দেড় হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত তিস্তা সেচ প্রকল্পের সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন রংপুর অঞ্চলের হাজারো কৃষক। প্রকল্পের আওতায় খনন করা খালে পানি থাকলেও, সংশ্লিষ্টদের অবহেলায় সেই পানি পৌঁছাচ্ছে না কৃষকের জমিতে। ফলে রংপুর খালসংলগ্ন এলাকায় ইরি-বোরো চাষাবাদ মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে।
জানা গেছে, তিস্তা সেচ প্রকল্পের আওতায় প্রায় ৭৬৬ কিলোমিটার দীর্ঘ প্রধান ও শাখা খাল খনন করা হয়েছে, যা নীলফামারী, দিনাজপুর ও রংপুরের ১২টি উপজেলা দিয়ে প্রবাহিত। কিন্তু বাস্তবে রংপুর খালের দুই পাড়ের প্রায় ২০ হাজার কৃষক সেচ সুবিধা থেকে বঞ্চিত।
তিস্তার প্রধান খাল থেকে উৎপন্ন রংপুর খালটি কিশোরগঞ্জ, গঙ্গাচড়া হয়ে মমিনপুর পর্যন্ত প্রায় ৭৪ কিলোমিটার বিস্তৃত। তবে গঙ্গাচড়ার খলেয়া ইউনিয়নের ভিন্নজগত এলাকায় খালের ওপর নির্মিত একটি রেগুলেটর এখন ভাটির কৃষকদের জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই রেগুলেটরের কারণে খলেয়া, মমিনপুর ও অতিরামপুর ইউনিয়নের প্রায় ১৮ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে ১০ হাজার হেক্টর জমিতে সেচ সংকট দেখা দিয়েছে।
শুষ্ক মৌসুমে নদীর পানি কমে গেলে রেগুলেটরে পানি আটকে থাকায় জমিতে পানি পৌঁছায় না। ফলে জমি প্রস্তুত থাকলেও চারা রোপণ করতে পারছেন না কৃষকরা। এতে তাদের মধ্যে চরম হতাশা বিরাজ করছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, গংগাচড়ার ওই রেগুলেটরটি ভাটির দিকে বন্ধ। এর কারনে ভাটিতে ১৮ কিলোমিটার প্রবাহিত রংপুর খালটির উভয় দিকে খলেয়া, মমিনপুর ও অতিরামপুর ইউনিয়নে ৫টি সেকেন্ডারি খালের প্রায় ৩০ টি টারশিয়ারি খালে এক ফোটা পানি নেই। ফলে ওই খাল থেকে সেচ সুবিধায় আওতায় প্রায় ১০ হাজার হেক্টর জমি ইরিবোরো ধান রোপনের জন্য তৈরি করতে পারছেনা। অনেকে শুকনো জমি লাঙ্গল দিচ্ছে। বাধছে আইল। অনেকে চারা রোপণ করে সেচের অপেক্ষায় রয়েছে। সকলের দরকার পানি। কারন পাম্পে সহজে তেল পাওয়া যাচ্ছে না। সাথে কোন গভীর বা অগভীর নলকুপ নেই বিশাল ওই কৃষি এলাকায়। তাই সেচ পানির অভাবে কৃষকরা বিপাকে পড়েছেন। কোথায় গেলে পানি পাওয়া যাবে এমন ভাবনায় রাতদিন ছুটছেন তিস্তা সেচ প্রকল্পের অফিসে। তবে কোন লাভ হচ্ছে না।
মমিনপুর ইউনিয়নের কৃষক দুলাল মিয়া বলেন, তেলের অভাবে শ্যালো মেশিন চালানো যাচ্ছে না। গভীর নলকূপও নেই। আমাদের একমাত্র ভরসা তিস্তার সেচ খাল, কিন্তু সেই পানিও পাচ্ছি না।”
কৃষাণী লিপি আক্তার জানান, আমার ৭৫ শতক জমি। পরিবারের ৮ জনের জীবিকা এই জমির ওপর নির্ভরশীল। তামাক তোলার পর জমি প্রস্তুত করেছি, কিন্তু বারবার পানি চেয়েও পাচ্ছি না।
কৃষকদের মতে, সম্প্রতি বৃষ্টির কারণে তামাক ফসল ক্ষতির মুখে পড়েছিল। এখন তারা দ্রুত জমি প্রস্তুত করে ইরি-বোরো ধান লাগাতে চান। কিন্তু সেচের পানি না থাকায় পুরো মৌসুমই অনিশ্চয়তার মুখে।
সেচ নালার সভাপতি আসাদুল হক বলেন, একাধিকবার প্রকৌশলীদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি। তারা শুধু আশ্বাস দেন, কিন্তু বাস্তবে কোনো ব্যবস্থা নেই।
