ট্রেনে অচেতন অবস্থায় উদ্ধার, পাশে নেই স্বজন, জানা নেই পরিচয়—এমন একজন অসহায় মানুষের জন্য সবচেয়ে জরুরি ছিল দ্রুত চিকিৎসা। অথচ সেই অচেতন যাত্রীর কাছে ট্রেনের টিকিট না থাকায় সৈয়দপুর রেলওয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা শুরু করতে প্রায় দুই ঘণ্টা বিলম্ব করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় রেলওয়ে হাসপাতালের দায়িত্বশীলতা ও মানবিকতা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
একই দিনে পৃথক দুটি ট্রেন থেকে অচেতন অবস্থায় দুই যাত্রীকে উদ্ধারের ঘটনায় বিষয়টি আরও আলোচনায় এসেছে।
সৈয়দপুর জিআরপি থানা সূত্রে জানা যায়, সকাল ৭টা ৪০ মিনিটের দিকে খুলনা থেকে চিলাহাটিগামী সীমান্ত এক্সপ্রেস ট্রেন থেকে আমিন জোরদার (৬৬) নামে এক যাত্রীকে অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করে ট্রেনে দায়িত্বে থাকা পুলিশ। পরে তাঁকে সৈয়দপুর জিআরপি থানায় নিয়ে আসা হয়।
আমিন জোরদার ঝিনাইদহ জেলার শৈলকুপা থানার জালসুকা ইউনিয়নের বাসিন্দা। তাঁর বাবার নাম মোকছেদ জোরদার। তিনি পেশায় কাপড় ব্যবসায়ী। কাপড় কেনার উদ্দেশ্যে সিরাজগঞ্জে যাচ্ছিলেন। পথে তিনি অজ্ঞান পার্টির খপ্পরে পড়েছেন বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।
সৈয়দপুর জিআরপি থানার ডিউটি অফিসার জিয়াবুন নেছা জানান, ট্রেন থেকে অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করার পর তাঁকে সৈয়দপুর জিআরপি থানায় আনা হয়। পরে তাঁর চিকিৎসার প্রয়োজন হওয়ায় হাসপাতালে নেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়।
এদিকে একই দিন ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা চিলাহাটিগামী চিলাহাটি এক্সপ্রেস ট্রেন থেকেও প্রায় ৫০ বছর বয়সী এক অজ্ঞাতনামা যাত্রীকে অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করে রেলওয়ে পুলিশ। তাঁর সঙ্গে কোনো স্বজন ছিলেন না। এমনকি তাৎক্ষণিকভাবে তাঁর পরিচয়ও জানা যায়নি।
অচেতন ওই ব্যক্তিকে চিকিৎসার জন্য সৈয়দপুর রেলওয়ে হাসপাতালে নেওয়া হয়। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, তাঁর কাছে ট্রেনের টিকিট না থাকায় হাসপাতালে চিকিৎসা শুরু করতে প্রায় দুই ঘণ্টা বিলম্ব করা হয়। অচেতন অবস্থায় পড়ে থাকা একজন মানুষের ক্ষেত্রে জরুরি চিকিৎসার পরিবর্তে টিকিটের বিষয়টি সামনে আসায় ঘটনাটি নিয়ে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে।
সৈয়দপুর জিআরপি থানার ওসি জুলফিকার আলী বলেন, অচেতন ব্যক্তিকে হাসপাতালে নেওয়ার পর প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহ করতে গিয়ে তাঁদের লোকজনকে বিড়ম্বনায় পড়তে হয়েছে। স্টেশন মাস্টারের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহ করতেও বিলম্ব হয়েছে। এ ঘটনায় হাসপাতালের সংশ্লিষ্টদের আচরণে তাঁদের লোকজন কষ্ট পেয়েছেন বলেও জানান তিনি।
সৈয়দপুর রেলওয়ে হাসপাতালের মেট্রন মশিউর রহমান জুয়েল জানান, অচেতন ওই যাত্রীর বিষয়টি হাসপাতালের বিভাগীয় মেডিকেল অফিসার (ডিএমও) ডা. পার্থ সারথি বণিককে জানানো হয়েছিল। তিনি টেলিফোনে চিকিৎসাসংক্রান্ত পরামর্শ দেন।
হাসপাতালের আয়া জেসমিনও অচেতন অবস্থায় ওই যাত্রীকে হাসপাতালে আনার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
তবে এ বিষয়ে সৈয়দপুর রেলওয়ে বিভাগের মেডিকেল অফিসার ডা. পার্থ সারথি বণিকের বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা করা হলে তাঁর মুঠোফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়। ফলে অচেতন যাত্রীর চিকিৎসা শুরুতে প্রায় দুই ঘণ্টা বিলম্বের অভিযোগ এবং টিকিট না থাকাকে কেন্দ্র করে চিকিৎসা বিলম্বের বিষয়ে তাঁর বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।
একই দিনে দুটি ট্রেন থেকে অচেতন যাত্রী উদ্ধারের ঘটনায় রেলপথে অজ্ঞান পার্টির তৎপরতা নিয়েও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। দূরপাল্লার ট্রেনে অপরিচিত ব্যক্তির কাছ থেকে খাবার বা পানীয় গ্রহণের ক্ষেত্রে যাত্রীদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
তবে এই ঘটনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—একজন মানুষ যখন অচেতন অবস্থায় হাসপাতালে পৌঁছান, তখন তাঁর হাতে টিকিট আছে কি না, নাকি তাঁর জীবন বাঁচানোই প্রথম দায়িত্ব?
চিকিৎসার জরুরি মুহূর্তে রোগীর পরিচয়, টিকিট বা কাগজপত্রের আনুষ্ঠানিকতা গুরুত্বপূর্ণ হলেও জীবন রক্ষার প্রয়োজনীয়তা তার চেয়ে অগ্রাধিকার পাওয়ার কথা। অভিযোগটি সত্য হলে, অচেতন একজন যাত্রীর চিকিৎসা পেতে দুই ঘণ্টা অপেক্ষার ঘটনা শুধু প্রশাসনিক জটিলতার বিষয় নয়; এটি রেলওয়ের জরুরি মানবিক সেবাব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে।
রেলপথে যাত্রীদের নিরাপত্তার পাশাপাশি অচেতন, অসুস্থ কিংবা পরিচয়হীন কোনো যাত্রী উদ্ধার হলে দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তাঁদের মতে, টিকিটের হিসাব পরে করা গেলেও একজন মানুষের জীবন রক্ষার সময় কখনোই ফিরে আসে না।

মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২২ আগস্ট ২০২৬
ট্রেনে অচেতন অবস্থায় উদ্ধার, পাশে নেই স্বজন, জানা নেই পরিচয়—এমন একজন অসহায় মানুষের জন্য সবচেয়ে জরুরি ছিল দ্রুত চিকিৎসা। অথচ সেই অচেতন যাত্রীর কাছে ট্রেনের টিকিট না থাকায় সৈয়দপুর রেলওয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা শুরু করতে প্রায় দুই ঘণ্টা বিলম্ব করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় রেলওয়ে হাসপাতালের দায়িত্বশীলতা ও মানবিকতা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
একই দিনে পৃথক দুটি ট্রেন থেকে অচেতন অবস্থায় দুই যাত্রীকে উদ্ধারের ঘটনায় বিষয়টি আরও আলোচনায় এসেছে।
সৈয়দপুর জিআরপি থানা সূত্রে জানা যায়, সকাল ৭টা ৪০ মিনিটের দিকে খুলনা থেকে চিলাহাটিগামী সীমান্ত এক্সপ্রেস ট্রেন থেকে আমিন জোরদার (৬৬) নামে এক যাত্রীকে অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করে ট্রেনে দায়িত্বে থাকা পুলিশ। পরে তাঁকে সৈয়দপুর জিআরপি থানায় নিয়ে আসা হয়।
আমিন জোরদার ঝিনাইদহ জেলার শৈলকুপা থানার জালসুকা ইউনিয়নের বাসিন্দা। তাঁর বাবার নাম মোকছেদ জোরদার। তিনি পেশায় কাপড় ব্যবসায়ী। কাপড় কেনার উদ্দেশ্যে সিরাজগঞ্জে যাচ্ছিলেন। পথে তিনি অজ্ঞান পার্টির খপ্পরে পড়েছেন বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।
সৈয়দপুর জিআরপি থানার ডিউটি অফিসার জিয়াবুন নেছা জানান, ট্রেন থেকে অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করার পর তাঁকে সৈয়দপুর জিআরপি থানায় আনা হয়। পরে তাঁর চিকিৎসার প্রয়োজন হওয়ায় হাসপাতালে নেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়।
এদিকে একই দিন ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা চিলাহাটিগামী চিলাহাটি এক্সপ্রেস ট্রেন থেকেও প্রায় ৫০ বছর বয়সী এক অজ্ঞাতনামা যাত্রীকে অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করে রেলওয়ে পুলিশ। তাঁর সঙ্গে কোনো স্বজন ছিলেন না। এমনকি তাৎক্ষণিকভাবে তাঁর পরিচয়ও জানা যায়নি।
অচেতন ওই ব্যক্তিকে চিকিৎসার জন্য সৈয়দপুর রেলওয়ে হাসপাতালে নেওয়া হয়। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, তাঁর কাছে ট্রেনের টিকিট না থাকায় হাসপাতালে চিকিৎসা শুরু করতে প্রায় দুই ঘণ্টা বিলম্ব করা হয়। অচেতন অবস্থায় পড়ে থাকা একজন মানুষের ক্ষেত্রে জরুরি চিকিৎসার পরিবর্তে টিকিটের বিষয়টি সামনে আসায় ঘটনাটি নিয়ে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে।
সৈয়দপুর জিআরপি থানার ওসি জুলফিকার আলী বলেন, অচেতন ব্যক্তিকে হাসপাতালে নেওয়ার পর প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহ করতে গিয়ে তাঁদের লোকজনকে বিড়ম্বনায় পড়তে হয়েছে। স্টেশন মাস্টারের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহ করতেও বিলম্ব হয়েছে। এ ঘটনায় হাসপাতালের সংশ্লিষ্টদের আচরণে তাঁদের লোকজন কষ্ট পেয়েছেন বলেও জানান তিনি।
সৈয়দপুর রেলওয়ে হাসপাতালের মেট্রন মশিউর রহমান জুয়েল জানান, অচেতন ওই যাত্রীর বিষয়টি হাসপাতালের বিভাগীয় মেডিকেল অফিসার (ডিএমও) ডা. পার্থ সারথি বণিককে জানানো হয়েছিল। তিনি টেলিফোনে চিকিৎসাসংক্রান্ত পরামর্শ দেন।
হাসপাতালের আয়া জেসমিনও অচেতন অবস্থায় ওই যাত্রীকে হাসপাতালে আনার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
তবে এ বিষয়ে সৈয়দপুর রেলওয়ে বিভাগের মেডিকেল অফিসার ডা. পার্থ সারথি বণিকের বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা করা হলে তাঁর মুঠোফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়। ফলে অচেতন যাত্রীর চিকিৎসা শুরুতে প্রায় দুই ঘণ্টা বিলম্বের অভিযোগ এবং টিকিট না থাকাকে কেন্দ্র করে চিকিৎসা বিলম্বের বিষয়ে তাঁর বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।
একই দিনে দুটি ট্রেন থেকে অচেতন যাত্রী উদ্ধারের ঘটনায় রেলপথে অজ্ঞান পার্টির তৎপরতা নিয়েও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। দূরপাল্লার ট্রেনে অপরিচিত ব্যক্তির কাছ থেকে খাবার বা পানীয় গ্রহণের ক্ষেত্রে যাত্রীদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
তবে এই ঘটনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—একজন মানুষ যখন অচেতন অবস্থায় হাসপাতালে পৌঁছান, তখন তাঁর হাতে টিকিট আছে কি না, নাকি তাঁর জীবন বাঁচানোই প্রথম দায়িত্ব?
চিকিৎসার জরুরি মুহূর্তে রোগীর পরিচয়, টিকিট বা কাগজপত্রের আনুষ্ঠানিকতা গুরুত্বপূর্ণ হলেও জীবন রক্ষার প্রয়োজনীয়তা তার চেয়ে অগ্রাধিকার পাওয়ার কথা। অভিযোগটি সত্য হলে, অচেতন একজন যাত্রীর চিকিৎসা পেতে দুই ঘণ্টা অপেক্ষার ঘটনা শুধু প্রশাসনিক জটিলতার বিষয় নয়; এটি রেলওয়ের জরুরি মানবিক সেবাব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে।
রেলপথে যাত্রীদের নিরাপত্তার পাশাপাশি অচেতন, অসুস্থ কিংবা পরিচয়হীন কোনো যাত্রী উদ্ধার হলে দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তাঁদের মতে, টিকিটের হিসাব পরে করা গেলেও একজন মানুষের জীবন রক্ষার সময় কখনোই ফিরে আসে না।

আপনার মতামত লিখুন