ঢাকা   মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬
BD State News

সারাদেশ

‘ভাড়া করা’ ইট দিয়ে প্রধানমন্ত্রীর জন্য রাস্তা বানিয়েছিল এলজিইডি

‘ভাড়া করা’ ইট দিয়ে প্রধানমন্ত্রীর জন্য রাস্তা বানিয়েছিল এলজিইডি

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বগুড়ার গাবতলী উপজেলার বাগবাড়ী সফরের সময় তড়িঘড়ি করে প্রায় ১০ লাখ টাকা ব্যয়ে ইটের অস্থায়ী সোলিং নির্মাণ করে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)। সফর শেষ হওয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই সেই ইট খুলে নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

স্থানীয় সূত্র ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের অক্টোবর মাসে বাগবাড়ী বাজার থেকে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের বাড়ির সংযোগ সড়ক কার্পেটিংয়ের জন্য প্রায় ৮০ লাখ টাকার প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়। কিন্তু প্রায় এক বছর পেরিয়ে গেলেও মূল নির্মাণকাজ শুরু হয়নি। নির্ধারিত সময়সীমা শেষ হলেও প্রকল্পের দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই বললেই চলে।

এদিকে প্রধানমন্ত্রীর বগুড়া সফরকে কেন্দ্র করে সম্প্রতি আলোচনায় আসে সড়কটি। সফরের সময় একটি খাল খনন প্রকল্প পরিদর্শনে যাওয়ার জন্য এই সড়ক ব্যবহার করা হবে বলে সিদ্ধান্ত হলে মাত্র দুদিনের মধ্যে ইটের সোলিং বসানো হয়। স্থানীয়দের ভাষ্য, এটি ছিল মূলত সফরকেন্দ্রিক একটি সাময়িক ব্যবস্থা, যার স্থায়িত্ব ছিল কয়েক দিনের বেশি নয়।

সরেজমিনে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, সড়কে ব্যবহৃত ইট স্থায়ীভাবে কেনা হয়নি। ভাড়ায় আনা ইট দিয়ে সোলিং নির্মাণ করা হয়েছিল। প্রধানমন্ত্রীর সফর শেষ হওয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই ইটের মালিকেরা সেগুলো খুলে নিয়ে যান। ফলে সড়কটি আবার আগের অবস্থায় ফিরে যায়। এতে স্থানীয়দের ভোগান্তি আরও বেড়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিশেষ করে আমন ধান ঘরে তোলার মৌসুমে কৃষকদের চলাচলে দুর্ভোগ তৈরি হয়েছে।

একাধিক বাসিন্দা বলেন, প্রায় ১৭ বছর ধরে তারা একটি চলাচলযোগ্য সড়কের অপেক্ষায় আছেন। রাস্তা নির্মাণের খবর শুনে আশাবাদী হলেও এখন তাদের মনে হচ্ছে, সফর উপলক্ষে কয়েক দিনের জন্যই সাজসজ্জা করা হয়েছিল।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন বাসিন্দা বলেন, ‘১৭ বছর ধরে আমরা রাস্তার জন্য অপেক্ষা করছি। রাস্তা হবে শুনে আশাবাদী হয়েছিলাম। কিন্তু এখন দেখছি প্রধানমন্ত্রীর সফরের জন্য কয়েক দিনের সাজসজ্জা করা হয়েছিল। সফর শেষ, রাস্তার ইটও খুলে নিয়ে গেল।’

স্থানীয়দের ভাষ্য, প্রধানমন্ত্রীর বাড়ির পাশের এলাকার মানুষ যদি দীর্ঘদিন ধরে এমন অবহেলার শিকার হন, তাহলে এর চেয়ে দুঃখজনক ও লজ্জার বিষয় আর হতে পারে না।

প্রকল্পের কাজ শুরু না হওয়ার বিষয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান হক ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী শামিম রেজা শামিম বলেন, জমিসংক্রান্ত জটিলতা এবং প্রকল্পের প্রাক্কলন (এস্টিমেট) নিয়ে সমস্যার কারণে কাজ শুরু করা সম্ভব হয়নি। এ বিষয়ে একাধিকবার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।

তিনি আরও বলেন, যে পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, তা দিয়ে কাজ করলে রাস্তা টেকসই হবে না। এতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানেরই বদনাম হবে। এ ছাড়া নির্মাণকাজ শুরু করতে গেলে বিভিন্ন সময়ে বাধার মুখে পড়তে হয়েছে। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে নির্মিত অংশ ভেঙে ফেলার ঘটনাও ঘটেছে। তবে এসব সমস্যা সমাধানে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা পাওয়া যায়নি।

