায়।
স্থানীয় ব্যবসায়ী তোজাম্মেল হোসেনের ভাষায়, পণ্য আনা-নেওয়া শুরু হলে দরিদ্র মানুষের জন্য কিছু কাজের সুযোগ তৈরি হয়েছিল। স্থলবন্দর বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর তাঁদের অনেকেই কাজ হারিয়েছেন।
একটি স্থলবন্দর শুধু কাস্টমসের গেট কিংবা রেললাইন নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একটি এলাকার মানুষের জীবন-জীবিকা। চিলাহাটির ক্ষেত্রে সেই বাস্তবতাই এখন সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান।
স্থানীয় ব্যবসায়ীদের দীর্ঘদিনের দাবি—চিলাহাটি স্থলবন্দর পুনরায় চালু করা হোক। তাঁদের মতে, এটি শুধু ভারত-বাংলাদেশ বাণিজ্যের একটি পথ নয়; উত্তরাঞ্চলের জন্য এটি হতে পারে বহুমাত্রিক বাণিজ্যিক সম্ভাবনার দ্বার।
নীলফামারী চেম্বারের সাবেক সভাপতি মো. আবদুল ওয়াহেদ মনে করেন, চিলাহাটি দিয়ে পাথর সৈয়দপুরসহ উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় তুলনামূলক কম খরচে আনা সম্ভব। বর্তমানে পঞ্চগড় হয়ে ট্রাকে পাথর আনতে পরিবহন ব্যয় বেড়ে যায়।
তাঁর মতে, স্থলবন্দর বন্ধ থাকায় সাধারণ মানুষ, ব্যবসায়ী ও সরকার—সব পক্ষই ক্ষতির মুখে পড়ছে। উত্তরাঞ্চলের মানুষের স্বার্থে দ্রুত বন্দরটি চালু করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশ স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মানজারুল মান্নানের বক্তব্য, আপাতত স্থলবন্দরটি চালু হচ্ছে না। এটি চালু করতে বাংলাদেশ ও ভারত—দুই দেশের সম্মতি প্রয়োজন। এ জন্য উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক হস্তক্ষেপও প্রয়োজন।
অর্থাৎ চিলাহাটি আবার প্রাণ ফিরে পাবে কি না, তা এখন কেবল স্থানীয় মানুষের চাওয়ার ওপর নির্ভর করছে না। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে দুই দেশের নীতিগত সিদ্ধান্ত, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং কূটনৈতিক সমন্বয়।
তবে প্রশ্ন থেকেই যায়—যদি স্থলবন্দরটি দীর্ঘদিন চালু রাখার পরিকল্পনা না থাকে, তাহলে কেন এত বিপুল অর্থ ব্যয়ে এত বড় অবকাঠামো তৈরি করা হলো? আর যদি চালু করার সম্ভাবনা থাকে, তাহলে প্রস্তুত থাকা অবকাঠামোগুলো কেন বছরের পর বছর অব্যবহৃত থাকবে?
চিলাহাটি সীমান্তে আজ তাই শুধু একটি বন্ধ বন্দর পড়ে নেই। পড়ে আছে মানুষের প্রত্যাশা, ব্যবসায়ীদের বিনিয়োগের স্বপ্ন, শ্রমিকের কর্মসংস্থানের আশা এবং রাষ্ট্রের বিপুল অর্থের বিনিয়োগ।
দামি চেয়ার-টেবিলে ধুলো জমছে। তালাবদ্ধ রেস্টহাউস নীরবে দাঁড়িয়ে আছে। সীমান্তের রেললাইনে মরিচা পড়ছে। অথচ এই পথেই একদিন আবার ট্রেনের হুইসেল বাজতে পারে—জাগতে পারে ঘুমিয়ে থাকা জনপদ।
প্রশ্ন শুধু সেটুকুই—চিলাহাটির এই কোটি টাকার স্বপ্ন কি আবার জেগে উঠবে, নাকি ইতিহাসের পাতায় আরেকটি অপূর্ণ প্রকল্পের নাম হয়ে থাকবে?

আপনার মতামত লিখুন