ঢাকা   মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬
BD State News

সারাদেশ

হাপরের টান আর হাতুড়ির আঘাত, কামারশালায় আগুনের ফুলকি

হাপরের টান আর হাতুড়ির আঘাত, কামারশালায় আগুনের ফুলকি
হাপরের টান আর হাতুড়ির আঘাতে কামারশালায় কর্মব্যস্ততা

কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে দোহার-নবাবগঞ্জে ও কেরানীগঞ্জ উপজেলায় দিন-রাত ব্যস্ত কারিগরেরা। চোখ ধাঁধানো আগুনের ফুলকি, কয়লার তীব্র উত্তাপ আর চারপাশ জুড়ে লোহার ওপর হাতুড়িপেটার ‘টুং টাং’ শব্দ। পবিত্র ঈদুল আজহা বা কোরবানির ঈদ যতই ঘনিয়ে আসছে, এ সব  উপজেলার কামারপাড়া গুলোতে ব্যস্ততা ততই বাড়ছে। কোরবানি পশুর চামড়া ছাড়ানো এবং মাংস কাটার প্রধান হাতিয়ার দা, বঁটি, ছুরি আর চাপাতি তৈরিতে দিন-রাত এক করে কাজ করছেন এ শিল্পের কারিগরেরা।

বছরের অন্য দিনগুলোতে কামার দোকানগুলোতে তেমন একটা কাজ না থাকলেও, কোরবানির ঈদই এই শিল্পের ব্যবসার মূল মরসুম। বর্তমানে কামার দোকানগুলোতে জ্বলছে লাল-সবুজ কয়লার আগুন। সেই আগুনে পুড়িয়ে লাল করা হচ্ছে কাঁচা লোহা। এরপর হাপরের টানে বাতাস দিয়ে আর ভারী হাতুড়ির নিখুঁত পিটুনিতে লোহা গলিয়ে তৈরি হচ্ছে ধারালো সব কোরবানি সামগ্রী।

কামারশালার এক কারিগর প্রদীপ (৬৫) কপালে জমে থাকা ঘাম মুছতে মুছতে বলেন, "ঈদের আর মাত্র কয়েকটা দিন বাকি। এখন আমাদের দম ফেলার সময় নেই। ভোর থেকে শুরু করে গভীর রাত পর্যন্ত কয়লার আগুনের সামনে বসে থাকতে হয়। শরীর পুড়লেও এই সময়ে একটু বাড়তি আয়ের আশায় সব কষ্ট ভুলে যাই।"

কোরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে কামার দোকানগুলোতে এখন দুই ধরনের ক্রেতার ভিড়। একদল আসছেন নতুন দা, চাপাতি বা ছুরি কিনতে; আর অন্য দল আসছেন ঘরে থাকা পুরোনো জং ধরা হাতিয়ারগুলো শান দিয়ে ধারালো করে নিতে।

স্থানীয় বাজারের কারিগর সঞ্জিত কর্মকার (৪০) জানান, সাধারণত স্প্রিং লোহা (পাকা লোহা) ও কাঁচা লোহা ব্যবহার করে এসব উপকরণ তৈরি করা হয়। এর মধ্যে স্প্রিং লোহা দিয়ে তৈরি উপকরণের মান অনেক ভালো এবং টেকসই হওয়ায় এর দাম ও চাহিদাও বেশি। এ সব দা, বঁটি, ছুরি ও চাপাতি বিক্রি করা হয় প্রতি কেজি হিসেবে। লোহার মান ও প্রকারভেদে তা বর্তমানে ৮০০ থেকে ১০০০ টাকা  বিক্রি দরে। প্রতি বছর কোরবানির আগে পশুদাতারা তাদের সুবিধেমতো নতুন সামগ্রী ক্রয় করেন অথবা পুরোনো জিনিস মেরামত করে থাকেন।

আধুনিক যান্ত্রিক সভ্যতার যুগে এবং বাজারে বিদেশি তৈরি সস্তা স্টিলের সামগ্রীর ভিড়ে কামারদের এই দেশীয় ঐতিহ্যবাহী শিল্পটি এখন নানা সংকটের মুখোমুখি। কয়লা, লোহা ও হাপরের দাম দিন দিন বেড়ে যাওয়ায় এই কাজের উৎপাদন খরচও অনেক বেড়ে গেছে। ফলে বছরের বাকি সময়টা অনেক কারিগরকে অনাহারে-অর্ধাহারে দিন কাটাতে হয়। অনেকেই বাধ্য হয়ে পূর্বপুরুষের এই আদি পেশা ছেড়ে দিচ্ছেন।

তবে এত সংকটের মাঝেও কোরবানির ঈদের এই একটা মাস কামার পাড়ায় যেন নতুন প্রাণের সঞ্চার হয়। কয়লার আগুন আর লোহার টুং টাং শব্দ মনে করিয়ে দেয় আমাদের গ্রামীণ ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি এখনো কতটা জীবন্ত। সব কষ্ট উপেক্ষা করে, আগুনের উত্তাপ সয়ে কামার শিল্পীরা এখন ব্যস্ত নতুন স্বপ্ন আর ধারালো দা-ছুরি তৈরিতে।

আপনার মতামত লিখুন

BD State News

মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬


হাপরের টান আর হাতুড়ির আঘাত, কামারশালায় আগুনের ফুলকি

প্রকাশের তারিখ : ১৯ মে ২০২৬

featured Image

কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে দোহার-নবাবগঞ্জে ও কেরানীগঞ্জ উপজেলায় দিন-রাত ব্যস্ত কারিগরেরা। চোখ ধাঁধানো আগুনের ফুলকি, কয়লার তীব্র উত্তাপ আর চারপাশ জুড়ে লোহার ওপর হাতুড়িপেটার ‘টুং টাং’ শব্দ। পবিত্র ঈদুল আজহা বা কোরবানির ঈদ যতই ঘনিয়ে আসছে, এ সব  উপজেলার কামারপাড়া গুলোতে ব্যস্ততা ততই বাড়ছে। কোরবানি পশুর চামড়া ছাড়ানো এবং মাংস কাটার প্রধান হাতিয়ার দা, বঁটি, ছুরি আর চাপাতি তৈরিতে দিন-রাত এক করে কাজ করছেন এ শিল্পের কারিগরেরা।

বছরের অন্য দিনগুলোতে কামার দোকানগুলোতে তেমন একটা কাজ না থাকলেও, কোরবানির ঈদই এই শিল্পের ব্যবসার মূল মরসুম। বর্তমানে কামার দোকানগুলোতে জ্বলছে লাল-সবুজ কয়লার আগুন। সেই আগুনে পুড়িয়ে লাল করা হচ্ছে কাঁচা লোহা। এরপর হাপরের টানে বাতাস দিয়ে আর ভারী হাতুড়ির নিখুঁত পিটুনিতে লোহা গলিয়ে তৈরি হচ্ছে ধারালো সব কোরবানি সামগ্রী।

কামারশালার এক কারিগর প্রদীপ (৬৫) কপালে জমে থাকা ঘাম মুছতে মুছতে বলেন, "ঈদের আর মাত্র কয়েকটা দিন বাকি। এখন আমাদের দম ফেলার সময় নেই। ভোর থেকে শুরু করে গভীর রাত পর্যন্ত কয়লার আগুনের সামনে বসে থাকতে হয়। শরীর পুড়লেও এই সময়ে একটু বাড়তি আয়ের আশায় সব কষ্ট ভুলে যাই।"

কোরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে কামার দোকানগুলোতে এখন দুই ধরনের ক্রেতার ভিড়। একদল আসছেন নতুন দা, চাপাতি বা ছুরি কিনতে; আর অন্য দল আসছেন ঘরে থাকা পুরোনো জং ধরা হাতিয়ারগুলো শান দিয়ে ধারালো করে নিতে।

স্থানীয় বাজারের কারিগর সঞ্জিত কর্মকার (৪০) জানান, সাধারণত স্প্রিং লোহা (পাকা লোহা) ও কাঁচা লোহা ব্যবহার করে এসব উপকরণ তৈরি করা হয়। এর মধ্যে স্প্রিং লোহা দিয়ে তৈরি উপকরণের মান অনেক ভালো এবং টেকসই হওয়ায় এর দাম ও চাহিদাও বেশি। এ সব দা, বঁটি, ছুরি ও চাপাতি বিক্রি করা হয় প্রতি কেজি হিসেবে। লোহার মান ও প্রকারভেদে তা বর্তমানে ৮০০ থেকে ১০০০ টাকা  বিক্রি দরে। প্রতি বছর কোরবানির আগে পশুদাতারা তাদের সুবিধেমতো নতুন সামগ্রী ক্রয় করেন অথবা পুরোনো জিনিস মেরামত করে থাকেন।

আধুনিক যান্ত্রিক সভ্যতার যুগে এবং বাজারে বিদেশি তৈরি সস্তা স্টিলের সামগ্রীর ভিড়ে কামারদের এই দেশীয় ঐতিহ্যবাহী শিল্পটি এখন নানা সংকটের মুখোমুখি। কয়লা, লোহা ও হাপরের দাম দিন দিন বেড়ে যাওয়ায় এই কাজের উৎপাদন খরচও অনেক বেড়ে গেছে। ফলে বছরের বাকি সময়টা অনেক কারিগরকে অনাহারে-অর্ধাহারে দিন কাটাতে হয়। অনেকেই বাধ্য হয়ে পূর্বপুরুষের এই আদি পেশা ছেড়ে দিচ্ছেন।

তবে এত সংকটের মাঝেও কোরবানির ঈদের এই একটা মাস কামার পাড়ায় যেন নতুন প্রাণের সঞ্চার হয়। কয়লার আগুন আর লোহার টুং টাং শব্দ মনে করিয়ে দেয় আমাদের গ্রামীণ ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি এখনো কতটা জীবন্ত। সব কষ্ট উপেক্ষা করে, আগুনের উত্তাপ সয়ে কামার শিল্পীরা এখন ব্যস্ত নতুন স্বপ্ন আর ধারালো দা-ছুরি তৈরিতে।



BD State News

সম্পাদক: আবদুর রাকিব

কপিরাইট © ২০২৬ BD State News । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত