অভাবের নির্মম বাস্তবতায় মেয়ের বিয়ের তিন মাস পরও বিদায় অনুষ্ঠান সম্পন্ন করতে পারেননি এক অসহায় আইসক্রিম বিক্রেতা বাবা। শেষ পর্যন্ত মানবতার হাত বাড়িয়ে দেয় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘হৃদয়ে সৈয়দপুর’। তাদের উদ্যোগে সম্পন্ন হয় মেয়ের বিদায় অনুষ্ঠান, আর তাতেই দীর্ঘদিনের দুশ্চিন্তার অবসান ঘটে সেই পরিবারের।
সৈয়দপুর উপজেলার কামারপুকুর ইউনিয়নের কলাবাগান এলাকার বাসিন্দা মিস্টল ইসলাম পেশায় একজন আইসক্রিম বিক্রেতা। নিজের কোনো জমিজমা বা বসতভিটা নেই। পরিবারের সদস্যদের নিয়ে একটি টিনশেড ভাড়া বাড়িতেই তার জীবনযাপন। প্রতিদিন রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে আইসক্রিম বিক্রি করে যে সামান্য আয় হয়, তা দিয়েই কোনোমতে চলে তার সংসার।
সেই সীমিত আয়ের মধ্যেই তিন মাস আগে বড় মেয়ে মিশু আক্তারের বিয়ে দেন কিশোরগঞ্জ উপজেলার সিংগেরগাড়ী এলাকার নুর মোহাম্মদ তাওহীদের সঙ্গে। কিন্তু বিয়ের পর মেয়ের বিদায় অনুষ্ঠানের খরচ জোগাড় করতে না পারায় বারবার পিছিয়ে যায় বিদায়ের আয়োজন। ইচ্ছা থাকলেও অভাবের কাছে হার মানতে হয় অসহায় বাবাকে।
অবশেষে শেষ ভরসা হিসেবে তিনি যোগাযোগ করেন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘হৃদয়ে সৈয়দপুর’-এর সঙ্গে। বিষয়টি জানার পর সংগঠনের কামারপুকুর ইউনিয়ন শাখার সাধারণ সম্পাদক জনি সরকারের উদ্যোগে মেয়ের বিদায় অনুষ্ঠানের সম্পূর্ণ দায়িত্ব গ্রহণ করে সংগঠনটি।
পরে গত ৩১ মে রাতে সৈয়দপুর শহরের রেলওয়ে অফিসার্স ক্লাবে আয়োজন করা হয় মিশু আক্তারের বিদায় অনুষ্ঠান। এতে নবদম্পতি ও তাদের স্বজনদের পাশাপাশি সংগঠনের কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় পর্যায়ের নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন সংগঠনের উপদেষ্টা এরশাদ হোসেন পাপ্পু, রেজাউল করিম রেজা, রবিউল আউয়াল রবি, বুলবুল সরকার, আশরাফুল হক লিপটন, নুর আলম ভরসা, সাবিনা ইয়াসমিন মাশা, ফিরোজ আহমেদ, মনিরা আক্তার মিল্কিসহ আরও অনেকে।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে সংগঠনের উপদেষ্টা এরশাদ হোসেন পাপ্পু বলেন, “মানবতার সেবাই আমাদের মূল লক্ষ্য। সমাজে এমন অনেক পরিবার রয়েছে, যারা আর্থিক সংকটের কারণে জীবনের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলোও স্বাভাবিকভাবে উদযাপন করতে পারেন না। মিস্টল ইসলামের পরিবারের কষ্টের কথা জানতে পেরে আমরা তাদের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছি। ভবিষ্যতেও মানুষের কল্যাণে এ ধরনের মানবিক কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।”
বিদায় অনুষ্ঠান সম্পন্ন হওয়ার পর আবেগাপ্লুত মিস্টল ইসলাম বলেন, “আমি একজন গরিব মানুষ। আইসক্রিম বিক্রি করে সংসার চালাই। মেয়ের বিয়ে দিয়েছিলাম, কিন্তু বিদায়ের আয়োজন করার মতো সামর্থ্য ছিল না। তিন মাস ধরে খুব কষ্টে ছিলাম। ‘হৃদয়ে সৈয়দপুর’ আমার মেয়ের বিদায়ের সব ব্যবস্থা করে দিয়েছে। তাদের এই সহযোগিতা আমি কোনোদিন ভুলব না।”
স্থানীয়দের মতে, অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে ‘হৃদয়ে সৈয়দপুর’ মানবিকতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। তাদের এই উদ্যোগ শুধু একটি পরিবারের মুখে হাসি ফিরিয়ে দেয়নি, বরং সমাজে সহমর্মিতা, ভালোবাসা ও মানবিক মূল্যবোধের বার্তাও ছড়িয়ে দিয়েছে।
একজন অসহায় বাবার চোখের জল মুছে দিয়ে ‘হৃদয়ে সৈয়দপুর’ যেন আবারও প্রমাণ করল—সম্পদ নয়, মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসাই সবচেয়ে বড় শক্তি। মানবতার জয় হয় তখনই, যখন একজন মানুষের কষ্টকে নিজের কষ্ট মনে করে আরেকজন মানুষ পাশে দাঁড়ায়। সত্যিই, সবার উপরে মানুষ সত্য।

মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০২ জুন ২০২৬
অভাবের নির্মম বাস্তবতায় মেয়ের বিয়ের তিন মাস পরও বিদায় অনুষ্ঠান সম্পন্ন করতে পারেননি এক অসহায় আইসক্রিম বিক্রেতা বাবা। শেষ পর্যন্ত মানবতার হাত বাড়িয়ে দেয় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘হৃদয়ে সৈয়দপুর’। তাদের উদ্যোগে সম্পন্ন হয় মেয়ের বিদায় অনুষ্ঠান, আর তাতেই দীর্ঘদিনের দুশ্চিন্তার অবসান ঘটে সেই পরিবারের।
সৈয়দপুর উপজেলার কামারপুকুর ইউনিয়নের কলাবাগান এলাকার বাসিন্দা মিস্টল ইসলাম পেশায় একজন আইসক্রিম বিক্রেতা। নিজের কোনো জমিজমা বা বসতভিটা নেই। পরিবারের সদস্যদের নিয়ে একটি টিনশেড ভাড়া বাড়িতেই তার জীবনযাপন। প্রতিদিন রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে আইসক্রিম বিক্রি করে যে সামান্য আয় হয়, তা দিয়েই কোনোমতে চলে তার সংসার।
সেই সীমিত আয়ের মধ্যেই তিন মাস আগে বড় মেয়ে মিশু আক্তারের বিয়ে দেন কিশোরগঞ্জ উপজেলার সিংগেরগাড়ী এলাকার নুর মোহাম্মদ তাওহীদের সঙ্গে। কিন্তু বিয়ের পর মেয়ের বিদায় অনুষ্ঠানের খরচ জোগাড় করতে না পারায় বারবার পিছিয়ে যায় বিদায়ের আয়োজন। ইচ্ছা থাকলেও অভাবের কাছে হার মানতে হয় অসহায় বাবাকে।
অবশেষে শেষ ভরসা হিসেবে তিনি যোগাযোগ করেন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘হৃদয়ে সৈয়দপুর’-এর সঙ্গে। বিষয়টি জানার পর সংগঠনের কামারপুকুর ইউনিয়ন শাখার সাধারণ সম্পাদক জনি সরকারের উদ্যোগে মেয়ের বিদায় অনুষ্ঠানের সম্পূর্ণ দায়িত্ব গ্রহণ করে সংগঠনটি।
পরে গত ৩১ মে রাতে সৈয়দপুর শহরের রেলওয়ে অফিসার্স ক্লাবে আয়োজন করা হয় মিশু আক্তারের বিদায় অনুষ্ঠান। এতে নবদম্পতি ও তাদের স্বজনদের পাশাপাশি সংগঠনের কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় পর্যায়ের নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন সংগঠনের উপদেষ্টা এরশাদ হোসেন পাপ্পু, রেজাউল করিম রেজা, রবিউল আউয়াল রবি, বুলবুল সরকার, আশরাফুল হক লিপটন, নুর আলম ভরসা, সাবিনা ইয়াসমিন মাশা, ফিরোজ আহমেদ, মনিরা আক্তার মিল্কিসহ আরও অনেকে।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে সংগঠনের উপদেষ্টা এরশাদ হোসেন পাপ্পু বলেন, “মানবতার সেবাই আমাদের মূল লক্ষ্য। সমাজে এমন অনেক পরিবার রয়েছে, যারা আর্থিক সংকটের কারণে জীবনের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলোও স্বাভাবিকভাবে উদযাপন করতে পারেন না। মিস্টল ইসলামের পরিবারের কষ্টের কথা জানতে পেরে আমরা তাদের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছি। ভবিষ্যতেও মানুষের কল্যাণে এ ধরনের মানবিক কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।”
বিদায় অনুষ্ঠান সম্পন্ন হওয়ার পর আবেগাপ্লুত মিস্টল ইসলাম বলেন, “আমি একজন গরিব মানুষ। আইসক্রিম বিক্রি করে সংসার চালাই। মেয়ের বিয়ে দিয়েছিলাম, কিন্তু বিদায়ের আয়োজন করার মতো সামর্থ্য ছিল না। তিন মাস ধরে খুব কষ্টে ছিলাম। ‘হৃদয়ে সৈয়দপুর’ আমার মেয়ের বিদায়ের সব ব্যবস্থা করে দিয়েছে। তাদের এই সহযোগিতা আমি কোনোদিন ভুলব না।”
স্থানীয়দের মতে, অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে ‘হৃদয়ে সৈয়দপুর’ মানবিকতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। তাদের এই উদ্যোগ শুধু একটি পরিবারের মুখে হাসি ফিরিয়ে দেয়নি, বরং সমাজে সহমর্মিতা, ভালোবাসা ও মানবিক মূল্যবোধের বার্তাও ছড়িয়ে দিয়েছে।
একজন অসহায় বাবার চোখের জল মুছে দিয়ে ‘হৃদয়ে সৈয়দপুর’ যেন আবারও প্রমাণ করল—সম্পদ নয়, মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসাই সবচেয়ে বড় শক্তি। মানবতার জয় হয় তখনই, যখন একজন মানুষের কষ্টকে নিজের কষ্ট মনে করে আরেকজন মানুষ পাশে দাঁড়ায়। সত্যিই, সবার উপরে মানুষ সত্য।

আপনার মতামত লিখুন