ঢাকা   মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬
BD State News

খেলা

ফুটবলের স্বর্নালী অধ্যায়ের কালোচিতা খ্যাত ফুটবলার মনোয়ার হোসেন মনু: দর্শক হৃদয়ে আজও অমলিন

ফুটবলের স্বর্নালী অধ্যায়ের কালোচিতা খ্যাত ফুটবলার মনোয়ার হোসেন মনু: দর্শক হৃদয়ে আজও অমলিন

ঢাকার ফুটবল মানেই একসময় গ্যালারির গর্জন, ধুলো উড়ানো মাঠ আর এমন কিছু জাদুকর, যারা বল পায়ে নিলে সময় যেন থমকে যেত। 

সেই স্বর্ণালি সময়েরই এক উজ্জ্বল নাম মনোয়ার হোসেন মনু— ঢাকার ফুটবল ইতিহাসে যিনি পরিচিত ছিলেন ‘কালো চিতা’ নামে। গতি, শক্তি আর বিস্ময়কর শুটিং ক্ষমতায় তিনি এক সময় কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন পুরো দেশ।

‎মোহামেডান স্পোটিং ক্লাব ঢাকা এর সাদা-কালো জার্সি গায়ে জড়িয়ে মনু যখন মাঠে নামতেন, তখন প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডারদের চোখে একটাই ভয়— এই উইঙ্গার কখন, কোথা থেকে, কীভাবে আঘাত হানবেন তা অনুমান করা প্রায় অসম্ভব। তিনি শুধু একজন ফুটবলার ছিলেন না; ছিলেন এক ধরনের আতঙ্ক, এক ধরনের রোমাঞ্চ, এক ধরনের ফুটবল-কবিতা।
‎সত্তর ও আশির দশকের ফুটবলে যখন পাসিং গেমের পাশাপাশি ব্যক্তিগত দক্ষতার রাজত্ব চলছিল, তখন মনুর নাম ছিল আলাদা উচ্চারণের মতো। মাঝমাঠের অনেক দূর থেকে হঠাৎ নেওয়া তার শট— যা বাতাস কেটে, বাঁক খেয়ে সোজা জালে ঢুকে যেত— দর্শকদের অবাক করে দিত। অনেকে দাঁড়িয়ে ভাবতেন, এটা কি সত্যিই সম্ভব! গোলরক্ষকরা তখন শুধু বল নয়, নিজের ভাগ্যকেও আটকাতে ব্যর্থ হতেন।
‎ঢাকার ফুটবল তখন শুধু খেলা ছিল না, ছিল এক সামাজিক উৎসব। সেই উৎসবের কেন্দ্রবিন্দুতে প্রায়ই থাকতেন মনু। বিশেষ করে  আবাহনি লিঃ এর বিপক্ষে তার পারফরম্যান্স ছিল আলোচনার কেন্দ্র। প্রতিবার মাঠে নামলেই সমর্থকদের মনে এক ধরনের উত্তেজনা— আজ কি আবার সেই ‘রেইনবো গোল’ দেখা যাবে?
‎মনুর ফুটবল জীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শুরু হয় দ্বিতীয় বিভাগ থেকে। সেখান থেকে তিনি বিআরটিসি স্পোর্টস ক্লাব -কে চ্যাম্পিয়ন করে প্রথম বিভাগে তুলে আনেন। সেই মৌসুমে তার গোলসংখ্যা ছিল প্রায় ১৪, যা তখনকার ফুটবল মহলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। পরের দিকে শেরে বাংলা কাপেও তার পারফরম্যান্স ছিল চোখধাঁধানো— ফাইনালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিপক্ষে প্রায় ৪০ গজ দূর থেকে নেওয়া এক শটে বল জাল কাঁপিয়ে দেয়, আর গোলরক্ষক শুধু তাকিয়ে থাকেন বিস্ময়ে।
‎স্ট্রাইকার হিসেবে শুরু করলেও মোহামেডানে এসে তিনি রূপ নেন এক ভয়ংকর উইঙ্গারে। ডান পাশ দিয়ে তার দৌড়, হঠাৎ ভেতরে ঢুকে শট নেওয়া— সব মিলিয়ে প্রতিপক্ষ রক্ষণভাগের জন্য ছিলেন এক দুঃস্বপ্ন। ১৯৮৪ থেকে ১৯৮৭— এই সময়টুকু ছিল তার ক্যারিয়ারের স্বর্ণযুগ। একাধিকবার সুযোগ পেয়েছিলেন আবাহনীতে যাওয়ার, কিন্তু তিনি ছিলেন নিজের ক্লাবের প্রতি অনুগত। মোহামেডানের প্রতি তার এই ভালোবাসাই তাকে ভক্তদের হৃদয়ে স্থায়ী করে দেয়।
‎তখনকার কোচদের জন্য মনু ছিলেন আলাদা কৌশলের বিষয়। ম্যাচের আগের টিম মিটিংয়ে তার নাম আলাদা করে লেখা থাকত— “মনুকে থামাতে হবে।” কিন্তু বাস্তবে তাকে থামানো ছিল প্রায় অসম্ভব। কখনো ড্রিবলিং, কখনো দূরপাল্লার শট, আবার কখনো গতি— সব মিলিয়ে তিনি ছিলেন একাধিক অস্ত্রের এক যোদ্ধা।
‎তবে ফুটবলের গল্প সবসময় সুখের হয় না। ১৯৮৯ সালে মোহামেডানের বিপক্ষেই এক ম্যাচে খেলার সময় দুর্ভাগ্য তার পিছু নেয়। সংঘর্ষে গুরুতর অ্যাংকেল ইনজুরিতে পড়েন তিনি— সঙ্গে ছিলেন কায়সার হামিদ। সেই আঘাতই ধীরে ধীরে তার ক্যারিয়ারের গতিপথ থামিয়ে দেয়। এরপর আর আগের মতো মাঠে ফিরতে পারেননি মনু। এক সময়ের সেই গতিময় ‘কালো চিতা’ ধীরে ধীরে সরে যান সবুজ গালিচা থেকে।
‎ফুটবল থেকে বিদায় নেওয়ার পরও মনুর নাম কখনো মুছে যায়নি ঢাকার গ্যালারি থেকে। বরং সময় যত গিয়েছে, ততই তার স্মৃতি আরও উজ্জ্বল হয়েছে। পুরোনো দর্শকরা আজও বলেন— মনুর শট ছিল যেন আকাশের লেখা কোনো কবিতা, যা পড়া যায় না, শুধু অনুভব করা যায়।
‎২০১৮ সালের ২০ এপ্রিল লিভার সিরোসিসে আক্রান্ত হয়ে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেন মনোয়ার হোসেন মনু। কিন্তু কিংবদন্তিরা কখনো সত্যিই চলে যান না। তারা থেকে যান স্মৃতির গ্যালারিতে, দর্শকের গল্পে, আর পুরোনো দিনের ফুটবল আড্ডায়।
‎আজও ঢাকার মাঠের প্রবীণ দর্শকরা যখন সেই সময়ের কথা বলেন, তখন একটি নাম আবার ফিরে আসে— মনু ভাই। চোখে ভেসে ওঠে দূরপাল্লার সেই শট, গ্যালারির বিস্ময় আর সাদা-কালো ফুটবলের এক স্বর্ণালি অধ্যায়।
‎ফুটবল বদলেছে, মাঠ বদলেছে, প্রজন্ম বদলেছে— কিন্তু মনুর মতো খেলোয়াড়রা সময়ের সীমা পেরিয়ে থেকে যান ইতিহাসের পাতায়। যেখানে তিনি আজও ‘কালো চিতা’— ঢাকার ফুটবলের এক অমর অধ্যায়।

আপনার মতামত লিখুন

BD State News

মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬


ফুটবলের স্বর্নালী অধ্যায়ের কালোচিতা খ্যাত ফুটবলার মনোয়ার হোসেন মনু: দর্শক হৃদয়ে আজও অমলিন

প্রকাশের তারিখ : ২৪ মে ২০২৬

featured Image

ঢাকার ফুটবল মানেই একসময় গ্যালারির গর্জন, ধুলো উড়ানো মাঠ আর এমন কিছু জাদুকর, যারা বল পায়ে নিলে সময় যেন থমকে যেত। 

সেই স্বর্ণালি সময়েরই এক উজ্জ্বল নাম মনোয়ার হোসেন মনু— ঢাকার ফুটবল ইতিহাসে যিনি পরিচিত ছিলেন ‘কালো চিতা’ নামে। গতি, শক্তি আর বিস্ময়কর শুটিং ক্ষমতায় তিনি এক সময় কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন পুরো দেশ।

‎মোহামেডান স্পোটিং ক্লাব ঢাকা এর সাদা-কালো জার্সি গায়ে জড়িয়ে মনু যখন মাঠে নামতেন, তখন প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডারদের চোখে একটাই ভয়— এই উইঙ্গার কখন, কোথা থেকে, কীভাবে আঘাত হানবেন তা অনুমান করা প্রায় অসম্ভব। তিনি শুধু একজন ফুটবলার ছিলেন না; ছিলেন এক ধরনের আতঙ্ক, এক ধরনের রোমাঞ্চ, এক ধরনের ফুটবল-কবিতা।
‎সত্তর ও আশির দশকের ফুটবলে যখন পাসিং গেমের পাশাপাশি ব্যক্তিগত দক্ষতার রাজত্ব চলছিল, তখন মনুর নাম ছিল আলাদা উচ্চারণের মতো। মাঝমাঠের অনেক দূর থেকে হঠাৎ নেওয়া তার শট— যা বাতাস কেটে, বাঁক খেয়ে সোজা জালে ঢুকে যেত— দর্শকদের অবাক করে দিত। অনেকে দাঁড়িয়ে ভাবতেন, এটা কি সত্যিই সম্ভব! গোলরক্ষকরা তখন শুধু বল নয়, নিজের ভাগ্যকেও আটকাতে ব্যর্থ হতেন।
‎ঢাকার ফুটবল তখন শুধু খেলা ছিল না, ছিল এক সামাজিক উৎসব। সেই উৎসবের কেন্দ্রবিন্দুতে প্রায়ই থাকতেন মনু। বিশেষ করে  আবাহনি লিঃ এর বিপক্ষে তার পারফরম্যান্স ছিল আলোচনার কেন্দ্র। প্রতিবার মাঠে নামলেই সমর্থকদের মনে এক ধরনের উত্তেজনা— আজ কি আবার সেই ‘রেইনবো গোল’ দেখা যাবে?
‎মনুর ফুটবল জীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শুরু হয় দ্বিতীয় বিভাগ থেকে। সেখান থেকে তিনি বিআরটিসি স্পোর্টস ক্লাব -কে চ্যাম্পিয়ন করে প্রথম বিভাগে তুলে আনেন। সেই মৌসুমে তার গোলসংখ্যা ছিল প্রায় ১৪, যা তখনকার ফুটবল মহলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। পরের দিকে শেরে বাংলা কাপেও তার পারফরম্যান্স ছিল চোখধাঁধানো— ফাইনালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিপক্ষে প্রায় ৪০ গজ দূর থেকে নেওয়া এক শটে বল জাল কাঁপিয়ে দেয়, আর গোলরক্ষক শুধু তাকিয়ে থাকেন বিস্ময়ে।
‎স্ট্রাইকার হিসেবে শুরু করলেও মোহামেডানে এসে তিনি রূপ নেন এক ভয়ংকর উইঙ্গারে। ডান পাশ দিয়ে তার দৌড়, হঠাৎ ভেতরে ঢুকে শট নেওয়া— সব মিলিয়ে প্রতিপক্ষ রক্ষণভাগের জন্য ছিলেন এক দুঃস্বপ্ন। ১৯৮৪ থেকে ১৯৮৭— এই সময়টুকু ছিল তার ক্যারিয়ারের স্বর্ণযুগ। একাধিকবার সুযোগ পেয়েছিলেন আবাহনীতে যাওয়ার, কিন্তু তিনি ছিলেন নিজের ক্লাবের প্রতি অনুগত। মোহামেডানের প্রতি তার এই ভালোবাসাই তাকে ভক্তদের হৃদয়ে স্থায়ী করে দেয়।
‎তখনকার কোচদের জন্য মনু ছিলেন আলাদা কৌশলের বিষয়। ম্যাচের আগের টিম মিটিংয়ে তার নাম আলাদা করে লেখা থাকত— “মনুকে থামাতে হবে।” কিন্তু বাস্তবে তাকে থামানো ছিল প্রায় অসম্ভব। কখনো ড্রিবলিং, কখনো দূরপাল্লার শট, আবার কখনো গতি— সব মিলিয়ে তিনি ছিলেন একাধিক অস্ত্রের এক যোদ্ধা।
‎তবে ফুটবলের গল্প সবসময় সুখের হয় না। ১৯৮৯ সালে মোহামেডানের বিপক্ষেই এক ম্যাচে খেলার সময় দুর্ভাগ্য তার পিছু নেয়। সংঘর্ষে গুরুতর অ্যাংকেল ইনজুরিতে পড়েন তিনি— সঙ্গে ছিলেন কায়সার হামিদ। সেই আঘাতই ধীরে ধীরে তার ক্যারিয়ারের গতিপথ থামিয়ে দেয়। এরপর আর আগের মতো মাঠে ফিরতে পারেননি মনু। এক সময়ের সেই গতিময় ‘কালো চিতা’ ধীরে ধীরে সরে যান সবুজ গালিচা থেকে।
‎ফুটবল থেকে বিদায় নেওয়ার পরও মনুর নাম কখনো মুছে যায়নি ঢাকার গ্যালারি থেকে। বরং সময় যত গিয়েছে, ততই তার স্মৃতি আরও উজ্জ্বল হয়েছে। পুরোনো দর্শকরা আজও বলেন— মনুর শট ছিল যেন আকাশের লেখা কোনো কবিতা, যা পড়া যায় না, শুধু অনুভব করা যায়।
‎২০১৮ সালের ২০ এপ্রিল লিভার সিরোসিসে আক্রান্ত হয়ে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেন মনোয়ার হোসেন মনু। কিন্তু কিংবদন্তিরা কখনো সত্যিই চলে যান না। তারা থেকে যান স্মৃতির গ্যালারিতে, দর্শকের গল্পে, আর পুরোনো দিনের ফুটবল আড্ডায়।
‎আজও ঢাকার মাঠের প্রবীণ দর্শকরা যখন সেই সময়ের কথা বলেন, তখন একটি নাম আবার ফিরে আসে— মনু ভাই। চোখে ভেসে ওঠে দূরপাল্লার সেই শট, গ্যালারির বিস্ময় আর সাদা-কালো ফুটবলের এক স্বর্ণালি অধ্যায়।
‎ফুটবল বদলেছে, মাঠ বদলেছে, প্রজন্ম বদলেছে— কিন্তু মনুর মতো খেলোয়াড়রা সময়ের সীমা পেরিয়ে থেকে যান ইতিহাসের পাতায়। যেখানে তিনি আজও ‘কালো চিতা’— ঢাকার ফুটবলের এক অমর অধ্যায়।


BD State News

সম্পাদক: আবদুর রাকিব

কপিরাইট © ২০২৬ BD State News । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত