ঢাকা   মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬
BD State News

শিক্ষাঙ্গন

স্মৃতির পাতায় সৈয়দপুর সরকারি কলেজ: শিক্ষক ছিলেন অভিভাবক

স্মৃতির পাতায় সৈয়দপুর সরকারি কলেজ: শিক্ষক ছিলেন অভিভাবক
সৈয়দপুর সরকারী কলেজের সাবেক মেধাবী শিক্ষার্থী ডান থেকে ফাতিমা পারভীন, হোসেন তাহমিদ মুক্তা ও ইবরার সিদ্দিকী

একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ইতিহাস শুধু ইট-পাথরের দেয়ালে লেখা থাকে না; তার প্রকৃত ইতিহাস গড়ে ওঠে মানুষের স্মৃতিতে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম যে প্রতিষ্ঠানকে ঘিরে স্বপ্ন দেখে, জ্ঞান অর্জন করে এবং জীবনের পথে এগিয়ে যায়, সেই প্রতিষ্ঠানের প্রতিটি করিডোর, শ্রেণিকক্ষ আর মাঠ হয়ে ওঠে একেকটি জীবন্ত গল্প।

 সৈয়দপুর সরকারি কলেজও তেমনই এক স্মৃতিময় শিক্ষাঙ্গন। ১৯৫৩ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে উত্তর জনপদের অসংখ্য শিক্ষার্থীর স্বপ্নের ঠিকানা হয়ে ওঠা এই প্রতিষ্ঠানটি আশির ও নব্বইয়ের দশকে যেন নিজস্ব এক স্বর্ণসময় পার করেছে।

সেই সময়ে শিক্ষার সঙ্গে বাণিজ্যিক কোচিং বা প্রাইভেট পড়ার সম্পর্ক ছিল না বললেই চলে। শ্রেণিকক্ষই ছিল শিক্ষার্থীদের প্রধান ভরসা, আর শিক্ষকরাই ছিলেন পথ দেখানোর মানুষ। তাঁদের আন্তরিকতা, নিষ্ঠা ও মমতায় কঠিন বিষয়গুলোও সহজ হয়ে উঠত। নির্ধারিত সময়ের বাইরেও দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য চলত অতিরিক্ত পাঠদান। কেউ নিয়মিত ক্লাসে না এলে শিক্ষকরা খোঁজ নিতেন। একজন শিক্ষকের কাছে শিক্ষার্থী শুধু রোল নম্বর ছিল না; ছিল একটি ভবিষ্যৎ, একটি পরিবারের স্বপ্ন।

সেই সময়ের শিক্ষকদের কথা আজও শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারণ করেন সাবেক শিক্ষার্থীরা। অধ্যক্ষ আনসার আলী, সহকারী অধ্যাপক মতিউর রহমান, মনসুর রহমান, আশরাফুল হক, খলিলুর রহমানসহ আ. সাত্তার, অধ্যক্ষ আফসার আলী, জিকরুল হক, মোসলেম উদ্দিন, শাহজাহান আলী, আবুবকর সিদ্দিক, দ্বিজেন্দ্র বর্মন, ওবায়েদ শিবলী, মিনাল কান্তি, আব্দুল হাফিজ, আমিনুল ইসলাম, মোখবুল হোসেন, নজরুল ইসলাম, আসাদুজ্জামান আসাদ, মোখলেছুর রহমান, আ. রাজ্জাকসহ আরও অনেক শিক্ষক তাঁদের জ্ঞান, শাসন ও ভালোবাসা দিয়ে গড়ে তুলেছিলেন একটি প্রজন্মকে।

সেই শিক্ষার প্রতিফলন দেখা যায় ফলাফলের পাতাতেও। ১৯৮৭ সালে ইবরার সিদ্দিকী রাজশাহী বোর্ডের অধীনে বিএসসি পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণি অর্জন করে মেধাতালিকায় চতুর্থ স্থান লাভ করেন। নব্বইয়ের দশকে ডিগ্রি বোর্ড গাজীপুরে স্থানান্তরিত হওয়ার পরও সৈয়দপুর কলেজের সাফল্যের ধারায় ভাটা পড়েনি। ১৯৯১ সালে জেবুন্নেসা মিরা বিএসসিতে ষষ্ঠ, ১৯৯৫ সালে হোসেন তাহমিদ মুক্তা চতুর্থ, ১৯৯৬ সালে ফাতেমা পারভীন ত্রয়োদশ, ১৯৯৭ সালে মোছা. রোখসানা আহমেদ অষ্টম এবং মৌসুমি সোহানী শিমুল চতুর্দশ, ১৯৯৮ সালে রানা মোকবুল চতুর্দশ ও ফারজানা সুলতানা ইভা সপ্তদশ স্থান অর্জন করেন।

সৈয়দপুর আল-ফারুক একাডেমির সহকারী শিক্ষক ও কলেজটির সাবেক শিক্ষার্থী মো. নজরুল ইসলাম এসব ফলাফলের স্মৃতি এখনও মনে রেখেছেন। তাঁর কাছে সেসব দিন শুধু মেধাতালিকার কয়েকটি সংখ্যা নয়; বরং একটি শিক্ষাঙ্গনের গৌরবময় অধ্যায়ের স্মারক।

হোসেন তাহমিদ মুক্তার জীবনেও সৈয়দপুর কলেজের সেই সময়টি গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। তাঁর ভাষায়, ১৯৯১ থেকে ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত এই প্রতিষ্ঠানে পড়ার সুযোগ তাঁর জীবনের অন্যতম বড় সৌভাগ্য। ১৯৯২ সালের এসএসসি পরীক্ষায় তিনি নীলফামারী জেলায় তৃতীয় স্থান অর্জন করেন। পরবর্তী সময়ে ১৯৯৪ সালে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে বিএসসি পরীক্ষায় জাতীয় মেধাতালিকায় চতুর্থ স্থান লাভ করেন।

পেছনে ফিরে তাকালে তিনি সাফল্যের কৃতিত্ব একা নিজের বলে মনে করেন না। তাঁর স্মৃতিতে ভেসে ওঠেন একদল যোগ্য, নিবেদিতপ্রাণ, সৎ ও বিনয়ী শিক্ষক। তাঁদের স্নেহ, সহযোগিতা ও দিকনির্দেশনা তাঁর শিক্ষাজীবনের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁকে সাহস জুগিয়েছে। তিনি মনে করেন, জীবনের যে অবস্থানে তিনি পৌঁছেছেন, তার পেছনে ওই শিক্ষকদের অবদান গভীর ও অনস্বীকার্য। সময় পেরিয়ে গেলেও তাঁদের ভালোবাসা ও শুভকামনা এখনও তাঁর কাছে অমূল্য সম্পদ। প্রিয় শিক্ষকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তিনি তাঁদের সবার জন্য দোয়া করেন।

একই স্মৃতি বয়ে চলেছেন মোছা. রোখসানা আহমেদ। ১৯৯৭ সালের বিএসসি পরীক্ষায় মেধাতালিকায় অষ্টম স্থান অর্জন করা এই শিক্ষার্থী এসএসসি পাস করেছিলেন সৈয়দপুর পাইলট বালিকা উচ্চবিদ্যালয় থেকে প্রথম বিভাগে। এরপর ‘বিজ্ঞান কলেজ’ থেকে এইচএসসি পরীক্ষায় দ্বিতীয় বিভাগে উত্তীর্ণ হন। সে সময় অসুস্থতার কারণে প্রত্যাশিত ফল করতে পারেননি তিনি। কিন্তু সৈয়দপুর কলেজে ভর্তি হওয়ার পর যেন তাঁর শিক্ষাজীবনের নতুন দরজা খুলে যায়।

রোখসানার বাবা ছিলেন কাপড়ের ব্যবসায়ী এবং পাকিস্তান আমলের একজন স্নাতক। মেয়ের পড়াশোনার প্রতি তাঁর ছিল গভীর আগ্রহ। পরিবারের অনুপ্রেরণা, সহপাঠীদের সহযোগিতা, শিক্ষকদের নিবিড় তত্ত্বাবধান আর নিজের নিরলস পরিশ্রম—সবকিছু মিলেই বদলে যায় তাঁর ফলাফলের চিত্র।

রোখসানা আহমেদ ও রানা মোকবুলের স্মৃতিতে সেই সময়ের একটি বাক্য আজও স্পষ্ট—“আমরা কখনই প্রাইভেট পড়তাম না। স্যাররা ক্লাসে যা পড়াতেন, সেটাই ছিল আমাদের সম্পদ।” এই একটি কথার মধ্যেই যেন ধরা পড়ে সেই সময়ের শিক্ষাব্যবস্থার চিত্র। শ্রেণিকক্ষ ছিল জ্ঞানের মূল উৎস, শিক্ষক ছিলেন পথপ্রদর্শক, আর শিক্ষার্থীর অধ্যবসায় ছিল সাফল্যের চাবিকাঠি।

ফাতেমা পারভীনের স্মৃতিতেও সেই দিনগুলো উজ্জ্বল। ১৯৯৬ সালের বিএসসি পরীক্ষায় মেধাতালিকায় ত্রয়োদশ স্থান অর্জন করেন তিনি। ১৯৯১ সালে সৈয়দপুর পাইলট বালিকা উচ্চবিদ্যালয় থেকে প্রথম বিভাগে এসএসসি এবং ১৯৯৩ সালে সৈয়দপুর ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে স্টার মার্কসহ এইচএসসি পাস করেন।

ফাতেমার চোখে সেই সময়ের শিক্ষকরা ছিলেন শুধু বিষয়ভিত্তিক জ্ঞানদাতা নন, তাঁরা ছিলেন শিক্ষার্থীদের জীবনের অভিভাবকের মতো। কোনো শিক্ষার্থী ক্লাসে অনুপস্থিত থাকলে তাঁরা কারণ জানতে চাইতেন। কোনো কঠিন বিষয় বুঝতে সমস্যা হলে বারবার বুঝিয়ে দিতেন। আর এখন শিক্ষকগণ অনেকটা ব্যাবসা প্রবৃত্তির। তারা ক্লাসে বলেন, আমার কাছে প্রাইভেট পড়তে হবে। আর আমাদের শিক্ষকগণ ছিলেন ব্যাতিক্রম। ধারাবাহিকতায়  সহকারী অধ্যাপক মতিউর রহমান, মনসুর রহমান, খলিলুর রহমান ও আশরাফুল হকের কথা বিশেষভাবে স্মরণ করেন তিনি। তাঁদের পাঠদানের ধরন ও আন্তরিকতা শিক্ষার্থীদের আত্মবিশ্বাসী করে তুলেছিল।

শুধু পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান নয়, শিক্ষকদের স্নেহ-সহযোগিতা শিক্ষার্থীদের জীবনের পথও বদলে দিয়েছে। ফাতেমা পারভীনের ভাষ্য অনুযায়ী, সহকারী অধ্যাপক মতিউর রহমানের সহযোগিতায় তিনি পড়াশোনার সময়ই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চাকরির সুযোগ পান। পরবর্তীতে সৈয়দপুর ক্যান্টনমেন্টের কাছে ‘ফ্রি আমিন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়’ প্রতিষ্ঠার সঙ্গে যুক্ত হন তিনি। তাঁর বিশ্বাস, একজন শিক্ষকের আন্তরিকতা কখনো কখনো একটি শিক্ষার্থীর পুরো জীবনকে নতুন পথে নিয়ে যেতে পারে।

আজ সময় বদলেছে। বদলেছে শিক্ষার ধরন, বদলেছে প্রযুক্তি, বদলেছে শিক্ষার্থীদের স্বপ্ন দেখার পরিধিও। কিন্তু সৈয়দপুর কলেজের সেই পুরোনো দিনের গল্পগুলো এখনও হারিয়ে যায়নি। পুরোনো শ্রেণিকক্ষের দেয়ালে হয়তো আজ আর সেই কণ্ঠস্বর শোনা যায় না, করিডোরে হয়তো নেই সেই চেনা পদচারণা; তবু সাবেক শিক্ষার্থীদের হৃদয়ে শিক্ষকরা এখনও বেঁচে আছেন শ্রদ্ধা আর ভালোবাসার জায়গায়।

একসময় যে শিক্ষকরা চক হাতে ব্ল্যাকবোর্ডের সামনে দাঁড়িয়ে একটি কঠিন সূত্র সহজ করে দিতেন, তাঁরাই হয়তো জানতেন না—তাঁদের সেই কয়েকটি কথা কোনো এক শিক্ষার্থীর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেবে। তাঁদের দেওয়া শিক্ষা শুধু পরীক্ষার খাতায় নম্বর হয়ে থাকেনি; তা ছড়িয়ে পড়েছে কর্মজীবনে, সমাজে, পরিবারে এবং পরবর্তী প্রজন্মের স্বপ্নে।

সৈয়দপুর সরকারি কলেজের সেই সময় তাই কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের অতীত নয়, এটি একটি প্রজন্মের বেড়ে ওঠার গল্প। যেখানে শিক্ষকতা ছিল দায়িত্বের চেয়েও বেশি কিছু, শ্রেণিকক্ষ ছিল স্বপ্ন গড়ার কারখানা, আর শিক্ষার্থীদের সাফল্য ছিল শিক্ষকদের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। সময়ের স্রোত অনেক কিছু মুছে দেয়, কিন্তু কিছু স্মৃতি কখনো পুরোনো হয় না। সৈয়দপুর কলেজের সেই দিনগুলোও তেমনি—স্মৃতির পাতায় আজও অমলিন, আজও আলো ছড়ায়।

 (চলবে)

আপনার মতামত লিখুন

BD State News

মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬


স্মৃতির পাতায় সৈয়দপুর সরকারি কলেজ: শিক্ষক ছিলেন অভিভাবক

প্রকাশের তারিখ : ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

featured Image

একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ইতিহাস শুধু ইট-পাথরের দেয়ালে লেখা থাকে না; তার প্রকৃত ইতিহাস গড়ে ওঠে মানুষের স্মৃতিতে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম যে প্রতিষ্ঠানকে ঘিরে স্বপ্ন দেখে, জ্ঞান অর্জন করে এবং জীবনের পথে এগিয়ে যায়, সেই প্রতিষ্ঠানের প্রতিটি করিডোর, শ্রেণিকক্ষ আর মাঠ হয়ে ওঠে একেকটি জীবন্ত গল্প।

 সৈয়দপুর সরকারি কলেজও তেমনই এক স্মৃতিময় শিক্ষাঙ্গন। ১৯৫৩ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে উত্তর জনপদের অসংখ্য শিক্ষার্থীর স্বপ্নের ঠিকানা হয়ে ওঠা এই প্রতিষ্ঠানটি আশির ও নব্বইয়ের দশকে যেন নিজস্ব এক স্বর্ণসময় পার করেছে।


সেই সময়ে শিক্ষার সঙ্গে বাণিজ্যিক কোচিং বা প্রাইভেট পড়ার সম্পর্ক ছিল না বললেই চলে। শ্রেণিকক্ষই ছিল শিক্ষার্থীদের প্রধান ভরসা, আর শিক্ষকরাই ছিলেন পথ দেখানোর মানুষ। তাঁদের আন্তরিকতা, নিষ্ঠা ও মমতায় কঠিন বিষয়গুলোও সহজ হয়ে উঠত। নির্ধারিত সময়ের বাইরেও দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য চলত অতিরিক্ত পাঠদান। কেউ নিয়মিত ক্লাসে না এলে শিক্ষকরা খোঁজ নিতেন। একজন শিক্ষকের কাছে শিক্ষার্থী শুধু রোল নম্বর ছিল না; ছিল একটি ভবিষ্যৎ, একটি পরিবারের স্বপ্ন।


সেই সময়ের শিক্ষকদের কথা আজও শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারণ করেন সাবেক শিক্ষার্থীরা। অধ্যক্ষ আনসার আলী, সহকারী অধ্যাপক মতিউর রহমান, মনসুর রহমান, আশরাফুল হক, খলিলুর রহমানসহ আ. সাত্তার, অধ্যক্ষ আফসার আলী, জিকরুল হক, মোসলেম উদ্দিন, শাহজাহান আলী, আবুবকর সিদ্দিক, দ্বিজেন্দ্র বর্মন, ওবায়েদ শিবলী, মিনাল কান্তি, আব্দুল হাফিজ, আমিনুল ইসলাম, মোখবুল হোসেন, নজরুল ইসলাম, আসাদুজ্জামান আসাদ, মোখলেছুর রহমান, আ. রাজ্জাকসহ আরও অনেক শিক্ষক তাঁদের জ্ঞান, শাসন ও ভালোবাসা দিয়ে গড়ে তুলেছিলেন একটি প্রজন্মকে।


সেই শিক্ষার প্রতিফলন দেখা যায় ফলাফলের পাতাতেও। ১৯৮৭ সালে ইবরার সিদ্দিকী রাজশাহী বোর্ডের অধীনে বিএসসি পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণি অর্জন করে মেধাতালিকায় চতুর্থ স্থান লাভ করেন। নব্বইয়ের দশকে ডিগ্রি বোর্ড গাজীপুরে স্থানান্তরিত হওয়ার পরও সৈয়দপুর কলেজের সাফল্যের ধারায় ভাটা পড়েনি। ১৯৯১ সালে জেবুন্নেসা মিরা বিএসসিতে ষষ্ঠ, ১৯৯৫ সালে হোসেন তাহমিদ মুক্তা চতুর্থ, ১৯৯৬ সালে ফাতেমা পারভীন ত্রয়োদশ, ১৯৯৭ সালে মোছা. রোখসানা আহমেদ অষ্টম এবং মৌসুমি সোহানী শিমুল চতুর্দশ, ১৯৯৮ সালে রানা মোকবুল চতুর্দশ ও ফারজানা সুলতানা ইভা সপ্তদশ স্থান অর্জন করেন।


সৈয়দপুর আল-ফারুক একাডেমির সহকারী শিক্ষক ও কলেজটির সাবেক শিক্ষার্থী মো. নজরুল ইসলাম এসব ফলাফলের স্মৃতি এখনও মনে রেখেছেন। তাঁর কাছে সেসব দিন শুধু মেধাতালিকার কয়েকটি সংখ্যা নয়; বরং একটি শিক্ষাঙ্গনের গৌরবময় অধ্যায়ের স্মারক।


হোসেন তাহমিদ মুক্তার জীবনেও সৈয়দপুর কলেজের সেই সময়টি গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। তাঁর ভাষায়, ১৯৯১ থেকে ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত এই প্রতিষ্ঠানে পড়ার সুযোগ তাঁর জীবনের অন্যতম বড় সৌভাগ্য। ১৯৯২ সালের এসএসসি পরীক্ষায় তিনি নীলফামারী জেলায় তৃতীয় স্থান অর্জন করেন। পরবর্তী সময়ে ১৯৯৪ সালে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে বিএসসি পরীক্ষায় জাতীয় মেধাতালিকায় চতুর্থ স্থান লাভ করেন।


পেছনে ফিরে তাকালে তিনি সাফল্যের কৃতিত্ব একা নিজের বলে মনে করেন না। তাঁর স্মৃতিতে ভেসে ওঠেন একদল যোগ্য, নিবেদিতপ্রাণ, সৎ ও বিনয়ী শিক্ষক। তাঁদের স্নেহ, সহযোগিতা ও দিকনির্দেশনা তাঁর শিক্ষাজীবনের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁকে সাহস জুগিয়েছে। তিনি মনে করেন, জীবনের যে অবস্থানে তিনি পৌঁছেছেন, তার পেছনে ওই শিক্ষকদের অবদান গভীর ও অনস্বীকার্য। সময় পেরিয়ে গেলেও তাঁদের ভালোবাসা ও শুভকামনা এখনও তাঁর কাছে অমূল্য সম্পদ। প্রিয় শিক্ষকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তিনি তাঁদের সবার জন্য দোয়া করেন।


একই স্মৃতি বয়ে চলেছেন মোছা. রোখসানা আহমেদ। ১৯৯৭ সালের বিএসসি পরীক্ষায় মেধাতালিকায় অষ্টম স্থান অর্জন করা এই শিক্ষার্থী এসএসসি পাস করেছিলেন সৈয়দপুর পাইলট বালিকা উচ্চবিদ্যালয় থেকে প্রথম বিভাগে। এরপর ‘বিজ্ঞান কলেজ’ থেকে এইচএসসি পরীক্ষায় দ্বিতীয় বিভাগে উত্তীর্ণ হন। সে সময় অসুস্থতার কারণে প্রত্যাশিত ফল করতে পারেননি তিনি। কিন্তু সৈয়দপুর কলেজে ভর্তি হওয়ার পর যেন তাঁর শিক্ষাজীবনের নতুন দরজা খুলে যায়।


রোখসানার বাবা ছিলেন কাপড়ের ব্যবসায়ী এবং পাকিস্তান আমলের একজন স্নাতক। মেয়ের পড়াশোনার প্রতি তাঁর ছিল গভীর আগ্রহ। পরিবারের অনুপ্রেরণা, সহপাঠীদের সহযোগিতা, শিক্ষকদের নিবিড় তত্ত্বাবধান আর নিজের নিরলস পরিশ্রম—সবকিছু মিলেই বদলে যায় তাঁর ফলাফলের চিত্র।


রোখসানা আহমেদ ও রানা মোকবুলের স্মৃতিতে সেই সময়ের একটি বাক্য আজও স্পষ্ট—“আমরা কখনই প্রাইভেট পড়তাম না। স্যাররা ক্লাসে যা পড়াতেন, সেটাই ছিল আমাদের সম্পদ।” এই একটি কথার মধ্যেই যেন ধরা পড়ে সেই সময়ের শিক্ষাব্যবস্থার চিত্র। শ্রেণিকক্ষ ছিল জ্ঞানের মূল উৎস, শিক্ষক ছিলেন পথপ্রদর্শক, আর শিক্ষার্থীর অধ্যবসায় ছিল সাফল্যের চাবিকাঠি।


ফাতেমা পারভীনের স্মৃতিতেও সেই দিনগুলো উজ্জ্বল। ১৯৯৬ সালের বিএসসি পরীক্ষায় মেধাতালিকায় ত্রয়োদশ স্থান অর্জন করেন তিনি। ১৯৯১ সালে সৈয়দপুর পাইলট বালিকা উচ্চবিদ্যালয় থেকে প্রথম বিভাগে এসএসসি এবং ১৯৯৩ সালে সৈয়দপুর ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে স্টার মার্কসহ এইচএসসি পাস করেন।


ফাতেমার চোখে সেই সময়ের শিক্ষকরা ছিলেন শুধু বিষয়ভিত্তিক জ্ঞানদাতা নন, তাঁরা ছিলেন শিক্ষার্থীদের জীবনের অভিভাবকের মতো। কোনো শিক্ষার্থী ক্লাসে অনুপস্থিত থাকলে তাঁরা কারণ জানতে চাইতেন। কোনো কঠিন বিষয় বুঝতে সমস্যা হলে বারবার বুঝিয়ে দিতেন। আর এখন শিক্ষকগণ অনেকটা ব্যাবসা প্রবৃত্তির। তারা ক্লাসে বলেন, আমার কাছে প্রাইভেট পড়তে হবে। আর আমাদের শিক্ষকগণ ছিলেন ব্যাতিক্রম। ধারাবাহিকতায়  সহকারী অধ্যাপক মতিউর রহমান, মনসুর রহমান, খলিলুর রহমান ও আশরাফুল হকের কথা বিশেষভাবে স্মরণ করেন তিনি। তাঁদের পাঠদানের ধরন ও আন্তরিকতা শিক্ষার্থীদের আত্মবিশ্বাসী করে তুলেছিল।


শুধু পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান নয়, শিক্ষকদের স্নেহ-সহযোগিতা শিক্ষার্থীদের জীবনের পথও বদলে দিয়েছে। ফাতেমা পারভীনের ভাষ্য অনুযায়ী, সহকারী অধ্যাপক মতিউর রহমানের সহযোগিতায় তিনি পড়াশোনার সময়ই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চাকরির সুযোগ পান। পরবর্তীতে সৈয়দপুর ক্যান্টনমেন্টের কাছে ‘ফ্রি আমিন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়’ প্রতিষ্ঠার সঙ্গে যুক্ত হন তিনি। তাঁর বিশ্বাস, একজন শিক্ষকের আন্তরিকতা কখনো কখনো একটি শিক্ষার্থীর পুরো জীবনকে নতুন পথে নিয়ে যেতে পারে।


আজ সময় বদলেছে। বদলেছে শিক্ষার ধরন, বদলেছে প্রযুক্তি, বদলেছে শিক্ষার্থীদের স্বপ্ন দেখার পরিধিও। কিন্তু সৈয়দপুর কলেজের সেই পুরোনো দিনের গল্পগুলো এখনও হারিয়ে যায়নি। পুরোনো শ্রেণিকক্ষের দেয়ালে হয়তো আজ আর সেই কণ্ঠস্বর শোনা যায় না, করিডোরে হয়তো নেই সেই চেনা পদচারণা; তবু সাবেক শিক্ষার্থীদের হৃদয়ে শিক্ষকরা এখনও বেঁচে আছেন শ্রদ্ধা আর ভালোবাসার জায়গায়।


একসময় যে শিক্ষকরা চক হাতে ব্ল্যাকবোর্ডের সামনে দাঁড়িয়ে একটি কঠিন সূত্র সহজ করে দিতেন, তাঁরাই হয়তো জানতেন না—তাঁদের সেই কয়েকটি কথা কোনো এক শিক্ষার্থীর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেবে। তাঁদের দেওয়া শিক্ষা শুধু পরীক্ষার খাতায় নম্বর হয়ে থাকেনি; তা ছড়িয়ে পড়েছে কর্মজীবনে, সমাজে, পরিবারে এবং পরবর্তী প্রজন্মের স্বপ্নে।


সৈয়দপুর সরকারি কলেজের সেই সময় তাই কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের অতীত নয়, এটি একটি প্রজন্মের বেড়ে ওঠার গল্প। যেখানে শিক্ষকতা ছিল দায়িত্বের চেয়েও বেশি কিছু, শ্রেণিকক্ষ ছিল স্বপ্ন গড়ার কারখানা, আর শিক্ষার্থীদের সাফল্য ছিল শিক্ষকদের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। সময়ের স্রোত অনেক কিছু মুছে দেয়, কিন্তু কিছু স্মৃতি কখনো পুরোনো হয় না। সৈয়দপুর কলেজের সেই দিনগুলোও তেমনি—স্মৃতির পাতায় আজও অমলিন, আজও আলো ছড়ায়।

 (চলবে)


BD State News

সম্পাদক: আবদুর রাকিব

কপিরাইট © ২০২৬ BD State News । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত