ঢাকা   মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬
BD State News

সারাদেশ

কুয়াকাটার আদি ঐতিহ্য রক্ষায় নড়েচড়ে বসল প্রশাসন

কুয়াকাটার আদি ঐতিহ্য রক্ষায় নড়েচড়ে বসল প্রশাসন

সমুদ্রকন্যা কুয়াকাটার আদিম অধিবাসী রাখাইন সম্প্রদায়ের শতবছরের ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতি রক্ষা এবং ‘রাখাইন কালচারাল একাডেমি’র জরাজীর্ণ দশা নিয়ে গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশের পর টনক নড়েছে প্রশাসনের। সংবাদটি উচ্চপর্যায়ের নজরে আসার পরপরই একাডেমিকে অবৈধ দখলমুক্ত করতে এবং এর প্রাণ ফিরিয়ে আনতে তড়িৎ পদক্ষেপ নিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন।

আজ (২৪ মে) বিকেলে কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও একাডেমির সভাপতি কাউছার হামিদ কুয়াকাটা রাখাইন কালচারাল একাডেমি সরেজমিন পরিদর্শন করেন। এ সময় তিনি একাডেমির চত্বরে গড়ে ওঠা সকল অবৈধ স্থাপনা অবিলম্বে উচ্ছেদের ঘোষণা দেন এবং আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে একাডেমির পরিবেশ ও সৌন্দর্য পুনরুদ্ধারের আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

অনুসন্ধানে জানা যায়, ১৭৮৪ সালে আরাকান থেকে বিতাড়িত হয়ে ১৫০টি রাখাইন পরিবার কুয়াকাটার এই সৈকতে প্রথম বসতি স্থাপন করে এই উপকূলীয় জনপদে সভ্যতার আলো জ্বেলেছিল। তাদের সেই নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতিকে বিশ্বদরবারে তুলে ধরার উদ্দেশ্যে ১৯৯৮ সালের ১৪ মার্চ আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করেছিল কুয়াকাটা রাখাইন কালচারাল একাডেমি।

তবে মূলত সরকারি তদারকির অভাব এবং স্থানীয় পর্যায়ে কমিটির অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের কারণে গত আট বছর ধরে এই প্রতিষ্ঠানটি সম্পূর্ণ স্থবির হয়ে রয়েছে। একাডেমির অ্যাডহক কমিটির তৎকালীন প্রাণপুরুষ মংচোমিং তালুকদারের মৃত্যুর পর প্রতিষ্ঠানটি চরম নেতৃত্ব সংকটে পড়ে। পরবর্তীতে এলাকার বাইরের কিছু লোক প্রশাসনকে ভুল বুঝিয়ে একটি অকার্যকর কমিটি গঠন করায় প্রতিষ্ঠানটি অভিভাবকহীন হয়ে পড়ে। রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে মূল ভবনে বড় বড় ফাটল ধরে ছাদ থেকে পলেস্তারা খসে পড়তে থাকে, যা ভবনটিকে ব্যবহারের অনুপযোগী ও ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে। এই সুযোগে একাডেমির চারপাশ অবৈধ দখলদারদের কবলে চলে যায় এবং ভেতরে ময়লার স্তূপ জমে এটি একটি ভুতুড়ে ভবনে পরিণত হয়।

কুয়াকাটা বর্তমানে একটি আন্তর্জাতিক পর্যটন কেন্দ্র হলেও এখানে আগত দেশি-বিদেশি পর্যটকদের সামনে রাখাইন সংস্কৃতি প্রদর্শনের কোনো প্ল্যাটফর্ম নেই। একাডেমির কার্যক্রম বন্ধ থাকায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে রাখাইন তরুণ সমাজ। কেরানীপাড়াসহ স্থানীয় রাখাইন পাড়াগুলোতে নিজস্ব ভাষা শেখানোর কোনো নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান বা শিক্ষক নেই। ফলে বর্তমান প্রজন্মের অনেকেই মুখে মাতৃভাষায় কথা বলতে পারলেও, নিজেদের ঐতিহ্যবাহী বর্ণমালার সাথে সম্পূর্ণ পরিচিতি হারাচ্ছে, যা একটি জাতিগোষ্ঠীর অস্তিত্বের জন্য বড় হুমকি।

স্থানীয় রাখাইন সচেতন মহলের মতে, একাডেমিটি পূর্ণাঙ্গভাবে সচল হলে এই প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর একাধিক স্থায়ী উপকার হবে। যেখানে নতুন প্রজন্ম নিজস্ব বর্ণমালা শিক্ষার সুযোগ পাবে, ফলে বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা পাবে শতবছরের রাখাইন ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি।

 

প্রবীণ ও তরুণ রাখাইনদের মতে, একাডেমির সংস্কার ও এর বাণিজ্যিক অংশ সচল হলে সেখান থেকে অর্জিত আয় দিয়ে অসচ্ছল রাখাইন পরিবারগুলোকে আর্থিক সহায়তা দেওয়া সম্ভব হবে এবং তরুণদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। এছাড়াও নিয়মিত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও রাখাইন লাইফস্টাইল প্রদর্শনীর আয়োজন করা হলে, তা কুয়াকাটায় আগত দেশি-বিদেশি পর্যটকদের জন্য অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হবে, যা স্থানীয় পর্যটন অর্থনীতিকে আরও সমৃদ্ধ করবে।

পরিদর্শনকালে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক কর্মকর্তা, স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি ও রাখাইন সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিরাও উপস্থিত ছিলেন। তারা একাডেমির সৌন্দর্য ও ঐতিহ্য রক্ষায় সম্মিলিতভাবে কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।

এ বিষয়ে কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) কাউছার হামিদ বলেন, "কলাপাড়ার মূল সৌন্দর্যই হচ্ছে রাখাইন সম্প্রদায়। তাদের কালচারাল একাডেমি চত্বর থেকে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করতে এবং এটি সচল করার লক্ষ্যেই আজ সরেজমিনে কুয়াকাটা রাখাইন কালচারাল একাডেমি পরিদর্শন করা হয়েছে। আশা করি আগামী ১ সপ্তাহের মধ্যে কালচারাল একাডেমি তার আপন রূপে ফিরবে।"

বিভিন্ন গণমাধ্যমে খবর প্রকাশের পড় প্রশাসনের এমন ঝটিকা উচ্ছেদ ও সংস্কারের উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়েছে রাখাইন সম্প্রদায়সহ স্থানীয় বিভিন্ন সম্প্রদায়-সমাজ। তবে তাদের দাবি, শুধু উচ্ছেদই নয়, দ্রুত যেন ভবনটির স্থায়ী সংস্কার করে রাখাইনদের নিজস্ব ভাষার বই ও দক্ষ শিক্ষক নিয়োগের মাধ্যমে একাডেমির মূল শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রম স্থায়ীভাবে চালু করা হয়। 

আপনার মতামত লিখুন

BD State News

মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬


কুয়াকাটার আদি ঐতিহ্য রক্ষায় নড়েচড়ে বসল প্রশাসন

প্রকাশের তারিখ : ২৪ মে ২০২৬

featured Image

সমুদ্রকন্যা কুয়াকাটার আদিম অধিবাসী রাখাইন সম্প্রদায়ের শতবছরের ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতি রক্ষা এবং ‘রাখাইন কালচারাল একাডেমি’র জরাজীর্ণ দশা নিয়ে গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশের পর টনক নড়েছে প্রশাসনের। সংবাদটি উচ্চপর্যায়ের নজরে আসার পরপরই একাডেমিকে অবৈধ দখলমুক্ত করতে এবং এর প্রাণ ফিরিয়ে আনতে তড়িৎ পদক্ষেপ নিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন।


আজ (২৪ মে) বিকেলে কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও একাডেমির সভাপতি কাউছার হামিদ কুয়াকাটা রাখাইন কালচারাল একাডেমি সরেজমিন পরিদর্শন করেন। এ সময় তিনি একাডেমির চত্বরে গড়ে ওঠা সকল অবৈধ স্থাপনা অবিলম্বে উচ্ছেদের ঘোষণা দেন এবং আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে একাডেমির পরিবেশ ও সৌন্দর্য পুনরুদ্ধারের আশাবাদ ব্যক্ত করেন।


অনুসন্ধানে জানা যায়, ১৭৮৪ সালে আরাকান থেকে বিতাড়িত হয়ে ১৫০টি রাখাইন পরিবার কুয়াকাটার এই সৈকতে প্রথম বসতি স্থাপন করে এই উপকূলীয় জনপদে সভ্যতার আলো জ্বেলেছিল। তাদের সেই নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতিকে বিশ্বদরবারে তুলে ধরার উদ্দেশ্যে ১৯৯৮ সালের ১৪ মার্চ আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করেছিল কুয়াকাটা রাখাইন কালচারাল একাডেমি।

তবে মূলত সরকারি তদারকির অভাব এবং স্থানীয় পর্যায়ে কমিটির অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের কারণে গত আট বছর ধরে এই প্রতিষ্ঠানটি সম্পূর্ণ স্থবির হয়ে রয়েছে। একাডেমির অ্যাডহক কমিটির তৎকালীন প্রাণপুরুষ মংচোমিং তালুকদারের মৃত্যুর পর প্রতিষ্ঠানটি চরম নেতৃত্ব সংকটে পড়ে। পরবর্তীতে এলাকার বাইরের কিছু লোক প্রশাসনকে ভুল বুঝিয়ে একটি অকার্যকর কমিটি গঠন করায় প্রতিষ্ঠানটি অভিভাবকহীন হয়ে পড়ে। রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে মূল ভবনে বড় বড় ফাটল ধরে ছাদ থেকে পলেস্তারা খসে পড়তে থাকে, যা ভবনটিকে ব্যবহারের অনুপযোগী ও ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে। এই সুযোগে একাডেমির চারপাশ অবৈধ দখলদারদের কবলে চলে যায় এবং ভেতরে ময়লার স্তূপ জমে এটি একটি ভুতুড়ে ভবনে পরিণত হয়।


কুয়াকাটা বর্তমানে একটি আন্তর্জাতিক পর্যটন কেন্দ্র হলেও এখানে আগত দেশি-বিদেশি পর্যটকদের সামনে রাখাইন সংস্কৃতি প্রদর্শনের কোনো প্ল্যাটফর্ম নেই। একাডেমির কার্যক্রম বন্ধ থাকায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে রাখাইন তরুণ সমাজ। কেরানীপাড়াসহ স্থানীয় রাখাইন পাড়াগুলোতে নিজস্ব ভাষা শেখানোর কোনো নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান বা শিক্ষক নেই। ফলে বর্তমান প্রজন্মের অনেকেই মুখে মাতৃভাষায় কথা বলতে পারলেও, নিজেদের ঐতিহ্যবাহী বর্ণমালার সাথে সম্পূর্ণ পরিচিতি হারাচ্ছে, যা একটি জাতিগোষ্ঠীর অস্তিত্বের জন্য বড় হুমকি।


স্থানীয় রাখাইন সচেতন মহলের মতে, একাডেমিটি পূর্ণাঙ্গভাবে সচল হলে এই প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর একাধিক স্থায়ী উপকার হবে। যেখানে নতুন প্রজন্ম নিজস্ব বর্ণমালা শিক্ষার সুযোগ পাবে, ফলে বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা পাবে শতবছরের রাখাইন ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি।

 

প্রবীণ ও তরুণ রাখাইনদের মতে, একাডেমির সংস্কার ও এর বাণিজ্যিক অংশ সচল হলে সেখান থেকে অর্জিত আয় দিয়ে অসচ্ছল রাখাইন পরিবারগুলোকে আর্থিক সহায়তা দেওয়া সম্ভব হবে এবং তরুণদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। এছাড়াও নিয়মিত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও রাখাইন লাইফস্টাইল প্রদর্শনীর আয়োজন করা হলে, তা কুয়াকাটায় আগত দেশি-বিদেশি পর্যটকদের জন্য অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হবে, যা স্থানীয় পর্যটন অর্থনীতিকে আরও সমৃদ্ধ করবে।


পরিদর্শনকালে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক কর্মকর্তা, স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি ও রাখাইন সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিরাও উপস্থিত ছিলেন। তারা একাডেমির সৌন্দর্য ও ঐতিহ্য রক্ষায় সম্মিলিতভাবে কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।


এ বিষয়ে কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) কাউছার হামিদ বলেন, "কলাপাড়ার মূল সৌন্দর্যই হচ্ছে রাখাইন সম্প্রদায়। তাদের কালচারাল একাডেমি চত্বর থেকে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করতে এবং এটি সচল করার লক্ষ্যেই আজ সরেজমিনে কুয়াকাটা রাখাইন কালচারাল একাডেমি পরিদর্শন করা হয়েছে। আশা করি আগামী ১ সপ্তাহের মধ্যে কালচারাল একাডেমি তার আপন রূপে ফিরবে।"


বিভিন্ন গণমাধ্যমে খবর প্রকাশের পড় প্রশাসনের এমন ঝটিকা উচ্ছেদ ও সংস্কারের উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়েছে রাখাইন সম্প্রদায়সহ স্থানীয় বিভিন্ন সম্প্রদায়-সমাজ। তবে তাদের দাবি, শুধু উচ্ছেদই নয়, দ্রুত যেন ভবনটির স্থায়ী সংস্কার করে রাখাইনদের নিজস্ব ভাষার বই ও দক্ষ শিক্ষক নিয়োগের মাধ্যমে একাডেমির মূল শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রম স্থায়ীভাবে চালু করা হয়। 


BD State News

সম্পাদক: আবদুর রাকিব

কপিরাইট © ২০২৬ BD State News । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত