ঢাকা   মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬
BD State News

শিক্ষাঙ্গন

স্মৃতির পাতায় সৈয়দপুর কলেজ: চমকপ্রদ ছিল ক্রীড়াঙ্গনের সফলতা

স্মৃতির পাতায় সৈয়দপুর কলেজ: চমকপ্রদ ছিল ক্রীড়াঙ্গনের সফলতা
চ্যাম্পিয়ন শিল্ড হাতে সৈয়দপুর কলেজের সাবেক সেরা এ্যথলেট মিজানুর রহমান মনা, সাখাওয়াত হোসেন, মধ্য খানে শারিরীক শিক্ষক আহসান উদ্দিন বাদল, দেবব্রত বর্মন দেবু ও মাসুূদ। ছবিটি ১৯৯৪ সালের সৈয়দপুর বিমানবন্দর থেকে তোলা।

বাশির শব্দ। স্টার্টিং লাইনে দাঁড়িয়ে কয়েকজন তরুণ। মুহূর্তের অপেক্ষা। তারপরই ছুটে চলা। কারও চোখ সামনে, কারও মনে শুধু জয়ের স্বপ্ন। সেই দৌড় শেষ হয়ে গেছে বহু বছর আগে। কিন্তু সৈয়দপুর কলেজের সাবেক অ্যাথলেটদের কাছে সেই মুহূর্তগুলো এখনও যেন সেদিনের।

আশি ও নব্বইয়ের দশকে সৈয়দপুর কলেজের মাঠ ছিল এমনই অসংখ্য স্বপ্নের সাক্ষী। পড়াশোনা, সংস্কৃতি কিংবা রাজনীতির পাশাপাশি ক্রীড়াঙ্গনেও তখন তৈরি হয়েছিল এক উজ্জ্বল অধ্যায়। সীমিত সুযোগ-সুবিধা, অপ্রতুল সরঞ্জাম আর আধুনিক প্রশিক্ষণব্যবস্থার অভাব তাঁদের থামাতে পারেনি। কলেজের মাঠ, পেছনের খোলা জায়গা কিংবা নদীর বালুচর—যেখানে সুযোগ মিলেছে, সেখানেই হয়েছে অনুশীলন।

৪০০, ৮০০ ও ১ হাজার ৫০০ মিটার দৌড়, জ্যাভলিন, লং জাম্প, হাই জাম্প, লাফ-ধাপ-ঝাঁপ, ডিসকাস, শটপুটসহ বিভিন্ন ইভেন্টে ছিল তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা। অভ্যন্তরীণ প্রতিযোগিতা থেকেই উঠে আসতেন নতুন অ্যাথলেট। একজনের সাফল্য অন্যজনকে আরও ভালো করার তাগিদ দিত।

বালুচর থেকে ট্র্যাকে

অ্যাথলেট সারাফাত আলী মুন্না ছিলেন মূলত ম্যারাথন দৌড়বিদ। তবে ৪০০, ৮০০ ও ১ হাজার ৫০০ মিটার দৌড়েও অংশ নিতেন। অনুশীলনের জন্য তাঁর নির্দিষ্ট কোনো আধুনিক ট্র্যাক ছিল না। অনেক সময় নদীর বালুচরই হয়ে উঠত তাঁর দৌড়ের জায়গা। কখনো সৈয়দপুর থেকে পার্বতীপুর পর্যন্ত দৌড়েও অনুশীলন করতেন তিনি।

সেই অনুশীলনের মধ্য দিয়েই তৈরি হন নারী অ্যাথলেট মিন্নি, কৃষ্ণা মজুমদার ও কলি। তাঁদের আন্তঃকলেজ প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে রাজশাহীতে নিয়ে যেতেন সৈয়দপুর কলেজের শিক্ষক আবদুস সাত্তার ও স্বনামধন্য ফুটবলার মোকবুল হোসেন।

সেই সময় মেয়েদের খেলাধুলায় অংশ নেওয়া আজকের মতো স্বাভাবিক ছিল না। সামাজিক সংকোচ ছিল, ছিল নানা প্রশ্ন। কিন্তু কৃষ্ণা, মিন্নি ও কলিরা সেসব পেছনে ফেলে ট্র্যাকে নেমেছিলেন। দৌড় তাঁদের কাছে শুধু প্রতিযোগিতা ছিল না, ছিল নিজেদের সামর্থ্য প্রকাশেরও একটি মাধ্যম।

কৃষ্ণার দৌড়

কৃষ্ণা মজুমদার ছিলেন সেই সময়ের অন্যতম আলোচিত নারী অ্যাথলেট। তাঁর বাবা রেলওয়ে পুলিশ স্টেশনে কর্মরত ছিলেন। বাবার চাকরির সুবাদে শৈশব-কৈশোরের একটি সময় কেটেছে সৈয়দপুরে। সৈয়দপুর পাইলট বালিকা উচ্চবিদ্যালয় থেকে এসএসসি এবং সৈয়দপুর কলেজ থেকে এইচএসসি পড়াশোনা করেন তিনি।

১৯৮৫ সালে ইন্টারমিডিয়েটে পড়ার সময় ১০০, ২০০ ও ৪০০ মিটার দৌড় এবং জ্যাভলিন নিক্ষেপে প্রথম হন কৃষ্ণা। পরপর দুইবার চ্যাম্পিয়ন হওয়ার কৃতিত্বও অর্জন করেন।

ট্র্যাকে শর্টস ও জার্সি পরে দৌড়ানো তখনও অনেকের চোখে স্বাভাবিক ছিল না। কিন্তু কৃষ্ণার কাছে এসবের চেয়ে বড় ছিল দৌড় এবং নিজের সামর্থ্য প্রমাণের আকাঙ্ক্ষা।

পরবর্তী সময়ে বাবার চাকরির কারণে পরিবার রাজবাড়ীতে চলে গেলেও তাঁর অ্যাথলেটিকস জীবন থেমে থাকেনি। সেখানেও খেলাধুলার সঙ্গে যুক্ত থাকেন। ২০০০ সালে ঢাকা ক্লাবের হয়ে বাংলাদেশ গেমসে অংশ নিয়ে রানার্সআপ হন।

মঞ্জুর আগমনে নতুন গতি

১৯৮৮ সালে সৈয়দপুর কলেজে আসেন মঞ্জুরুল ইসলাম মঞ্জু। তাঁর আগমনে কলেজের অ্যাথলেটিকসে যোগ হয় নতুন গতি। রাজশাহীর আন্তঃকলেজ প্রতিযোগিতায় ১০০ ও ২০০ মিটার দৌড়ে প্রথম হন তিনি। লাফ-ধাপ-ঝাঁপের ইভেন্টেও সাফল্য পান।

একজন দৌড়বিদের কাছে কয়েক সেকেন্ডের দৌড়ের পেছনে লুকিয়ে থাকে দীর্ঘ অনুশীলন। স্টার্টিং লাইনে দাঁড়ানোর আগের উত্তেজনা, বাঁশির অপেক্ষা এবং তারপর শরীরের সব শক্তি দিয়ে সামনে ছুটে যাওয়া—সেই অভিজ্ঞতা তাঁদের কাছে আজও অমলিন।

খোকনের জ্যাভলিন

জহুরুল ইসলাম খোকনের স্মৃতিতে রাজশাহীর সেই মাঠ এখনও জীবন্ত। নিজ কলেজে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পাশাপাশি আন্তঃকলেজ প্রতিযোগিতায় জ্যাভলিন নিক্ষেপে তৎকালীন সাফ গেমসের খেলোয়াড় আবদুস সালামকে ছাড়িয়ে যাওয়ার স্মৃতি তিনি এখনও ভুলতে পারেননি।

জ্যাভলিন হাতে নেওয়ার আগে মোকবুল হোসেন তাঁকে বলেছিলেন, “খোকন, থ্রো আমার বুকে মার। না হলে আমি সরব না।”

খোকন ছুটলেন। জ্যাভলিন ছুড়লেন। সেটিই সেদিন সর্বোচ্চ দূরত্ব অতিক্রম করল।

একজন অ্যাথলেটের জীবনে এমন একটি মুহূর্ত হয়তো কয়েক সেকেন্ডের। কিন্তু সেই কয়েক সেকেন্ডই হয়ে যায় সারাজীবনের স্মৃতি।

ফুটবল মাঠেও ছিল লড়াই

ক্রীড়াঙ্গনের সেই সময়টিতে শুধু অ্যাথলেটিকস নয়, ফুটবলও ছিল সমান প্রাণবন্ত।

১৯৯০ সালের সেপ্টেম্বরে রাজশাহীতে শুরু হয় আন্তঃকলেজ ফুটবল প্রতিযোগিতা। এতে অংশ নেয় ৩২টি কলেজ। সৈয়দপুর কলেজের ১৬ সদস্যের দলে ছিলেন মোয়াজ্জেম, সাইফুল, লাড্ডাম, খাইরুল, মনা, বাবুসহ অনেকে। কোচ হিসেবে তাঁদের সঙ্গে ছিলেন আবদুস সাত্তার।

সৈয়দপুর কলেজ কোয়ার্টার ফাইনাল পর্যন্ত খেলেছিল। ফুটবলের মাঠের সেই লড়াইও কলেজের ক্রীড়া ইতিহাসের স্মৃতিতে আলাদা জায়গা করে নেয়।

নব্বইয়ের দশকে সাফল্যের ধারাবাহিকতা

নব্বইয়ের দশকে সৈয়দপুর কলেজের ক্রীড়াঙ্গনে যেন একসঙ্গে অনেক প্রতিভার আবির্ভাব ঘটে। ট্র্যাক অ্যান্ড ফিল্ডের পাশাপাশি হাই জাম্প, লং জাম্প, লাফ-ধাপ-ঝাঁপ, পোল ভল্ট, ডিসকাস ও জ্যাভলিনসহ বিভিন্ন ইভেন্টে অংশ নিতেন শিক্ষার্থীরা।

নতুন শারীরিক শিক্ষক আহসান উদ্দিন বাদলের আগমনে অনুশীলনে আসে নতুন শৃঙ্খলা। কলেজের পেছনের মাঠে সময় ধরে দৌড় করাতেন তিনি। শুধু দ্রুত দৌড়ানো নয়, প্রতিযোগিতার নিয়ম-কানুনও শেখাতেন। কোন ভুলে একজন অ্যাথলেট ডিসকোয়ালিফাই হতে পারেন, সেটিও ছিল প্রশিক্ষণের অংশ।

১৯৯২ থেকে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত রাজশাহীর আন্তঃকলেজ প্রতিযোগিতায় সৈয়দপুর কলেজ তিনবার চ্যাম্পিয়ন এবং দুইবার রানার্সআপ হয়।

চার অ্যাথলেটের হাতে ১৯৯৪-এর গৌরব

১৯৯৪ সাল ছিল সৈয়দপুর কলেজের ক্রীড়া ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় বছর। মাত্র চারজন অ্যাথলেট—দেবু, আবদুল্লাহ আল আখেরুজ্জামান আপেল, মঞ্জুর আলম ও মাসুদকে নিয়ে রাজশাহীর ৩২ কলেজের প্রতিযোগিতায় অংশ নেয় সৈয়দপুর কলেজ।

সংখ্যায় তাঁরা ছিলেন মাত্র চারজন। কিন্তু মাঠে তাঁদের লড়াই ছিল অনেক বড় দলের সঙ্গে।

দেবু ১০০ মিটার, ২০০ মিটার ও জ্যাভলিন নিক্ষেপে প্রথম হয়ে ব্যক্তিগতভাবে ১৫ পয়েন্ট অর্জন করেন। আপেল ৪০০ মিটার দৌড় ও লং জাম্পে প্রথম হয়ে পান ১০ পয়েন্ট। মঞ্জুর আলম লাফ-ধাপ-ঝাঁপে দ্বিতীয় হয়ে অর্জন করেন ৩ পয়েন্ট। মাসুদ হাই জাম্পে তৃতীয় হয়ে পান ১ পয়েন্ট।

চারজনের ব্যক্তিগত ইভেন্ট থেকে সৈয়দপুর কলেজের সংগ্রহ দাঁড়ায় ২৯ পয়েন্টে। এরপর ৪০০ ও ৮০০ মিটার রিলেতে প্রথম হয়ে দলটি আরও ২০ পয়েন্ট অর্জন করে।

সব মিলিয়ে সৈয়দপুর কলেজের পয়েন্ট হয় ৪৯।

৩২টি কলেজের প্রতিযোগিতায় মাত্র চারজন অ্যাথলেট নিয়ে ৪৯ পয়েন্ট অর্জন করে চ্যাম্পিয়ন হয় সৈয়দপুর কলেজ।

সংখ্যায় ছোট সেই দলটির সাফল্য তাই শুধু একটি চ্যাম্পিয়নশিপ ছিল না; ছিল প্রস্তুতি, আত্মবিশ্বাস ও সীমিত সুযোগের মধ্যেও বড় স্বপ্ন দেখার এক অনন্য উদাহরণ।

বাদলের ঘড়িতে চলত অনুশীলন

এই সাফল্যের নেপথ্যে প্রশিক্ষক আহসান উদ্দিন বাদলের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর স্মৃতিতে, দলের অনেক খেলোয়াড়ই ছিলেন ফুটবলার ও অভিজ্ঞ ক্রীড়াবিদ। তাঁদের মধ্যে সম্ভাবনা আগে থেকেই ছিল। প্রয়োজন ছিল সেই সম্ভাবনাকে সঠিক ইভেন্টে কাজে লাগানো এবং প্রতিযোগিতার জন্য প্রস্তুত করা।

তাঁর তত্ত্বাবধানে আবদুল্লাহ আল আখেরুজ্জামান আপেল, মিজানুর রহমান মোনা, সাখাওয়াত হোসেন, মাসুদ, আবদুল খালেক, মোকছেদ আলী, আবদুস সবুর, দেবব্রত বর্মন, রেজাউল হক, মাসুম, তাহাজিবুল আলম মিন্টু, রোকসানা খাতুনসহ অনেকেই নিজ নিজ ইভেন্টে সুনাম অর্জন করেন।

একজনের সাফল্যে অন্যজন অনুপ্রাণিত হতেন। একজন দৌড়বিদ ভালো করলে অন্যজন তাঁকে ছাড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতেন। একজন জ্যাভলিন ছুড়লে অন্যজনের লক্ষ্য থাকত আরও দূরে ছোড়া। এভাবেই গড়ে উঠেছিল প্রতিযোগিতার প্রাণবন্ত পরিবেশ।

মাঠের সেই দিনগুলো আজ স্মৃতি

তখন আধুনিক জিম ছিল না। উন্নত ট্র্যাক ছিল না। দামি প্রশিক্ষণ সরঞ্জামও ছিল না। ছিল কলেজের পেছনের মাঠ, নদীর বালুচর আর নিজেদের শরীর-মনকে প্রস্তুত করার দৃঢ়তা।

একজন অ্যাথলেটের কাছে মাঠ কখনো শুধু মাঠ নয়। সেখানে পড়ে থাকে ঘাম, পরাজয়ের কষ্ট, জয়ের আনন্দ, বন্ধুত্ব এবং স্বপ্ন। বহু বছর পরও সেই মাঠের কথা মনে পড়লে চোখে ভেসে ওঠে তরুণ বয়স—স্টার্টিং লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা, কোচের নির্দেশ শোনা, প্রতিযোগিতার আগে বুক ধড়ফড় করা আর জয়ের পর সতীর্থদের সঙ্গে আনন্দ ভাগ করে নেওয়া।

২০০০ সালের পর শিক্ষা বোর্ডের পরিবর্তনসহ বিভিন্ন বাস্তবতায় আন্তঃকলেজ পর্যায়ে আগের মতো খেলাধুলার ধারাবাহিকতা আর থাকেনি বলে সংশ্লিষ্টদের স্মৃতিচারণে উঠে আসে। সময়ের সঙ্গে মাঠের সেই ব্যস্ততাও কমে যায়।

কেউ সংসারে, কেউ পেশায়, কেউ দূর শহরে। অনেকের হাতে আর জ্যাভলিন ওঠেনি, কেউ আর স্টার্টিং লাইনে দাঁড়াননি। তবু তাঁদের জীবনের একটি অংশ যেন এখনও পড়ে আছে সৈয়দপুর কলেজের সেই মাঠে।

নদীর বালুচর থেকে কলেজের মাঠ, সেখান থেকে রাজশাহীর আন্তঃকলেজের মঞ্চ—এভাবেই এক প্রজন্মের অ্যাথলেট গড়ে উঠেছিল। তাঁদের দৌড় থেমে গেছে, কিন্তু গল্প থামেনি।

সময় বদলেছে, মাঠ বদলেছে, প্রজন্ম বদলেছে। কিন্তু সেই তরুণদের ঘামের স্মৃতি এখনও সৈয়দপুর কলেজের ক্রীড়া ইতিহাসে মিশে আছে।

সুযোগ ছিল সীমিত, সরঞ্জাম ছিল অপ্রতুল—কিন্তু স্বপ্ন ছিল সীমাহীন। সেই সীমাহীন স্বপ্নের দৌড়েই একসময় সৈয়দপুর কলেজের ক্রীড়াঙ্গন লিখেছিল তার নিজস্ব গৌরবের ইতিহাস। (চলবে)

আপনার মতামত লিখুন

BD State News

মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬


স্মৃতির পাতায় সৈয়দপুর কলেজ: চমকপ্রদ ছিল ক্রীড়াঙ্গনের সফলতা

প্রকাশের তারিখ : ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

featured Image

বাশির শব্দ। স্টার্টিং লাইনে দাঁড়িয়ে কয়েকজন তরুণ। মুহূর্তের অপেক্ষা। তারপরই ছুটে চলা। কারও চোখ সামনে, কারও মনে শুধু জয়ের স্বপ্ন। সেই দৌড় শেষ হয়ে গেছে বহু বছর আগে। কিন্তু সৈয়দপুর কলেজের সাবেক অ্যাথলেটদের কাছে সেই মুহূর্তগুলো এখনও যেন সেদিনের।

আশি ও নব্বইয়ের দশকে সৈয়দপুর কলেজের মাঠ ছিল এমনই অসংখ্য স্বপ্নের সাক্ষী। পড়াশোনা, সংস্কৃতি কিংবা রাজনীতির পাশাপাশি ক্রীড়াঙ্গনেও তখন তৈরি হয়েছিল এক উজ্জ্বল অধ্যায়। সীমিত সুযোগ-সুবিধা, অপ্রতুল সরঞ্জাম আর আধুনিক প্রশিক্ষণব্যবস্থার অভাব তাঁদের থামাতে পারেনি। কলেজের মাঠ, পেছনের খোলা জায়গা কিংবা নদীর বালুচর—যেখানে সুযোগ মিলেছে, সেখানেই হয়েছে অনুশীলন।

৪০০, ৮০০ ও ১ হাজার ৫০০ মিটার দৌড়, জ্যাভলিন, লং জাম্প, হাই জাম্প, লাফ-ধাপ-ঝাঁপ, ডিসকাস, শটপুটসহ বিভিন্ন ইভেন্টে ছিল তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা। অভ্যন্তরীণ প্রতিযোগিতা থেকেই উঠে আসতেন নতুন অ্যাথলেট। একজনের সাফল্য অন্যজনকে আরও ভালো করার তাগিদ দিত।

বালুচর থেকে ট্র্যাকে

অ্যাথলেট সারাফাত আলী মুন্না ছিলেন মূলত ম্যারাথন দৌড়বিদ। তবে ৪০০, ৮০০ ও ১ হাজার ৫০০ মিটার দৌড়েও অংশ নিতেন। অনুশীলনের জন্য তাঁর নির্দিষ্ট কোনো আধুনিক ট্র্যাক ছিল না। অনেক সময় নদীর বালুচরই হয়ে উঠত তাঁর দৌড়ের জায়গা। কখনো সৈয়দপুর থেকে পার্বতীপুর পর্যন্ত দৌড়েও অনুশীলন করতেন তিনি।

সেই অনুশীলনের মধ্য দিয়েই তৈরি হন নারী অ্যাথলেট মিন্নি, কৃষ্ণা মজুমদার ও কলি। তাঁদের আন্তঃকলেজ প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে রাজশাহীতে নিয়ে যেতেন সৈয়দপুর কলেজের শিক্ষক আবদুস সাত্তার ও স্বনামধন্য ফুটবলার মোকবুল হোসেন।

সেই সময় মেয়েদের খেলাধুলায় অংশ নেওয়া আজকের মতো স্বাভাবিক ছিল না। সামাজিক সংকোচ ছিল, ছিল নানা প্রশ্ন। কিন্তু কৃষ্ণা, মিন্নি ও কলিরা সেসব পেছনে ফেলে ট্র্যাকে নেমেছিলেন। দৌড় তাঁদের কাছে শুধু প্রতিযোগিতা ছিল না, ছিল নিজেদের সামর্থ্য প্রকাশেরও একটি মাধ্যম।

কৃষ্ণার দৌড়

কৃষ্ণা মজুমদার ছিলেন সেই সময়ের অন্যতম আলোচিত নারী অ্যাথলেট। তাঁর বাবা রেলওয়ে পুলিশ স্টেশনে কর্মরত ছিলেন। বাবার চাকরির সুবাদে শৈশব-কৈশোরের একটি সময় কেটেছে সৈয়দপুরে। সৈয়দপুর পাইলট বালিকা উচ্চবিদ্যালয় থেকে এসএসসি এবং সৈয়দপুর কলেজ থেকে এইচএসসি পড়াশোনা করেন তিনি।

১৯৮৫ সালে ইন্টারমিডিয়েটে পড়ার সময় ১০০, ২০০ ও ৪০০ মিটার দৌড় এবং জ্যাভলিন নিক্ষেপে প্রথম হন কৃষ্ণা। পরপর দুইবার চ্যাম্পিয়ন হওয়ার কৃতিত্বও অর্জন করেন।

ট্র্যাকে শর্টস ও জার্সি পরে দৌড়ানো তখনও অনেকের চোখে স্বাভাবিক ছিল না। কিন্তু কৃষ্ণার কাছে এসবের চেয়ে বড় ছিল দৌড় এবং নিজের সামর্থ্য প্রমাণের আকাঙ্ক্ষা।

পরবর্তী সময়ে বাবার চাকরির কারণে পরিবার রাজবাড়ীতে চলে গেলেও তাঁর অ্যাথলেটিকস জীবন থেমে থাকেনি। সেখানেও খেলাধুলার সঙ্গে যুক্ত থাকেন। ২০০০ সালে ঢাকা ক্লাবের হয়ে বাংলাদেশ গেমসে অংশ নিয়ে রানার্সআপ হন।

মঞ্জুর আগমনে নতুন গতি

১৯৮৮ সালে সৈয়দপুর কলেজে আসেন মঞ্জুরুল ইসলাম মঞ্জু। তাঁর আগমনে কলেজের অ্যাথলেটিকসে যোগ হয় নতুন গতি। রাজশাহীর আন্তঃকলেজ প্রতিযোগিতায় ১০০ ও ২০০ মিটার দৌড়ে প্রথম হন তিনি। লাফ-ধাপ-ঝাঁপের ইভেন্টেও সাফল্য পান।

একজন দৌড়বিদের কাছে কয়েক সেকেন্ডের দৌড়ের পেছনে লুকিয়ে থাকে দীর্ঘ অনুশীলন। স্টার্টিং লাইনে দাঁড়ানোর আগের উত্তেজনা, বাঁশির অপেক্ষা এবং তারপর শরীরের সব শক্তি দিয়ে সামনে ছুটে যাওয়া—সেই অভিজ্ঞতা তাঁদের কাছে আজও অমলিন।

খোকনের জ্যাভলিন

জহুরুল ইসলাম খোকনের স্মৃতিতে রাজশাহীর সেই মাঠ এখনও জীবন্ত। নিজ কলেজে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পাশাপাশি আন্তঃকলেজ প্রতিযোগিতায় জ্যাভলিন নিক্ষেপে তৎকালীন সাফ গেমসের খেলোয়াড় আবদুস সালামকে ছাড়িয়ে যাওয়ার স্মৃতি তিনি এখনও ভুলতে পারেননি।

জ্যাভলিন হাতে নেওয়ার আগে মোকবুল হোসেন তাঁকে বলেছিলেন, “খোকন, থ্রো আমার বুকে মার। না হলে আমি সরব না।”

খোকন ছুটলেন। জ্যাভলিন ছুড়লেন। সেটিই সেদিন সর্বোচ্চ দূরত্ব অতিক্রম করল।

একজন অ্যাথলেটের জীবনে এমন একটি মুহূর্ত হয়তো কয়েক সেকেন্ডের। কিন্তু সেই কয়েক সেকেন্ডই হয়ে যায় সারাজীবনের স্মৃতি।

ফুটবল মাঠেও ছিল লড়াই

ক্রীড়াঙ্গনের সেই সময়টিতে শুধু অ্যাথলেটিকস নয়, ফুটবলও ছিল সমান প্রাণবন্ত।

১৯৯০ সালের সেপ্টেম্বরে রাজশাহীতে শুরু হয় আন্তঃকলেজ ফুটবল প্রতিযোগিতা। এতে অংশ নেয় ৩২টি কলেজ। সৈয়দপুর কলেজের ১৬ সদস্যের দলে ছিলেন মোয়াজ্জেম, সাইফুল, লাড্ডাম, খাইরুল, মনা, বাবুসহ অনেকে। কোচ হিসেবে তাঁদের সঙ্গে ছিলেন আবদুস সাত্তার।

সৈয়দপুর কলেজ কোয়ার্টার ফাইনাল পর্যন্ত খেলেছিল। ফুটবলের মাঠের সেই লড়াইও কলেজের ক্রীড়া ইতিহাসের স্মৃতিতে আলাদা জায়গা করে নেয়।

নব্বইয়ের দশকে সাফল্যের ধারাবাহিকতা

নব্বইয়ের দশকে সৈয়দপুর কলেজের ক্রীড়াঙ্গনে যেন একসঙ্গে অনেক প্রতিভার আবির্ভাব ঘটে। ট্র্যাক অ্যান্ড ফিল্ডের পাশাপাশি হাই জাম্প, লং জাম্প, লাফ-ধাপ-ঝাঁপ, পোল ভল্ট, ডিসকাস ও জ্যাভলিনসহ বিভিন্ন ইভেন্টে অংশ নিতেন শিক্ষার্থীরা।

নতুন শারীরিক শিক্ষক আহসান উদ্দিন বাদলের আগমনে অনুশীলনে আসে নতুন শৃঙ্খলা। কলেজের পেছনের মাঠে সময় ধরে দৌড় করাতেন তিনি। শুধু দ্রুত দৌড়ানো নয়, প্রতিযোগিতার নিয়ম-কানুনও শেখাতেন। কোন ভুলে একজন অ্যাথলেট ডিসকোয়ালিফাই হতে পারেন, সেটিও ছিল প্রশিক্ষণের অংশ।

১৯৯২ থেকে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত রাজশাহীর আন্তঃকলেজ প্রতিযোগিতায় সৈয়দপুর কলেজ তিনবার চ্যাম্পিয়ন এবং দুইবার রানার্সআপ হয়।

চার অ্যাথলেটের হাতে ১৯৯৪-এর গৌরব

১৯৯৪ সাল ছিল সৈয়দপুর কলেজের ক্রীড়া ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় বছর। মাত্র চারজন অ্যাথলেট—দেবু, আবদুল্লাহ আল আখেরুজ্জামান আপেল, মঞ্জুর আলম ও মাসুদকে নিয়ে রাজশাহীর ৩২ কলেজের প্রতিযোগিতায় অংশ নেয় সৈয়দপুর কলেজ।

সংখ্যায় তাঁরা ছিলেন মাত্র চারজন। কিন্তু মাঠে তাঁদের লড়াই ছিল অনেক বড় দলের সঙ্গে।

দেবু ১০০ মিটার, ২০০ মিটার ও জ্যাভলিন নিক্ষেপে প্রথম হয়ে ব্যক্তিগতভাবে ১৫ পয়েন্ট অর্জন করেন। আপেল ৪০০ মিটার দৌড় ও লং জাম্পে প্রথম হয়ে পান ১০ পয়েন্ট। মঞ্জুর আলম লাফ-ধাপ-ঝাঁপে দ্বিতীয় হয়ে অর্জন করেন ৩ পয়েন্ট। মাসুদ হাই জাম্পে তৃতীয় হয়ে পান ১ পয়েন্ট।

চারজনের ব্যক্তিগত ইভেন্ট থেকে সৈয়দপুর কলেজের সংগ্রহ দাঁড়ায় ২৯ পয়েন্টে। এরপর ৪০০ ও ৮০০ মিটার রিলেতে প্রথম হয়ে দলটি আরও ২০ পয়েন্ট অর্জন করে।

সব মিলিয়ে সৈয়দপুর কলেজের পয়েন্ট হয় ৪৯।

৩২টি কলেজের প্রতিযোগিতায় মাত্র চারজন অ্যাথলেট নিয়ে ৪৯ পয়েন্ট অর্জন করে চ্যাম্পিয়ন হয় সৈয়দপুর কলেজ।

সংখ্যায় ছোট সেই দলটির সাফল্য তাই শুধু একটি চ্যাম্পিয়নশিপ ছিল না; ছিল প্রস্তুতি, আত্মবিশ্বাস ও সীমিত সুযোগের মধ্যেও বড় স্বপ্ন দেখার এক অনন্য উদাহরণ।

বাদলের ঘড়িতে চলত অনুশীলন

এই সাফল্যের নেপথ্যে প্রশিক্ষক আহসান উদ্দিন বাদলের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর স্মৃতিতে, দলের অনেক খেলোয়াড়ই ছিলেন ফুটবলার ও অভিজ্ঞ ক্রীড়াবিদ। তাঁদের মধ্যে সম্ভাবনা আগে থেকেই ছিল। প্রয়োজন ছিল সেই সম্ভাবনাকে সঠিক ইভেন্টে কাজে লাগানো এবং প্রতিযোগিতার জন্য প্রস্তুত করা।

তাঁর তত্ত্বাবধানে আবদুল্লাহ আল আখেরুজ্জামান আপেল, মিজানুর রহমান মোনা, সাখাওয়াত হোসেন, মাসুদ, আবদুল খালেক, মোকছেদ আলী, আবদুস সবুর, দেবব্রত বর্মন, রেজাউল হক, মাসুম, তাহাজিবুল আলম মিন্টু, রোকসানা খাতুনসহ অনেকেই নিজ নিজ ইভেন্টে সুনাম অর্জন করেন।

একজনের সাফল্যে অন্যজন অনুপ্রাণিত হতেন। একজন দৌড়বিদ ভালো করলে অন্যজন তাঁকে ছাড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতেন। একজন জ্যাভলিন ছুড়লে অন্যজনের লক্ষ্য থাকত আরও দূরে ছোড়া। এভাবেই গড়ে উঠেছিল প্রতিযোগিতার প্রাণবন্ত পরিবেশ।

মাঠের সেই দিনগুলো আজ স্মৃতি

তখন আধুনিক জিম ছিল না। উন্নত ট্র্যাক ছিল না। দামি প্রশিক্ষণ সরঞ্জামও ছিল না। ছিল কলেজের পেছনের মাঠ, নদীর বালুচর আর নিজেদের শরীর-মনকে প্রস্তুত করার দৃঢ়তা।

একজন অ্যাথলেটের কাছে মাঠ কখনো শুধু মাঠ নয়। সেখানে পড়ে থাকে ঘাম, পরাজয়ের কষ্ট, জয়ের আনন্দ, বন্ধুত্ব এবং স্বপ্ন। বহু বছর পরও সেই মাঠের কথা মনে পড়লে চোখে ভেসে ওঠে তরুণ বয়স—স্টার্টিং লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা, কোচের নির্দেশ শোনা, প্রতিযোগিতার আগে বুক ধড়ফড় করা আর জয়ের পর সতীর্থদের সঙ্গে আনন্দ ভাগ করে নেওয়া।

২০০০ সালের পর শিক্ষা বোর্ডের পরিবর্তনসহ বিভিন্ন বাস্তবতায় আন্তঃকলেজ পর্যায়ে আগের মতো খেলাধুলার ধারাবাহিকতা আর থাকেনি বলে সংশ্লিষ্টদের স্মৃতিচারণে উঠে আসে। সময়ের সঙ্গে মাঠের সেই ব্যস্ততাও কমে যায়।

কেউ সংসারে, কেউ পেশায়, কেউ দূর শহরে। অনেকের হাতে আর জ্যাভলিন ওঠেনি, কেউ আর স্টার্টিং লাইনে দাঁড়াননি। তবু তাঁদের জীবনের একটি অংশ যেন এখনও পড়ে আছে সৈয়দপুর কলেজের সেই মাঠে।

নদীর বালুচর থেকে কলেজের মাঠ, সেখান থেকে রাজশাহীর আন্তঃকলেজের মঞ্চ—এভাবেই এক প্রজন্মের অ্যাথলেট গড়ে উঠেছিল। তাঁদের দৌড় থেমে গেছে, কিন্তু গল্প থামেনি।

সময় বদলেছে, মাঠ বদলেছে, প্রজন্ম বদলেছে। কিন্তু সেই তরুণদের ঘামের স্মৃতি এখনও সৈয়দপুর কলেজের ক্রীড়া ইতিহাসে মিশে আছে।

সুযোগ ছিল সীমিত, সরঞ্জাম ছিল অপ্রতুল—কিন্তু স্বপ্ন ছিল সীমাহীন। সেই সীমাহীন স্বপ্নের দৌড়েই একসময় সৈয়দপুর কলেজের ক্রীড়াঙ্গন লিখেছিল তার নিজস্ব গৌরবের ইতিহাস। (চলবে)


BD State News

সম্পাদক: আবদুর রাকিব

কপিরাইট © ২০২৬ BD State News । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত