কেরাণীগঞ্জে কিশোরীকে গলা কেটে হত্যা: ২৪ ঘণ্টায় প্রেমিক গ্রেপ্তার, উদ্ধার হত্যার অস্ত্র
ঢাকার কেরাণীগঞ্জে ১৭ বছর বয়সী কিশোরী মোসা. তানজিলাকে গলা কেটে হত্যার চাঞ্চল্যকর ঘটনার মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই রহস্য উদ্ঘাটন করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) ঢাকা জেলা। প্রযুক্তিনির্ভর তদন্ত, মোবাইল ফোনের কল রেকর্ড, লোকেশন ট্র্যাকিং, গোয়েন্দা তথ্য এবং ঘটনাস্থল থেকে সংগ্রহ করা আলামত বিশ্লেষণ করে নিহতের প্রেমিক মো. রানা হাওলাদারকে (৩০) গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
গ্রেপ্তারের পর তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত ফল কাটার চাকু, নিহতের দুটি স্মার্টফোন, একটি রূপার চেইন ও একটি রূপার ব্রেসলেট উদ্ধার করা হয়েছে। পরে আদালতে হাজির করা হলে অভিযুক্ত ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বেচ্ছায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।
বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) পিবিআই ঢাকা জেলা কার্যালয় থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়।
পিবিআই জানায়, গত ২৭ জুলাই দুপুরে দক্ষিণ কেরাণীগঞ্জের বাঘৈর এলাকার নিজ বাড়ি থেকে বের হয়ে তানজিলা তার খালার বাসায় যান। সেখানে দুপুরের খাবার খেয়ে বিকেল ৪টার দিকে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দেন। কিন্তু এরপর থেকেই তিনি নিখোঁজ ছিলেন। পরিবারের সদস্যরা সম্ভাব্য সব স্থানে খোঁজাখুঁজি করেও তার কোনো সন্ধান পাননি।
পরদিন ২৮ জুলাই সকালে কেরাণীগঞ্জ মডেল থানার কালিন্দী ইউনিয়নের মদিনানগর এলাকার একটি নির্জন প্লটের ভেতর গলাকাটা অবস্থায় এক কিশোরীর মরদেহ দেখতে পান স্থানীয়রা। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুত করে। পরে নিহতের মা নাসলিমা বেগম মরদেহটি তার মেয়ের বলে শনাক্ত করেন। ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহটি হাসপাতালে পাঠানো হয়।
ঘটনার পর নিহতের মা নাসলিমা বেগম বাদী হয়ে কেরাণীগঞ্জ মডেল থানায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে হত্যা মামলা দায়ের করেন।
ঘটনার গুরুত্ব বিবেচনায় পিবিআই ঢাকা জেলা ২৯ জুলাই স্বপ্রণোদিত হয়ে মামলার তদন্তভার গ্রহণ করে। অতিরিক্ত আইজিপি মো. মোস্তফা কামালের সার্বিক দিকনির্দেশনায় এবং পিবিআই ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার এম. এন. মোর্শেদ, পিপিএম-এর তত্ত্বাবধানে তদন্ত শুরু হয়।
তদন্তের অংশ হিসেবে ঘটনাস্থল থেকে আলামত সংগ্রহ, সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ, মোবাইল ফোনের কল ডিটেইলস রেকর্ড (সিডিআর), লোকেশন ট্র্যাকিং এবং গোয়েন্দা তথ্য পর্যালোচনা করে তদন্তকারীরা দ্রুত হত্যার সূত্র খুঁজে পান।
এসব তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণের ভিত্তিতে দক্ষিণ কেরাণীগঞ্জের রাজেন্দ্রপুর এলাকা থেকে প্রধান অভিযুক্ত মো. রানা হাওলাদারকে গ্রেপ্তার করা হয়। তিনি পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলার চিকনকান্দি গ্রামের জাহাঙ্গীর হোসেনের ছেলে। দীর্ঘদিন ধরে কেরাণীগঞ্জ এলাকায় অটোরিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছিলেন।
পিবিআইয়ের তদন্তে জানা গেছে, প্রায় ছয় থেকে সাত মাস ধরে রানা ও তানজিলার মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক ছিল। সম্প্রতি অর্থ লেনদেনকে কেন্দ্র করে তাদের মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়। তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য, তানজিলা রানার কাছে প্রায় ৩০ হাজার টাকা দাবি করেছিলেন। সেই টাকা দিতে না পারায় তাদের সম্পর্কের অবনতি ঘটে।
ঘটনার দিন বিকেলে রানা নিজের অটোরিকশায় করে তানজিলাকে ঘুরতে নিয়ে যান। পরে কালিন্দী ইউনিয়নের মদিনানগর এলাকায় শরিফ ফুড পার্কের বিপরীত পাশে একটি নির্জন স্থানে নিয়ে গেলে তাদের মধ্যে আবারও তীব্র বাকবিতণ্ডা শুরু হয়। একপর্যায়ে রাগের বশে রানা প্রথমে তানজিলার গলা চেপে ধরেন। পরে সঙ্গে থাকা একটি ফল কাটার চাকু দিয়ে তার গলা কেটে মৃত্যু নিশ্চিত করেন বলে জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করেছেন।
