সমুদ্রকন্যা কুয়াকাটার আদিম অধিবাসী রাখাইন সম্প্রদায়। তাদের হাত ধরেই এই উপকূলীয় জনপদে একসময় সভ্যতার আলো জ্বলেছিল। কিন্তু সেই ঐতিহ্যের ধারক ‘রাখাইন কালচারাল একাডেমি’ আজ নিজেই অস্তিত্ব সংকটে। দীর্ঘ আট বছর ধরে কার্যক্রম বন্ধ থাকায় এবং মূল ভবনটি ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ায় বিলুপ্তির পথে এই জনগোষ্ঠীর ভাষা, শিক্ষা ও সংস্কৃতি।
সমুদ্রের লোনা হাওয়ার সাথে মিশে আছে যে ইতিহাস, তা রাখাইনদের। ১৭৮৪ সালে আরাকান থেকে বিতাড়িত হয়ে ১৫০টি রাখাইন পরিবার কুয়াকাটার এই সৈকতে প্রথম বসতি স্থাপন করেছিল। বন্য পশুপাখি আর গহীন জঙ্গল পরিষ্কার করে তারা গড়ে তুলেছিল এক সমৃদ্ধ জনপদ। অথচ আজ সেই আদিম অধিবাসীদের ভাষা ও সংস্কৃতি রক্ষার প্রধান দুর্গ ‘কুয়াকাটা রাখাইন কালচারাল একাডেমি’ নিজেই এখন ধ্বংসস্তূপ। ভবনটির গায়ে পড়া ফাটল যেন এই প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর হৃদয়ে জমা হওয়া ক্ষোভের প্রতিচ্ছবি।
১৯৯৮ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করেছিল কুয়াকাটা রাখাইন কালচারাল একাডেমি। উদ্দেশ্য ছিল—রাখাইনদের নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতিকে বিশ্বদরবারে তুলে ধরা। কিন্তু সরেজমিনে দেখা যায়, একাডেমির ভবনে বড় বড় ফাটল ধরেছে, ছাদ থেকে খসে পড়ছে পলেস্তারা। চারপাশ ময়লার দখলে স্তূপে ঢাকা পড়ে এটি এখন এক ভুতুড়ে ভবনে পরিণত হয়েছে। ভবনটি পরিত্যক্ত ঘোষিত না হলেও জননিরাপত্তার জন্য এখন হুমকি। ভেতরে জমেছে ময়লার স্তূপ, আর বাইরে ঝুলছে স্থবিরতার তালা।
একাডেমির কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে রাখাইন তরুণ সমাজ। কেরানীপাড়ার একাধিক শিক্ষার্থীর সাথে কথা বলে জানা যায়, পাড়ায় কোনো নির্দিষ্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা শিক্ষক নেই। ফলে বর্তমান প্রজন্মের অনেকেই তাদের নিজস্ব ভাষায় কথা বলতে পারলেও বর্ণমালার সাথে পরিচিতি হারাচ্ছে।
শিক্ষার্থী রাখাইন মং-এর ভাষ্যমতে— কুয়াকাটা পর্যটন কেন্দ্র হওয়া সত্ত্বেও আমাদের সংস্কৃতির কোনো চর্চা নেই। কুয়াকাটা একটি আন্তর্জাতিক পর্যটন কেন্দ্র। অথচ এখানে আগত দেশি-বিদেশি পর্যটকদের সামনে রাখাইন সংস্কৃতি প্রদর্শনের কোনো প্ল্যাটফর্ম নেই।
একাডেমির বর্তমান সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও)। তবে সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, সরকারি তদারকির অভাব এবং স্থানীয় পর্যায়ে কমিটির দ্বন্দ্বে প্রতিষ্ঠানটি স্থবির হয়ে পড়েছে।
রাখাইন কালচারাল একাডেমির অ্যাডহক কমিটির সাধারণ সম্পাদক এমং তালুকদার জানান, এলাকার বাইরের কিছু লোক প্রশাসনকে ভুল বুঝিয়ে অ্যাডহক কমিটি গঠন করলেও আট বছরেও কোনো আলোর মুখ দেখেনি। বর্তমান কমিটি এবং ভবন সংস্কার নিয়ে সরকারের উদাসীনতায় আমরা এখন প্রশ্নের সম্মুখীন।
শুধু রাখাইনরাই নয়, স্থানীয় মুসলিম সমাজও এই একাডেমি সচলের দাবি জানিয়েছে। তাদের মতে, রাখাইনদের ইতিহাস কুয়াকাটার অবিচ্ছেদ্য অংশ। এটি রক্ষা করা না গেলে কুয়াকাটার পর্যটন গুরুত্বও ম্লান হবে।
রাখাইন সচেতন মহল ও সংশ্লিষ্টরা দ্রুত সমাধানের জন্য সরকারের কাছে তিনটি প্রধান দাবি জানিয়েছেন যে, জরাজীর্ণ ভবনটি ভেঙে কোনো হাউজিং কোম্পানির মাধ্যমে সরকারি তত্ত্বাবধানে একটি বহুতল ভবন নির্মাণ করা। যেখানে উপরে বাণিজ্যিক অংশ থাকবে এবং নিচের তলাগুলোতে কালচারাল একাডেমির কার্যক্রম চলবে। ভবনের বাণিজ্যিক আয় থেকে অসচ্ছল রাখাইন পরিবারগুলোকে সহায়তা করা এবং তরুণদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা। নিজস্ব ভাষার বই, দক্ষ শিক্ষক এবং নিয়মিত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা, যাতে দেশি-বিদেশি পর্যটকরা রাখাইন সাংস্কৃতি উপভোগ করতে পারেন।
কুয়াকাটা এখন আন্তর্জাতিক পর্যটন কেন্দ্র। এই পর্যটনের অন্যতম বড় আকর্ষণ হতে পারতো রাখাইন সংস্কৃতি। অথচ সরকারি উদাসীনতায় তা এখন বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে একসময় উপকূলীয় জনপদ থেকে হারিয়ে যাবে এই অনন্য জাতিগোষ্ঠীর পরিচয়।

মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৭ এপ্রিল ২০২৬
সমুদ্রকন্যা কুয়াকাটার আদিম অধিবাসী রাখাইন সম্প্রদায়। তাদের হাত ধরেই এই উপকূলীয় জনপদে একসময় সভ্যতার আলো জ্বলেছিল। কিন্তু সেই ঐতিহ্যের ধারক ‘রাখাইন কালচারাল একাডেমি’ আজ নিজেই অস্তিত্ব সংকটে। দীর্ঘ আট বছর ধরে কার্যক্রম বন্ধ থাকায় এবং মূল ভবনটি ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ায় বিলুপ্তির পথে এই জনগোষ্ঠীর ভাষা, শিক্ষা ও সংস্কৃতি।
সমুদ্রের লোনা হাওয়ার সাথে মিশে আছে যে ইতিহাস, তা রাখাইনদের। ১৭৮৪ সালে আরাকান থেকে বিতাড়িত হয়ে ১৫০টি রাখাইন পরিবার কুয়াকাটার এই সৈকতে প্রথম বসতি স্থাপন করেছিল। বন্য পশুপাখি আর গহীন জঙ্গল পরিষ্কার করে তারা গড়ে তুলেছিল এক সমৃদ্ধ জনপদ। অথচ আজ সেই আদিম অধিবাসীদের ভাষা ও সংস্কৃতি রক্ষার প্রধান দুর্গ ‘কুয়াকাটা রাখাইন কালচারাল একাডেমি’ নিজেই এখন ধ্বংসস্তূপ। ভবনটির গায়ে পড়া ফাটল যেন এই প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর হৃদয়ে জমা হওয়া ক্ষোভের প্রতিচ্ছবি।
১৯৯৮ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করেছিল কুয়াকাটা রাখাইন কালচারাল একাডেমি। উদ্দেশ্য ছিল—রাখাইনদের নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতিকে বিশ্বদরবারে তুলে ধরা। কিন্তু সরেজমিনে দেখা যায়, একাডেমির ভবনে বড় বড় ফাটল ধরেছে, ছাদ থেকে খসে পড়ছে পলেস্তারা। চারপাশ ময়লার দখলে স্তূপে ঢাকা পড়ে এটি এখন এক ভুতুড়ে ভবনে পরিণত হয়েছে। ভবনটি পরিত্যক্ত ঘোষিত না হলেও জননিরাপত্তার জন্য এখন হুমকি। ভেতরে জমেছে ময়লার স্তূপ, আর বাইরে ঝুলছে স্থবিরতার তালা।
একাডেমির কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে রাখাইন তরুণ সমাজ। কেরানীপাড়ার একাধিক শিক্ষার্থীর সাথে কথা বলে জানা যায়, পাড়ায় কোনো নির্দিষ্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা শিক্ষক নেই। ফলে বর্তমান প্রজন্মের অনেকেই তাদের নিজস্ব ভাষায় কথা বলতে পারলেও বর্ণমালার সাথে পরিচিতি হারাচ্ছে।
শিক্ষার্থী রাখাইন মং-এর ভাষ্যমতে— কুয়াকাটা পর্যটন কেন্দ্র হওয়া সত্ত্বেও আমাদের সংস্কৃতির কোনো চর্চা নেই। কুয়াকাটা একটি আন্তর্জাতিক পর্যটন কেন্দ্র। অথচ এখানে আগত দেশি-বিদেশি পর্যটকদের সামনে রাখাইন সংস্কৃতি প্রদর্শনের কোনো প্ল্যাটফর্ম নেই।
একাডেমির বর্তমান সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও)। তবে সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, সরকারি তদারকির অভাব এবং স্থানীয় পর্যায়ে কমিটির দ্বন্দ্বে প্রতিষ্ঠানটি স্থবির হয়ে পড়েছে।
রাখাইন কালচারাল একাডেমির অ্যাডহক কমিটির সাধারণ সম্পাদক এমং তালুকদার জানান, এলাকার বাইরের কিছু লোক প্রশাসনকে ভুল বুঝিয়ে অ্যাডহক কমিটি গঠন করলেও আট বছরেও কোনো আলোর মুখ দেখেনি। বর্তমান কমিটি এবং ভবন সংস্কার নিয়ে সরকারের উদাসীনতায় আমরা এখন প্রশ্নের সম্মুখীন।
শুধু রাখাইনরাই নয়, স্থানীয় মুসলিম সমাজও এই একাডেমি সচলের দাবি জানিয়েছে। তাদের মতে, রাখাইনদের ইতিহাস কুয়াকাটার অবিচ্ছেদ্য অংশ। এটি রক্ষা করা না গেলে কুয়াকাটার পর্যটন গুরুত্বও ম্লান হবে।
রাখাইন সচেতন মহল ও সংশ্লিষ্টরা দ্রুত সমাধানের জন্য সরকারের কাছে তিনটি প্রধান দাবি জানিয়েছেন যে, জরাজীর্ণ ভবনটি ভেঙে কোনো হাউজিং কোম্পানির মাধ্যমে সরকারি তত্ত্বাবধানে একটি বহুতল ভবন নির্মাণ করা। যেখানে উপরে বাণিজ্যিক অংশ থাকবে এবং নিচের তলাগুলোতে কালচারাল একাডেমির কার্যক্রম চলবে। ভবনের বাণিজ্যিক আয় থেকে অসচ্ছল রাখাইন পরিবারগুলোকে সহায়তা করা এবং তরুণদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা। নিজস্ব ভাষার বই, দক্ষ শিক্ষক এবং নিয়মিত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা, যাতে দেশি-বিদেশি পর্যটকরা রাখাইন সাংস্কৃতি উপভোগ করতে পারেন।
কুয়াকাটা এখন আন্তর্জাতিক পর্যটন কেন্দ্র। এই পর্যটনের অন্যতম বড় আকর্ষণ হতে পারতো রাখাইন সংস্কৃতি। অথচ সরকারি উদাসীনতায় তা এখন বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে একসময় উপকূলীয় জনপদ থেকে হারিয়ে যাবে এই অনন্য জাতিগোষ্ঠীর পরিচয়।

আপনার মতামত লিখুন