সৈয়দপুর শহরের পশ্চিম প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা সৈয়দপুর সরকারি কলেজ যেন একটি প্রতিষ্ঠান নয়—একটি শহরের কয়েক প্রজন্মের স্বপ্ন, সাফল্য, তারুণ্য ও স্মৃতির বিশাল এক ভাণ্ডার। ১৯৫৩ সালে প্রতিষ্ঠিত এই প্রতিষ্ঠানটি নীলফামারী জেলার প্রথম কলেজ হিসেবে পরিচিত এবং বর্তমানে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ও দিনাজপুর শিক্ষা বোর্ডের সঙ্গে যুক্ত।
আজকের সৈয়দপুর সরকারি কলেজের পুরোনো নাম ছিল কায়েদে আজম জিন্নাহ কলেজ। সময়ের পরিবর্তনে নাম বদলেছে, প্রতিষ্ঠানটি সরকারি হয়েছে, বদলে গেছে প্রজন্মের পর প্রজন্ম; কিন্তু এর দেয়াল, মাঠ, মঞ্চ আর বৃক্ষের পাতায় যেন জমে আছে সেই পুরোনো দিনের গল্প।
শহর থেকে পশ্চিমে এগোলেই চোখে পড়ে বিশালাকার কলেজ অবকাঠামো। দীর্ঘকায় ভবনটির স্থাপত্যে পুরোনো দিনের ছাপ স্পষ্ট। ভাষা আন্দোলনের স্মৃতিও এই ক্যাম্পাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। কলেজ প্রাঙ্গণেই রয়েছে সৈয়দপুরের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার—ফলে শিক্ষা ও ভাষার ইতিহাসের সঙ্গেও প্রতিষ্ঠানটির একটি বিশেষ যোগসূত্র তৈরি হয়েছে।
কয়েক দিন আগে কলেজটির চারপাশের প্রাচীর উঁচু করে ঘিরে দেওয়া হয়েছে। ফলে বাইরে দাঁড়িয়ে আগের মতো এর স্থাপত্য-সৌন্দর্য অবলোকনের সুযোগ অনেকটাই কমেছে। এখন সেই সৌন্দর্য দেখতে হলে প্রবেশ করতে হয় কলেজের ভেতরে। আর ভেতরে ঢুকলেই যেন খুলে যায় স্মৃতির আরেক দরজা।
এই কলেজের ইতিহাস শুধু ভবনের নয়, মানুষের ইতিহাস। ষাটের দশক থেকে নব্বইয়ের দশক পর্যন্ত এই প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করেছেন সৈয়দপুরসহ বৃহত্তর উত্তরাঞ্চলের বহু মেধাবী শিক্ষার্থী। তাঁদের অনেকে পরবর্তীতে দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে উচ্চপদে দায়িত্ব পালন করেছেন। কেউ প্রশাসনে, কেউ চিকিৎসা, প্রকৌশল, শিক্ষা, ব্যাংকিং কিংবা রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন পর্যায়ে নিজেদের যোগ্যতার স্বাক্ষর রেখেছেন।
একসময় আশপাশে পর্যাপ্ত ডিগ্রি কলেজ না থাকায় পঞ্চগড়, দিনাজপুর, নীলফামারী, ঠাকুরগাঁওসহ প্রায় আট জেলার শিক্ষার্থীরা উচ্চশিক্ষার জন্য ছুটে আসতেন সৈয়দপুরে। প্রায় চার হাজার শিক্ষার্থীর পদচারণায় মুখর থাকত বিশাল ক্যাম্পাস। আজকের সরকারি কলেজের অবস্থান ও পরিচয়ও সরকারি নথিতে সৈয়দপুর কলেজ হিসেবেই বিদ্যমান।
সেই সময়ের শিক্ষার মান ছিল এই প্রতিষ্ঠানের অন্যতম বড় পরিচয়। মেধাবী প্রভাষক ও অধ্যাপকদের পাঠদান, পরিশ্রম এবং শিক্ষার্থীদের মেধার পরিচর্যায় কলেজটি বিভাগীয় ও জাতীয় পর্যায়ে একাধিক সাফল্যের নজির গড়েছিল বলে সাবেক শিক্ষার্থী ও স্থানীয়দের স্মৃতিতে রয়েছে।
যে মঞ্চে প্রাণ পেত সংস্কৃতি
সৈয়দপুর সরকারি কলেজের ইতিহাসের সবচেয়ে বর্ণিল অধ্যায়গুলোর একটি সংস্কৃতি চর্চা। গান, নাটক, আবৃত্তি, বিতর্ক, মুকাভিনয়—সবকিছুর মধ্যেই ছিল শিক্ষার্থীদের প্রাণবন্ত অংশগ্রহণ।
নব্বইয়ের দশকে সৈয়দপুরের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের পরিচিত শিল্পী ইবরার টিপু বিভিন্ন স্টেজ প্রোগ্রামে নিয়মিত গান পরিবেশন করতেন। তাঁর কণ্ঠে গান, মঞ্চের আলো আর দর্শকদের উচ্ছ্বাস—সব মিলিয়ে তখনকার সৈয়দপুরের সাংস্কৃতিক পরিবেশ ছিল অন্যরকম।
অভিনয় জগতের পরিচিত মুখ উজ্জ্বলও এই কলেজে পড়াশোনা করেছেন। ছাত্রজীবনে তিনি একাধিক মঞ্চনাটকে অভিনয় করেছেন। ফলে কলেজের মঞ্চ শুধু অনুষ্ঠান আয়োজনের জায়গা ছিল না, নতুন প্রতিভা বিকাশেরও এক গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র ছিল।
১৯৮৮ সালে এই সাংস্কৃতিক ইতিহাসে যোগ হয় আরেক স্মরণীয় অধ্যায়। খ্যাতিমান নাট্যকার ও নাট্যব্যক্তিত্ব মামুনুর রশীদ তাঁর নাট্যদল নিয়ে সৈয়দপুরে আসেন। শহীদ মিনারে তাঁদের একটি নাটক মঞ্চস্থ হয়। সেই আয়োজন তখনকার সংস্কৃতিপ্রেমী মানুষ ও শিক্ষার্থীদের জন্য ছিল বিশেষ আকর্ষণের।
এর তিন বছর পর, ১৯৯১ সালে নিজেদের অভিনয় প্রতিভার অনন্য পরিচয় দেন কলেজের শিক্ষার্থীরাই। তাঁরা মুকাভিনয়ের মাধ্যমে পল্লীকবি জসীমউদ্দীনের ‘সোজন বাদিয়ার ঘাট’ ও ‘নকশী কাঁথার মাঠ’-এর আবহ মঞ্চে তুলে ধরেন।
পর্দার পেছনে স্বল্প আলো জ্বালিয়ে, অঙ্গভঙ্গি, শরীরের ভাষা ও মুখের অভিব্যক্তির মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা ফুটিয়ে তুলেছিলেন গ্রামীণ বাংলার প্রেম, বিরহ, বেদনা ও জীবনের গল্প। সংলাপের পরিবর্তে নীরব অভিনয়ের শক্তিতে দর্শকদের সামনে কাহিনিকে জীবন্ত করে তোলা সেই আয়োজন আজও স্মৃতিতে উজ্জ্বল।
সেই সময়ের শিক্ষার্থীরা প্রমাণ করেছিলেন—শিক্ষা শুধু বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ নয়; শিক্ষা মানুষের সৌন্দর্যবোধ, সৃজনশীলতা ও কল্পনাকেও জাগিয়ে তোলে।
রাজনীতির উত্তাপ, বন্ধুত্বের আড্ডা
১৯৮২ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত কলেজ ক্যাম্পাস ছিল বহুদলীয় ছাত্ররাজনীতিরও সরব ক্ষেত্র। ছাত্র ইউনিয়ন, ছাত্র মৈত্রী, জাসদ ছাত্রলীগ, ছাত্রলীগ, ছাত্রদল, ছাত্রসমাজ ও ছাত্রশিবির—বিভিন্ন সংগঠন নিয়মিত সভা, মিছিল ও সাংগঠনিক কর্মসূচি পালন করত।
মতের পার্থক্য ছিল, আদর্শের ভিন্নতা ছিল, রাজনৈতিক উত্তাপও ছিল। কিন্তু সেই রাজনীতির পাশাপাশি চলত বন্ধুত্ব, খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক চর্চা।
ছাত্র ও ছাত্রীদের জন্য ছিল পৃথক কমনরুম। সেখানে খেলাধুলা ও বিনোদনের পাশাপাশি চলত নানা ধরনের আড্ডা। আবার কলেজের পেছনের মাঠ ছিল বন্ধুদের আরেক ঠিকানা। কেউ খেলত, কেউ গল্প করত, কেউ ভবিষ্যতের স্বপ্ন নিয়ে আলোচনা করত।
তারুণ্যের সেই দিনগুলো আজ অনেক দূরের ইতিহাস। কিন্তু যাঁরা সেই সময়ের শিক্ষার্থী ছিলেন, তাঁদের কাছে সেগুলো যেন গতকালের ঘটনা।
যে মাঠে জন্ম নিয়েছিল চ্যাম্পিয়ন
সৈয়দপুর সরকারি কলেজের ইতিহাসে খেলাধুলার অধ্যায়টি ছিল আরও উজ্জ্বল। বিশেষ করে নব্বইয়ের দশককে অনেকে কলেজের ক্রীড়াঙ্গনের স্বর্ণালী সময় হিসেবে স্মরণ করেন।
কলেজের ছাত্র মুন্না ও কুন্দলের আসলাম পারভেজ ম্যারাথন দৌড়ে একাধিকবার প্রথম হয়ে অ্যাথলেটিকসে নিজেদের প্রতিভার অনন্য স্বাক্ষর রাখেন। দীর্ঘ পথের দৌড়ে তাঁদের সাফল্য কলেজের ক্রীড়া ঐতিহ্যকে আরও সমৃদ্ধ করেছিল।
একই সময়ে মেধাবী দৌড়বিদ হিসেবে পরিচিত ছিলেন বর্তমান জামায়াতে ইসলামী সৈয়দপুর উপজেলা নায়েবে আমির মো. শফিকুল ইসলাম। ছাত্রজীবনে তিনি কয়েকটি ইভেন্টে টানা পাঁচবার চ্যাম্পিয়ন হওয়ার কৃতিত্ব অর্জন করেন বলে সাবেক শিক্ষার্থী ও সংশ্লিষ্টদের স্মৃতিতে রয়েছে।
সাংবাদিক জহুরুল ইসলাম খোকনও ছিলেন কলেজের ক্রীড়া অঙ্গনের একজন পরিচিত মুখ। বর্ষা নিক্ষেপে রাজশাহী বিভাগীয় প্রতিযোগিতায় প্রথম হওয়ার গৌরব অর্জন করেছিলেন তিনি।
আর নব্বইয়ের দশকে রাজশাহী বিভাগীয় আন্তঃকলেজ অ্যাথলেটিক প্রতিযোগিতায় সৈয়দপুর কলেজের ছিল এক অসাধারণ দাপট। টানা পাঁচবার চ্যাম্পিয়ন হওয়ার কৃতিত্ব অর্জন করে কলেজটি।
১০০ মিটার, ৮০০ মিটার, ১৫০০ মিটার, রিলে বা যোগাযোগ দৌড় এবং পোল ভল্ট—এই পাঁচটি ইভেন্টে সাফল্যের মাধ্যমে কলেজের অ্যাথলেটরা শ্রেষ্ঠত্বের স্বাক্ষর রাখেন।
সেই স্বর্ণালী দলের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা নামগুলোর মধ্যে ছিলেন আখেরুজ্জামান আপেল, দেবু ভট্টাচার্য, মিন্টু, মঞ্জুর আলম, মোনা, মকছেদ, সবুর, আবদুল খালেক, রেজাউল হক, মাসুমসহ আরও অনেকে।
কেউ ছিলেন দ্রুততম দৌড়বিদ, কেউ মধ্য ও দীর্ঘদূরত্বের প্রতিযোগী, কেউ রিলের ব্যাটন হাতে দলকে এগিয়ে নিয়েছেন, আবার কেউ পোল ভল্টে উচ্চতার সঙ্গে লড়াই করেছেন। তাঁদের সম্মিলিত সাফল্যেই সৈয়দপুর কলেজ রাজশাহী বিভাগের আন্তঃকলেজ ক্রীড়াঙ্গনে শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করেছিল।
সম্প্রতি অবসরে যাওয়া কলেজটির ক্রীড়া বিভাগের প্রভাষক আহসান উদ্দিন বাদল সেই সময়ের প্রত্যক্ষ সাক্ষী। তাঁর ভাষায়, “আমার সময় খেলাধুলায় নব্বই দশকে এ কলেজ স্বর্ণালী সময় অতিবাহিত করেছে।”
একজন শিক্ষক হিসেবে তিনি দেখেছেন কীভাবে একটি প্রজন্ম মাঠকে ভালোবেসে নিজেদের তৈরি করেছে। অনুশীলন, প্রতিযোগিতা, পরাজয়, আবার ফিরে আসা—সবকিছুর মধ্য দিয়ে গড়ে উঠেছিল চ্যাম্পিয়নদের সেই প্রজন্ম।
ফুলের বাগানে হারানো সৌন্দর্য
কলেজের সামনের বৃত্তাকার বাগান ছিল একসময় ক্যাম্পাসের অন্যতম আকর্ষণ। জবা, কৃষ্ণচূড়া, গন্ধরাজ, রজনীগন্ধা, বিভিন্ন জাতের গোলাপ, কামিনীসহ শতাধিক প্রজাতির ফুলের গাছ ছিল সেখানে।
ঋতু বদলালে বদলে যেত বাগানের রং। ফুলের সুবাস আর সবুজের ছায়ায় কলেজের পরিবেশ হয়ে উঠত আরও মনোরম।
নিচতলার পূর্বদিকে ছিল অধ্যক্ষের কক্ষ। এখনও সেই কক্ষ রয়েছে। তবে একসময় এর সামনে দাঁড়িয়ে ছিল প্রায় ত্রিশ ফুট উঁচু একটি সাদা কলকে ফুলের গাছ। নব্বইয়ের দশকে কোনো এক কালবৈশাখীর ঝড়ে গাছটি ভেঙে পড়ে। ধীরে ধীরে হারিয়ে যায় আরও কিছু পুরোনো গাছ ও ফুলের সৌন্দর্য।
পরবর্তীতে নতুন করে সাজানো হয়েছে বাগান। আবারও সেখানে ফুটছে ফুল। কিন্তু সেই সৌন্দর্য কতটা অনুভব করে আজকের প্রজন্ম—সেটিই যেন বড় প্রশ্ন।
বাগানের পরিচর্যাকারী মালী মনে করেন, আগের প্রজন্মের মতো ক্যাম্পাস ও বাগানের প্রতি শিক্ষার্থীদের আবেগ এখন আর ততটা দেখা যায় না। হয়তো সময় বদলেছে। হয়তো প্রযুক্তিনির্ভর জীবনে মানুষের মনোযোগের জায়গাগুলোও বদলে গেছে।
তবুও ফুল ফুটে। গাছ বেড়ে ওঠে। আর বাগানটি নীরবে সাক্ষ্য দেয়—কত প্রজন্ম এই পথ দিয়ে হেঁটে গেছে।
একটি কলেজ, হাজারো স্মৃতি
সৈয়দপুর সরকারি কলেজের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার ভবন নয়, তার মানুষ। সেইসব শিক্ষক, যাঁরা প্রজন্মের পর প্রজন্মকে গড়ে তুলেছেন; সেইসব শিক্ষার্থী, যাঁরা এখান থেকে বেরিয়ে দেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছেন; সেইসব শিল্পী, অভিনেতা ও সংস্কৃতিকর্মী, যাঁরা মঞ্চকে প্রাণ দিয়েছেন; সেইসব ক্রীড়াবিদ, যাঁরা মাঠ থেকে ট্রফি এনে কলেজের নাম উজ্জ্বল করেছেন।
এই প্রতিষ্ঠানকে ঘিরে একসময় যে প্রাণচাঞ্চল্য ছিল, তা ছিল একটি পূর্ণাঙ্গ সমাজের মতো। শ্রেণিকক্ষ ছিল জ্ঞানের জায়গা, মাঠ ছিল স্বপ্নের জায়গা, মঞ্চ ছিল সৃজনশীলতার জায়গা, কমনরুম ছিল বন্ধুত্বের জায়গা আর রাজনৈতিক সংগঠনগুলো ছিল মতপ্রকাশের জায়গা।
আজ সেই সময় নেই। নেই সেই মানুষগুলোর অনেকেই। কিন্তু তাঁদের স্মৃতি আছে।
কলেজের দীর্ঘ বারান্দায় দাঁড়ালে হয়তো কোনো সাবেক শিক্ষার্থীর মনে পড়ে যায় পুরোনো কোনো ক্লাসরুম। শহীদ মিনারের কাছে দাঁড়ালে মনে পড়ে ১৯৮৮ সালের সেই নাট্য আয়োজন। মঞ্চের কথা মনে পড়লে ফিরে আসে ১৯৯১ সালের সেই মুকাভিনয়। মাঠে চোখ পড়লে মনে পড়ে মুন্না, আসলাম পারভেজ, শফিকুল ইসলাম কিংবা আখেরুজ্জামান আপেলদের দৌড়। আর ফুলের বাগানের পাশে দাঁড়ালে মনে পড়ে নব্বইয়ের সেই কালবৈশাখী, যে ঝড়ে হারিয়ে গিয়েছিল ত্রিশ ফুট উঁচু সাদা কলকে ফুলের গাছটি।
সময় মানুষকে দূরে সরিয়ে দেয়, কিন্তু স্মৃতিকে নয়।
সৈয়দপুর সরকারি কলেজ তাই শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়—এটি সৈয়দপুরের শিক্ষা, সংস্কৃতি, রাজনীতি ও ক্রীড়ার দীর্ঘ ইতিহাসের এক জীবন্ত দলিল।
একসময় এই ক্যাম্পাস থেকে বেরিয়ে গেছে দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে দায়িত্ব পালনকারী মানুষ। এখানকার মঞ্চে অভিনয় হয়েছে, শহীদ মিনারে নাটক মঞ্চস্থ হয়েছে, আলো-আঁধারির মঞ্চে জসীমউদ্দীনের সাহিত্য জীবন্ত হয়েছে। আবার সেই একই ক্যাম্পাসের মাঠ থেকে বেরিয়ে এসেছে একের পর এক চ্যাম্পিয়ন অ্যাথলেট।
এ যেন একই ছাদের নিচে জ্ঞান, সংস্কৃতি ও ক্রীড়ার এক বিরল সহাবস্থান।
আজ নতুন প্রজন্ম সেই ইতিহাসের উত্তরাধিকারী। তাঁদের সামনে শুধু নতুন ভবিষ্যৎ নয়—পেছনেও রয়েছে এক বিশাল ঐতিহ্য।
সেই ঐতিহ্যকে জানা, সংরক্ষণ করা এবং নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া এখন সময়ের দাবি।
কারণ একটি কলেজের দেয়াল শুধু ইট-বালু দিয়ে তৈরি হয় না। তার সঙ্গে মিশে থাকে মানুষের স্বপ্ন, চোখের জল, হাসি, বন্ধুত্ব, সাফল্য, পরাজয় আর ফিরে আসার গল্প।
সৈয়দপুর সরকারি কলেজের প্রতিটি ইট-পাথর, প্রতিটি গাছ, প্রতিটি মাঠ আর প্রতিটি মঞ্চ যেন আজও সেই গল্পই বলে যাচ্ছে।
(চলবে)

মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৩ আগস্ট ২০২৬
সৈয়দপুর শহরের পশ্চিম প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা সৈয়দপুর সরকারি কলেজ যেন একটি প্রতিষ্ঠান নয়—একটি শহরের কয়েক প্রজন্মের স্বপ্ন, সাফল্য, তারুণ্য ও স্মৃতির বিশাল এক ভাণ্ডার। ১৯৫৩ সালে প্রতিষ্ঠিত এই প্রতিষ্ঠানটি নীলফামারী জেলার প্রথম কলেজ হিসেবে পরিচিত এবং বর্তমানে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ও দিনাজপুর শিক্ষা বোর্ডের সঙ্গে যুক্ত।
আজকের সৈয়দপুর সরকারি কলেজের পুরোনো নাম ছিল কায়েদে আজম জিন্নাহ কলেজ। সময়ের পরিবর্তনে নাম বদলেছে, প্রতিষ্ঠানটি সরকারি হয়েছে, বদলে গেছে প্রজন্মের পর প্রজন্ম; কিন্তু এর দেয়াল, মাঠ, মঞ্চ আর বৃক্ষের পাতায় যেন জমে আছে সেই পুরোনো দিনের গল্প।
শহর থেকে পশ্চিমে এগোলেই চোখে পড়ে বিশালাকার কলেজ অবকাঠামো। দীর্ঘকায় ভবনটির স্থাপত্যে পুরোনো দিনের ছাপ স্পষ্ট। ভাষা আন্দোলনের স্মৃতিও এই ক্যাম্পাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। কলেজ প্রাঙ্গণেই রয়েছে সৈয়দপুরের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার—ফলে শিক্ষা ও ভাষার ইতিহাসের সঙ্গেও প্রতিষ্ঠানটির একটি বিশেষ যোগসূত্র তৈরি হয়েছে।
কয়েক দিন আগে কলেজটির চারপাশের প্রাচীর উঁচু করে ঘিরে দেওয়া হয়েছে। ফলে বাইরে দাঁড়িয়ে আগের মতো এর স্থাপত্য-সৌন্দর্য অবলোকনের সুযোগ অনেকটাই কমেছে। এখন সেই সৌন্দর্য দেখতে হলে প্রবেশ করতে হয় কলেজের ভেতরে। আর ভেতরে ঢুকলেই যেন খুলে যায় স্মৃতির আরেক দরজা।
এই কলেজের ইতিহাস শুধু ভবনের নয়, মানুষের ইতিহাস। ষাটের দশক থেকে নব্বইয়ের দশক পর্যন্ত এই প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করেছেন সৈয়দপুরসহ বৃহত্তর উত্তরাঞ্চলের বহু মেধাবী শিক্ষার্থী। তাঁদের অনেকে পরবর্তীতে দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে উচ্চপদে দায়িত্ব পালন করেছেন। কেউ প্রশাসনে, কেউ চিকিৎসা, প্রকৌশল, শিক্ষা, ব্যাংকিং কিংবা রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন পর্যায়ে নিজেদের যোগ্যতার স্বাক্ষর রেখেছেন।
একসময় আশপাশে পর্যাপ্ত ডিগ্রি কলেজ না থাকায় পঞ্চগড়, দিনাজপুর, নীলফামারী, ঠাকুরগাঁওসহ প্রায় আট জেলার শিক্ষার্থীরা উচ্চশিক্ষার জন্য ছুটে আসতেন সৈয়দপুরে। প্রায় চার হাজার শিক্ষার্থীর পদচারণায় মুখর থাকত বিশাল ক্যাম্পাস। আজকের সরকারি কলেজের অবস্থান ও পরিচয়ও সরকারি নথিতে সৈয়দপুর কলেজ হিসেবেই বিদ্যমান।
সেই সময়ের শিক্ষার মান ছিল এই প্রতিষ্ঠানের অন্যতম বড় পরিচয়। মেধাবী প্রভাষক ও অধ্যাপকদের পাঠদান, পরিশ্রম এবং শিক্ষার্থীদের মেধার পরিচর্যায় কলেজটি বিভাগীয় ও জাতীয় পর্যায়ে একাধিক সাফল্যের নজির গড়েছিল বলে সাবেক শিক্ষার্থী ও স্থানীয়দের স্মৃতিতে রয়েছে।
যে মঞ্চে প্রাণ পেত সংস্কৃতি
সৈয়দপুর সরকারি কলেজের ইতিহাসের সবচেয়ে বর্ণিল অধ্যায়গুলোর একটি সংস্কৃতি চর্চা। গান, নাটক, আবৃত্তি, বিতর্ক, মুকাভিনয়—সবকিছুর মধ্যেই ছিল শিক্ষার্থীদের প্রাণবন্ত অংশগ্রহণ।
নব্বইয়ের দশকে সৈয়দপুরের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের পরিচিত শিল্পী ইবরার টিপু বিভিন্ন স্টেজ প্রোগ্রামে নিয়মিত গান পরিবেশন করতেন। তাঁর কণ্ঠে গান, মঞ্চের আলো আর দর্শকদের উচ্ছ্বাস—সব মিলিয়ে তখনকার সৈয়দপুরের সাংস্কৃতিক পরিবেশ ছিল অন্যরকম।
অভিনয় জগতের পরিচিত মুখ উজ্জ্বলও এই কলেজে পড়াশোনা করেছেন। ছাত্রজীবনে তিনি একাধিক মঞ্চনাটকে অভিনয় করেছেন। ফলে কলেজের মঞ্চ শুধু অনুষ্ঠান আয়োজনের জায়গা ছিল না, নতুন প্রতিভা বিকাশেরও এক গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র ছিল।
১৯৮৮ সালে এই সাংস্কৃতিক ইতিহাসে যোগ হয় আরেক স্মরণীয় অধ্যায়। খ্যাতিমান নাট্যকার ও নাট্যব্যক্তিত্ব মামুনুর রশীদ তাঁর নাট্যদল নিয়ে সৈয়দপুরে আসেন। শহীদ মিনারে তাঁদের একটি নাটক মঞ্চস্থ হয়। সেই আয়োজন তখনকার সংস্কৃতিপ্রেমী মানুষ ও শিক্ষার্থীদের জন্য ছিল বিশেষ আকর্ষণের।
এর তিন বছর পর, ১৯৯১ সালে নিজেদের অভিনয় প্রতিভার অনন্য পরিচয় দেন কলেজের শিক্ষার্থীরাই। তাঁরা মুকাভিনয়ের মাধ্যমে পল্লীকবি জসীমউদ্দীনের ‘সোজন বাদিয়ার ঘাট’ ও ‘নকশী কাঁথার মাঠ’-এর আবহ মঞ্চে তুলে ধরেন।
পর্দার পেছনে স্বল্প আলো জ্বালিয়ে, অঙ্গভঙ্গি, শরীরের ভাষা ও মুখের অভিব্যক্তির মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা ফুটিয়ে তুলেছিলেন গ্রামীণ বাংলার প্রেম, বিরহ, বেদনা ও জীবনের গল্প। সংলাপের পরিবর্তে নীরব অভিনয়ের শক্তিতে দর্শকদের সামনে কাহিনিকে জীবন্ত করে তোলা সেই আয়োজন আজও স্মৃতিতে উজ্জ্বল।
সেই সময়ের শিক্ষার্থীরা প্রমাণ করেছিলেন—শিক্ষা শুধু বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ নয়; শিক্ষা মানুষের সৌন্দর্যবোধ, সৃজনশীলতা ও কল্পনাকেও জাগিয়ে তোলে।
রাজনীতির উত্তাপ, বন্ধুত্বের আড্ডা
১৯৮২ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত কলেজ ক্যাম্পাস ছিল বহুদলীয় ছাত্ররাজনীতিরও সরব ক্ষেত্র। ছাত্র ইউনিয়ন, ছাত্র মৈত্রী, জাসদ ছাত্রলীগ, ছাত্রলীগ, ছাত্রদল, ছাত্রসমাজ ও ছাত্রশিবির—বিভিন্ন সংগঠন নিয়মিত সভা, মিছিল ও সাংগঠনিক কর্মসূচি পালন করত।
মতের পার্থক্য ছিল, আদর্শের ভিন্নতা ছিল, রাজনৈতিক উত্তাপও ছিল। কিন্তু সেই রাজনীতির পাশাপাশি চলত বন্ধুত্ব, খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক চর্চা।
ছাত্র ও ছাত্রীদের জন্য ছিল পৃথক কমনরুম। সেখানে খেলাধুলা ও বিনোদনের পাশাপাশি চলত নানা ধরনের আড্ডা। আবার কলেজের পেছনের মাঠ ছিল বন্ধুদের আরেক ঠিকানা। কেউ খেলত, কেউ গল্প করত, কেউ ভবিষ্যতের স্বপ্ন নিয়ে আলোচনা করত।
তারুণ্যের সেই দিনগুলো আজ অনেক দূরের ইতিহাস। কিন্তু যাঁরা সেই সময়ের শিক্ষার্থী ছিলেন, তাঁদের কাছে সেগুলো যেন গতকালের ঘটনা।
যে মাঠে জন্ম নিয়েছিল চ্যাম্পিয়ন
সৈয়দপুর সরকারি কলেজের ইতিহাসে খেলাধুলার অধ্যায়টি ছিল আরও উজ্জ্বল। বিশেষ করে নব্বইয়ের দশককে অনেকে কলেজের ক্রীড়াঙ্গনের স্বর্ণালী সময় হিসেবে স্মরণ করেন।
কলেজের ছাত্র মুন্না ও কুন্দলের আসলাম পারভেজ ম্যারাথন দৌড়ে একাধিকবার প্রথম হয়ে অ্যাথলেটিকসে নিজেদের প্রতিভার অনন্য স্বাক্ষর রাখেন। দীর্ঘ পথের দৌড়ে তাঁদের সাফল্য কলেজের ক্রীড়া ঐতিহ্যকে আরও সমৃদ্ধ করেছিল।
একই সময়ে মেধাবী দৌড়বিদ হিসেবে পরিচিত ছিলেন বর্তমান জামায়াতে ইসলামী সৈয়দপুর উপজেলা নায়েবে আমির মো. শফিকুল ইসলাম। ছাত্রজীবনে তিনি কয়েকটি ইভেন্টে টানা পাঁচবার চ্যাম্পিয়ন হওয়ার কৃতিত্ব অর্জন করেন বলে সাবেক শিক্ষার্থী ও সংশ্লিষ্টদের স্মৃতিতে রয়েছে।
সাংবাদিক জহুরুল ইসলাম খোকনও ছিলেন কলেজের ক্রীড়া অঙ্গনের একজন পরিচিত মুখ। বর্ষা নিক্ষেপে রাজশাহী বিভাগীয় প্রতিযোগিতায় প্রথম হওয়ার গৌরব অর্জন করেছিলেন তিনি।
আর নব্বইয়ের দশকে রাজশাহী বিভাগীয় আন্তঃকলেজ অ্যাথলেটিক প্রতিযোগিতায় সৈয়দপুর কলেজের ছিল এক অসাধারণ দাপট। টানা পাঁচবার চ্যাম্পিয়ন হওয়ার কৃতিত্ব অর্জন করে কলেজটি।
১০০ মিটার, ৮০০ মিটার, ১৫০০ মিটার, রিলে বা যোগাযোগ দৌড় এবং পোল ভল্ট—এই পাঁচটি ইভেন্টে সাফল্যের মাধ্যমে কলেজের অ্যাথলেটরা শ্রেষ্ঠত্বের স্বাক্ষর রাখেন।
সেই স্বর্ণালী দলের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা নামগুলোর মধ্যে ছিলেন আখেরুজ্জামান আপেল, দেবু ভট্টাচার্য, মিন্টু, মঞ্জুর আলম, মোনা, মকছেদ, সবুর, আবদুল খালেক, রেজাউল হক, মাসুমসহ আরও অনেকে।
কেউ ছিলেন দ্রুততম দৌড়বিদ, কেউ মধ্য ও দীর্ঘদূরত্বের প্রতিযোগী, কেউ রিলের ব্যাটন হাতে দলকে এগিয়ে নিয়েছেন, আবার কেউ পোল ভল্টে উচ্চতার সঙ্গে লড়াই করেছেন। তাঁদের সম্মিলিত সাফল্যেই সৈয়দপুর কলেজ রাজশাহী বিভাগের আন্তঃকলেজ ক্রীড়াঙ্গনে শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করেছিল।
সম্প্রতি অবসরে যাওয়া কলেজটির ক্রীড়া বিভাগের প্রভাষক আহসান উদ্দিন বাদল সেই সময়ের প্রত্যক্ষ সাক্ষী। তাঁর ভাষায়, “আমার সময় খেলাধুলায় নব্বই দশকে এ কলেজ স্বর্ণালী সময় অতিবাহিত করেছে।”
একজন শিক্ষক হিসেবে তিনি দেখেছেন কীভাবে একটি প্রজন্ম মাঠকে ভালোবেসে নিজেদের তৈরি করেছে। অনুশীলন, প্রতিযোগিতা, পরাজয়, আবার ফিরে আসা—সবকিছুর মধ্য দিয়ে গড়ে উঠেছিল চ্যাম্পিয়নদের সেই প্রজন্ম।
ফুলের বাগানে হারানো সৌন্দর্য
কলেজের সামনের বৃত্তাকার বাগান ছিল একসময় ক্যাম্পাসের অন্যতম আকর্ষণ। জবা, কৃষ্ণচূড়া, গন্ধরাজ, রজনীগন্ধা, বিভিন্ন জাতের গোলাপ, কামিনীসহ শতাধিক প্রজাতির ফুলের গাছ ছিল সেখানে।
ঋতু বদলালে বদলে যেত বাগানের রং। ফুলের সুবাস আর সবুজের ছায়ায় কলেজের পরিবেশ হয়ে উঠত আরও মনোরম।
নিচতলার পূর্বদিকে ছিল অধ্যক্ষের কক্ষ। এখনও সেই কক্ষ রয়েছে। তবে একসময় এর সামনে দাঁড়িয়ে ছিল প্রায় ত্রিশ ফুট উঁচু একটি সাদা কলকে ফুলের গাছ। নব্বইয়ের দশকে কোনো এক কালবৈশাখীর ঝড়ে গাছটি ভেঙে পড়ে। ধীরে ধীরে হারিয়ে যায় আরও কিছু পুরোনো গাছ ও ফুলের সৌন্দর্য।
পরবর্তীতে নতুন করে সাজানো হয়েছে বাগান। আবারও সেখানে ফুটছে ফুল। কিন্তু সেই সৌন্দর্য কতটা অনুভব করে আজকের প্রজন্ম—সেটিই যেন বড় প্রশ্ন।
বাগানের পরিচর্যাকারী মালী মনে করেন, আগের প্রজন্মের মতো ক্যাম্পাস ও বাগানের প্রতি শিক্ষার্থীদের আবেগ এখন আর ততটা দেখা যায় না। হয়তো সময় বদলেছে। হয়তো প্রযুক্তিনির্ভর জীবনে মানুষের মনোযোগের জায়গাগুলোও বদলে গেছে।
তবুও ফুল ফুটে। গাছ বেড়ে ওঠে। আর বাগানটি নীরবে সাক্ষ্য দেয়—কত প্রজন্ম এই পথ দিয়ে হেঁটে গেছে।
একটি কলেজ, হাজারো স্মৃতি
সৈয়দপুর সরকারি কলেজের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার ভবন নয়, তার মানুষ। সেইসব শিক্ষক, যাঁরা প্রজন্মের পর প্রজন্মকে গড়ে তুলেছেন; সেইসব শিক্ষার্থী, যাঁরা এখান থেকে বেরিয়ে দেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছেন; সেইসব শিল্পী, অভিনেতা ও সংস্কৃতিকর্মী, যাঁরা মঞ্চকে প্রাণ দিয়েছেন; সেইসব ক্রীড়াবিদ, যাঁরা মাঠ থেকে ট্রফি এনে কলেজের নাম উজ্জ্বল করেছেন।
এই প্রতিষ্ঠানকে ঘিরে একসময় যে প্রাণচাঞ্চল্য ছিল, তা ছিল একটি পূর্ণাঙ্গ সমাজের মতো। শ্রেণিকক্ষ ছিল জ্ঞানের জায়গা, মাঠ ছিল স্বপ্নের জায়গা, মঞ্চ ছিল সৃজনশীলতার জায়গা, কমনরুম ছিল বন্ধুত্বের জায়গা আর রাজনৈতিক সংগঠনগুলো ছিল মতপ্রকাশের জায়গা।
আজ সেই সময় নেই। নেই সেই মানুষগুলোর অনেকেই। কিন্তু তাঁদের স্মৃতি আছে।
কলেজের দীর্ঘ বারান্দায় দাঁড়ালে হয়তো কোনো সাবেক শিক্ষার্থীর মনে পড়ে যায় পুরোনো কোনো ক্লাসরুম। শহীদ মিনারের কাছে দাঁড়ালে মনে পড়ে ১৯৮৮ সালের সেই নাট্য আয়োজন। মঞ্চের কথা মনে পড়লে ফিরে আসে ১৯৯১ সালের সেই মুকাভিনয়। মাঠে চোখ পড়লে মনে পড়ে মুন্না, আসলাম পারভেজ, শফিকুল ইসলাম কিংবা আখেরুজ্জামান আপেলদের দৌড়। আর ফুলের বাগানের পাশে দাঁড়ালে মনে পড়ে নব্বইয়ের সেই কালবৈশাখী, যে ঝড়ে হারিয়ে গিয়েছিল ত্রিশ ফুট উঁচু সাদা কলকে ফুলের গাছটি।
সময় মানুষকে দূরে সরিয়ে দেয়, কিন্তু স্মৃতিকে নয়।
সৈয়দপুর সরকারি কলেজ তাই শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়—এটি সৈয়দপুরের শিক্ষা, সংস্কৃতি, রাজনীতি ও ক্রীড়ার দীর্ঘ ইতিহাসের এক জীবন্ত দলিল।
একসময় এই ক্যাম্পাস থেকে বেরিয়ে গেছে দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে দায়িত্ব পালনকারী মানুষ। এখানকার মঞ্চে অভিনয় হয়েছে, শহীদ মিনারে নাটক মঞ্চস্থ হয়েছে, আলো-আঁধারির মঞ্চে জসীমউদ্দীনের সাহিত্য জীবন্ত হয়েছে। আবার সেই একই ক্যাম্পাসের মাঠ থেকে বেরিয়ে এসেছে একের পর এক চ্যাম্পিয়ন অ্যাথলেট।
এ যেন একই ছাদের নিচে জ্ঞান, সংস্কৃতি ও ক্রীড়ার এক বিরল সহাবস্থান।
আজ নতুন প্রজন্ম সেই ইতিহাসের উত্তরাধিকারী। তাঁদের সামনে শুধু নতুন ভবিষ্যৎ নয়—পেছনেও রয়েছে এক বিশাল ঐতিহ্য।
সেই ঐতিহ্যকে জানা, সংরক্ষণ করা এবং নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া এখন সময়ের দাবি।
কারণ একটি কলেজের দেয়াল শুধু ইট-বালু দিয়ে তৈরি হয় না। তার সঙ্গে মিশে থাকে মানুষের স্বপ্ন, চোখের জল, হাসি, বন্ধুত্ব, সাফল্য, পরাজয় আর ফিরে আসার গল্প।
সৈয়দপুর সরকারি কলেজের প্রতিটি ইট-পাথর, প্রতিটি গাছ, প্রতিটি মাঠ আর প্রতিটি মঞ্চ যেন আজও সেই গল্পই বলে যাচ্ছে।
(চলবে)

আপনার মতামত লিখুন