বাংলা চলচ্চিত্রের রঙিন ইতিহাসে কিছু মুখ আছে, যারা কখনো উচ্চকণ্ঠে নিজেদের জানান দেননি, তবুও দর্শকের হৃদয়ের গভীরে স্থায়ী আসন গড়ে নিয়েছেন। তেমনই এক নাম হল রানী। যার মুচকি হাসিতে ছিল ভালোবাসার ভাষা, চোখের কোণে ছিল অভিমানের গল্প, আর সংযত অভিনয়ে ছিল জীবনের সহজ-সরল আবেগের প্রতিচ্ছবি।
এক সময়ের জনপ্রিয় এই নায়িকা পর্দায় উপস্থিত হলেই যেন গল্পের ভেতর প্রাণ ফিরে আসত। তিনি ছিলেন না ঝলমলে গ্ল্যামারের প্রতীক, ছিলেন ঘরের মেয়ে, পরিবারের একজন, দর্শকের আপনজন। তাই সামাজিক ও পারিবারিক চলচ্চিত্রের আবেগঘন মুহূর্তগুলোতে তার উপস্থিতি হয়ে উঠত অবিচ্ছেদ্য।
রানীর প্রকৃত নাম রেজিনা হক। ১৯৬৮ সালের ১৪ অক্টোবর দিনাজপুরের ঘামিপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন তিনি। সচ্ছল ব্যবসায়ী পরিবারের সন্তান হিসেবে দিনাজপুর শহরেই কেটেছে তার শৈশব ও কৈশোর। বাবা ছিলেন সাইকেল যন্ত্রাংশের বড় ব্যবসায়ী। তিন ভাই ও তিন বোনের সংসারে বেড়ে ওঠা মেয়েটি পড়াশোনা করেন দিনাজপুর জেলা স্কুলে। সেখান থেকেই এসএসসি পাস করে পরিবারের সঙ্গে ঢাকায় পাড়ি জমান। তখনও কেউ ভাবেনি, একদিন এই সাধারণ মেয়েটিই রুপালি পর্দার পরিচিত মুখ হয়ে উঠবেন।
চলচ্চিত্রে তার পথচলার শুরু কিংবদন্তি নির্মাতা মোস্তফা আনোয়ার-এর হাত ধরে। ১৯৮২ সালে চলচ্চিত্রে আগমন, আর মাত্র এক বছরের মধ্যেই দর্শকের হৃদয় জয়। ১৯৮৩ সালের ২৮ অক্টোবর মুক্তি পায় ‘আঁখি মিলন’। প্রবীণ অভিনেতা প্রবীর মিত্র-এর বিপরীতে নায়িকা হিসেবে অভিষেক ঘটে রানীর। আর প্রথম ছবিতেই তিনি প্রমাণ করে দেন, অভিনয়ই হবে তার পরিচয়ের সবচেয়ে বড় ভাষা।
ছবিটি শুধু ব্যবসায়িক সফলতাই পায়নি, এর গানও ছড়িয়ে পড়ে দেশজুড়ে। ‘আমার গরুর গাড়ীতে বউ সাজিয়ে’ গানটি গ্রামবাংলার মেঠোপথ থেকে শহরের অলিগলি পর্যন্ত মানুষের কণ্ঠে কণ্ঠে ফিরেছে। একইভাবে ‘শোনরে বুবু শোন, তুই আমার কথা শোন’ গানটিও জনপ্রিয়তার শিখরে পৌঁছে যায়। সেই সুরের সঙ্গে জড়িয়ে যায় রানীর মায়াময় মুখচ্ছবি।
এরপর একে একে ‘স্বামীর আদেশ’, ‘শাহী খান্দান’, ‘অবদান’, ‘ছোট বউ’, ‘প্রেম লড়াই’, ‘পাষাণ’, ‘জীবন দিয়ে ভালোবাসি’, ‘ভাগ্যবতী’, ‘পরীস্থান’, ‘দাগী’, ‘সালমা’, ‘দেশ দুশমন’, ‘মালামাল’, ‘দাঙ্গা ফ্যাসাদ’, ‘রুবেল আমার নাম’সহ অসংখ্য চলচ্চিত্রে অভিনয় করে তিনি হয়ে ওঠেন আশি ও নব্বই দশকের পরিচিত মুখ।
তার অভিনয়ের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল স্বাভাবিকতা। অতিরঞ্জন নয়, সংলাপের বাড়াবাড়ি নয়—একটি মৃদু হাসি, একটি নীরব দৃষ্টি কিংবা চোখের জলে তিনি ফুটিয়ে তুলতে পারতেন চরিত্রের গভীরতম অনুভূতি। এ কারণেই পারিবারিক গল্পনির্ভর চলচ্চিত্রে নির্মাতাদের আস্থার নাম হয়ে উঠেছিলেন তিনি।
নায়িকা হিসেবে সাফল্যের পাশাপাশি ১৯৯৬ সালে তিনি প্রযোজক হিসেবেও নতুন যাত্রা শুরু করেন। ‘বশিরা’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে প্রযোজনায় আসেন রানী। জনপ্রিয় নায়ক মান্না-কে নিয়ে নির্মিত ছবিটি সে সময়ের অন্যতম ব্যবসাসফল চলচ্চিত্রে পরিণত হয়। অভিনয়ের পাশাপাশি প্রযোজক হিসেবে তার সাহসী পদক্ষেপও প্রশংসিত হয় চলচ্চিত্রাঙ্গনে।
রানীর জুটি হয়েছিল বাংলা চলচ্চিত্রের বহু জনপ্রিয় নায়কের সঙ্গে। জসিম, ইলিয়াস কাঞ্চন, মান্না ও রুবেল-এর সঙ্গে তার অভিনীত চরিত্রগুলো দর্শকের মনে এখনও উজ্জ্বল।
‘স্বামীর আদেশ’ চলচ্চিত্রে জসিমের স্ত্রী চরিত্রে তার সংযত অভিনয় ছিল হৃদয়স্পর্শী। আবার ‘বিদ্রোহী সন্তান’-এ ইলিয়াস কাঞ্চনের বিপরীতে তার রাগ, ক্ষোভ ও প্রতিবাদের অভিব্যক্তি দর্শককে মুগ্ধ করেছিল। আর ‘বশিরা’ চলচ্চিত্রের শেষ দৃশ্যে স্বামীর মৃত্যুর বেদনা বুকে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা রানীর মুখের নীরব কষ্ট আজও অনেক দর্শকের স্মৃতিতে অমলিন।
গানের ক্ষেত্রেও কিছু স্মরণীয় মুহূর্ত রয়েছে তার ক্যারিয়ারে। ‘অবদান’ চলচ্চিত্রের ‘মন একবার ভালোবাসে যারে’ কিংবা ‘বিদ্রোহী সন্তান’-এর ‘তোমাকে আমি ভালোবাসি’—এসব গান এখনও পুরোনো বাংলা চলচ্চিত্রপ্রেমীদের নস্টালজিয়ায় ফিরিয়ে নিয়ে যায়।
সময়ের স্রোতে অনেক কিছু বদলে গেছে। ২০১৭ সালে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির নির্বাচনে তার উপস্থিতি শেষবারের মতো আলোচনায় আসে। এরপর ধীরে ধীরে তিনি সরে গেছেন রুপালি পর্দার আলো থেকে। আজ তিনি চলচ্চিত্রজগতের কোলাহল থেকে অনেক দূরে।
তবে শিল্পীরা কখনো হারিয়ে যান না। তারা বেঁচে থাকেন তাদের সৃষ্টি, তাদের অভিনয় আর দর্শকের স্মৃতির ভেতর। রানীও তেমনই এক শিল্পী, যার নীরব অভিনয়, মিষ্টি হাসি আর সহজ-সরল অভিব্যক্তি এখনও বাংলা চলচ্চিত্রের সোনালি দিনের কথা মনে করিয়ে দেয়।
সময়ের পর্দা নেমে গেছে, আলো নিভেছে, ক্যামেরা থেমেছে। তবু বাংলা চলচ্চিত্রের দর্শক যখন অতীতের স্মৃতির অ্যালবাম খুলে বসেন, তখন মিষ্টি হাসির সেই মুখটি আবারও ভেসে ওঠে।

মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১২ জুন ২০২৬
বাংলা চলচ্চিত্রের রঙিন ইতিহাসে কিছু মুখ আছে, যারা কখনো উচ্চকণ্ঠে নিজেদের জানান দেননি, তবুও দর্শকের হৃদয়ের গভীরে স্থায়ী আসন গড়ে নিয়েছেন। তেমনই এক নাম হল রানী। যার মুচকি হাসিতে ছিল ভালোবাসার ভাষা, চোখের কোণে ছিল অভিমানের গল্প, আর সংযত অভিনয়ে ছিল জীবনের সহজ-সরল আবেগের প্রতিচ্ছবি।
এক সময়ের জনপ্রিয় এই নায়িকা পর্দায় উপস্থিত হলেই যেন গল্পের ভেতর প্রাণ ফিরে আসত। তিনি ছিলেন না ঝলমলে গ্ল্যামারের প্রতীক, ছিলেন ঘরের মেয়ে, পরিবারের একজন, দর্শকের আপনজন। তাই সামাজিক ও পারিবারিক চলচ্চিত্রের আবেগঘন মুহূর্তগুলোতে তার উপস্থিতি হয়ে উঠত অবিচ্ছেদ্য।
রানীর প্রকৃত নাম রেজিনা হক। ১৯৬৮ সালের ১৪ অক্টোবর দিনাজপুরের ঘামিপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন তিনি। সচ্ছল ব্যবসায়ী পরিবারের সন্তান হিসেবে দিনাজপুর শহরেই কেটেছে তার শৈশব ও কৈশোর। বাবা ছিলেন সাইকেল যন্ত্রাংশের বড় ব্যবসায়ী। তিন ভাই ও তিন বোনের সংসারে বেড়ে ওঠা মেয়েটি পড়াশোনা করেন দিনাজপুর জেলা স্কুলে। সেখান থেকেই এসএসসি পাস করে পরিবারের সঙ্গে ঢাকায় পাড়ি জমান। তখনও কেউ ভাবেনি, একদিন এই সাধারণ মেয়েটিই রুপালি পর্দার পরিচিত মুখ হয়ে উঠবেন।
চলচ্চিত্রে তার পথচলার শুরু কিংবদন্তি নির্মাতা মোস্তফা আনোয়ার-এর হাত ধরে। ১৯৮২ সালে চলচ্চিত্রে আগমন, আর মাত্র এক বছরের মধ্যেই দর্শকের হৃদয় জয়। ১৯৮৩ সালের ২৮ অক্টোবর মুক্তি পায় ‘আঁখি মিলন’। প্রবীণ অভিনেতা প্রবীর মিত্র-এর বিপরীতে নায়িকা হিসেবে অভিষেক ঘটে রানীর। আর প্রথম ছবিতেই তিনি প্রমাণ করে দেন, অভিনয়ই হবে তার পরিচয়ের সবচেয়ে বড় ভাষা।
ছবিটি শুধু ব্যবসায়িক সফলতাই পায়নি, এর গানও ছড়িয়ে পড়ে দেশজুড়ে। ‘আমার গরুর গাড়ীতে বউ সাজিয়ে’ গানটি গ্রামবাংলার মেঠোপথ থেকে শহরের অলিগলি পর্যন্ত মানুষের কণ্ঠে কণ্ঠে ফিরেছে। একইভাবে ‘শোনরে বুবু শোন, তুই আমার কথা শোন’ গানটিও জনপ্রিয়তার শিখরে পৌঁছে যায়। সেই সুরের সঙ্গে জড়িয়ে যায় রানীর মায়াময় মুখচ্ছবি।
এরপর একে একে ‘স্বামীর আদেশ’, ‘শাহী খান্দান’, ‘অবদান’, ‘ছোট বউ’, ‘প্রেম লড়াই’, ‘পাষাণ’, ‘জীবন দিয়ে ভালোবাসি’, ‘ভাগ্যবতী’, ‘পরীস্থান’, ‘দাগী’, ‘সালমা’, ‘দেশ দুশমন’, ‘মালামাল’, ‘দাঙ্গা ফ্যাসাদ’, ‘রুবেল আমার নাম’সহ অসংখ্য চলচ্চিত্রে অভিনয় করে তিনি হয়ে ওঠেন আশি ও নব্বই দশকের পরিচিত মুখ।
তার অভিনয়ের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল স্বাভাবিকতা। অতিরঞ্জন নয়, সংলাপের বাড়াবাড়ি নয়—একটি মৃদু হাসি, একটি নীরব দৃষ্টি কিংবা চোখের জলে তিনি ফুটিয়ে তুলতে পারতেন চরিত্রের গভীরতম অনুভূতি। এ কারণেই পারিবারিক গল্পনির্ভর চলচ্চিত্রে নির্মাতাদের আস্থার নাম হয়ে উঠেছিলেন তিনি।
নায়িকা হিসেবে সাফল্যের পাশাপাশি ১৯৯৬ সালে তিনি প্রযোজক হিসেবেও নতুন যাত্রা শুরু করেন। ‘বশিরা’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে প্রযোজনায় আসেন রানী। জনপ্রিয় নায়ক মান্না-কে নিয়ে নির্মিত ছবিটি সে সময়ের অন্যতম ব্যবসাসফল চলচ্চিত্রে পরিণত হয়। অভিনয়ের পাশাপাশি প্রযোজক হিসেবে তার সাহসী পদক্ষেপও প্রশংসিত হয় চলচ্চিত্রাঙ্গনে।
রানীর জুটি হয়েছিল বাংলা চলচ্চিত্রের বহু জনপ্রিয় নায়কের সঙ্গে। জসিম, ইলিয়াস কাঞ্চন, মান্না ও রুবেল-এর সঙ্গে তার অভিনীত চরিত্রগুলো দর্শকের মনে এখনও উজ্জ্বল।
‘স্বামীর আদেশ’ চলচ্চিত্রে জসিমের স্ত্রী চরিত্রে তার সংযত অভিনয় ছিল হৃদয়স্পর্শী। আবার ‘বিদ্রোহী সন্তান’-এ ইলিয়াস কাঞ্চনের বিপরীতে তার রাগ, ক্ষোভ ও প্রতিবাদের অভিব্যক্তি দর্শককে মুগ্ধ করেছিল। আর ‘বশিরা’ চলচ্চিত্রের শেষ দৃশ্যে স্বামীর মৃত্যুর বেদনা বুকে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা রানীর মুখের নীরব কষ্ট আজও অনেক দর্শকের স্মৃতিতে অমলিন।
গানের ক্ষেত্রেও কিছু স্মরণীয় মুহূর্ত রয়েছে তার ক্যারিয়ারে। ‘অবদান’ চলচ্চিত্রের ‘মন একবার ভালোবাসে যারে’ কিংবা ‘বিদ্রোহী সন্তান’-এর ‘তোমাকে আমি ভালোবাসি’—এসব গান এখনও পুরোনো বাংলা চলচ্চিত্রপ্রেমীদের নস্টালজিয়ায় ফিরিয়ে নিয়ে যায়।
সময়ের স্রোতে অনেক কিছু বদলে গেছে। ২০১৭ সালে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির নির্বাচনে তার উপস্থিতি শেষবারের মতো আলোচনায় আসে। এরপর ধীরে ধীরে তিনি সরে গেছেন রুপালি পর্দার আলো থেকে। আজ তিনি চলচ্চিত্রজগতের কোলাহল থেকে অনেক দূরে।
তবে শিল্পীরা কখনো হারিয়ে যান না। তারা বেঁচে থাকেন তাদের সৃষ্টি, তাদের অভিনয় আর দর্শকের স্মৃতির ভেতর। রানীও তেমনই এক শিল্পী, যার নীরব অভিনয়, মিষ্টি হাসি আর সহজ-সরল অভিব্যক্তি এখনও বাংলা চলচ্চিত্রের সোনালি দিনের কথা মনে করিয়ে দেয়।
সময়ের পর্দা নেমে গেছে, আলো নিভেছে, ক্যামেরা থেমেছে। তবু বাংলা চলচ্চিত্রের দর্শক যখন অতীতের স্মৃতির অ্যালবাম খুলে বসেন, তখন মিষ্টি হাসির সেই মুখটি আবারও ভেসে ওঠে।

আপনার মতামত লিখুন