জনবল-সরঞ্জামের ঘাটতির মধ্যেও দেশসেরা চিকিৎসাসেবার মূল্যায়ন পেয়েছে সৈয়দপুর ১০০ শয্যা হাসপাতাল। তবে বাড়তি রোগীর চাপের তুলনায় সীমিত সক্ষমতা এখন প্রতিষ্ঠানটির বড় চ্যালেঞ্জ।
নীলফামারীর সৈয়দপুর ১০০ শয্যা হাসপাতালে প্রতিদিন গড়ে দেড় হাজার মানুষ বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিতে আসেন। ভর্তি রোগীর সংখ্যাও প্রায়ই ২০০ থেকে ২১০ জনে পৌঁছে যায়। অথচ অনুমোদিত শয্যা রয়েছে মাত্র ১০০টি। ফলে নির্ধারিত শয্যার বাইরে করিডোর ও বারান্দাতেও রোগীদের চিকিৎসা দিতে হচ্ছে।
চিকিৎসক সংকটও প্রকট। ৫৭টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে কর্মরত রয়েছেন মাত্র ১৯ জন। শূন্য রয়েছে ৩৮টি পদ। রোগীর তুলনায় এই জনবল ঘাটতি চিকিৎসকদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে। এর সঙ্গে রয়েছে প্রয়োজনীয় বিশেষজ্ঞ ও কারিগরি জনবলের সংকট।
হাসপাতাল সূত্র জানায়, বর্তমানে ২৮ জন কর্মী আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে দায়িত্ব পালন করছেন। তবে রোগীর বিপুল চাপের তুলনায় এই জনবলও পর্যাপ্ত নয়।
হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) ডা. মো. নাজমুল হুদা বলেন, “রোগীর চাপের তুলনায় জনবল ও শয্যা কম। প্রয়োজনীয় জনবল ও সরঞ্জাম বাড়ানো গেলে সেবার মান আরও উন্নত করা সম্ভব।”
রোগ নির্ণয় ব্যবস্থাতেও রয়েছে সীমাবদ্ধতা। হাসপাতালে একটি করে এক্স-রে, আলট্রাসনোগ্রাম ও ইসিজি মেশিন রয়েছে। সকাল থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত এসব পরীক্ষা করা হলেও জনবল সংকটের কারণে রাতে পরীক্ষার সুবিধা চালু রাখা সম্ভব হচ্ছে না। রোগীর চাপ সামলাতে আরও দুটি ল্যাব অ্যানালাইজার ও প্রয়োজনীয় সংখ্যক টেকনোলজিস্ট প্রয়োজন।
হৃদরোগ, ইউরোলজি, সার্জারি, গাইনি, নাক-কান-গলা, অর্থোপেডিকস ও রেডিওলজি বিভাগে প্রয়োজনীয় বিশেষজ্ঞ ও চিকিৎসক বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে। চক্ষু চিকিৎসায়ও আধুনিক সরঞ্জামের প্রয়োজন রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
জরুরি রোগী পরিবহনের ক্ষেত্রেও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। হাসপাতালে দুটি অ্যাম্বুলেন্স থাকলেও দুটিই প্রায় অচল অবস্থায় রয়েছে। বিপরীতে চালক রয়েছেন মাত্র একজন। ফলে জরুরি প্রয়োজনে রোগী স্থানান্তরে বাড়তি চাপ তৈরি হয়।
খাদ্য ব্যবস্থাপনাতেও রয়েছে বাড়তি চাপ। হাসপাতাল থেকে ১০০ জন রোগীর জন্য খাবারের বরাদ্দ থাকলেও বাস্তবে ভর্তি রোগীর সংখ্যা প্রায়ই দুই শতাধিক ছাড়িয়ে যায়। ফলে নির্ধারিত বরাদ্দের সঙ্গে প্রকৃত চাহিদার বড় ধরনের ব্যবধান তৈরি হচ্ছে।
পরিচ্ছন্নতা ব্যবস্থাপনাতেও জনবল ঘাটতি রয়েছে। এর সঙ্গে ভর্তি প্রত্যেক রোগীর সঙ্গে গড়ে তিনজন করে স্বজন বা পরিচর্যাকারী থাকায় হাসপাতাল চত্বরে মানুষের চাপ বেড়ে যায়। অনেকের পান-সুপারি খাওয়ার কারণে যত্রতত্র পানের পিক ফেলার প্রবণতাও পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখাকে কঠিন করে তুলছে।
নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনাতেও বাড়তি নজর প্রয়োজন। হাসপাতালের সীমানাপ্রাচীর থাকলেও প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক রোগী, স্বজন ও দর্শনার্থীর চলাচল থাকে। এ কারণে সাইকেল, রিকশা ও ভ্যানসহ বিভিন্ন মালামাল চুরির আশঙ্কা রয়েছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ রোগী ও স্বজনদের যানবাহন রাখার জন্য একটি গ্যারেজ এবং নিরাপত্তা জোরদারে আনসার সদস্য বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়েছে।
তবে এসব সীমাবদ্ধতার মধ্যেও সেবার মানের বিভিন্ন সূচকে হাসপাতালটি ভালো অবস্থান ধরে রেখেছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, স্বাস্থ্যসেবা মান মূল্যায়নের বিভিন্ন ক্ষেত্রে খাদ্য, পরিচ্ছন্নতা, ল্যাবরেটরি, অপারেশন কার্যক্রম, এনসিপিএনসি, স্বাভাবিক প্রসব এবং শিশু চিকিৎসাসহ কয়েকটি সূচকে প্রতিষ্ঠানটি সন্তোষজনক ফল করেছে। এসব মূল্যায়নেই দেশসেরা চিকিৎসাসেবার স্বীকৃতি ও মূল্যায়ন পাওয়ার বিষয়টি সামনে এসেছে।
হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মো. আসিফ ফেরদৌস বলেন, “জনবল, যন্ত্রপাতি ও পরিচ্ছন্নতাকর্মীর সংকট রয়েছে। প্রয়োজনীয় লোকবল ও আধুনিক সরঞ্জাম নিশ্চিত করা গেলে রোগীদের আরও উন্নত সেবা দেওয়া সম্ভব হবে।”
সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রতিদিনের বিপুল রোগীর চাপ বিবেচনায় শয্যা সংখ্যা বৃদ্ধি, শূন্য পদে জনবল নিয়োগ, প্রয়োজনীয় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও কারিগরি কর্মী পদায়ন, আধুনিক সরঞ্জাম সংযোজন এবং অ্যাম্বুলেন্স সচল করা জরুরি। একই সঙ্গে খাবার, পরিচ্ছন্নতা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়ানো গেলে হাসপাতালটির বিদ্যমান সেবার মান আরও কার্যকরভাবে ধরে রাখা সম্ভব হবে।

মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
জনবল-সরঞ্জামের ঘাটতির মধ্যেও দেশসেরা চিকিৎসাসেবার মূল্যায়ন পেয়েছে সৈয়দপুর ১০০ শয্যা হাসপাতাল। তবে বাড়তি রোগীর চাপের তুলনায় সীমিত সক্ষমতা এখন প্রতিষ্ঠানটির বড় চ্যালেঞ্জ।
নীলফামারীর সৈয়দপুর ১০০ শয্যা হাসপাতালে প্রতিদিন গড়ে দেড় হাজার মানুষ বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিতে আসেন। ভর্তি রোগীর সংখ্যাও প্রায়ই ২০০ থেকে ২১০ জনে পৌঁছে যায়। অথচ অনুমোদিত শয্যা রয়েছে মাত্র ১০০টি। ফলে নির্ধারিত শয্যার বাইরে করিডোর ও বারান্দাতেও রোগীদের চিকিৎসা দিতে হচ্ছে।
চিকিৎসক সংকটও প্রকট। ৫৭টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে কর্মরত রয়েছেন মাত্র ১৯ জন। শূন্য রয়েছে ৩৮টি পদ। রোগীর তুলনায় এই জনবল ঘাটতি চিকিৎসকদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে। এর সঙ্গে রয়েছে প্রয়োজনীয় বিশেষজ্ঞ ও কারিগরি জনবলের সংকট।
হাসপাতাল সূত্র জানায়, বর্তমানে ২৮ জন কর্মী আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে দায়িত্ব পালন করছেন। তবে রোগীর বিপুল চাপের তুলনায় এই জনবলও পর্যাপ্ত নয়।
হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) ডা. মো. নাজমুল হুদা বলেন, “রোগীর চাপের তুলনায় জনবল ও শয্যা কম। প্রয়োজনীয় জনবল ও সরঞ্জাম বাড়ানো গেলে সেবার মান আরও উন্নত করা সম্ভব।”
রোগ নির্ণয় ব্যবস্থাতেও রয়েছে সীমাবদ্ধতা। হাসপাতালে একটি করে এক্স-রে, আলট্রাসনোগ্রাম ও ইসিজি মেশিন রয়েছে। সকাল থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত এসব পরীক্ষা করা হলেও জনবল সংকটের কারণে রাতে পরীক্ষার সুবিধা চালু রাখা সম্ভব হচ্ছে না। রোগীর চাপ সামলাতে আরও দুটি ল্যাব অ্যানালাইজার ও প্রয়োজনীয় সংখ্যক টেকনোলজিস্ট প্রয়োজন।
হৃদরোগ, ইউরোলজি, সার্জারি, গাইনি, নাক-কান-গলা, অর্থোপেডিকস ও রেডিওলজি বিভাগে প্রয়োজনীয় বিশেষজ্ঞ ও চিকিৎসক বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে। চক্ষু চিকিৎসায়ও আধুনিক সরঞ্জামের প্রয়োজন রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
জরুরি রোগী পরিবহনের ক্ষেত্রেও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। হাসপাতালে দুটি অ্যাম্বুলেন্স থাকলেও দুটিই প্রায় অচল অবস্থায় রয়েছে। বিপরীতে চালক রয়েছেন মাত্র একজন। ফলে জরুরি প্রয়োজনে রোগী স্থানান্তরে বাড়তি চাপ তৈরি হয়।
খাদ্য ব্যবস্থাপনাতেও রয়েছে বাড়তি চাপ। হাসপাতাল থেকে ১০০ জন রোগীর জন্য খাবারের বরাদ্দ থাকলেও বাস্তবে ভর্তি রোগীর সংখ্যা প্রায়ই দুই শতাধিক ছাড়িয়ে যায়। ফলে নির্ধারিত বরাদ্দের সঙ্গে প্রকৃত চাহিদার বড় ধরনের ব্যবধান তৈরি হচ্ছে।
পরিচ্ছন্নতা ব্যবস্থাপনাতেও জনবল ঘাটতি রয়েছে। এর সঙ্গে ভর্তি প্রত্যেক রোগীর সঙ্গে গড়ে তিনজন করে স্বজন বা পরিচর্যাকারী থাকায় হাসপাতাল চত্বরে মানুষের চাপ বেড়ে যায়। অনেকের পান-সুপারি খাওয়ার কারণে যত্রতত্র পানের পিক ফেলার প্রবণতাও পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখাকে কঠিন করে তুলছে।
নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনাতেও বাড়তি নজর প্রয়োজন। হাসপাতালের সীমানাপ্রাচীর থাকলেও প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক রোগী, স্বজন ও দর্শনার্থীর চলাচল থাকে। এ কারণে সাইকেল, রিকশা ও ভ্যানসহ বিভিন্ন মালামাল চুরির আশঙ্কা রয়েছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ রোগী ও স্বজনদের যানবাহন রাখার জন্য একটি গ্যারেজ এবং নিরাপত্তা জোরদারে আনসার সদস্য বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়েছে।
তবে এসব সীমাবদ্ধতার মধ্যেও সেবার মানের বিভিন্ন সূচকে হাসপাতালটি ভালো অবস্থান ধরে রেখেছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, স্বাস্থ্যসেবা মান মূল্যায়নের বিভিন্ন ক্ষেত্রে খাদ্য, পরিচ্ছন্নতা, ল্যাবরেটরি, অপারেশন কার্যক্রম, এনসিপিএনসি, স্বাভাবিক প্রসব এবং শিশু চিকিৎসাসহ কয়েকটি সূচকে প্রতিষ্ঠানটি সন্তোষজনক ফল করেছে। এসব মূল্যায়নেই দেশসেরা চিকিৎসাসেবার স্বীকৃতি ও মূল্যায়ন পাওয়ার বিষয়টি সামনে এসেছে।
হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মো. আসিফ ফেরদৌস বলেন, “জনবল, যন্ত্রপাতি ও পরিচ্ছন্নতাকর্মীর সংকট রয়েছে। প্রয়োজনীয় লোকবল ও আধুনিক সরঞ্জাম নিশ্চিত করা গেলে রোগীদের আরও উন্নত সেবা দেওয়া সম্ভব হবে।”
সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রতিদিনের বিপুল রোগীর চাপ বিবেচনায় শয্যা সংখ্যা বৃদ্ধি, শূন্য পদে জনবল নিয়োগ, প্রয়োজনীয় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও কারিগরি কর্মী পদায়ন, আধুনিক সরঞ্জাম সংযোজন এবং অ্যাম্বুলেন্স সচল করা জরুরি। একই সঙ্গে খাবার, পরিচ্ছন্নতা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়ানো গেলে হাসপাতালটির বিদ্যমান সেবার মান আরও কার্যকরভাবে ধরে রাখা সম্ভব হবে।

আপনার মতামত লিখুন