ঢাকা   মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬
BD State News

খেলা

সৈয়দপুর সোনালী অতিতের ৩-২ গোলে পরাজয়

সৈয়দপুর সোনালী অতিতের ৩-২ গোলে পরাজয়
ছবিতে সোনালী অতিত এর বিরুদ্ধে সৈয়দপুর শিক্ষক একাদশের একটি ফাউল থেকে কিক নেয়ার প্রস্তুতি

একসময় যাদের পায়ের ছন্দে উত্তরাঞ্চলের ফুটবল মাঠে উঠত উন্মাদনা, সেই সোনালী দিনের ফুটবলাররা আবারও নামলেন সবুজ মাঠে। বয়সের ভার শরীরে, দীর্ঘদিন নিয়মিত ফুটবলের বাইরে—তবু পায়ের স্পর্শে এখনও পুরোনো দিনের সেই নান্দনিকতার ঝলক। শুক্রবার বিকালে সৈয়দপুর স্টেডিয়ামের জরাজীর্ণ ও ঘাসে ভরা মাঠে অনুষ্ঠিত এক প্রীতি ফুটবল ম্যাচে শিক্ষক একাদশের কাছে ৩-২ গোলে হেরে গেলেও দর্শকদের ফিরিয়ে দিলেন ৮০ ও ৯০ দশকের ফুটবলের স্মৃতি।

বাংলাদেশ ফুটবলের জীবন্ত কিংবদন্তি কায়সার হামিদ ও আসলাম পারভেজের ব্যাচমেট মো. হান্নানের নেতৃত্বে মাঠে নামে সৈয়দপুর সোনালী অতীত। দলের ম্যানেজার ছিলেন সোহেল ও জাকির হোসেন মেনন।

ম্যাচের শুরুতেই পঞ্চাশোর্ধ্ব খেলোয়াড়দের মাঠে নামিয়ে যেন সময়ের কাঁটা ঘুরিয়ে দেওয়া হয় তিন-চার দশক পেছনে। মুহূর্তেই সৈয়দপুর স্টেডিয়ামের মাঠ যেন ফিরে যায় ৮০ থেকে ৯০ দশকের ফুটবল আমলে। তবে বয়স যে শরীরের ওপর তার ছাপ রেখে যায়, তা কিছুক্ষণ পরেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ধারাবাহিকভাবে খেলোয়াড় পরিবর্তন করে দলকে সচল রাখার চেষ্টা করেন সোনালী অতীতের ম্যানেজমেন্ট।

সোনালী অতীতের ২০ সদস্যের স্কোয়াডটি ছিল সাবেক সেরাদের সমন্বয়ে গড়া। দলে ছিলেন বাংলাদেশ বয়সভিত্তিক জাতীয় দলের সাবেক ফুটবলার আজাদ, ঢাকা লীগের দ্বিতীয় বিভাগে মহাখালী দলের সাবেক অধিনায়ক আতাউর রহমান গেদা, লেফট ডিফেন্ডার মোস্তাক, রাইট উইঙ্গার মোকছেদ এবং উত্তরাঞ্চলের মাঠ মাতানো সাবেক খেলোয়াড় আমজাদ, সবুজ, স্যামুয়েল পাহান, তাহের, খোকন (সিনিয়র), খোকন (জুনিয়র), নুরুল হুদা, আপেল, স্বপন, বাপ্পি, রেজু ও জহুরুল ইসলাম খোকনসহ অন্যরা।

অন্যদিকে শিক্ষক একাদশেও ছিলেন সাবেক ফুটবলার। তবে বয়সের জায়গায় ছিল বড় পার্থক্য। তাদের খেলোয়াড়দের বয়স ছিল আনুমানিক ২০ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে। আর এখানেই যেন ম্যাচের ফল নির্ধারণে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখে বয়স।

ম্যাচের শুরু থেকেই শিক্ষক একাদশের তরুণ খেলোয়াড়রা তুলনামূলক বেশি গতি নিয়ে খেলতে থাকেন। মাত্র পাঁচ মিনিটের মাথায় ডি-বক্সের বাইরে থেকে নেওয়া দীর্ঘ কিক সোনালী অতীতের গোলরক্ষক বাসুদেবকে ফাঁকি দিয়ে জালে জড়িয়ে যায়।

গোলটি নিয়ে অবশ্য মাঠে তৈরি হয় খানিকটা হাস্যরস। বাসুদেব সাবেক ফুটবলার হলেও বর্তমানে শিক্ষক। সহকর্মীদের বিপক্ষে গোলরক্ষকের দায়িত্বে থাকা বাসুদেব বাতাসে ভেসে আসা বলটি আটকাতে যথেষ্ট চেষ্টা করেননি—এমন রসিকতা করতে থাকেন সতীর্থরা। কেউ কেউ মজা করে এতে ‘ষড়যন্ত্রের গন্ধ’ও খুঁজতে থাকেন।

প্রথমার্ধে আরও দুটি গোল হজম করে সোনালী অতীত। তবে এর মধ্যে একটি গোল শোধ করে তারা। বিরতিতে ৩-১ গোলে পিছিয়ে থাকে সাবেকদের দল।

দ্বিতীয়ার্ধে অবশ্য আক্রমণাত্মক ফুটবলে ফেরে সোনালী অতীত। বয়সের সঙ্গে লড়াই করেও গোল পরিশোধের জন্য মরিয়া হয়ে ওঠেন হান্নান বাহিনীর খেলোয়াড়রা। এ সময় বাপ্পির অনবদ্য ব্যক্তিগত নৈপুণ্যে আসে আরও একটি গোল। ফলে ব্যবধান কমে দাঁড়ায় ৩-২।

শেষ পর্যন্ত সমতা ফেরানোর জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করেও আর গোলের দেখা পায়নি সোনালী অতীত। শেষ বাঁশিতে ৩-২ গোলের জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে শিক্ষক একাদশ।

তবে ম্যাচ শেষে জয়-পরাজয়ের চেয়েও বেশি আলোচনায় আসে সৈয়দপুর স্টেডিয়ামের মাঠের অবস্থা। দুই দলের খেলোয়াড়রাই মাঠের বেহাল দশাকে খারাপ পারফরম্যান্সের অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন।

সাংবাদিক ও সাবেক ফুটবলার জহুরুল ইসলাম খোকন বলেন, “মাঠের দক্ষিণ প্রান্তে প্রায় এক ফুট উচ্চতার ঘাস। তার সঙ্গে রয়েছে ঘাসফুল। ফলে বল নিয়ে কোনোভাবেই স্বাভাবিকভাবে দৌড়ানো কিংবা শট নেওয়া যাচ্ছিল না। এই মাঠে খেলতে গিয়ে যেকোনো সময় খেলোয়াড়রা আহত হতে পারেন। বিষয়টি মাঠের অভিভাবকদের গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত।”

একই অভিযোগ করেন শিক্ষক একাদশের খেলোয়াড়রাও। তাদের ভাষ্য, মাঠের অতিরিক্ত ঘাস ও অসমতল পরিবেশে স্বাভাবিক ফুটবল খেলা কঠিন হয়ে পড়েছিল।

স্কোরবোর্ডে জয় শিক্ষক একাদশের হলেও মাঠের বাইরে যেন জয় হলো স্মৃতির। কারণ বয়সের ভারে গতি কমে গেলেও সোনালী অতীতের খেলোয়াড়রা আবারও প্রমাণ করলেন ফুটবল থেকে অবসর নেওয়া যায়, কিন্তু ফুটবলের প্রতি ভালোবাসা থেকে নয়।

সৈয়দপুর স্টেডিয়ামের জরাজীর্ণ মাঠে তাই এদিন শুধু একটি প্রীতি ম্যাচ হয়নি; ফিরে এসেছিল একটি প্রজন্মের ফুটবল স্মৃতি। পায়ের গতি কমেছে, শ্বাস ভারী হয়েছে, শরীর আর আগের মতো সাড়া দেয় না—তবুও বল পায়ে নিলেই চোখেমুখে ফুটে ওঠে সেই পুরোনো দিনের উচ্ছ্বাস।

আপনার মতামত লিখুন

BD State News

মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬


সৈয়দপুর সোনালী অতিতের ৩-২ গোলে পরাজয়

প্রকাশের তারিখ : ৩০ আগস্ট ২০২৬

featured Image

একসময় যাদের পায়ের ছন্দে উত্তরাঞ্চলের ফুটবল মাঠে উঠত উন্মাদনা, সেই সোনালী দিনের ফুটবলাররা আবারও নামলেন সবুজ মাঠে। বয়সের ভার শরীরে, দীর্ঘদিন নিয়মিত ফুটবলের বাইরে—তবু পায়ের স্পর্শে এখনও পুরোনো দিনের সেই নান্দনিকতার ঝলক। শুক্রবার বিকালে সৈয়দপুর স্টেডিয়ামের জরাজীর্ণ ও ঘাসে ভরা মাঠে অনুষ্ঠিত এক প্রীতি ফুটবল ম্যাচে শিক্ষক একাদশের কাছে ৩-২ গোলে হেরে গেলেও দর্শকদের ফিরিয়ে দিলেন ৮০ ও ৯০ দশকের ফুটবলের স্মৃতি।

বাংলাদেশ ফুটবলের জীবন্ত কিংবদন্তি কায়সার হামিদ ও আসলাম পারভেজের ব্যাচমেট মো. হান্নানের নেতৃত্বে মাঠে নামে সৈয়দপুর সোনালী অতীত। দলের ম্যানেজার ছিলেন সোহেল ও জাকির হোসেন মেনন।

ম্যাচের শুরুতেই পঞ্চাশোর্ধ্ব খেলোয়াড়দের মাঠে নামিয়ে যেন সময়ের কাঁটা ঘুরিয়ে দেওয়া হয় তিন-চার দশক পেছনে। মুহূর্তেই সৈয়দপুর স্টেডিয়ামের মাঠ যেন ফিরে যায় ৮০ থেকে ৯০ দশকের ফুটবল আমলে। তবে বয়স যে শরীরের ওপর তার ছাপ রেখে যায়, তা কিছুক্ষণ পরেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ধারাবাহিকভাবে খেলোয়াড় পরিবর্তন করে দলকে সচল রাখার চেষ্টা করেন সোনালী অতীতের ম্যানেজমেন্ট।

সোনালী অতীতের ২০ সদস্যের স্কোয়াডটি ছিল সাবেক সেরাদের সমন্বয়ে গড়া। দলে ছিলেন বাংলাদেশ বয়সভিত্তিক জাতীয় দলের সাবেক ফুটবলার আজাদ, ঢাকা লীগের দ্বিতীয় বিভাগে মহাখালী দলের সাবেক অধিনায়ক আতাউর রহমান গেদা, লেফট ডিফেন্ডার মোস্তাক, রাইট উইঙ্গার মোকছেদ এবং উত্তরাঞ্চলের মাঠ মাতানো সাবেক খেলোয়াড় আমজাদ, সবুজ, স্যামুয়েল পাহান, তাহের, খোকন (সিনিয়র), খোকন (জুনিয়র), নুরুল হুদা, আপেল, স্বপন, বাপ্পি, রেজু ও জহুরুল ইসলাম খোকনসহ অন্যরা।

অন্যদিকে শিক্ষক একাদশেও ছিলেন সাবেক ফুটবলার। তবে বয়সের জায়গায় ছিল বড় পার্থক্য। তাদের খেলোয়াড়দের বয়স ছিল আনুমানিক ২০ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে। আর এখানেই যেন ম্যাচের ফল নির্ধারণে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখে বয়স।

ম্যাচের শুরু থেকেই শিক্ষক একাদশের তরুণ খেলোয়াড়রা তুলনামূলক বেশি গতি নিয়ে খেলতে থাকেন। মাত্র পাঁচ মিনিটের মাথায় ডি-বক্সের বাইরে থেকে নেওয়া দীর্ঘ কিক সোনালী অতীতের গোলরক্ষক বাসুদেবকে ফাঁকি দিয়ে জালে জড়িয়ে যায়।

গোলটি নিয়ে অবশ্য মাঠে তৈরি হয় খানিকটা হাস্যরস। বাসুদেব সাবেক ফুটবলার হলেও বর্তমানে শিক্ষক। সহকর্মীদের বিপক্ষে গোলরক্ষকের দায়িত্বে থাকা বাসুদেব বাতাসে ভেসে আসা বলটি আটকাতে যথেষ্ট চেষ্টা করেননি—এমন রসিকতা করতে থাকেন সতীর্থরা। কেউ কেউ মজা করে এতে ‘ষড়যন্ত্রের গন্ধ’ও খুঁজতে থাকেন।

প্রথমার্ধে আরও দুটি গোল হজম করে সোনালী অতীত। তবে এর মধ্যে একটি গোল শোধ করে তারা। বিরতিতে ৩-১ গোলে পিছিয়ে থাকে সাবেকদের দল।

দ্বিতীয়ার্ধে অবশ্য আক্রমণাত্মক ফুটবলে ফেরে সোনালী অতীত। বয়সের সঙ্গে লড়াই করেও গোল পরিশোধের জন্য মরিয়া হয়ে ওঠেন হান্নান বাহিনীর খেলোয়াড়রা। এ সময় বাপ্পির অনবদ্য ব্যক্তিগত নৈপুণ্যে আসে আরও একটি গোল। ফলে ব্যবধান কমে দাঁড়ায় ৩-২।

শেষ পর্যন্ত সমতা ফেরানোর জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করেও আর গোলের দেখা পায়নি সোনালী অতীত। শেষ বাঁশিতে ৩-২ গোলের জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে শিক্ষক একাদশ।

তবে ম্যাচ শেষে জয়-পরাজয়ের চেয়েও বেশি আলোচনায় আসে সৈয়দপুর স্টেডিয়ামের মাঠের অবস্থা। দুই দলের খেলোয়াড়রাই মাঠের বেহাল দশাকে খারাপ পারফরম্যান্সের অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন।

সাংবাদিক ও সাবেক ফুটবলার জহুরুল ইসলাম খোকন বলেন, “মাঠের দক্ষিণ প্রান্তে প্রায় এক ফুট উচ্চতার ঘাস। তার সঙ্গে রয়েছে ঘাসফুল। ফলে বল নিয়ে কোনোভাবেই স্বাভাবিকভাবে দৌড়ানো কিংবা শট নেওয়া যাচ্ছিল না। এই মাঠে খেলতে গিয়ে যেকোনো সময় খেলোয়াড়রা আহত হতে পারেন। বিষয়টি মাঠের অভিভাবকদের গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত।”

একই অভিযোগ করেন শিক্ষক একাদশের খেলোয়াড়রাও। তাদের ভাষ্য, মাঠের অতিরিক্ত ঘাস ও অসমতল পরিবেশে স্বাভাবিক ফুটবল খেলা কঠিন হয়ে পড়েছিল।

স্কোরবোর্ডে জয় শিক্ষক একাদশের হলেও মাঠের বাইরে যেন জয় হলো স্মৃতির। কারণ বয়সের ভারে গতি কমে গেলেও সোনালী অতীতের খেলোয়াড়রা আবারও প্রমাণ করলেন ফুটবল থেকে অবসর নেওয়া যায়, কিন্তু ফুটবলের প্রতি ভালোবাসা থেকে নয়।

সৈয়দপুর স্টেডিয়ামের জরাজীর্ণ মাঠে তাই এদিন শুধু একটি প্রীতি ম্যাচ হয়নি; ফিরে এসেছিল একটি প্রজন্মের ফুটবল স্মৃতি। পায়ের গতি কমেছে, শ্বাস ভারী হয়েছে, শরীর আর আগের মতো সাড়া দেয় না—তবুও বল পায়ে নিলেই চোখেমুখে ফুটে ওঠে সেই পুরোনো দিনের উচ্ছ্বাস।


BD State News

সম্পাদক: আবদুর রাকিব

কপিরাইট © ২০২৬ BD State News । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত