সৈয়দপুর উপজেলার বুক চিরে বয়ে চলা নদী স্বরমঙ্গলা দখল, ভরাট আর প্রশাসনিক জটিলতায় হারিয়ে গেলেও এ জনপদের মানুষের স্মৃতি, মাটির রেখা ও লোকঐতিহ্যের ভাঁজে এখনও টিকে আছে তার অস্তিত্ব।
সৈয়দপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য মতে, একসময় প্রায় ৩০০ ফুট প্রশস্ত এবং প্রায় ২৬ কিলোমিটার দীর্ঘ ছিল স্বরমঙ্গলা নদী। নীলফামারীর টেক্সটাইল এলাকার বিস্তীর্ণ নিচু কৃষিজমি থেকে উৎপন্ন হয়ে নদীটি প্রবাহিত হয়ে রংপুরের বদরগঞ্জ উপজেলার ধোলাইঘাটে গিয়ে চিকলি নদীর সঙ্গে মিলিত হতো। কিন্তু সময়ের প্রবাহে নদীটির তলদেশ ভরাট হয়ে হারিয়ে যায় এর নাব্যতা। পরে নদীর বুকে কাগজে-কলমে দখল নিয়ে কাঁচা বাড়িঘর থেকে অট্টালিকা গড়ে তোলা হয়। কোথাও পুকুর, কোথাও ধানক্ষেত, কোথাও নিচু জমিতে চাষাবাদ—এভাবেই নদীর দৃশ্যমান জলরেখা হারিয়ে যায়। তবুও এর দুই তীরের রেখা এখনও স্পষ্ট সাক্ষ্য বহন করছে।
ধলাগাছ, বাগডোকরা, লক্ষণপুর চড়কপাড়া, দলুয়া, নিয়ামতপুর, তারাগঞ্জ ও মধুরামপুর মৌজাজুড়ে মাটির গঠনে এখনও দেখা যায় প্রাচীন এই নদীপথের চিহ্ন।
সৈয়দপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আখিনুজ্জামান বলেন, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে নদীটি পুনঃখননের একটি উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু মৌজা নকশায় নদীর নামে কোনো জমির দাগ না থাকায় সেই উদ্যোগ থেমে যায়। খতিয়ানে জমিগুলো ব্যক্তিমালিকানায় রেকর্ডভুক্ত। ফলে প্রশাসনিকভাবে নদীটির কোনো অস্তিত্ব নেই। নথির ভাষায় নদীটি যেন কখনও ছিলই না। অথচ বাস্তবতা অন্য কথা বলে। তিনি বলেন, ঐতিহাসিক এই নদী উদ্ধারে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন জানানো হয়েছে।
স্থানীয়দের স্মৃতিতে এখনও ভাসে নদীর গল্প। প্রায় দুই দশক আগে কৃষিকাজের সময় জমি খুঁড়তে গিয়ে বাগডোকরা মৌজার কয়েকজন কৃষক একটি পুরোনো নৌকার কাঠ খুঁজে পান। ঘটনাটি নিছক কাকতালীয় নয়; বরং এটি ইঙ্গিত দেয়—কখনও এখানে নৌযান চলাচল করত। অর্থাৎ স্বরমঙ্গলা ছিল একটি সক্রিয় নৌপথ।
লোকমুখে আরও একটি কাহিনি প্রচলিত আছে। বাংলা মঙ্গলকাব্যের বিখ্যাত কাহিনি বেহুলা-লখিন্দরের সঙ্গে নাকি এই অঞ্চলের নদীপথের সম্পর্ক রয়েছে। জনশ্রুতি আছে, বণিক চাঁদ সওদাগরের সপ্তডিঙ্গা নৌকা একসময় এই নদীর বুকেই ভেসে চলত। এখান থেকেই ব্যবসায়ীরা পণ্য নিয়ে বিভিন্ন গন্তব্যে যেতেন। যদিও এটি প্রমাণিত ইতিহাস নয়, তবু লোককথা কখনও সম্পূর্ণ শূন্য থেকে জন্ম নেয় না; কোনো না কোনো বাস্তবতার ভিত্তি সেখানে থেকেই যায়।
একটি নদী কেবল জলধারা নয়; এটি একটি জনপদের অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও জীবনযাত্রার ধারক। নদীপথ ঘিরেই গড়ে ওঠে বাণিজ্য, যাতায়াত এবং বসতি। তাই একটি নদী বিলীন হয়ে গেলে শুধু জলধারা নয়, হারিয়ে যায় একটি অঞ্চলের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশও।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নদীর নাব্যতা হারানো, দখল, অপরিকল্পিত ভরাট এবং ভূমি রেকর্ডে অসামঞ্জস্য—এসব কারণেই ধীরে ধীরে বিলীন হয়েছে স্বরমঙ্গলা। উন্নয়ন প্রকল্পের নামে অনেক সময় নদীর স্বাভাবিক প্রবাহপথ বাধাগ্রস্ত হয়েছে। প্রশাসনিক জটিলতাও পুনরুদ্ধারের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তবে প্রকৃতি এখনও পুরোপুরি হার মানেনি। উপজেলার কামারপুকুর ইউনিয়নের টইল্লাপাড়ার কৃষক আসাদুর রহমান বলেন, “আমাদের পাঁচ পুরুষ ধরে এই নদীকে এভাবেই অবলুপ্ত হতে দেখছি। তবুও এর তলদেশ দিয়ে এখনও ভূগর্ভস্থ জলের স্রোত অনুভব করা যায়।”
ওই ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ও সাংবাদিক আমিরুজ্জামান বলেন, “এই নদীটি ঐতিহাসিক। বাপ-দাদাদের মুখে এর অনেক গল্প শুনেছি।”
বর্ষাকালে কিছু স্থানে জমে থাকা পানির ধারা যেন পুরোনো নদীপথের স্মৃতি জাগিয়ে তোলে। মনে হয়, নদীটি পুরোপুরি মৃত নয়—বরং মাটির নিচে চাপা পড়ে আছে।
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক এবং নদী রক্ষাবিষয়ক সংগঠন ‘রিভারাইন পিপল’-এর পরিচালক তুহিন ওয়াদুদ বলেন, নদীর এই পরিণতি আমাদের সম্মিলিত অবহেলার ফল। তাঁর ভাষায়, “পৃথিবীর দীর্ঘতম পুকুর আর সরুতম নদী আমরা চোখের সামনে হতে দেখেছি। আমরা যদি নিজেদের দায়িত্ব পালন করতাম, তাহলে এই নদীর এমন পরিণতি হতো না।”
তাঁর এই আক্ষেপ শুধু একটি নদীর জন্য নয়; বরং দেশের অসংখ্য হারিয়ে যাওয়া নদীর জন্যও এক সতর্কবার্তা।
স্বরমঙ্গলা তাই আজ গবেষণারও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠতে পারে। প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধান, পুরোনো মানচিত্র যাচাই এবং আধুনিক স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণের মাধ্যমে হয়তো একদিন বেরিয়ে আসবে এই নদীর প্রকৃত প্রবাহপথ। তাতে শুধু একটি নদীর ইতিহাসই উন্মোচিত হবে না, বরং জানা যাবে একটি অঞ্চলের অর্থনীতি ও জনজীবনের বিস্মৃত অধ্যায়।
কারণ নদী কখনও কেবল জলধারা নয়—সে একটি জনপদের স্মৃতি, সংস্কৃতি ও ইতিহাসের ধারক। স্বরমঙ্গলা সেই ইতিহাসেরই এক চাপা পড়ে থাকা স্রোত, যা হয়তো এখনও মাটির গভীরে নীরবে বয়ে চলেছে।

মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৭ মার্চ ২০২৬
সৈয়দপুর উপজেলার বুক চিরে বয়ে চলা নদী স্বরমঙ্গলা দখল, ভরাট আর প্রশাসনিক জটিলতায় হারিয়ে গেলেও এ জনপদের মানুষের স্মৃতি, মাটির রেখা ও লোকঐতিহ্যের ভাঁজে এখনও টিকে আছে তার অস্তিত্ব।
সৈয়দপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য মতে, একসময় প্রায় ৩০০ ফুট প্রশস্ত এবং প্রায় ২৬ কিলোমিটার দীর্ঘ ছিল স্বরমঙ্গলা নদী। নীলফামারীর টেক্সটাইল এলাকার বিস্তীর্ণ নিচু কৃষিজমি থেকে উৎপন্ন হয়ে নদীটি প্রবাহিত হয়ে রংপুরের বদরগঞ্জ উপজেলার ধোলাইঘাটে গিয়ে চিকলি নদীর সঙ্গে মিলিত হতো। কিন্তু সময়ের প্রবাহে নদীটির তলদেশ ভরাট হয়ে হারিয়ে যায় এর নাব্যতা। পরে নদীর বুকে কাগজে-কলমে দখল নিয়ে কাঁচা বাড়িঘর থেকে অট্টালিকা গড়ে তোলা হয়। কোথাও পুকুর, কোথাও ধানক্ষেত, কোথাও নিচু জমিতে চাষাবাদ—এভাবেই নদীর দৃশ্যমান জলরেখা হারিয়ে যায়। তবুও এর দুই তীরের রেখা এখনও স্পষ্ট সাক্ষ্য বহন করছে।
ধলাগাছ, বাগডোকরা, লক্ষণপুর চড়কপাড়া, দলুয়া, নিয়ামতপুর, তারাগঞ্জ ও মধুরামপুর মৌজাজুড়ে মাটির গঠনে এখনও দেখা যায় প্রাচীন এই নদীপথের চিহ্ন।
সৈয়দপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আখিনুজ্জামান বলেন, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে নদীটি পুনঃখননের একটি উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু মৌজা নকশায় নদীর নামে কোনো জমির দাগ না থাকায় সেই উদ্যোগ থেমে যায়। খতিয়ানে জমিগুলো ব্যক্তিমালিকানায় রেকর্ডভুক্ত। ফলে প্রশাসনিকভাবে নদীটির কোনো অস্তিত্ব নেই। নথির ভাষায় নদীটি যেন কখনও ছিলই না। অথচ বাস্তবতা অন্য কথা বলে। তিনি বলেন, ঐতিহাসিক এই নদী উদ্ধারে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন জানানো হয়েছে।
স্থানীয়দের স্মৃতিতে এখনও ভাসে নদীর গল্প। প্রায় দুই দশক আগে কৃষিকাজের সময় জমি খুঁড়তে গিয়ে বাগডোকরা মৌজার কয়েকজন কৃষক একটি পুরোনো নৌকার কাঠ খুঁজে পান। ঘটনাটি নিছক কাকতালীয় নয়; বরং এটি ইঙ্গিত দেয়—কখনও এখানে নৌযান চলাচল করত। অর্থাৎ স্বরমঙ্গলা ছিল একটি সক্রিয় নৌপথ।
লোকমুখে আরও একটি কাহিনি প্রচলিত আছে। বাংলা মঙ্গলকাব্যের বিখ্যাত কাহিনি বেহুলা-লখিন্দরের সঙ্গে নাকি এই অঞ্চলের নদীপথের সম্পর্ক রয়েছে। জনশ্রুতি আছে, বণিক চাঁদ সওদাগরের সপ্তডিঙ্গা নৌকা একসময় এই নদীর বুকেই ভেসে চলত। এখান থেকেই ব্যবসায়ীরা পণ্য নিয়ে বিভিন্ন গন্তব্যে যেতেন। যদিও এটি প্রমাণিত ইতিহাস নয়, তবু লোককথা কখনও সম্পূর্ণ শূন্য থেকে জন্ম নেয় না; কোনো না কোনো বাস্তবতার ভিত্তি সেখানে থেকেই যায়।
একটি নদী কেবল জলধারা নয়; এটি একটি জনপদের অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও জীবনযাত্রার ধারক। নদীপথ ঘিরেই গড়ে ওঠে বাণিজ্য, যাতায়াত এবং বসতি। তাই একটি নদী বিলীন হয়ে গেলে শুধু জলধারা নয়, হারিয়ে যায় একটি অঞ্চলের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশও।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নদীর নাব্যতা হারানো, দখল, অপরিকল্পিত ভরাট এবং ভূমি রেকর্ডে অসামঞ্জস্য—এসব কারণেই ধীরে ধীরে বিলীন হয়েছে স্বরমঙ্গলা। উন্নয়ন প্রকল্পের নামে অনেক সময় নদীর স্বাভাবিক প্রবাহপথ বাধাগ্রস্ত হয়েছে। প্রশাসনিক জটিলতাও পুনরুদ্ধারের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তবে প্রকৃতি এখনও পুরোপুরি হার মানেনি। উপজেলার কামারপুকুর ইউনিয়নের টইল্লাপাড়ার কৃষক আসাদুর রহমান বলেন, “আমাদের পাঁচ পুরুষ ধরে এই নদীকে এভাবেই অবলুপ্ত হতে দেখছি। তবুও এর তলদেশ দিয়ে এখনও ভূগর্ভস্থ জলের স্রোত অনুভব করা যায়।”
ওই ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ও সাংবাদিক আমিরুজ্জামান বলেন, “এই নদীটি ঐতিহাসিক। বাপ-দাদাদের মুখে এর অনেক গল্প শুনেছি।”
বর্ষাকালে কিছু স্থানে জমে থাকা পানির ধারা যেন পুরোনো নদীপথের স্মৃতি জাগিয়ে তোলে। মনে হয়, নদীটি পুরোপুরি মৃত নয়—বরং মাটির নিচে চাপা পড়ে আছে।
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক এবং নদী রক্ষাবিষয়ক সংগঠন ‘রিভারাইন পিপল’-এর পরিচালক তুহিন ওয়াদুদ বলেন, নদীর এই পরিণতি আমাদের সম্মিলিত অবহেলার ফল। তাঁর ভাষায়, “পৃথিবীর দীর্ঘতম পুকুর আর সরুতম নদী আমরা চোখের সামনে হতে দেখেছি। আমরা যদি নিজেদের দায়িত্ব পালন করতাম, তাহলে এই নদীর এমন পরিণতি হতো না।”
তাঁর এই আক্ষেপ শুধু একটি নদীর জন্য নয়; বরং দেশের অসংখ্য হারিয়ে যাওয়া নদীর জন্যও এক সতর্কবার্তা।
স্বরমঙ্গলা তাই আজ গবেষণারও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠতে পারে। প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধান, পুরোনো মানচিত্র যাচাই এবং আধুনিক স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণের মাধ্যমে হয়তো একদিন বেরিয়ে আসবে এই নদীর প্রকৃত প্রবাহপথ। তাতে শুধু একটি নদীর ইতিহাসই উন্মোচিত হবে না, বরং জানা যাবে একটি অঞ্চলের অর্থনীতি ও জনজীবনের বিস্মৃত অধ্যায়।
কারণ নদী কখনও কেবল জলধারা নয়—সে একটি জনপদের স্মৃতি, সংস্কৃতি ও ইতিহাসের ধারক। স্বরমঙ্গলা সেই ইতিহাসেরই এক চাপা পড়ে থাকা স্রোত, যা হয়তো এখনও মাটির গভীরে নীরবে বয়ে চলেছে।

আপনার মতামত লিখুন