জীবন কত দ্রুত রঙ বদলায়, তার নির্মম উদাহরণ তাপস চন্দ্র বিশ্বাস। একসময় সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানার পেইন্ট শপে অস্থায়ী শ্রমিক হিসেবে রঙের তুলিতে নতুন রূপ দিতেন রেলের যাত্রীবাহী কোচগুলোকে। তার হাতের নিপুণ ছোঁয়ায় ঝকঝকে হয়ে উঠত দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছুটে চলা অসংখ্য কোচ। প্রতিদিনের সেই কর্মব্যস্ত জীবনই ছিল তার পরিবারের স্বপ্ন, সন্তানের ভবিষ্যৎ আর সংসারের একমাত্র ভরসা। অথচ আজ সেই মানুষটিই বিছানায় শুয়ে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন। যে হাত একসময় রেলগাড়িকে রঙিন করত, সেই হাত আজ মানুষের সহমর্মিতার জন্য প্রসারিত।
নীলফামারীর সৈয়দপুর শহরের পুলিশ লাইন্স সাদ্দাম মোড় এলাকার বাসিন্দা তাপস চন্দ্র বিশ্বাসের বয়স মাত্র ৩৯ বছর। কিন্তু এই বয়সেই তিনি দীর্ঘ তিন বছর ধরে ন্যাসোফ্যারিঞ্জিয়াল ক্যান্সারের সঙ্গে কঠিন লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। দুরারোগ্য এই রোগ শুধু তার শরীরকেই ক্ষতবিক্ষত করেনি, ভেঙে দিয়েছে একটি স্বপ্নময় পরিবারের আর্থিক ভিত্তি, কেড়ে নিয়েছে স্বাভাবিক জীবনের সব আনন্দ।
তিন বছর আগে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন তাপস। প্রথমে তাকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর চিকিৎসকদের মুখে উচ্চারিত হয় ভয়ংকর সেই শব্দ—ক্যান্সার। মুহূর্তেই যেন অন্ধকার নেমে আসে পরিবারের জীবনে। উন্নত চিকিৎসার আশায় পরে তাকে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (সাবেক পিজি হাসপাতাল) নেওয়া হয়। সেখানে সহকারী অধ্যাপক ডা. আব্দুল্লাহ আল-মামুনের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসা শুরু হলেও রেডিওথেরাপি মেশিন বিকল থাকায় তাকে আহ্ছানিয়া মিশন ক্যান্সার ও জেনারেল হাসপাতালে পাঠানো হয়। বর্তমানে হাসপাতালটির রেডিয়েশন অনকোলজি বিভাগের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ডা. সুরা যুকরূক মমতাহীনার তত্ত্বাবধানে তার চিকিৎসা চলছে।
চিকিৎসার প্রতিটি ধাপ যেন ছিল এক একটি কঠিন পরীক্ষা। চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে বসতভিটা, সঞ্চয়, সহায়-সম্বল—যা কিছু ছিল, একে একে সব বিক্রি করতে হয়েছে। আত্মীয়-স্বজনের কাছ থেকেও ধারদেনা করতে হয়েছে। তবুও থামেনি খরচের হিসাব। এ পর্যন্ত প্রায় ১৩ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। চিকিৎসা সম্পন্ন করতে আরও প্রায় ১০ লাখ টাকার প্রয়োজন। কিন্তু সেই অর্থ জোগাড় করার মতো আর কোনো পথ খোলা নেই।
অর্থের অভাবে এখন নিয়মিত চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। ক্যান্সারের নির্মম আঘাতে তাপসের কণ্ঠস্বর প্রায় হারিয়ে গেছে। গলা দিয়ে আর স্বাভাবিকভাবে কথা বের হয় না। অনেক কথা বলতে চান, কিন্তু পারেন না। চোখের জল আর নীরব দৃষ্টি দিয়েই যেন নিজের বেঁচে থাকার আকুতি প্রকাশ করেন। তার সেই নীরবতা পরিবারের প্রতিটি সদস্যের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ ঘটায়।
পরিবারের সদস্যরা জানান, চিকিৎসকরা আশার কথা শুনিয়েছেন। নিয়মিত চিকিৎসা চালিয়ে যেতে পারলে সুস্থ হয়ে ওঠার সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু অর্থের অভাবে সেই সম্ভাবনাই ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে যাচ্ছে। প্রতিটি দিন এখন তাদের কাছে অনিশ্চয়তার, প্রতিটি রাত দীর্ঘশ্বাসের।
একসময় যিনি নিজের শ্রম আর ঘামে দেশের রেলগাড়িগুলোকে নতুন রঙে সাজিয়েছেন, আজ তিনিই নিজের জীবনের রঙ ধরে রাখতে মানুষের সহযোগিতার অপেক্ষায়। সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি, শিল্পপ্রতিষ্ঠান, মানবিক সংগঠন এবং সরকারের সংশ্লিষ্ট মহলের প্রতি তার পরিবারের আকুল আবেদন—একটু সহানুভূতি, একটু সহযোগিতা হয়তো ফিরিয়ে দিতে পারে একজন পরিশ্রমী মানুষের জীবন।
তাপস এখনও হাল ছাড়েননি। মৃত্যুর সঙ্গে প্রতিদিন যুদ্ধ করেও তিনি বাঁচতে চান। তিনি আবারও দেখতে চান সূর্যের আলো, পরিবারের হাসিমুখ, আর হয়তো কোনো একদিন সুস্থ হয়ে ফিরে যেতে চান সেই কর্মস্থলে, যেখানে তার হাতের রঙে একসময় প্রাণ ফিরে পেত রেলের কোচগুলো।
একজন তাপসকে বাঁচানো মানে শুধু একটি জীবন রক্ষা করা নয়; একটি পরিবারের স্বপ্ন, সন্তানের ভবিষ্যৎ এবং একজন পরিশ্রমী শ্রমিকের বেঁচে থাকার অধিকারকে বাঁচিয়ে রাখা।

মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৬ জুলাই ২০২৬
জীবন কত দ্রুত রঙ বদলায়, তার নির্মম উদাহরণ তাপস চন্দ্র বিশ্বাস। একসময় সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানার পেইন্ট শপে অস্থায়ী শ্রমিক হিসেবে রঙের তুলিতে নতুন রূপ দিতেন রেলের যাত্রীবাহী কোচগুলোকে। তার হাতের নিপুণ ছোঁয়ায় ঝকঝকে হয়ে উঠত দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছুটে চলা অসংখ্য কোচ। প্রতিদিনের সেই কর্মব্যস্ত জীবনই ছিল তার পরিবারের স্বপ্ন, সন্তানের ভবিষ্যৎ আর সংসারের একমাত্র ভরসা। অথচ আজ সেই মানুষটিই বিছানায় শুয়ে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন। যে হাত একসময় রেলগাড়িকে রঙিন করত, সেই হাত আজ মানুষের সহমর্মিতার জন্য প্রসারিত।
নীলফামারীর সৈয়দপুর শহরের পুলিশ লাইন্স সাদ্দাম মোড় এলাকার বাসিন্দা তাপস চন্দ্র বিশ্বাসের বয়স মাত্র ৩৯ বছর। কিন্তু এই বয়সেই তিনি দীর্ঘ তিন বছর ধরে ন্যাসোফ্যারিঞ্জিয়াল ক্যান্সারের সঙ্গে কঠিন লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। দুরারোগ্য এই রোগ শুধু তার শরীরকেই ক্ষতবিক্ষত করেনি, ভেঙে দিয়েছে একটি স্বপ্নময় পরিবারের আর্থিক ভিত্তি, কেড়ে নিয়েছে স্বাভাবিক জীবনের সব আনন্দ।
তিন বছর আগে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন তাপস। প্রথমে তাকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর চিকিৎসকদের মুখে উচ্চারিত হয় ভয়ংকর সেই শব্দ—ক্যান্সার। মুহূর্তেই যেন অন্ধকার নেমে আসে পরিবারের জীবনে। উন্নত চিকিৎসার আশায় পরে তাকে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (সাবেক পিজি হাসপাতাল) নেওয়া হয়। সেখানে সহকারী অধ্যাপক ডা. আব্দুল্লাহ আল-মামুনের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসা শুরু হলেও রেডিওথেরাপি মেশিন বিকল থাকায় তাকে আহ্ছানিয়া মিশন ক্যান্সার ও জেনারেল হাসপাতালে পাঠানো হয়। বর্তমানে হাসপাতালটির রেডিয়েশন অনকোলজি বিভাগের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ডা. সুরা যুকরূক মমতাহীনার তত্ত্বাবধানে তার চিকিৎসা চলছে।
চিকিৎসার প্রতিটি ধাপ যেন ছিল এক একটি কঠিন পরীক্ষা। চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে বসতভিটা, সঞ্চয়, সহায়-সম্বল—যা কিছু ছিল, একে একে সব বিক্রি করতে হয়েছে। আত্মীয়-স্বজনের কাছ থেকেও ধারদেনা করতে হয়েছে। তবুও থামেনি খরচের হিসাব। এ পর্যন্ত প্রায় ১৩ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। চিকিৎসা সম্পন্ন করতে আরও প্রায় ১০ লাখ টাকার প্রয়োজন। কিন্তু সেই অর্থ জোগাড় করার মতো আর কোনো পথ খোলা নেই।
অর্থের অভাবে এখন নিয়মিত চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। ক্যান্সারের নির্মম আঘাতে তাপসের কণ্ঠস্বর প্রায় হারিয়ে গেছে। গলা দিয়ে আর স্বাভাবিকভাবে কথা বের হয় না। অনেক কথা বলতে চান, কিন্তু পারেন না। চোখের জল আর নীরব দৃষ্টি দিয়েই যেন নিজের বেঁচে থাকার আকুতি প্রকাশ করেন। তার সেই নীরবতা পরিবারের প্রতিটি সদস্যের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ ঘটায়।
পরিবারের সদস্যরা জানান, চিকিৎসকরা আশার কথা শুনিয়েছেন। নিয়মিত চিকিৎসা চালিয়ে যেতে পারলে সুস্থ হয়ে ওঠার সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু অর্থের অভাবে সেই সম্ভাবনাই ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে যাচ্ছে। প্রতিটি দিন এখন তাদের কাছে অনিশ্চয়তার, প্রতিটি রাত দীর্ঘশ্বাসের।
একসময় যিনি নিজের শ্রম আর ঘামে দেশের রেলগাড়িগুলোকে নতুন রঙে সাজিয়েছেন, আজ তিনিই নিজের জীবনের রঙ ধরে রাখতে মানুষের সহযোগিতার অপেক্ষায়। সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি, শিল্পপ্রতিষ্ঠান, মানবিক সংগঠন এবং সরকারের সংশ্লিষ্ট মহলের প্রতি তার পরিবারের আকুল আবেদন—একটু সহানুভূতি, একটু সহযোগিতা হয়তো ফিরিয়ে দিতে পারে একজন পরিশ্রমী মানুষের জীবন।
তাপস এখনও হাল ছাড়েননি। মৃত্যুর সঙ্গে প্রতিদিন যুদ্ধ করেও তিনি বাঁচতে চান। তিনি আবারও দেখতে চান সূর্যের আলো, পরিবারের হাসিমুখ, আর হয়তো কোনো একদিন সুস্থ হয়ে ফিরে যেতে চান সেই কর্মস্থলে, যেখানে তার হাতের রঙে একসময় প্রাণ ফিরে পেত রেলের কোচগুলো।
একজন তাপসকে বাঁচানো মানে শুধু একটি জীবন রক্ষা করা নয়; একটি পরিবারের স্বপ্ন, সন্তানের ভবিষ্যৎ এবং একজন পরিশ্রমী শ্রমিকের বেঁচে থাকার অধিকারকে বাঁচিয়ে রাখা।

আপনার মতামত লিখুন