গভীর রাত। সৈয়দপুর শহরবাসী ঘুমে আচ্ছন্ন। ঘরে ঘরে নিভে গেছে আলো। রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে ভেসে আসে এক পরিচিত কণ্ঠস্বর—
“ওঠ ওঠ রোজা রাখ…
ও বড় ভাই ওঠেন…
সেহেরির সময় পেরিয়ে যাচ্ছে…”
কোলকাতার বাংলার মিষ্টি টানে উচ্চারিত সেই ডাক যেন বাতাস ভেদ করে পৌঁছে যায় প্রতিটি ঘরের ভেতর। এরপরই শোনা যায় দরজায় লাঠির আলতো কষাঘাত।
হাতে একটি লাঠি, টর্চলাইট আর ছোট্ট একটি মাইক। ধীর পায়ে অন্ধকার গলি ধরে হাঁটছেন এক মানুষ। এক বাড়ি থেকে আরেক বাড়ি, এক দরজা থেকে আরেক দরজায় গিয়ে তিনি ডাক দেন—সেহেরির ডাক। যেন ঘুমন্ত মানুষকে জাগিয়ে তোলার এক নীরব দায়িত্ব তার কাঁধে।
এই মানুষটির নাম শেখ তৌহিদ (৬০)। তবে নতুন বাবু পাড়ার মানুষের কাছে তিনি বেশি পরিচিত “পটল ভাই” নামেই।
শেখ তৌহিদের পারিবারিক শিকড় রয়েছে ভারতের কাচড়াপাড়ায়। তার পুর্বপুরুষ শেখ তুস্ত, দাদা শেখ সাবের এবং বাবা শেখ জাফর সেখানে ব্রিটিশ আমলে রেলকারখানার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।দেশভাগের অস্থির সময়ে শেখ জাফর বাংলাদেশে চলে আসেন এবং সৈয়দপুরের নতুন বাবু পাড়ায় বসতি গড়েন। একসময় রেলওয়ে কারখানার উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এই এলাকায় বসবাস করতেন বলেই জায়গাটির নাম হয়ে যায় “নতুন বাবু পাড়া”।
পরবর্তীতে শেখ জাফরও চাকরিসূত্রে সৈয়দপুর রেলকারখানায় যুক্ত হন। সেই রেলনগরীর বাতাসেই বড় হয়েছেন শেখ তৌহিদ।
দশ ভাইবোনের মধ্যে ষষ্ঠ শেখ তৌহিদ। পড়াশোনা বেশিদূর এগোয়নি তার। অন্য ভাইবোনেরা জীবনে প্রতিষ্ঠিত হলেও তিনি থেকে গেছেন সাধারণ মানুষের কাতারে।
স্ত্রী, ছেলে ও মেয়েকে নিয়ে শ্রম বিক্রি করেই চলে তার সংসার। জীবনের হিসাবটা খুব বড় নয়—সাধারণ আয়, ছোট্ট সংসার আর মানুষের ভালোবাসা।
বেশভূষায়ও তিনি অতি সাধারণ। কিন্তু তার হৃদয়ের ভেতরে রয়েছে গভীর এক বিশ্বাস—সৃষ্টিকর্তা মহান রব্বুল আলামীনকে খুশি করার আকাঙ্ক্ষা।
সেই বিশ্বাস থেকেই গত ৩২ বছর ধরে পবিত্র রমজান এলেই তিনি নিজের কাঁধে তুলে নেন এক অদ্ভুত দায়িত্ব।
রাত ঠিক ৩টা বাজলেই হাতে লাঠি, টর্চলাইট আর মাইক নিয়ে বেরিয়ে পড়েন তিনি মহল্লায়। অন্ধকার গলি পেরিয়ে একে একে দাঁড়ান প্রতিটি বাড়ির সামনে।
“ওঠ ওঠ রোজা রাখ … সময় বেশি নাই…”
বলেই আলতো করে লাঠি দিয়ে দরজায় কড়া নাড়েন।
প্রায় পাঁচ শত পরিবারের দরজায় তিনি দু’বার করে যান, যেন কারও সেহেরি বাদ না যায়। রাত ৩টা থেকে সাড়ে ৪টা পর্যন্ত চলতে থাকে তার এই নিরলস হাঁটা আর ডাকাডাকি। ঘুম ভেঙে যখন মানুষ দরজা খোলে, তখন অনেকেই জানালার ফাঁক দিয়ে তাকিয়ে দেখে—অন্ধকার গলি পেরিয়ে আরেকটি বাড়ির দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন পটল ভাই।
ওই এলাকার আলহাজ্ব মজিবর রহমান বলেন, পটল আমাদের জন্য অনেক কষ্ট করে। তার ডাকে সঠিক সময়ে সেহেরী খাওয়া হয়। না হলে অনেকের মিস হত।
একই কথা বলেন সাইদুল ইসলাম। তিনি বলেন, পটলের মত মুসলমানের কারণে রমজান মাসের রাতটি রোজাদারের জন্য সহজ। তার সময়মত উঠে, রোজার প্রস্তুতি নেয়, অনেকে রাতের নামাজে দাড়িয়ে যায়।
রমজানের ত্রিশটি রাত এভাবেই কেটে যায় তার।
মাস শেষে খুশি হয়ে কেউ যদি ৫০ বা ১০০ টাকা হাতে তুলে দেয়, তাতেই তিনি খুশি। তবে এই কাজের আসল প্রাপ্তি টাকা নয়।
জিজ্ঞেস করলে হাসিমুখে তিনি বলেন—
“ভাল লাগে। সওয়াব পাবো—এই আশাতেই করি।”
মানবিকতার এক নীরব প্রতীক
এই আশাতেই রমজানের প্রতিটি রাত জেগে কাটান পটল ভাই।
হয়তো তিনি বড় কোনো পদ বা সম্পদের মালিক নন। কিন্তু নতুন বাবু পাড়ার মানুষের হৃদয়ে তিনি হয়ে উঠেছেন এক নীরব মানবিকতার প্রতীক।
গভীর রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে যখন তার কণ্ঠে আবার ভেসে আসে—
“ওঠ ওঠ রোজা রাখ…”
তখন মনে হয়, মানুষের ভেতরে এখনও বেঁচে আছে নিঃস্বার্থ সেবা, বিশ্বাস আর সৃষ্টিকর্তার সন্তুষ্টি পাওয়ার এক সরল কিন্তু গভীর আকাঙ্ক্ষা।
নতুন বাবু পাড়ার মানুষের কাছে তাই পটল ভাই শুধু একজন মানুষ নন—তিনি যেন এক জাগরণের কণ্ঠস্বর, যে কণ্ঠ প্রতি রমজানে ঘুমন্ত মহল্লাকে মনে করিয়ে দেয়—
সেহেরির সময় হয়ে গেছে।

মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৩ মার্চ ২০২৬
গভীর রাত। সৈয়দপুর শহরবাসী ঘুমে আচ্ছন্ন। ঘরে ঘরে নিভে গেছে আলো। রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে ভেসে আসে এক পরিচিত কণ্ঠস্বর—
“ওঠ ওঠ রোজা রাখ…
ও বড় ভাই ওঠেন…
সেহেরির সময় পেরিয়ে যাচ্ছে…”
কোলকাতার বাংলার মিষ্টি টানে উচ্চারিত সেই ডাক যেন বাতাস ভেদ করে পৌঁছে যায় প্রতিটি ঘরের ভেতর। এরপরই শোনা যায় দরজায় লাঠির আলতো কষাঘাত।
হাতে একটি লাঠি, টর্চলাইট আর ছোট্ট একটি মাইক। ধীর পায়ে অন্ধকার গলি ধরে হাঁটছেন এক মানুষ। এক বাড়ি থেকে আরেক বাড়ি, এক দরজা থেকে আরেক দরজায় গিয়ে তিনি ডাক দেন—সেহেরির ডাক। যেন ঘুমন্ত মানুষকে জাগিয়ে তোলার এক নীরব দায়িত্ব তার কাঁধে।
এই মানুষটির নাম শেখ তৌহিদ (৬০)। তবে নতুন বাবু পাড়ার মানুষের কাছে তিনি বেশি পরিচিত “পটল ভাই” নামেই।
শেখ তৌহিদের পারিবারিক শিকড় রয়েছে ভারতের কাচড়াপাড়ায়। তার পুর্বপুরুষ শেখ তুস্ত, দাদা শেখ সাবের এবং বাবা শেখ জাফর সেখানে ব্রিটিশ আমলে রেলকারখানার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।দেশভাগের অস্থির সময়ে শেখ জাফর বাংলাদেশে চলে আসেন এবং সৈয়দপুরের নতুন বাবু পাড়ায় বসতি গড়েন। একসময় রেলওয়ে কারখানার উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এই এলাকায় বসবাস করতেন বলেই জায়গাটির নাম হয়ে যায় “নতুন বাবু পাড়া”।
পরবর্তীতে শেখ জাফরও চাকরিসূত্রে সৈয়দপুর রেলকারখানায় যুক্ত হন। সেই রেলনগরীর বাতাসেই বড় হয়েছেন শেখ তৌহিদ।
দশ ভাইবোনের মধ্যে ষষ্ঠ শেখ তৌহিদ। পড়াশোনা বেশিদূর এগোয়নি তার। অন্য ভাইবোনেরা জীবনে প্রতিষ্ঠিত হলেও তিনি থেকে গেছেন সাধারণ মানুষের কাতারে।
স্ত্রী, ছেলে ও মেয়েকে নিয়ে শ্রম বিক্রি করেই চলে তার সংসার। জীবনের হিসাবটা খুব বড় নয়—সাধারণ আয়, ছোট্ট সংসার আর মানুষের ভালোবাসা।
বেশভূষায়ও তিনি অতি সাধারণ। কিন্তু তার হৃদয়ের ভেতরে রয়েছে গভীর এক বিশ্বাস—সৃষ্টিকর্তা মহান রব্বুল আলামীনকে খুশি করার আকাঙ্ক্ষা।
সেই বিশ্বাস থেকেই গত ৩২ বছর ধরে পবিত্র রমজান এলেই তিনি নিজের কাঁধে তুলে নেন এক অদ্ভুত দায়িত্ব।
রাত ঠিক ৩টা বাজলেই হাতে লাঠি, টর্চলাইট আর মাইক নিয়ে বেরিয়ে পড়েন তিনি মহল্লায়। অন্ধকার গলি পেরিয়ে একে একে দাঁড়ান প্রতিটি বাড়ির সামনে।
“ওঠ ওঠ রোজা রাখ … সময় বেশি নাই…”
বলেই আলতো করে লাঠি দিয়ে দরজায় কড়া নাড়েন।
প্রায় পাঁচ শত পরিবারের দরজায় তিনি দু’বার করে যান, যেন কারও সেহেরি বাদ না যায়। রাত ৩টা থেকে সাড়ে ৪টা পর্যন্ত চলতে থাকে তার এই নিরলস হাঁটা আর ডাকাডাকি। ঘুম ভেঙে যখন মানুষ দরজা খোলে, তখন অনেকেই জানালার ফাঁক দিয়ে তাকিয়ে দেখে—অন্ধকার গলি পেরিয়ে আরেকটি বাড়ির দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন পটল ভাই।
ওই এলাকার আলহাজ্ব মজিবর রহমান বলেন, পটল আমাদের জন্য অনেক কষ্ট করে। তার ডাকে সঠিক সময়ে সেহেরী খাওয়া হয়। না হলে অনেকের মিস হত।
একই কথা বলেন সাইদুল ইসলাম। তিনি বলেন, পটলের মত মুসলমানের কারণে রমজান মাসের রাতটি রোজাদারের জন্য সহজ। তার সময়মত উঠে, রোজার প্রস্তুতি নেয়, অনেকে রাতের নামাজে দাড়িয়ে যায়।
রমজানের ত্রিশটি রাত এভাবেই কেটে যায় তার।
মাস শেষে খুশি হয়ে কেউ যদি ৫০ বা ১০০ টাকা হাতে তুলে দেয়, তাতেই তিনি খুশি। তবে এই কাজের আসল প্রাপ্তি টাকা নয়।
জিজ্ঞেস করলে হাসিমুখে তিনি বলেন—
“ভাল লাগে। সওয়াব পাবো—এই আশাতেই করি।”
মানবিকতার এক নীরব প্রতীক
এই আশাতেই রমজানের প্রতিটি রাত জেগে কাটান পটল ভাই।
হয়তো তিনি বড় কোনো পদ বা সম্পদের মালিক নন। কিন্তু নতুন বাবু পাড়ার মানুষের হৃদয়ে তিনি হয়ে উঠেছেন এক নীরব মানবিকতার প্রতীক।
গভীর রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে যখন তার কণ্ঠে আবার ভেসে আসে—
“ওঠ ওঠ রোজা রাখ…”
তখন মনে হয়, মানুষের ভেতরে এখনও বেঁচে আছে নিঃস্বার্থ সেবা, বিশ্বাস আর সৃষ্টিকর্তার সন্তুষ্টি পাওয়ার এক সরল কিন্তু গভীর আকাঙ্ক্ষা।
নতুন বাবু পাড়ার মানুষের কাছে তাই পটল ভাই শুধু একজন মানুষ নন—তিনি যেন এক জাগরণের কণ্ঠস্বর, যে কণ্ঠ প্রতি রমজানে ঘুমন্ত মহল্লাকে মনে করিয়ে দেয়—
সেহেরির সময় হয়ে গেছে।

আপনার মতামত লিখুন