হত্যাকাণ্ডের পর ঘটনাটি ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার উদ্দেশ্যে রানা নিহতের ব্যবহৃত দুটি স্মার্টফোন, একটি রূপার চেইন ও একটি রূপার ব্রেসলেট নিয়ে ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন। পরে মোবাইল ফোন দুটি নিজের বাসার পাশের খড়ের গাদায় লুকিয়ে রাখেন এবং রূপার অলংকার নিজের কাছেই সংরক্ষণ করেন। গ্রেপ্তারের পর তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পিবিআই এসব আলামত উদ্ধার করে জব্দ করে।
গ্রেপ্তারের পর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে রানা হত্যাকাণ্ডে নিজের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেন। পরবর্তীতে তাকে আদালতে হাজির করা হলে তিনি ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বেচ্ছায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান করেন।
পিবিআই ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার এম. এন. মোর্শেদ, পিপিএম বলেন, ঘটনার সংবাদ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই পিবিআইয়ের ক্রাইম সিন টিম ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে এবং সমন্বিতভাবে তদন্ত শুরু করে। তথ্যপ্রযুক্তি, গোয়েন্দা তথ্য ও মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধানের সমন্বয়ে মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যে মূল অভিযুক্তকে শনাক্ত ও গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে অন্য কোনো ব্যক্তি জড়িত ছিল কি না, সেটিও গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। মামলার তদন্ত এখনো চলমান রয়েছে এবং তদন্তের স্বার্থে প্রয়োজনীয় সব বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, উদ্ধার হওয়া আলামত, ফরেনসিক পরীক্ষার প্রতিবেদন, ময়নাতদন্ত রিপোর্ট এবং অন্যান্য প্রযুক্তিগত তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহের মাধ্যমে মামলাটি আরও শক্তিশালী করা হচ্ছে। তদন্ত শেষে আদালতে পূর্ণাঙ্গ চার্জশিট দাখিল করা হবে।

মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ৩০ জুলাই ২০২৬
কেরাণীগঞ্জে কিশোরীকে গলা কেটে হত্যা: ২৪ ঘণ্টায় প্রেমিক গ্রেপ্তার, উদ্ধার হত্যার অস্ত্র
ঢাকার কেরাণীগঞ্জে ১৭ বছর বয়সী কিশোরী মোসা. তানজিলাকে গলা কেটে হত্যার চাঞ্চল্যকর ঘটনার মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই রহস্য উদ্ঘাটন করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) ঢাকা জেলা। প্রযুক্তিনির্ভর তদন্ত, মোবাইল ফোনের কল রেকর্ড, লোকেশন ট্র্যাকিং, গোয়েন্দা তথ্য এবং ঘটনাস্থল থেকে সংগ্রহ করা আলামত বিশ্লেষণ করে নিহতের প্রেমিক মো. রানা হাওলাদারকে (৩০) গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
গ্রেপ্তারের পর তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত ফল কাটার চাকু, নিহতের দুটি স্মার্টফোন, একটি রূপার চেইন ও একটি রূপার ব্রেসলেট উদ্ধার করা হয়েছে। পরে আদালতে হাজির করা হলে অভিযুক্ত ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বেচ্ছায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।
বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) পিবিআই ঢাকা জেলা কার্যালয় থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়।
পিবিআই জানায়, গত ২৭ জুলাই দুপুরে দক্ষিণ কেরাণীগঞ্জের বাঘৈর এলাকার নিজ বাড়ি থেকে বের হয়ে তানজিলা তার খালার বাসায় যান। সেখানে দুপুরের খাবার খেয়ে বিকেল ৪টার দিকে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দেন। কিন্তু এরপর থেকেই তিনি নিখোঁজ ছিলেন। পরিবারের সদস্যরা সম্ভাব্য সব স্থানে খোঁজাখুঁজি করেও তার কোনো সন্ধান পাননি।
পরদিন ২৮ জুলাই সকালে কেরাণীগঞ্জ মডেল থানার কালিন্দী ইউনিয়নের মদিনানগর এলাকার একটি নির্জন প্লটের ভেতর গলাকাটা অবস্থায় এক কিশোরীর মরদেহ দেখতে পান স্থানীয়রা। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুত করে। পরে নিহতের মা নাসলিমা বেগম মরদেহটি তার মেয়ের বলে শনাক্ত করেন। ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহটি হাসপাতালে পাঠানো হয়।
