ঢাকা   মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬
BD State News

সারাদেশ

সৈয়দপুরে ফিরছে বিমান সেনা আয়েশার নিথর দেহ

সৈয়দপুরে ফিরছে বিমান সেনা আয়েশার নিথর দেহ
ছবি-সংগৃহিত। বিমান সেনা আয়েশা আক্তার অন্যন্যা

‎কিছু স্বপ্ন থাকে, যা শুধু একজন মানুষের নয়—পুরো একটি পরিবারের, কখনো কখনো একটি পাড়ারও। সেই স্বপ্ন যখন হঠাৎ করেই নিভে যায়, তখন শোক শুধু একটি ঘরের দেয়ালে আটকে থাকে না; ছড়িয়ে পড়ে চারপাশে।

‎ঢাকার মিরপুর এলাকার একটি বহুতল ভবনে অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ হারিয়েছেন বাংলাদেশ বিমান বাহিনী-এর সদস্য আয়েশা সিদ্দিকা অনন্যা। তার মৃত্যুর খবর পৌঁছানোর পর থেকেই নীলফামারীর সৈয়দপুর শহরের বিমানবন্দর পূর্বপাড়া এলাকায় নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া।

‎মঙ্গলবার দুপুরে সেই পাড়ায় গেলে বোঝা যায়, একটি মৃত্যু কিভাবে পুরো পরিবেশকে স্তব্ধ করে দিতে পারে। মানুষের ছোট ছোট দলে জটলা, নিঃশব্দে চোখ মুছছেন কেউ কেউ। প্রতিবেশীরা একে একে ভিড় করছেন আয়েশাদের বাড়িতে। কারও মুখে শব্দ নেই, তবু সবার চোখে একই প্রশ্ন—এভাবে কি চলে যেতে হয়?
‎আয়েশা সিদ্দিকা অনন্যা ছিলেন ওই এলাকার আব্দুল হান্নানের বড় মেয়ে। দরিদ্র পরিবারের মেয়ে হয়েও স্বপ্ন দেখেছিলেন বড় কিছু করার। প্রায় চার বছর আগে তিনি যোগ দেন বাংলাদেশ বিমান বাহিনীতে সৈনিক পদে। সেই চাকরিই ধীরে ধীরে বদলে দিতে শুরু করেছিল তাদের পরিবারের ভাগ্য।

‎পরিবারের সদস্যরা বলেন, আয়েশা শুধু নিজের স্বপ্নই দেখেননি; তার কাঁধে ছিল পরিবারের দায়ও। ছোট ভাই-বোনদের পড়াশোনা, সংসারের খরচ—সবকিছুতেই তিনি ছিলেন ভরসার নাম। ‎কিন্তু সেই স্বপ্নের পথ হঠাৎ করেই থেমে গেল সোমবার দুপুরে।

‎সেদিন তিনি গিয়েছিলেন ঢাকার মিরপুর-২ এলাকার একটি বহুতল ভবনের শপিংমলে। দুপুর ১টা ৫২ মিনিটে সেখানে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। মুহূর্তের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে ভবনজুড়ে। অনেকেই আটকা পড়েন ভেতরে। ‎পরে ফায়ার সার্ভিস সদস্যরা আহতদের উদ্ধার করে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল-এর বার্ন ইউনিটে ভর্তি করেন। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় প্রাণ হারান আয়েশা সিদ্দিকা অনন্যা এবং বিমান বাহিনীর আরেক সদস্য শেখ রাকিবুজ্জামান।

‎খবরটি যখন সৈয়দপুরে পৌঁছায়, তখন রাত গভীর। প্রথমে জানানো হয়েছিল তিনি নিখোঁজ। সেই আশায় বুক বেঁধেছিলেন পরিবারের সদস্যরা। কিন্তু রাত গড়াতেই আসে সেই কঠিন সংবাদ—আয়েশা আর নেই।

‎অনন্যার চাচা আবুল কালাম আজাদ বলেন, “আমাদের পরিবার খুবই গরিব। অনন্যা চাকরি পাওয়ার পর থেকে একটু একটু করে সংসারটা দাঁড়াচ্ছিল। আমরা ভেবেছিলাম, মেয়েটা অনেক দূর যাবে। কিন্তু এমন করে চলে যাবে—এটা কখনো ভাবিনি।”

‎অনন্যার ফুফু ফরিদা পারভীন বুলবুলির চোখে তখন শুধু অশ্রু। তিনি বলেন, “আমি তাকে নিজের সন্তানের মতোই ভালোবাসতাম। চাকরিতে যাওয়ার সময় তাকে ছাড়তে কষ্ট হয়েছিল। আজ এভাবে তাকে হারাতে হবে—এটা মেনে নেওয়া খুব কঠিন।”

‎এদিকে পুরো পাড়ায় এখন একটাই অপেক্ষা—আয়েশার শেষবারের মতো বাড়ি ফেরা। তার মরদেহ আনা হবে সৈয়দপুরে। নিচুকলোনী ঈদগাহ মাঠে অনুষ্ঠিত হবে জানাজা। এরপর শহরের হাতিখানা কবরস্থানে, নানির কবরের পাশেই তাকে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হবে।

‎একসময় যে মেয়েটি এই পাড়া ছেড়ে গিয়েছিল স্বপ্ন নিয়ে—নিজের এবং পরিবারের ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন—সে-ই এখন ফিরছে, কিন্তু নিথর হয়ে। ‎আর সৈয়দপুরের আকাশে ভেসে বেড়াচ্ছে একটাই দীর্ঘশ্বাস— ‎কিছু স্বপ্ন সত্যিই খুব তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে যায়।
‎

আপনার মতামত লিখুন

BD State News

মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬


সৈয়দপুরে ফিরছে বিমান সেনা আয়েশার নিথর দেহ

প্রকাশের তারিখ : ১০ মার্চ ২০২৬

featured Image

‎কিছু স্বপ্ন থাকে, যা শুধু একজন মানুষের নয়—পুরো একটি পরিবারের, কখনো কখনো একটি পাড়ারও। সেই স্বপ্ন যখন হঠাৎ করেই নিভে যায়, তখন শোক শুধু একটি ঘরের দেয়ালে আটকে থাকে না; ছড়িয়ে পড়ে চারপাশে।

‎ঢাকার মিরপুর এলাকার একটি বহুতল ভবনে অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ হারিয়েছেন বাংলাদেশ বিমান বাহিনী-এর সদস্য আয়েশা সিদ্দিকা অনন্যা। তার মৃত্যুর খবর পৌঁছানোর পর থেকেই নীলফামারীর সৈয়দপুর শহরের বিমানবন্দর পূর্বপাড়া এলাকায় নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া।

‎মঙ্গলবার দুপুরে সেই পাড়ায় গেলে বোঝা যায়, একটি মৃত্যু কিভাবে পুরো পরিবেশকে স্তব্ধ করে দিতে পারে। মানুষের ছোট ছোট দলে জটলা, নিঃশব্দে চোখ মুছছেন কেউ কেউ। প্রতিবেশীরা একে একে ভিড় করছেন আয়েশাদের বাড়িতে। কারও মুখে শব্দ নেই, তবু সবার চোখে একই প্রশ্ন—এভাবে কি চলে যেতে হয়?
‎আয়েশা সিদ্দিকা অনন্যা ছিলেন ওই এলাকার আব্দুল হান্নানের বড় মেয়ে। দরিদ্র পরিবারের মেয়ে হয়েও স্বপ্ন দেখেছিলেন বড় কিছু করার। প্রায় চার বছর আগে তিনি যোগ দেন বাংলাদেশ বিমান বাহিনীতে সৈনিক পদে। সেই চাকরিই ধীরে ধীরে বদলে দিতে শুরু করেছিল তাদের পরিবারের ভাগ্য।

‎পরিবারের সদস্যরা বলেন, আয়েশা শুধু নিজের স্বপ্নই দেখেননি; তার কাঁধে ছিল পরিবারের দায়ও। ছোট ভাই-বোনদের পড়াশোনা, সংসারের খরচ—সবকিছুতেই তিনি ছিলেন ভরসার নাম। ‎কিন্তু সেই স্বপ্নের পথ হঠাৎ করেই থেমে গেল সোমবার দুপুরে।

‎সেদিন তিনি গিয়েছিলেন ঢাকার মিরপুর-২ এলাকার একটি বহুতল ভবনের শপিংমলে। দুপুর ১টা ৫২ মিনিটে সেখানে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। মুহূর্তের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে ভবনজুড়ে। অনেকেই আটকা পড়েন ভেতরে। ‎পরে ফায়ার সার্ভিস সদস্যরা আহতদের উদ্ধার করে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল-এর বার্ন ইউনিটে ভর্তি করেন। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় প্রাণ হারান আয়েশা সিদ্দিকা অনন্যা এবং বিমান বাহিনীর আরেক সদস্য শেখ রাকিবুজ্জামান।

‎খবরটি যখন সৈয়দপুরে পৌঁছায়, তখন রাত গভীর। প্রথমে জানানো হয়েছিল তিনি নিখোঁজ। সেই আশায় বুক বেঁধেছিলেন পরিবারের সদস্যরা। কিন্তু রাত গড়াতেই আসে সেই কঠিন সংবাদ—আয়েশা আর নেই।

‎অনন্যার চাচা আবুল কালাম আজাদ বলেন, “আমাদের পরিবার খুবই গরিব। অনন্যা চাকরি পাওয়ার পর থেকে একটু একটু করে সংসারটা দাঁড়াচ্ছিল। আমরা ভেবেছিলাম, মেয়েটা অনেক দূর যাবে। কিন্তু এমন করে চলে যাবে—এটা কখনো ভাবিনি।”

‎অনন্যার ফুফু ফরিদা পারভীন বুলবুলির চোখে তখন শুধু অশ্রু। তিনি বলেন, “আমি তাকে নিজের সন্তানের মতোই ভালোবাসতাম। চাকরিতে যাওয়ার সময় তাকে ছাড়তে কষ্ট হয়েছিল। আজ এভাবে তাকে হারাতে হবে—এটা মেনে নেওয়া খুব কঠিন।”

‎এদিকে পুরো পাড়ায় এখন একটাই অপেক্ষা—আয়েশার শেষবারের মতো বাড়ি ফেরা। তার মরদেহ আনা হবে সৈয়দপুরে। নিচুকলোনী ঈদগাহ মাঠে অনুষ্ঠিত হবে জানাজা। এরপর শহরের হাতিখানা কবরস্থানে, নানির কবরের পাশেই তাকে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হবে।

‎একসময় যে মেয়েটি এই পাড়া ছেড়ে গিয়েছিল স্বপ্ন নিয়ে—নিজের এবং পরিবারের ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন—সে-ই এখন ফিরছে, কিন্তু নিথর হয়ে। ‎আর সৈয়দপুরের আকাশে ভেসে বেড়াচ্ছে একটাই দীর্ঘশ্বাস— ‎কিছু স্বপ্ন সত্যিই খুব তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে যায়।
‎


BD State News

সম্পাদক: আবদুর রাকিব

কপিরাইট © ২০২৬ BD State News । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত