জমি, অনুমোদন ও জনবল আছে, নেই শুধু হাসপাতাল ভবন। ফলে কাগজে-কলমে সৈয়দপুর ৩১ শয্যার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স হলেও বাস্তবে এর কার্যক্রম চলছে সৈয়দপুর পৌর নগর স্বাস্থ্যকেন্দ্রের কয়েকটি কক্ষে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, উপজেলার কাশিরাম বেলপুকুর ইউনিয়ন সংলগ্ন এলাকায় স্থানীয় বাসিন্দা ধনির উদ্দিন দানপত্রের মাধ্যমে সরকারকে ৪ একর ২০ শতক জমি দান করেন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স নির্মাণের জন্য। মানুষের চিকিৎসাসেবার স্বপ্ন নিয়ে দেওয়া সেই জমিতে হাসপাতাল গড়ে ওঠার কথা ছিল। কিন্তু ২০০৩ সালে জমি পাওয়ার পরও আজ পর্যন্ত খারিজ সম্পন্ন হয়নি। ফলে দীর্ঘ ২৩ বছরেও হাসপাতালের নিজস্ব ভবন নির্মাণের কাজ শুরু করা যায়নি।
সরেজমিনে দেখা যায়, সৈয়দপুর পৌর নগর স্বাস্থ্যকেন্দ্রের কয়েকটি কক্ষেই উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তার কার্যালয়, পরিবার পরিকল্পনা, মাতৃস্বাস্থ্য, টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) ও প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। অথচ একটি ৩১ শয্যার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যেখানে জরুরি বিভাগ, ইনডোর ওয়ার্ড, প্রসূতি সেবা, অপারেশন থিয়েটার, ল্যাবরেটরি ও রোগী ভর্তির ব্যবস্থা থাকার কথা, সেখানে এসবের কোনো সুবিধাই নেই।
স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্রে জানা গেছে, এখানে বর্তমানে মোট ৮০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্মরত রয়েছেন। তাদের মধ্যে ২৬ জন সিনিয়র স্টাফ নার্স, ৪ জন মেডিকেল অফিসার, ১৪ জন হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার, ১১ জন টিকাদানকর্মী, একজন পরিসংখ্যানবিদ, একজন স্টোরকিপার, একজন অফিস সহকারী, একজন মালি এবং অন্যান্য পদে কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছেন। এর মধ্যে ১৭ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে প্রেষণে দায়িত্ব পালন করছেন।
অবকাঠামো না থাকায় কর্মস্থলে থাকা জনবলের বড় একটি অংশও তাদের দক্ষতা অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করতে পারছেন না। সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে ২৬ জন সিনিয়র স্টাফ নার্সের ওপর। ওয়ার্ড নেই, ভর্তি রোগী নেই, নেই অস্ত্রোপচারের প্রস্তুতি কিংবা ইনডোর সেবার ব্যস্ততা। ফলে রোগীর শয্যার পাশে থাকার জন্য প্রশিক্ষিত এই নার্সদের দক্ষতার বড় একটি অংশই অব্যবহৃত থেকে যাচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, দিনের একটি উল্লেখযোগ্য সময় তাদের কাজের অপেক্ষায় কাটে। স্বাস্থ্যসেবা বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি শুধু জনবলের অপচয় নয়, বরং রাষ্ট্রের বিনিয়োগ করা দক্ষ মানবসম্পদেরও অপূর্ণ ব্যবহার।
সৈয়দপুর উত্তরাঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রেলওয়ে শহর। এখানে রয়েছে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, রেলওয়ে কারখানা, শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও ব্যস্ত বাণিজ্যিক কেন্দ্র। প্রতিদিন হাজারো মানুষ চিকিৎসাসেবার জন্য এই শহরে আসেন। অথচ এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ উপজেলায় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের এই করুণ অবস্থা স্থানীয়দের হতাশ করেছে।
স্থানীয় সচেতন নাগরিকদের প্রশ্ন, জমি আছে, দানপত্র আছে, ৩১ শয্যার অনুমোদন আছে, ৮০ জন জনবলও রয়েছে—তাহলে ২৩ বছরেও একটি হাসপাতালের ভবন নির্মাণ হলো না কেন? শুধু একটি খারিজের কাজ শেষ করতে দুই দশকের বেশি সময় কেন লাগল? এই দীর্ঘসূত্রতার দায় কার?
এ বিষয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. শামসুন্নাহার বলেন, “উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে মোট ৮০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছেন। নিজস্ব ভবন না থাকায় পূর্ণাঙ্গ হাসপাতাল পরিচালনা সম্ভব হচ্ছে না। বর্তমানে ১৭ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে প্রেষণে দায়িত্ব পালন করছেন।”
তিনি আরও বলেন, “চিকিৎসক ও নার্সদের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণকারী দপ্তর আলাদা। তাই তাদের পদায়ন, প্রেষণ বা বদলির বিষয়ে উপজেলা পর্যায় থেকে অনেক কিছু করার সুযোগ নেই। এসব বিষয় সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তরের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পরিচালিত হয়।”
জমির বিষয়ে তিনি বলেন, “হাসপাতালের জন্য জমি অনেক আগে পাওয়া গেলেও এখনো খারিজ সম্পন্ন হয়নি। জমির খারিজ সম্পন্ন হলে ভবন নির্মাণের পথ সুগম হবে।”
এ বিষয়ে রংপুর বিভাগের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক (স্বাস্থ্য) ডা. ওয়াজেদ আলী বলেন, “বিষয়টি আমি এক সপ্তাহ আগে জেনেছি। প্রথমে ৪ একর ২০ শতক জমির খারিজ সম্পন্ন করার ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এরপর প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণের জন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে চাহিদাপত্র পাঠানো হবে।”
তিনি আরও বলেন, “খারিজ সম্পন্ন হলে ভবন নির্মাণের প্রক্রিয়া শুরু করা সহজ হবে। আমরা বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি।”
একটি হাসপাতাল শুধু চিকিৎসা দেয় না; এটি মানুষের জীবনে আশা জাগায়। প্রসূতি মায়ের নিরাপদ সন্তান জন্ম, দুর্ঘটনায় আহত মানুষের জরুরি চিকিৎসা, অসুস্থ শিশুর বেঁচে থাকার লড়াই—সবকিছুর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একটি হাসপাতাল। অথচ সৈয়দপুরে দান করা ৪ একর ২০ শতক জমি আজও নীরবে অপেক্ষা করছে সেই হাসপাতালের জন্য, যার স্বপ্ন দেখেছিলেন একজন দাতা এবং যার প্রতীক্ষায় আছেন কয়েক লাখ মানুষ।
২৩ বছর ধরে সেই অপেক্ষার শেষ হয়নি। খারিজের জট খুললেই হয়তো শুরু হবে ভবন নির্মাণের কাজ। ততদিন পর্যন্ত কাগজে-কলমে ৩১ শয্যার হাসপাতাল, ৮০ জন জনবল আর দান করা জমি—সবই যেন সৈয়দপুরবাসীর অপূর্ণ প্রত্যাশার এক নীরব প্রতীক হয়ে থাকবে।

মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২০ জুলাই ২০২৬
জমি, অনুমোদন ও জনবল আছে, নেই শুধু হাসপাতাল ভবন। ফলে কাগজে-কলমে সৈয়দপুর ৩১ শয্যার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স হলেও বাস্তবে এর কার্যক্রম চলছে সৈয়দপুর পৌর নগর স্বাস্থ্যকেন্দ্রের কয়েকটি কক্ষে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, উপজেলার কাশিরাম বেলপুকুর ইউনিয়ন সংলগ্ন এলাকায় স্থানীয় বাসিন্দা ধনির উদ্দিন দানপত্রের মাধ্যমে সরকারকে ৪ একর ২০ শতক জমি দান করেন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স নির্মাণের জন্য। মানুষের চিকিৎসাসেবার স্বপ্ন নিয়ে দেওয়া সেই জমিতে হাসপাতাল গড়ে ওঠার কথা ছিল। কিন্তু ২০০৩ সালে জমি পাওয়ার পরও আজ পর্যন্ত খারিজ সম্পন্ন হয়নি। ফলে দীর্ঘ ২৩ বছরেও হাসপাতালের নিজস্ব ভবন নির্মাণের কাজ শুরু করা যায়নি।
সরেজমিনে দেখা যায়, সৈয়দপুর পৌর নগর স্বাস্থ্যকেন্দ্রের কয়েকটি কক্ষেই উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তার কার্যালয়, পরিবার পরিকল্পনা, মাতৃস্বাস্থ্য, টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) ও প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। অথচ একটি ৩১ শয্যার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যেখানে জরুরি বিভাগ, ইনডোর ওয়ার্ড, প্রসূতি সেবা, অপারেশন থিয়েটার, ল্যাবরেটরি ও রোগী ভর্তির ব্যবস্থা থাকার কথা, সেখানে এসবের কোনো সুবিধাই নেই।
স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্রে জানা গেছে, এখানে বর্তমানে মোট ৮০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্মরত রয়েছেন। তাদের মধ্যে ২৬ জন সিনিয়র স্টাফ নার্স, ৪ জন মেডিকেল অফিসার, ১৪ জন হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার, ১১ জন টিকাদানকর্মী, একজন পরিসংখ্যানবিদ, একজন স্টোরকিপার, একজন অফিস সহকারী, একজন মালি এবং অন্যান্য পদে কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছেন। এর মধ্যে ১৭ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে প্রেষণে দায়িত্ব পালন করছেন।
অবকাঠামো না থাকায় কর্মস্থলে থাকা জনবলের বড় একটি অংশও তাদের দক্ষতা অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করতে পারছেন না। সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে ২৬ জন সিনিয়র স্টাফ নার্সের ওপর। ওয়ার্ড নেই, ভর্তি রোগী নেই, নেই অস্ত্রোপচারের প্রস্তুতি কিংবা ইনডোর সেবার ব্যস্ততা। ফলে রোগীর শয্যার পাশে থাকার জন্য প্রশিক্ষিত এই নার্সদের দক্ষতার বড় একটি অংশই অব্যবহৃত থেকে যাচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, দিনের একটি উল্লেখযোগ্য সময় তাদের কাজের অপেক্ষায় কাটে। স্বাস্থ্যসেবা বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি শুধু জনবলের অপচয় নয়, বরং রাষ্ট্রের বিনিয়োগ করা দক্ষ মানবসম্পদেরও অপূর্ণ ব্যবহার।
সৈয়দপুর উত্তরাঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রেলওয়ে শহর। এখানে রয়েছে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, রেলওয়ে কারখানা, শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও ব্যস্ত বাণিজ্যিক কেন্দ্র। প্রতিদিন হাজারো মানুষ চিকিৎসাসেবার জন্য এই শহরে আসেন। অথচ এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ উপজেলায় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের এই করুণ অবস্থা স্থানীয়দের হতাশ করেছে।
স্থানীয় সচেতন নাগরিকদের প্রশ্ন, জমি আছে, দানপত্র আছে, ৩১ শয্যার অনুমোদন আছে, ৮০ জন জনবলও রয়েছে—তাহলে ২৩ বছরেও একটি হাসপাতালের ভবন নির্মাণ হলো না কেন? শুধু একটি খারিজের কাজ শেষ করতে দুই দশকের বেশি সময় কেন লাগল? এই দীর্ঘসূত্রতার দায় কার?
এ বিষয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. শামসুন্নাহার বলেন, “উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে মোট ৮০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছেন। নিজস্ব ভবন না থাকায় পূর্ণাঙ্গ হাসপাতাল পরিচালনা সম্ভব হচ্ছে না। বর্তমানে ১৭ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে প্রেষণে দায়িত্ব পালন করছেন।”
তিনি আরও বলেন, “চিকিৎসক ও নার্সদের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণকারী দপ্তর আলাদা। তাই তাদের পদায়ন, প্রেষণ বা বদলির বিষয়ে উপজেলা পর্যায় থেকে অনেক কিছু করার সুযোগ নেই। এসব বিষয় সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তরের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পরিচালিত হয়।”
জমির বিষয়ে তিনি বলেন, “হাসপাতালের জন্য জমি অনেক আগে পাওয়া গেলেও এখনো খারিজ সম্পন্ন হয়নি। জমির খারিজ সম্পন্ন হলে ভবন নির্মাণের পথ সুগম হবে।”
এ বিষয়ে রংপুর বিভাগের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক (স্বাস্থ্য) ডা. ওয়াজেদ আলী বলেন, “বিষয়টি আমি এক সপ্তাহ আগে জেনেছি। প্রথমে ৪ একর ২০ শতক জমির খারিজ সম্পন্ন করার ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এরপর প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণের জন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে চাহিদাপত্র পাঠানো হবে।”
তিনি আরও বলেন, “খারিজ সম্পন্ন হলে ভবন নির্মাণের প্রক্রিয়া শুরু করা সহজ হবে। আমরা বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি।”
একটি হাসপাতাল শুধু চিকিৎসা দেয় না; এটি মানুষের জীবনে আশা জাগায়। প্রসূতি মায়ের নিরাপদ সন্তান জন্ম, দুর্ঘটনায় আহত মানুষের জরুরি চিকিৎসা, অসুস্থ শিশুর বেঁচে থাকার লড়াই—সবকিছুর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একটি হাসপাতাল। অথচ সৈয়দপুরে দান করা ৪ একর ২০ শতক জমি আজও নীরবে অপেক্ষা করছে সেই হাসপাতালের জন্য, যার স্বপ্ন দেখেছিলেন একজন দাতা এবং যার প্রতীক্ষায় আছেন কয়েক লাখ মানুষ।
২৩ বছর ধরে সেই অপেক্ষার শেষ হয়নি। খারিজের জট খুললেই হয়তো শুরু হবে ভবন নির্মাণের কাজ। ততদিন পর্যন্ত কাগজে-কলমে ৩১ শয্যার হাসপাতাল, ৮০ জন জনবল আর দান করা জমি—সবই যেন সৈয়দপুরবাসীর অপূর্ণ প্রত্যাশার এক নীরব প্রতীক হয়ে থাকবে।

আপনার মতামত লিখুন