রেলের ইস্পাত চাকার ঘর্ষণে যে শব্দ জন্ম নেয়—টং টং, ঝমঝম, ধুকধুক—তা শুধু যান্ত্রিক আওয়াজ নয়; তা এক জনপদের জীবন, শ্রম আর স্বপ্নের নীরব সংগীত। সেই সংগীতের কেন্দ্রবিন্দু দেশের ঐতিহ্যবাহী সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানা, যেখানে শতবর্ষের ইতিহাস, শ্রমিকের ঘাম আর রেলের গতিময়তা এক সুতোয় গাঁথা।
সীমিত সক্ষমতা, পুরাতন যন্ত্রপাতি এবং দীর্ঘদিনের অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে এই কারখানা আজ অনেকটাই ধুঁকে ধুঁকে চলছে। একসময় যেখানে একসঙ্গে বহু ক্যারেজ মেরামত হতো, সেখানে এখন মাত্র তিনটি ক্যারেজ মেরামতের সক্ষমতায় কার্যক্রম চালাতে হচ্ছে। সময়ের সঙ্গে তাল মেলাতে না পারা এই প্রতিষ্ঠানটি তাই এক ধরনের স্থবিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
তবুও থেমে নেই কারখানার জীবন। পুরনো মেশিনের কর্কশ শব্দ, লোহার ওপর হাতুড়ির আঘাত—সব মিলিয়ে যেন এক অনবরত সংগ্রামের চিত্র। শ্রমিকদের ঘাম ঝরা পরিশ্রমে এখনো টিকে আছে এই কারখানার প্রাণ।
এই বাস্তবতার মধ্যেই নতুন আশার আলো হয়ে আসেন বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক মো. আফজাল হোসেন।
সোমবার (২৭ এপ্রিল) বিকেলে কারখানা পরিদর্শন শেষে বিভাগীয় তত্ত্বাবধায়কের কার্যালয়ের সামনে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানার সক্ষমতা বাড়াতে একটি নতুন প্রকল্প গ্রহণের পরিকল্পনায় একটি স্বতন্ত্র বগি অ্যাসেম্বলি উপকারখানা স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এটি বাস্তবায়িত হলে কারখানার উৎপাদন সক্ষমতায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে। বর্তমানে যে সক্ষমতায় তিনটি ক্যারেজ মেরামত করা যায়, তা বেড়ে ১০টি পর্যন্ত উন্নীত করা সম্ভব হবে।
এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)-এর ৭ জনের একটি প্রতিনিধি দল। তারা কারখানার বর্তমান অবস্থা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা সরেজমিনে পরিদর্শন করেন। তাদের উপস্থিতি যেন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণের স্বীকৃতির মতো—এই কারখানায় এখনো উন্নয়নের সম্ভাবনা উজ্জ্বল।
কারখানার ভেতরে হাঁটলে দেখা যায় পুরনো যন্ত্রের পাশে দাঁড়িয়ে শ্রমিকদের অবিরাম পরিশ্রম। তাদের মুখে ক্লান্তি থাকলেও চোখে এখনো গর্ব। তারা জানে, এই কারখানার ইতিহাস তাদের হাতেই লেখা। আধুনিক যন্ত্রপাতির অভাব থাকলেও তারা থেমে নেই—প্রতিদিনই তারা সময়ের সঙ্গে লড়াই করছে।
পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন মো. আফজাল হোসেন, মহাপরিচালক ও বাংলাদেশ রেলওয়ে এবং এফ এম মহিউদ্দিন, অতিরিক্ত মহাপরিচালক (রোলিং স্টক)।
রেলের ইস্পাত কণ্ঠের মতোই দৃঢ়ভাবে তারা তুলে ধরেন কারখানার বর্তমান বাস্তবতা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা। তাদের বক্তব্যে উঠে আসে—সীমাবদ্ধতা থাকলেও এই কারখানাকে আধুনিকায়নের মাধ্যমে একটি শক্তিশালী উৎপাদন কেন্দ্রে রূপান্তরের সম্ভাবনা রয়েছে।
এ সময় রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক এফ এম মহিউদ্দিন, রেল পশ্চিমাঞ্চলের জিএম ফরিদ আহমেদ,অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অবকাঠামো)- আলফাত্তাহ মোঃ মাসউদুর রহমান, প্রধান প্রকৌশলী/পশ্চিম- মোঃ আহসান জাবির, প্রধান যন্ত্র প্রকৌশলী/পশ্চিম- মোঃ আমিনুল হাসান, এই প্রকল্পের কনসালটেন্ট টিমের মোঃ মিজানুর রহমান ও দুলাল রায়, ভূ-সম্পত্তি বিভাগের সহকারী নির্বাহী প্রকৌশলী (এইএন) তহিদুল ইসলাম, ঊর্ধ্বতন সহকারী প্রকৌশলী/কার্য (আইওডব্লিউ) শরিফুল ইসলামসহ কারখানা ও ওপেন লাইন বিভাগের বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন বগি অ্যাসেম্বলি উপকারখানা বাস্তবায়িত হলে শুধু উৎপাদন ক্ষমতাই বাড়বে না, বরং উত্তরাঞ্চলের অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। বাড়বে কর্মসংস্থান, গতি আসবে স্থানীয় শিল্পে এবং রেলওয়ের সার্বিক কার্যক্রমে। সাথে দীর্ঘদিনের অবহেলা, পুরনো প্রযুক্তি এবং সীমিত বাজেট বাস্তবায়নের পথে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
তবে এ কারখানার বাইরে পুরনো রেললাইনগুলোতে চলাচলকারী অসংখ্য ট্রেন মানুষের আশা ও সুখ সমৃদ্ধির স্বপ্ন বহন করত। আজও সেই রেললাইনগুকো নিঃশব্দে অপেক্ষা করছে মহাকর্মযজ্ঞের সেই চঞ্চলতার প্রহর। আর এটি বাস্তবায়ন হলে এ কারখানায় যন্ত্রের পুনঃজাগরন ঘটবে। উন্নয়নের ছোয়ায় বদলে যাবে এ জনপদের অর্থনীতির চিত্র। এমন প্রত্যাশা সকলের।

মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৮ এপ্রিল ২০২৬
রেলের ইস্পাত চাকার ঘর্ষণে যে শব্দ জন্ম নেয়—টং টং, ঝমঝম, ধুকধুক—তা শুধু যান্ত্রিক আওয়াজ নয়; তা এক জনপদের জীবন, শ্রম আর স্বপ্নের নীরব সংগীত। সেই সংগীতের কেন্দ্রবিন্দু দেশের ঐতিহ্যবাহী সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানা, যেখানে শতবর্ষের ইতিহাস, শ্রমিকের ঘাম আর রেলের গতিময়তা এক সুতোয় গাঁথা।
সীমিত সক্ষমতা, পুরাতন যন্ত্রপাতি এবং দীর্ঘদিনের অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে এই কারখানা আজ অনেকটাই ধুঁকে ধুঁকে চলছে। একসময় যেখানে একসঙ্গে বহু ক্যারেজ মেরামত হতো, সেখানে এখন মাত্র তিনটি ক্যারেজ মেরামতের সক্ষমতায় কার্যক্রম চালাতে হচ্ছে। সময়ের সঙ্গে তাল মেলাতে না পারা এই প্রতিষ্ঠানটি তাই এক ধরনের স্থবিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
তবুও থেমে নেই কারখানার জীবন। পুরনো মেশিনের কর্কশ শব্দ, লোহার ওপর হাতুড়ির আঘাত—সব মিলিয়ে যেন এক অনবরত সংগ্রামের চিত্র। শ্রমিকদের ঘাম ঝরা পরিশ্রমে এখনো টিকে আছে এই কারখানার প্রাণ।
এই বাস্তবতার মধ্যেই নতুন আশার আলো হয়ে আসেন বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক মো. আফজাল হোসেন।