রংপুর পানি উন্নয়ন বিভাগ-এর একটি সুত্র মতে, কৃষকদের স্বার্থে সাময়িকভাবে পানি বন্ধ রাখা হয়েছিল। এ ছাড়া মমিনপুর এলকা দিয়ে প্রবাহিত এ খালের ডাইক বা বাধের অবস্থা নাজুক। মহাসড়ক সাদৃশ্য বাধে ইদুরের গর্ত ও নানা কারণে ভিতরে চোরা ভাঙা সৃস্টি হয়েছে।
এতে পানি ছাড়লে বাঁধের ভিতরে চোরাবাঙা ও ইদুরের গর্ত দিয়ে পানি স্রোতের ধারায় বের হয়ে বাঁধকে প্লাবিত করবে। এতে ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়বে। তাই ওই বাঁধটি শক্তিশালী করতে দরপত্র আহবান করা হয়েছে। দ্রুত ঠিকাদার নিয়োগ দিয়ে ওই জীর্ণ বাঁধটি সংস্কার করা হবে।
তবে কবে নাগাদ কৃষকরা তিস্তার সেচ সুবিধা পাবেন এ নিয়ে ওই দপ্তরের কেউ মতামত প্রকাশ করতে রাজী নয়।
দপ্তরটির নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রবিউল আলমের সঙ্গে একাধিকবার মোবাইলে যোগাযোগের চেষ্টা করেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। একই ভাবে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড রংপুর এর অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (পুর) ড. মোহাঃ সরফরাজ বান্দা ফোন রিসিভ করেননি।
তবে সংশ্লিষ্টদের অপরিকল্পিত এই সেচ ব্যবস্থায় হাজার হাজার কৃষকের জীবিকা, স্বপ্নের ওপর সরাসরি আঘাত হেনেছে । এর দ্রুত সমাধান না হলে আসন্ন মৌসুমে বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।

মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০১ এপ্রিল ২০২৬
দেড় হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত তিস্তা সেচ প্রকল্পের সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন রংপুর অঞ্চলের হাজারো কৃষক। প্রকল্পের আওতায় খনন করা খালে পানি থাকলেও, সংশ্লিষ্টদের অবহেলায় সেই পানি পৌঁছাচ্ছে না কৃষকের জমিতে। ফলে রংপুর খালসংলগ্ন এলাকায় ইরি-বোরো চাষাবাদ মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে।
জানা গেছে, তিস্তা সেচ প্রকল্পের আওতায় প্রায় ৭৬৬ কিলোমিটার দীর্ঘ প্রধান ও শাখা খাল খনন করা হয়েছে, যা নীলফামারী, দিনাজপুর ও রংপুরের ১২টি উপজেলা দিয়ে প্রবাহিত। কিন্তু বাস্তবে রংপুর খালের দুই পাড়ের প্রায় ২০ হাজার কৃষক সেচ সুবিধা থেকে বঞ্চিত।
তিস্তার প্রধান খাল থেকে উৎপন্ন রংপুর খালটি কিশোরগঞ্জ, গঙ্গাচড়া হয়ে মমিনপুর পর্যন্ত প্রায় ৭৪ কিলোমিটার বিস্তৃত। তবে গঙ্গাচড়ার খলেয়া ইউনিয়নের ভিন্নজগত এলাকায় খালের ওপর নির্মিত একটি রেগুলেটর এখন ভাটির কৃষকদের জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই রেগুলেটরের কারণে খলেয়া, মমিনপুর ও অতিরামপুর ইউনিয়নের প্রায় ১৮ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে ১০ হাজার হেক্টর জমিতে সেচ সংকট দেখা দিয়েছে।
শুষ্ক মৌসুমে নদীর পানি কমে গেলে রেগুলেটরে পানি আটকে থাকায় জমিতে পানি পৌঁছায় না। ফলে জমি প্রস্তুত থাকলেও চারা রোপণ করতে পারছেন না কৃষকরা। এতে তাদের মধ্যে চরম হতাশা বিরাজ করছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, গংগাচড়ার ওই রেগুলেটরটি ভাটির দিকে বন্ধ। এর কারনে ভাটিতে ১৮ কিলোমিটার প্রবাহিত রংপুর খালটির উভয় দিকে খলেয়া, মমিনপুর ও অতিরামপুর ইউনিয়নে ৫টি সেকেন্ডারি খালের প্রায় ৩০ টি টারশিয়ারি খালে এক ফোটা পানি নেই। ফলে ওই খাল থেকে সেচ সুবিধায় আওতায় প্রায় ১০ হাজার হেক্টর জমি ইরিবোরো ধান রোপনের জন্য তৈরি করতে পারছেনা। অনেকে শুকনো জমি লাঙ্গল দিচ্ছে। বাধছে আইল। অনেকে চারা রোপণ করে সেচের অপেক্ষায় রয়েছে। সকলের দরকার পানি। কারন পাম্পে সহজে তেল পাওয়া যাচ্ছে না। সাথে কোন গভীর বা অগভীর নলকুপ নেই বিশাল ওই কৃষি এলাকায়। তাই সেচ পানির অভাবে কৃষকরা বিপাকে পড়েছেন। কোথায় গেলে পানি পাওয়া যাবে এমন ভাবনায় রাতদিন ছুটছেন তিস্তা সেচ প্রকল্পের অফিসে। তবে কোন লাভ হচ্ছে না।
মমিনপুর ইউনিয়নের কৃষক দুলাল মিয়া বলেন, তেলের অভাবে শ্যালো মেশিন চালানো যাচ্ছে না। গভীর নলকূপও নেই। আমাদের একমাত্র ভরসা তিস্তার সেচ খাল, কিন্তু সেই পানিও পাচ্ছি না।”
কৃষাণী লিপি আক্তার জানান, আমার ৭৫ শতক জমি। পরিবারের ৮ জনের জীবিকা এই জমির ওপর নির্ভরশীল। তামাক তোলার পর জমি প্রস্তুত করেছি, কিন্তু বারবার পানি চেয়েও পাচ্ছি না।
কৃষকদের মতে, সম্প্রতি বৃষ্টির কারণে তামাক ফসল ক্ষতির মুখে পড়েছিল। এখন তারা দ্রুত জমি প্রস্তুত করে ইরি-বোরো ধান লাগাতে চান। কিন্তু সেচের পানি না থাকায় পুরো মৌসুমই অনিশ্চয়তার মুখে।
সেচ নালার সভাপতি আসাদুল হক বলেন, একাধিকবার প্রকৌশলীদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি। তারা শুধু আশ্বাস দেন, কিন্তু বাস্তবে কোনো ব্যবস্থা নেই।
রংপুর পানি উন্নয়ন বিভাগ-এর একটি সুত্র মতে, কৃষকদের স্বার্থে সাময়িকভাবে পানি বন্ধ রাখা হয়েছিল। এ ছাড়া মমিনপুর এলকা দিয়ে প্রবাহিত এ খালের ডাইক বা বাধের অবস্থা নাজুক। মহাসড়ক সাদৃশ্য বাধে ইদুরের গর্ত ও নানা কারণে ভিতরে চোরা ভাঙা সৃস্টি হয়েছে।
এতে পানি ছাড়লে বাঁধের ভিতরে চোরাবাঙা ও ইদুরের গর্ত দিয়ে পানি স্রোতের ধারায় বের হয়ে বাঁধকে প্লাবিত করবে। এতে ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়বে। তাই ওই বাঁধটি শক্তিশালী করতে দরপত্র আহবান করা হয়েছে। দ্রুত ঠিকাদার নিয়োগ দিয়ে ওই জীর্ণ বাঁধটি সংস্কার করা হবে।
তবে কবে নাগাদ কৃষকরা তিস্তার সেচ সুবিধা পাবেন এ নিয়ে ওই দপ্তরের কেউ মতামত প্রকাশ করতে রাজী নয়।
দপ্তরটির নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রবিউল আলমের সঙ্গে একাধিকবার মোবাইলে যোগাযোগের চেষ্টা করেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। একই ভাবে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড রংপুর এর অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (পুর) ড. মোহাঃ সরফরাজ বান্দা ফোন রিসিভ করেননি।
তবে সংশ্লিষ্টদের অপরিকল্পিত এই সেচ ব্যবস্থায় হাজার হাজার কৃষকের জীবিকা, স্বপ্নের ওপর সরাসরি আঘাত হেনেছে । এর দ্রুত সমাধান না হলে আসন্ন মৌসুমে বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।

আপনার মতামত লিখুন