ঘটনার পর নিহতের মা নাসলিমা বেগম বাদী হয়ে কেরাণীগঞ্জ মডেল থানায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে হত্যা মামলা দায়ের করেন।
ঘটনার গুরুত্ব বিবেচনায় পিবিআই ঢাকা জেলা ২৯ জুলাই স্বপ্রণোদিত হয়ে মামলার তদন্তভার গ্রহণ করে। অতিরিক্ত আইজিপি মো. মোস্তফা কামালের সার্বিক দিকনির্দেশনায় এবং পিবিআই ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার এম. এন. মোর্শেদ, পিপিএম-এর তত্ত্বাবধানে তদন্ত শুরু হয়।
তদন্তের অংশ হিসেবে ঘটনাস্থল থেকে আলামত সংগ্রহ, সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ, মোবাইল ফোনের কল ডিটেইলস রেকর্ড (সিডিআর), লোকেশন ট্র্যাকিং এবং গোয়েন্দা তথ্য পর্যালোচনা করে তদন্তকারীরা দ্রুত হত্যার সূত্র খুঁজে পান।
এসব তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণের ভিত্তিতে দক্ষিণ কেরাণীগঞ্জের রাজেন্দ্রপুর এলাকা থেকে প্রধান অভিযুক্ত মো. রানা হাওলাদারকে গ্রেপ্তার করা হয়। তিনি পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলার চিকনকান্দি গ্রামের জাহাঙ্গীর হোসেনের ছেলে। দীর্ঘদিন ধরে কেরাণীগঞ্জ এলাকায় অটোরিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছিলেন।
পিবিআইয়ের তদন্তে জানা গেছে, প্রায় ছয় থেকে সাত মাস ধরে রানা ও তানজিলার মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক ছিল। সম্প্রতি অর্থ লেনদেনকে কেন্দ্র করে তাদের মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়। তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য, তানজিলা রানার কাছে প্রায় ৩০ হাজার টাকা দাবি করেছিলেন। সেই টাকা দিতে না পারায় তাদের সম্পর্কের অবনতি ঘটে।
ঘটনার দিন বিকেলে রানা নিজের অটোরিকশায় করে তানজিলাকে ঘুরতে নিয়ে যান। পরে কালিন্দী ইউনিয়নের মদিনানগর এলাকায় শরিফ ফুড পার্কের বিপরীত পাশে একটি নির্জন স্থানে নিয়ে গেলে তাদের মধ্যে আবারও তীব্র বাকবিতণ্ডা শুরু হয়। একপর্যায়ে রাগের বশে রানা প্রথমে তানজিলার গলা চেপে ধরেন। পরে সঙ্গে থাকা একটি ফল কাটার চাকু দিয়ে তার গলা কেটে মৃত্যু নিশ্চিত করেন বলে জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করেছেন।
হত্যাকাণ্ডের পর ঘটনাটি ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার উদ্দেশ্যে রানা নিহতের ব্যবহৃত দুটি স্মার্টফোন, একটি রূপার চেইন ও একটি রূপার ব্রেসলেট নিয়ে ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন। পরে মোবাইল ফোন দুটি নিজের বাসার পাশের খড়ের গাদায় লুকিয়ে রাখেন এবং রূপার অলংকার নিজের কাছেই সংরক্ষণ করেন। গ্রেপ্তারের পর তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পিবিআই এসব আলামত উদ্ধার করে জব্দ করে।
গ্রেপ্তারের পর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে রানা হত্যাকাণ্ডে নিজের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেন। পরবর্তীতে তাকে আদালতে হাজির করা হলে তিনি ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বেচ্ছায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান করেন।
পিবিআই ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার এম. এন. মোর্শেদ, পিপিএম বলেন, ঘটনার সংবাদ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই পিবিআইয়ের ক্রাইম সিন টিম ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে এবং সমন্বিতভাবে তদন্ত শুরু করে। তথ্যপ্রযুক্তি, গোয়েন্দা তথ্য ও মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধানের সমন্বয়ে মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যে মূল অভিযুক্তকে শনাক্ত ও গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে অন্য কোনো ব্যক্তি জড়িত ছিল কি না, সেটিও গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। মামলার তদন্ত এখনো চলমান রয়েছে এবং তদন্তের স্বার্থে প্রয়োজনীয় সব বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, উদ্ধার হওয়া আলামত, ফরেনসিক পরীক্ষার প্রতিবেদন, ময়নাতদন্ত রিপোর্ট এবং অন্যান্য প্রযুক্তিগত তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহের মাধ্যমে মামলাটি আরও শক্তিশালী করা হচ্ছে। তদন্ত শেষে আদালতে পূর্ণাঙ্গ চার্জশিট দাখিল করা হবে।

আপনার মতামত লিখুন