সোমবার (২৭ এপ্রিল) বিকেলে কারখানা পরিদর্শন শেষে বিভাগীয় তত্ত্বাবধায়কের কার্যালয়ের সামনে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানার সক্ষমতা বাড়াতে একটি নতুন প্রকল্প গ্রহণের পরিকল্পনায় একটি স্বতন্ত্র বগি অ্যাসেম্বলি উপকারখানা স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এটি বাস্তবায়িত হলে কারখানার উৎপাদন সক্ষমতায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে। বর্তমানে যে সক্ষমতায় তিনটি ক্যারেজ মেরামত করা যায়, তা বেড়ে ১০টি পর্যন্ত উন্নীত করা সম্ভব হবে।
এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)-এর ৭ জনের একটি প্রতিনিধি দল। তারা কারখানার বর্তমান অবস্থা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা সরেজমিনে পরিদর্শন করেন। তাদের উপস্থিতি যেন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণের স্বীকৃতির মতো—এই কারখানায় এখনো উন্নয়নের সম্ভাবনা উজ্জ্বল।
কারখানার ভেতরে হাঁটলে দেখা যায় পুরনো যন্ত্রের পাশে দাঁড়িয়ে শ্রমিকদের অবিরাম পরিশ্রম। তাদের মুখে ক্লান্তি থাকলেও চোখে এখনো গর্ব। তারা জানে, এই কারখানার ইতিহাস তাদের হাতেই লেখা। আধুনিক যন্ত্রপাতির অভাব থাকলেও তারা থেমে নেই—প্রতিদিনই তারা সময়ের সঙ্গে লড়াই করছে।
পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন মো. আফজাল হোসেন, মহাপরিচালক ও বাংলাদেশ রেলওয়ে এবং এফ এম মহিউদ্দিন, অতিরিক্ত মহাপরিচালক (রোলিং স্টক)।
রেলের ইস্পাত কণ্ঠের মতোই দৃঢ়ভাবে তারা তুলে ধরেন কারখানার বর্তমান বাস্তবতা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা। তাদের বক্তব্যে উঠে আসে—সীমাবদ্ধতা থাকলেও এই কারখানাকে আধুনিকায়নের মাধ্যমে একটি শক্তিশালী উৎপাদন কেন্দ্রে রূপান্তরের সম্ভাবনা রয়েছে।
এ সময় রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক এফ এম মহিউদ্দিন, রেল পশ্চিমাঞ্চলের জিএম ফরিদ আহমেদ,অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অবকাঠামো)- আলফাত্তাহ মোঃ মাসউদুর রহমান, প্রধান প্রকৌশলী/পশ্চিম- মোঃ আহসান জাবির, প্রধান যন্ত্র প্রকৌশলী/পশ্চিম- মোঃ আমিনুল হাসান, এই প্রকল্পের কনসালটেন্ট টিমের মোঃ মিজানুর রহমান ও দুলাল রায়, ভূ-সম্পত্তি বিভাগের সহকারী নির্বাহী প্রকৌশলী (এইএন) তহিদুল ইসলাম, ঊর্ধ্বতন সহকারী প্রকৌশলী/কার্য (আইওডব্লিউ) শরিফুল ইসলামসহ কারখানা ও ওপেন লাইন বিভাগের বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন বগি অ্যাসেম্বলি উপকারখানা বাস্তবায়িত হলে শুধু উৎপাদন ক্ষমতাই বাড়বে না, বরং উত্তরাঞ্চলের অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। বাড়বে কর্মসংস্থান, গতি আসবে স্থানীয় শিল্পে এবং রেলওয়ের সার্বিক কার্যক্রমে। সাথে দীর্ঘদিনের অবহেলা, পুরনো প্রযুক্তি এবং সীমিত বাজেট বাস্তবায়নের পথে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
তবে এ কারখানার বাইরে পুরনো রেললাইনগুলোতে চলাচলকারী অসংখ্য ট্রেন মানুষের আশা ও সুখ সমৃদ্ধির স্বপ্ন বহন করত। আজও সেই রেললাইনগুকো নিঃশব্দে অপেক্ষা করছে মহাকর্মযজ্ঞের সেই চঞ্চলতার প্রহর। আর এটি বাস্তবায়ন হলে এ কারখানায় যন্ত্রের পুনঃজাগরন ঘটবে। উন্নয়নের ছোয়ায় বদলে যাবে এ জনপদের অর্থনীতির চিত্র। এমন প্রত্যাশা সকলের।

আপনার মতামত লিখুন