এ বিষয়ে গাবতলী উপজেলা প্রকৌশলী মো. সাজেদুর রহমান বলেন, জমিসংক্রান্ত জটিলতার কারণেই প্রকল্পের কাজ দীর্ঘদিন ধরে আটকে আছে। তবে একটি সরকারি তালিকাভুক্ত (আইডিভুক্ত) সড়কের ক্ষেত্রে কী ধরনের জমিসংক্রান্ত জটিলতা রয়েছে, সে বিষয়ে তিনি স্পষ্ট ব্যাখ্যা দিতে পারেননি।

তিনি আরও বলেন, প্রায় ১০ লাখ টাকার ভাড়ার ইট এনে সড়কে সোলিং করা হয়েছিল। এ ব্যয় অনুমোদনের জন্য ঢাকায় আবেদন পাঠানো হলেও তা অনুমোদন হয়নি। এখন ঠিকাদারের মাধ্যমে ওই অর্থ পরিশোধের চেষ্টা চলছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে পরিকল্পনার ঘাটতি, সমন্বয়হীনতা এবং জবাবদিহির অভাবের কারণেই এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। মূল প্রকল্প দীর্ঘদিন স্থগিত থাকলেও সফরকেন্দ্রিক তৎপরতায় সরকারি অর্থ ব্যয়ের বিষয়টি উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের স্বচ্ছতা ও কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এছাড়া যে সড়কের মূল কাজ প্রায় এক বছরেও শুরু হয়নি, সেখানে কয়েক দিনের ব্যবহারের জন্য লাখ লাখ টাকা ব্যয়ে অস্থায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ কতটা যৌক্তিক ছিল, সে প্রশ্নও উঠেছে।

এ বিষয়ে বগুড়া এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী মাসুদুজ্জামানও স্বীকার করেন যে প্রধানমন্ত্রীর সফর উপলক্ষে সড়কে অস্থায়ী সোলিং করা হয়েছিল। তবে তার ভাষ্য, এটি না করলেও সমস্যা ছিল না।

আপনার মতামত লিখুন

BD State News

মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬


‘ভাড়া করা’ ইট দিয়ে প্রধানমন্ত্রীর জন্য রাস্তা বানিয়েছিল এলজিইডি

প্রকাশের তারিখ : ১০ জুন ২০২৬

featured Image

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বগুড়ার গাবতলী উপজেলার বাগবাড়ী সফরের সময় তড়িঘড়ি করে প্রায় ১০ লাখ টাকা ব্যয়ে ইটের অস্থায়ী সোলিং নির্মাণ করে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)। সফর শেষ হওয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই সেই ইট খুলে নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

স্থানীয় সূত্র ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের অক্টোবর মাসে বাগবাড়ী বাজার থেকে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের বাড়ির সংযোগ সড়ক কার্পেটিংয়ের জন্য প্রায় ৮০ লাখ টাকার প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়। কিন্তু প্রায় এক বছর পেরিয়ে গেলেও মূল নির্মাণকাজ শুরু হয়নি। নির্ধারিত সময়সীমা শেষ হলেও প্রকল্পের দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই বললেই চলে।

এদিকে প্রধানমন্ত্রীর বগুড়া সফরকে কেন্দ্র করে সম্প্রতি আলোচনায় আসে সড়কটি। সফরের সময় একটি খাল খনন প্রকল্প পরিদর্শনে যাওয়ার জন্য এই সড়ক ব্যবহার করা হবে বলে সিদ্ধান্ত হলে মাত্র দুদিনের মধ্যে ইটের সোলিং বসানো হয়। স্থানীয়দের ভাষ্য, এটি ছিল মূলত সফরকেন্দ্রিক একটি সাময়িক ব্যবস্থা, যার স্থায়িত্ব ছিল কয়েক দিনের বেশি নয়।

সরেজমিনে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, সড়কে ব্যবহৃত ইট স্থায়ীভাবে কেনা হয়নি। ভাড়ায় আনা ইট দিয়ে সোলিং নির্মাণ করা হয়েছিল। প্রধানমন্ত্রীর সফর শেষ হওয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই ইটের মালিকেরা সেগুলো খুলে নিয়ে যান। ফলে সড়কটি আবার আগের অবস্থায় ফিরে যায়। এতে স্থানীয়দের ভোগান্তি আরও বেড়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিশেষ করে আমন ধান ঘরে তোলার মৌসুমে কৃষকদের চলাচলে দুর্ভোগ তৈরি হয়েছে।

একাধিক বাসিন্দা বলেন, প্রায় ১৭ বছর ধরে তারা একটি চলাচলযোগ্য সড়কের অপেক্ষায় আছেন। রাস্তা নির্মাণের খবর শুনে আশাবাদী হলেও এখন তাদের মনে হচ্ছে, সফর উপলক্ষে কয়েক দিনের জন্যই সাজসজ্জা করা হয়েছিল।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন বাসিন্দা বলেন, ‘১৭ বছর ধরে আমরা রাস্তার জন্য অপেক্ষা করছি। রাস্তা হবে শুনে আশাবাদী হয়েছিলাম। কিন্তু এখন দেখছি প্রধানমন্ত্রীর সফরের জন্য কয়েক দিনের সাজসজ্জা করা হয়েছিল। সফর শেষ, রাস্তার ইটও খুলে নিয়ে গেল।’

স্থানীয়দের ভাষ্য, প্রধানমন্ত্রীর বাড়ির পাশের এলাকার মানুষ যদি দীর্ঘদিন ধরে এমন অবহেলার শিকার হন, তাহলে এর চেয়ে দুঃখজনক ও লজ্জার বিষয় আর হতে পারে না।

প্রকল্পের কাজ শুরু না হওয়ার বিষয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান হক ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী শামিম রেজা শামিম বলেন, জমিসংক্রান্ত জটিলতা এবং প্রকল্পের প্রাক্কলন (এস্টিমেট) নিয়ে সমস্যার কারণে কাজ শুরু করা সম্ভব হয়নি। এ বিষয়ে একাধিকবার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।

তিনি আরও বলেন, যে পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, তা দিয়ে কাজ করলে রাস্তা টেকসই হবে না। এতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানেরই বদনাম হবে। এ ছাড়া নির্মাণকাজ শুরু করতে গেলে বিভিন্ন সময়ে বাধার মুখে পড়তে হয়েছে। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে নির্মিত অংশ ভেঙে ফেলার ঘটনাও ঘটেছে। তবে এসব সমস্যা সমাধানে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা পাওয়া যায়নি।

এ বিষয়ে গাবতলী উপজেলা প্রকৌশলী মো. সাজেদুর রহমান বলেন, জমিসংক্রান্ত জটিলতার কারণেই প্রকল্পের কাজ দীর্ঘদিন ধরে আটকে আছে। তবে একটি সরকারি তালিকাভুক্ত (আইডিভুক্ত) সড়কের ক্ষেত্রে কী ধরনের জমিসংক্রান্ত জটিলতা রয়েছে, সে বিষয়ে তিনি স্পষ্ট ব্যাখ্যা দিতে পারেননি।

তিনি আরও বলেন, প্রায় ১০ লাখ টাকার ভাড়ার ইট এনে সড়কে সোলিং করা হয়েছিল। এ ব্যয় অনুমোদনের জন্য ঢাকায় আবেদন পাঠানো হলেও তা অনুমোদন হয়নি। এখন ঠিকাদারের মাধ্যমে ওই অর্থ পরিশোধের চেষ্টা চলছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে পরিকল্পনার ঘাটতি, সমন্বয়হীনতা এবং জবাবদিহির অভাবের কারণেই এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। মূল প্রকল্প দীর্ঘদিন স্থগিত থাকলেও সফরকেন্দ্রিক তৎপরতায় সরকারি অর্থ ব্যয়ের বিষয়টি উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের স্বচ্ছতা ও কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এছাড়া যে সড়কের মূল কাজ প্রায় এক বছরেও শুরু হয়নি, সেখানে কয়েক দিনের ব্যবহারের জন্য লাখ লাখ টাকা ব্যয়ে অস্থায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ কতটা যৌক্তিক ছিল, সে প্রশ্নও উঠেছে।

এ বিষয়ে বগুড়া এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী মাসুদুজ্জামানও স্বীকার করেন যে প্রধানমন্ত্রীর সফর উপলক্ষে সড়কে অস্থায়ী সোলিং করা হয়েছিল। তবে তার ভাষ্য, এটি না করলেও সমস্যা ছিল না।


BD State News

সম্পাদক: আবদুর রাকিব

কপিরাইট © ২০২৬ BD State News । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত