ঢাকা   মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬
BD State News

সারাদেশ

সৈয়দপুরে লাইট ইন্জিনিয়ারিং শিল্পের জাগরণ ‎

সৈয়দপুরে লাইট ইন্জিনিয়ারিং শিল্পের জাগরণ    ‎

‎ ইস্পাতের ঘর্ষণ, ওয়েল্ডিং আগুনের ঝলক আর লেদ মেশিনের নিরব ঘূর্ণনে সৈয়দপুরে নতুন শিল্পো স্বপ্নের  উদ্ভব ঘটেছে।

‎

‎শহর ও আশপাশে গড়ে ওঠা প্রায় ৬০টি লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং কারখানায় তৈরি হচ্ছে প্রায় ১০ হাজার ধরনের যন্ত্রপাতি ও স্পেয়ার পার্টস। এ সকল স্পেয়ার পার্টস বাংলাদেশ  রেলওয়ে, কয়লাখনি, তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র, কৃষিখাত, শিল্পকারখানাসহ সবখাতেই ব্যবহৃত হচ্ছে সৈয়দপুরে তৈরি দেশীয় এ যন্ত্রাংশ।

‎

‎শুধু বড় শিল্পই নয়, মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সূক্ষ্মতম প্রয়োজনীয় উপকরণ—একটি সুচ থেকে শুরু করে বিশাল শিল্পযন্ত্রের খুচরা যন্ত্রাংশ—সবই তৈরি হচ্ছে এই জনপদের লাইট ইন্জিনিয়ারিং শিল্পের কারখানায়।

‎

‎রেলওয়ে কারখানার অভিজ্ঞতা, দীর্ঘদিনের কারিগরি দক্ষতা আর প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে গড়ে ওঠা শ্রমশক্তির  মেলবন্ধনেই শক্ত ভিত পেয়েছে সৈয়দপুরের লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্প।

‎

‎স্থানীয় উদ্যোক্তারা বলছেন, বিদেশ থেকে আমদানি করা যন্ত্রাংশের বিকল্প এখন দেশের মাটিতেই তৈরি হচ্ছে। এতে যেমন খরচ কমছে, তেমনি বাড়ছে দেশীয় উৎপাদনের ওপর নির্ভরতা।

‎জেলা লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং সমিতির সভাপতি এরশাদ হোসেন পাপ্পু বলেন, “শুধু রেলওয়ে বা বিদ্যুৎ খাত নয়—দেশের প্রায় সব ধরনের শিল্প-কলকারখানার যন্ত্রপাতিই এখন সৈয়দপুরে তৈরি হচ্ছে। এমনকি মানুষের প্রাত্যহিক জীবনের ব্যবহৃত সুচ থেকে শুরু করে বড় শিল্পযন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ অংশ পর্যন্ত আমরা তৈরি করছি।”

‎

‎তিনি আরও বলেন, “দুঃখজনকভাবে সরকারের অর্থ সহায়তাকারী প্রতিষ্ঠানগুলো এই শিল্পের প্রতি এখনো যথাযথ নজর দেয়নি। সহজ শর্তে ঋণ ও প্রয়োজনীয় সহায়তা পেলে এই খাত আরও বহুগুণে বিস্তৃত হতে পারত। হাজারো মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতো।

‎

‎নাঈম ইঞ্জিনিয়ারিং, স্টার ইঞ্জিনিয়ারিংসহ অসংখ্য ওয়ার্কশপে দিন-রাত কাজ করছেন দক্ষ কারিগররা। কোথাও আগুনের ফুলকি, কোথাও লোহার গন্ধ, কোথাও নিখুঁত পরিমাপে তৈরি হচ্ছে যন্ত্রাংশ। এই হাতেই গড়ে উঠছে দেশের শিল্পচাকা ঘোরানোর শক্তি।

‎

‎নাঈম ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের স্বত্বাধিকারী ও জেলা সমিতির সহসভাপতি মোঃ নাঈম খান এমাদি বলেন, “আমাদের এই শিল্পকে বছরের পর বছর অবহেলায় রাখা হয়েছে। পরিকল্পিত শিল্পাঞ্চল বা বিসিক এলাকা না থাকায় আমরা বিক্ষিপ্তভাবে কারখানা গড়ে তুলেছি। অথচ এই খাতের ইতিহাস প্রায় দেড়শ বছরের পুরোনো।

‎

‎তিনি বলেন, “শত বাধা, সীমাবদ্ধতা ও আর্থিক সংকটের মধ্যেও আমরা দেশীয় উৎপাদন ধরে রেখেছি। বিদেশি প্রযুক্তির বিকল্প এখন নিজেরাই তৈরি করছি। শুধু প্রয়োজন রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা।

‎

‎মেসার্স স্টার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের স্বত্বাধিকারী মোঃ শরিফ জানান, রেলের কোচ মেরামতের সময় ব্যবহৃত স্ক্রু লিফটিং জ্যাক আগে জার্মানি থেকে প্রায় দেড় কোটি টাকা ব্যয়ে আমদানি করা হতো। এখন একই জ্যাক দেশীয় কাঁচামাল দিয়ে তৈরি হচ্ছে মাত্র ৩৪ লাখ টাকায়। এতে বিপুল অর্থ সাশ্রয় হচ্ছে।

‎তিনি বলেন, “এটা শুধু উৎপাদন নয়, এটা আত্মনির্ভরতার গল্প। আমরা প্রমাণ করছি—বাংলাদেশের কারিগররাও জটিল প্রযুক্তি তৈরি করতে সক্ষম।”

‎

‎সৈয়দপুরের এই শিল্পকে সামনে এগিয়ে নিতে ৮ মে থেকে ১২ মে পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হয় লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্পমেলা। ৪৫টি স্টলে প্রদর্শিত হয় স্থানীয় কারখানাগুলোর তৈরি যন্ত্রপাতি ও স্পেয়ার পার্টস। রেলওয়ের যন্ত্রাংশ থেকে শুরু করে শিল্প, কৃষি ও দৈনন্দিন জীবনের নানা উপকরণ—সবকিছুই ছিল প্রদর্শনীর কেন্দ্রবিন্দু।

‎

‎শিল্পসংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, পরিকল্পিত শিল্প এলাকা, সহজ ঋণ সুবিধা এবং আধুনিক প্রযুক্তি নিশ্চিত করা গেলে সৈয়দপুর শুধু দেশের চাহিদাই পূরণ করবে না, ভবিষ্যতে বিদেশেও যন্ত্রপাতি রপ্তানির সক্ষমতা অর্জন করবে।

‎

‎আজ সৈয়দপুরের প্রতিটি ওয়ার্কশপ যেন একেকটি ক্ষুদ্র কারখানা, যেখানে ঘাম, আগুন আর দক্ষতা মিলে তৈরি হচ্ছে দেশের শিল্পভবিষ্যৎ। অবহেলার অন্ধকার পেরিয়ে এই জনপদ এখন এগিয়ে চলেছে আত্মনির্ভর শিল্পজাগরণের এক উজ্জ্বল পথে।

আপনার মতামত লিখুন

BD State News

মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬


সৈয়দপুরে লাইট ইন্জিনিয়ারিং শিল্পের জাগরণ ‎

প্রকাশের তারিখ : ১৩ মে ২০২৬

featured Image

‎ ইস্পাতের ঘর্ষণ, ওয়েল্ডিং আগুনের ঝলক আর লেদ মেশিনের নিরব ঘূর্ণনে সৈয়দপুরে নতুন শিল্পো স্বপ্নের  উদ্ভব ঘটেছে।

‎

‎শহর ও আশপাশে গড়ে ওঠা প্রায় ৬০টি লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং কারখানায় তৈরি হচ্ছে প্রায় ১০ হাজার ধরনের যন্ত্রপাতি ও স্পেয়ার পার্টস। এ সকল স্পেয়ার পার্টস বাংলাদেশ  রেলওয়ে, কয়লাখনি, তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র, কৃষিখাত, শিল্পকারখানাসহ সবখাতেই ব্যবহৃত হচ্ছে সৈয়দপুরে তৈরি দেশীয় এ যন্ত্রাংশ।

‎

‎শুধু বড় শিল্পই নয়, মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সূক্ষ্মতম প্রয়োজনীয় উপকরণ—একটি সুচ থেকে শুরু করে বিশাল শিল্পযন্ত্রের খুচরা যন্ত্রাংশ—সবই তৈরি হচ্ছে এই জনপদের লাইট ইন্জিনিয়ারিং শিল্পের কারখানায়।

‎

‎রেলওয়ে কারখানার অভিজ্ঞতা, দীর্ঘদিনের কারিগরি দক্ষতা আর প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে গড়ে ওঠা শ্রমশক্তির  মেলবন্ধনেই শক্ত ভিত পেয়েছে সৈয়দপুরের লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্প।

‎

‎স্থানীয় উদ্যোক্তারা বলছেন, বিদেশ থেকে আমদানি করা যন্ত্রাংশের বিকল্প এখন দেশের মাটিতেই তৈরি হচ্ছে। এতে যেমন খরচ কমছে, তেমনি বাড়ছে দেশীয় উৎপাদনের ওপর নির্ভরতা।

‎জেলা লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং সমিতির সভাপতি এরশাদ হোসেন পাপ্পু বলেন, “শুধু রেলওয়ে বা বিদ্যুৎ খাত নয়—দেশের প্রায় সব ধরনের শিল্প-কলকারখানার যন্ত্রপাতিই এখন সৈয়দপুরে তৈরি হচ্ছে। এমনকি মানুষের প্রাত্যহিক জীবনের ব্যবহৃত সুচ থেকে শুরু করে বড় শিল্পযন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ অংশ পর্যন্ত আমরা তৈরি করছি।”

‎

‎তিনি আরও বলেন, “দুঃখজনকভাবে সরকারের অর্থ সহায়তাকারী প্রতিষ্ঠানগুলো এই শিল্পের প্রতি এখনো যথাযথ নজর দেয়নি। সহজ শর্তে ঋণ ও প্রয়োজনীয় সহায়তা পেলে এই খাত আরও বহুগুণে বিস্তৃত হতে পারত। হাজারো মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতো।

‎

‎নাঈম ইঞ্জিনিয়ারিং, স্টার ইঞ্জিনিয়ারিংসহ অসংখ্য ওয়ার্কশপে দিন-রাত কাজ করছেন দক্ষ কারিগররা। কোথাও আগুনের ফুলকি, কোথাও লোহার গন্ধ, কোথাও নিখুঁত পরিমাপে তৈরি হচ্ছে যন্ত্রাংশ। এই হাতেই গড়ে উঠছে দেশের শিল্পচাকা ঘোরানোর শক্তি।

‎

‎নাঈম ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের স্বত্বাধিকারী ও জেলা সমিতির সহসভাপতি মোঃ নাঈম খান এমাদি বলেন, “আমাদের এই শিল্পকে বছরের পর বছর অবহেলায় রাখা হয়েছে। পরিকল্পিত শিল্পাঞ্চল বা বিসিক এলাকা না থাকায় আমরা বিক্ষিপ্তভাবে কারখানা গড়ে তুলেছি। অথচ এই খাতের ইতিহাস প্রায় দেড়শ বছরের পুরোনো।

‎

‎তিনি বলেন, “শত বাধা, সীমাবদ্ধতা ও আর্থিক সংকটের মধ্যেও আমরা দেশীয় উৎপাদন ধরে রেখেছি। বিদেশি প্রযুক্তির বিকল্প এখন নিজেরাই তৈরি করছি। শুধু প্রয়োজন রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা।

‎

‎মেসার্স স্টার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের স্বত্বাধিকারী মোঃ শরিফ জানান, রেলের কোচ মেরামতের সময় ব্যবহৃত স্ক্রু লিফটিং জ্যাক আগে জার্মানি থেকে প্রায় দেড় কোটি টাকা ব্যয়ে আমদানি করা হতো। এখন একই জ্যাক দেশীয় কাঁচামাল দিয়ে তৈরি হচ্ছে মাত্র ৩৪ লাখ টাকায়। এতে বিপুল অর্থ সাশ্রয় হচ্ছে।

‎তিনি বলেন, “এটা শুধু উৎপাদন নয়, এটা আত্মনির্ভরতার গল্প। আমরা প্রমাণ করছি—বাংলাদেশের কারিগররাও জটিল প্রযুক্তি তৈরি করতে সক্ষম।”

‎

‎সৈয়দপুরের এই শিল্পকে সামনে এগিয়ে নিতে ৮ মে থেকে ১২ মে পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হয় লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্পমেলা। ৪৫টি স্টলে প্রদর্শিত হয় স্থানীয় কারখানাগুলোর তৈরি যন্ত্রপাতি ও স্পেয়ার পার্টস। রেলওয়ের যন্ত্রাংশ থেকে শুরু করে শিল্প, কৃষি ও দৈনন্দিন জীবনের নানা উপকরণ—সবকিছুই ছিল প্রদর্শনীর কেন্দ্রবিন্দু।

‎

‎শিল্পসংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, পরিকল্পিত শিল্প এলাকা, সহজ ঋণ সুবিধা এবং আধুনিক প্রযুক্তি নিশ্চিত করা গেলে সৈয়দপুর শুধু দেশের চাহিদাই পূরণ করবে না, ভবিষ্যতে বিদেশেও যন্ত্রপাতি রপ্তানির সক্ষমতা অর্জন করবে।

‎

‎আজ সৈয়দপুরের প্রতিটি ওয়ার্কশপ যেন একেকটি ক্ষুদ্র কারখানা, যেখানে ঘাম, আগুন আর দক্ষতা মিলে তৈরি হচ্ছে দেশের শিল্পভবিষ্যৎ। অবহেলার অন্ধকার পেরিয়ে এই জনপদ এখন এগিয়ে চলেছে আত্মনির্ভর শিল্পজাগরণের এক উজ্জ্বল পথে।


BD State News

সম্পাদক: আবদুর রাকিব

কপিরাইট © ২০২৬ BD State News । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত