ঐতিহ্যের পুনর্জাগরণ। আধুনিক প্রযুক্তির ভিড়ে হাত পাখা প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছিল। কিন্তু প্রাণ বাঁচাতে 'হাত পাখার' কাছে ফিরতে হচ্ছে। বর্তমান জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকট যেন সেই পুরোনো ঐতিহ্যকে আবার সামনে নিয়ে এসেছে।
যুক্তির উৎকর্ষতায় ঘরে ঘরে এখন বৈদ্যুতিক পাখা, এসি কিংবা রিচার্জেবল ফ্যান। তীব্র দাবদাহ আর লোডশেডিংয়ের কবলে পড়ে যখন আধুনিক সভ্যতা স্থবির হয়ে পড়ে, তখন পরম বন্ধুর মতো স্বস্তি দিতে ফিরে এসেছে সেই অতি চেনা ‘হাত পাখা’। কেবল বাতাস দেয়াই না, হাত পাখা আমাদের লোকজ সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং শৈল্পিক নিদর্শনের ধারক।
হাত পাখা বলতেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে নকশা করা সুতার কাজ কিংবা তালপাতার বাঁটুনি। এক সময় বাংলার ঘরে ঘরে সখীরা মিলে তৈরি করতেন নকশি পাখা। সুতি কাপড়, পুরোনো শাড়ি বা লুঙ্গির পাড় দিয়ে তৈরি এই পাখায় ফুটে উঠত ফুল, লতাপাতা, পাখি কিংবা গ্রামীণ জীবনের নানা দৃশ্য। শুধু বাতাস নয়, মেহমানদারিতেও হাত পাখার ছিল বিশেষ মর্যাদা। প্রচণ্ড গরমে অতিথিকে বসিয়ে হাত পাখার বাতাস করা ছিল বাঙালি শিষ্টাচারের অন্যতম বড়ো অংশ।
উপাদান ও গঠন ভেদে হাত পাখার রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন রূপ। তালপাতার পাখা সবচেয়ে জনপ্রিয় ও সহজলভ্য। এর গোল আকৃতি আর খসখসে শব্দ যেন গ্রামবাংলার দুপুরের স্মারক। নকশি পাখা বাঁশের কাঠি ও সুতোর বুননে তৈরি এই পাখা মূলত কারুশিল্পের নিদর্শন। সুতা ও কাপড়ের পাখা গোল বা চারকোনা ফ্রেমের ওপর কাপড় বসিয়ে তাতে লাল-নীল সুতোর কাজ করা হয়। শীতল পাটির পাখা মুর্তা বা পাটি বেত দিয়ে তৈরি এই পাখা অধিক শীতলতার জন্য পরিচিত।
আধুনিকতার চাপে হাত পাখার কারিগররা এখন অনেকটা কোণঠাসা। তবে বর্তমান জ্বালানি সংকট ও অসহনীয় লোডশেডিংয়ের কারণে এই আদি ঐতিহ্যের কদর আবার নতুন করে বাড়ছে। বিশেষ করে দোহার-নবাবগঞ্জের মতো এলাকাগুলোতে যেখানে বিদ্যুতের বিভ্রাট বেশি, সেখানে হাত পাখাই এখন সাধারণ মানুষের সবচেয়ে বড় ভরসা। হাট-বাজারে এখন প্লাস্টিকের পাখার ভিড় থাকলেও তালপাতা বা সুতোর পাখার আবেদন আজও অমলিন। এক সময় শৌখিনতার প্রতীক থাকলেও এখন হাত পাখা এই অঞ্চলের প্রতিটি পরিবারের অনিবার্য অনুষঙ্গ। বিদ্যুতের ‘ভেলকিবাজিতে’ রিচার্জেবল ফ্যানগুলোও যখন চার্জশূন্য হয়ে অকেজো হয়ে পড়ছে, তখন তালপাতা বা প্লাস্টিকের হাত পাখাই একমাত্র স্বস্তি দিচ্ছে। বিশেষ করে মাঝরাতে যখন লোডশেডিং শুরু হয়, তখন শিশুদের ঘুম নিশ্চিত করতে এবং বয়স্কদের স্বস্তি দিতে হাত পাখার কোনো বিকল্প থাকছে না।
হাত পাখা কেবল একটি পণ্য নয়, এটি আমাদের কয়েক হাজার বছরের কৃষ্টি। চৈত্র-বৈশাখের কাঠফাটা রোদ আর ভ্যাপসা গরমে পুড়ছে ঢাকার দোহার ও নবাবগঞ্জ উপজেলা। এর ওপর মরার ওপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দাঁড়িয়েছে বিদ্যুতের বিরামহীন লোডশেডিং। দিনে-রাতে অন্তত ৬ থেকে ৮ বার বিদ্যুতের যাওয়া-আসায় অতিষ্ঠ জনপদ। যান্ত্রিক পাখা যখন স্থবির, তখন জীবন বাঁচাতে এই অঞ্চলের মানুষের কাছে পরম বন্ধু হয়ে ধরা দিয়েছে গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী হাত পাখা। বৈশাখি মেলা কিংবা লোকজ উৎসবে আজও এই পাখার পসরা দেখা যায়। তবে কাঁচামালের অভাব এবং যান্ত্রিক সরঞ্জামের সহজলভ্যতায় এই শিল্পটি আজ বিলুপ্তির পথে। সচেতন মহলের মতে, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও কারিগরদের সহায়তা দিলে এই গ্রামীণ কুটির শিল্পটি যেমন টিকে থাকবে, তেমনি পরিবেশবান্ধব এই অনুষঙ্গটি আমাদের ঐতিহ্যের স্মারক হয়ে বেঁচে থাকবে প্রজন্মের পর প্রজন্ম।

মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৬ এপ্রিল ২০২৬
ঐতিহ্যের পুনর্জাগরণ। আধুনিক প্রযুক্তির ভিড়ে হাত পাখা প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছিল। কিন্তু প্রাণ বাঁচাতে 'হাত পাখার' কাছে ফিরতে হচ্ছে। বর্তমান জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকট যেন সেই পুরোনো ঐতিহ্যকে আবার সামনে নিয়ে এসেছে।
যুক্তির উৎকর্ষতায় ঘরে ঘরে এখন বৈদ্যুতিক পাখা, এসি কিংবা রিচার্জেবল ফ্যান। তীব্র দাবদাহ আর লোডশেডিংয়ের কবলে পড়ে যখন আধুনিক সভ্যতা স্থবির হয়ে পড়ে, তখন পরম বন্ধুর মতো স্বস্তি দিতে ফিরে এসেছে সেই অতি চেনা ‘হাত পাখা’। কেবল বাতাস দেয়াই না, হাত পাখা আমাদের লোকজ সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং শৈল্পিক নিদর্শনের ধারক।
হাত পাখা বলতেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে নকশা করা সুতার কাজ কিংবা তালপাতার বাঁটুনি। এক সময় বাংলার ঘরে ঘরে সখীরা মিলে তৈরি করতেন নকশি পাখা। সুতি কাপড়, পুরোনো শাড়ি বা লুঙ্গির পাড় দিয়ে তৈরি এই পাখায় ফুটে উঠত ফুল, লতাপাতা, পাখি কিংবা গ্রামীণ জীবনের নানা দৃশ্য। শুধু বাতাস নয়, মেহমানদারিতেও হাত পাখার ছিল বিশেষ মর্যাদা। প্রচণ্ড গরমে অতিথিকে বসিয়ে হাত পাখার বাতাস করা ছিল বাঙালি শিষ্টাচারের অন্যতম বড়ো অংশ।
উপাদান ও গঠন ভেদে হাত পাখার রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন রূপ। তালপাতার পাখা সবচেয়ে জনপ্রিয় ও সহজলভ্য। এর গোল আকৃতি আর খসখসে শব্দ যেন গ্রামবাংলার দুপুরের স্মারক। নকশি পাখা বাঁশের কাঠি ও সুতোর বুননে তৈরি এই পাখা মূলত কারুশিল্পের নিদর্শন। সুতা ও কাপড়ের পাখা গোল বা চারকোনা ফ্রেমের ওপর কাপড় বসিয়ে তাতে লাল-নীল সুতোর কাজ করা হয়। শীতল পাটির পাখা মুর্তা বা পাটি বেত দিয়ে তৈরি এই পাখা অধিক শীতলতার জন্য পরিচিত।
আধুনিকতার চাপে হাত পাখার কারিগররা এখন অনেকটা কোণঠাসা। তবে বর্তমান জ্বালানি সংকট ও অসহনীয় লোডশেডিংয়ের কারণে এই আদি ঐতিহ্যের কদর আবার নতুন করে বাড়ছে। বিশেষ করে দোহার-নবাবগঞ্জের মতো এলাকাগুলোতে যেখানে বিদ্যুতের বিভ্রাট বেশি, সেখানে হাত পাখাই এখন সাধারণ মানুষের সবচেয়ে বড় ভরসা। হাট-বাজারে এখন প্লাস্টিকের পাখার ভিড় থাকলেও তালপাতা বা সুতোর পাখার আবেদন আজও অমলিন। এক সময় শৌখিনতার প্রতীক থাকলেও এখন হাত পাখা এই অঞ্চলের প্রতিটি পরিবারের অনিবার্য অনুষঙ্গ। বিদ্যুতের ‘ভেলকিবাজিতে’ রিচার্জেবল ফ্যানগুলোও যখন চার্জশূন্য হয়ে অকেজো হয়ে পড়ছে, তখন তালপাতা বা প্লাস্টিকের হাত পাখাই একমাত্র স্বস্তি দিচ্ছে। বিশেষ করে মাঝরাতে যখন লোডশেডিং শুরু হয়, তখন শিশুদের ঘুম নিশ্চিত করতে এবং বয়স্কদের স্বস্তি দিতে হাত পাখার কোনো বিকল্প থাকছে না।
হাত পাখা কেবল একটি পণ্য নয়, এটি আমাদের কয়েক হাজার বছরের কৃষ্টি। চৈত্র-বৈশাখের কাঠফাটা রোদ আর ভ্যাপসা গরমে পুড়ছে ঢাকার দোহার ও নবাবগঞ্জ উপজেলা। এর ওপর মরার ওপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দাঁড়িয়েছে বিদ্যুতের বিরামহীন লোডশেডিং। দিনে-রাতে অন্তত ৬ থেকে ৮ বার বিদ্যুতের যাওয়া-আসায় অতিষ্ঠ জনপদ। যান্ত্রিক পাখা যখন স্থবির, তখন জীবন বাঁচাতে এই অঞ্চলের মানুষের কাছে পরম বন্ধু হয়ে ধরা দিয়েছে গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী হাত পাখা। বৈশাখি মেলা কিংবা লোকজ উৎসবে আজও এই পাখার পসরা দেখা যায়। তবে কাঁচামালের অভাব এবং যান্ত্রিক সরঞ্জামের সহজলভ্যতায় এই শিল্পটি আজ বিলুপ্তির পথে। সচেতন মহলের মতে, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও কারিগরদের সহায়তা দিলে এই গ্রামীণ কুটির শিল্পটি যেমন টিকে থাকবে, তেমনি পরিবেশবান্ধব এই অনুষঙ্গটি আমাদের ঐতিহ্যের স্মারক হয়ে বেঁচে থাকবে প্রজন্মের পর প্রজন্ম।

আপনার মতামত লিখুন