বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে কিছু নাম সময়ের গণ্ডি পেরিয়ে হয়ে ওঠে অনন্ত স্মৃতির অংশ। অভিনেতা ও প্রযোজক মাহবুব খান গুই এবং চিত্রনায়িকা কবিতা তেমনই দুই উজ্জ্বল নক্ষত্র, যাঁদের অবদান আজও চলচ্চিত্রপ্রেমীদের হৃদয়ে গভীরভাবে প্রোথিত। মৃত্যুর বহু বছর পরও তাঁদের অভিনীত চরিত্র, সংলাপ, আবেগ আর শিল্পনিষ্ঠা বারবার ফিরে আসে দর্শকের স্মৃতির সেলুলয়েডে।
আজ ৮ জুন, এই দুই গুণী শিল্পীর মৃত্যুবার্ষিকী। ভিন্ন সময়ে তাঁরা পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করলেও বাংলা চলচ্চিত্রে তাঁদের রেখে যাওয়া অবদান আজও সমানভাবে স্মরণীয়। একজন ছিলেন পর্দার শক্তিমান অভিনেতা ও সফল প্রযোজক, অন্যজন ছিলেন স্বর্ণালি যুগের জনপ্রিয় ও প্রতিভাবান নায়িকা। দুজনেই নিজেদের শিল্পকর্মের মাধ্যমে জয় করেছিলেন কোটি দর্শকের হৃদয়।
মাহবুব-উল আলম খান, যিনি চলচ্চিত্রাঙ্গনে ‘মাহবুব খান গুই’ নামে পরিচিত ছিলেন, জন্মগ্রহণ করেন ১৯৫১ সালের ১০ ডিসেম্বর চাঁদপুরে। ১৯৭৪ সালে ‘এখানে আকাশ নীল’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে তাঁর অভিনয়জীবনের সূচনা। এরপর একে একে অসংখ্য চলচ্চিত্রে অভিনয় করে তিনি হয়ে ওঠেন বাংলা সিনেমার পরিচিত মুখ। তাঁর অভিনয়ে ছিল সহজাত প্রাণবন্ততা, সংলাপ উচ্চারণে ছিল স্বতন্ত্রতা এবং চরিত্রের গভীরে প্রবেশ করার অসাধারণ ক্ষমতা।
‘দোস্ত দুশমন’, ‘বারুদ’, ‘ওস্তাদ সাগরেদ’, ‘জনি’, ‘আক্রোশ’, ‘সালতানাত’, ‘শত্রু’, ‘লালু মাস্তান’, ‘গরিবের ওস্তাদ’সহ বহু জনপ্রিয় চলচ্চিত্রে তিনি নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে গেছেন। শুধু অভিনয়েই নয়, চলচ্চিত্র প্রযোজনার ক্ষেত্রেও তিনি ছিলেন সফল। বন্ধু জসিম, আমান ও বাবুলকে নিয়ে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ‘জ্যাম্বস প্রোডাকশন্স প্রাইভেট লিমিটেড’। প্রতিষ্ঠানটির ব্যানারে নির্মিত বহু চলচ্চিত্র সে সময় বাণিজ্যিক সাফল্য অর্জন করে এবং বাংলা চলচ্চিত্র শিল্পকে সমৃদ্ধ করে।
২০০৪ সালের ৮ জুন মাত্র ৫৩ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু চলচ্চিত্রাঙ্গনে গভীর শোকের ছায়া ফেলেছিল। কিন্তু একজন শিল্পীর প্রকৃত মৃত্যু হয় না—তিনি বেঁচে থাকেন তাঁর কর্মে। মাহবুব খান গুইও তেমনি বেঁচে আছেন তাঁর অভিনীত চরিত্রগুলোর মধ্য দিয়ে।
অন্যদিকে চিত্রনায়িকা কবিতা ছিলেন বাংলা চলচ্চিত্রের স্বর্ণালি যুগের অন্যতম উজ্জ্বল মুখ। কাজী জোবেদা খাতুন নামের এই শিল্পী ১৯৫২ সালে করাচিতে জন্মগ্রহণ করেন। শিশুশিল্পী হিসেবে অভিনয়জীবন শুরু করলেও পরবর্তীতে ‘কবিতা’ নামেই তিনি দর্শকদের কাছে পরিচিতি ও জনপ্রিয়তা লাভ করেন।
সত্তর ও আশির দশকের বাংলা চলচ্চিত্রে তাঁর উপস্থিতি ছিল এক বিশেষ আকর্ষণ। সৌন্দর্য, অভিনয় দক্ষতা এবং চরিত্রের সঙ্গে একাত্ম হয়ে যাওয়ার ক্ষমতা তাঁকে সমসাময়িক নায়িকাদের মধ্যে আলাদা মর্যাদা এনে দেয়। ‘আলোমতি’, ‘রূপকুমারী’, ‘চম্পাকলি’, ‘মলুয়া’, ‘বাঘা বাঙালি’, ‘স্বপ্ন দিয়ে ঘেরা’, ‘তীর ভাঙা ঢেউ’, ‘ফান্দে পড়িয়া বগা কান্দে’, ‘ধন্যি মেয়ে’সহ অসংখ্য চলচ্চিত্রে তাঁর অভিনয় আজও দর্শকদের মুগ্ধ করে।
গ্রামীণ কাহিনি থেকে পারিবারিক নাটক—সব ধরনের চরিত্রেই তিনি ছিলেন সাবলীল। তাঁর চোখের ভাষা, মুখাভিনয় এবং সংলাপ উপস্থাপনার ভঙ্গি দর্শকদের আবেগ ছুঁয়ে যেত। তাই সময়ের পরিবর্তনের পরও তাঁর অভিনয় নতুন প্রজন্মের কাছেও সমান আবেদন সৃষ্টি করে।
২০১২ সালের ৮ জুন ৬০ বছর বয়সে তিনি পৃথিবী থেকে বিদায় নেন। কিন্তু তাঁর প্রস্থান ছিল কেবল শারীরিক। চলচ্চিত্রপ্রেমীদের হৃদয়ে তিনি আজও জীবন্ত, যেমন জীবন্ত তাঁর অভিনীত অসংখ্য চরিত্র।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে চলচ্চিত্রের প্রযুক্তি বদলেছে, বদলেছে নির্মাণশৈলী ও দর্শকের রুচি। তবুও বাংলা চলচ্চিত্রের স্বর্ণালি অধ্যায়ের কথা উঠলেই স্মরণ করা হয় মাহবুব খান গুই ও কবিতার মতো শিল্পীদের। কারণ তাঁরা শুধু চলচ্চিত্রে অভিনয় করেননি, তাঁরা নিজেদের মেধা, শ্রম ও ভালোবাসা দিয়ে সমৃদ্ধ করেছেন একটি শিল্পমাধ্যমকে।
তাঁদের মৃত্যুবার্ষিকীতে গভীর শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি বাংলা চলচ্চিত্রের এই দুই প্রিয় মুখকে। তাঁদের শিল্পকর্ম, সংগ্রাম ও সাফল্যের গল্প ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে। রুপালি পর্দার আলো নিভে গেলেও স্মৃতির সেলুলয়েডে তাঁরা চিরকাল বেঁচে থাকবেন—দুটি উজ্জ্বল, অমলিন নক্ষত্র হয়ে।

মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৯ জুন ২০২৬
বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে কিছু নাম সময়ের গণ্ডি পেরিয়ে হয়ে ওঠে অনন্ত স্মৃতির অংশ। অভিনেতা ও প্রযোজক মাহবুব খান গুই এবং চিত্রনায়িকা কবিতা তেমনই দুই উজ্জ্বল নক্ষত্র, যাঁদের অবদান আজও চলচ্চিত্রপ্রেমীদের হৃদয়ে গভীরভাবে প্রোথিত। মৃত্যুর বহু বছর পরও তাঁদের অভিনীত চরিত্র, সংলাপ, আবেগ আর শিল্পনিষ্ঠা বারবার ফিরে আসে দর্শকের স্মৃতির সেলুলয়েডে।
আজ ৮ জুন, এই দুই গুণী শিল্পীর মৃত্যুবার্ষিকী। ভিন্ন সময়ে তাঁরা পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করলেও বাংলা চলচ্চিত্রে তাঁদের রেখে যাওয়া অবদান আজও সমানভাবে স্মরণীয়। একজন ছিলেন পর্দার শক্তিমান অভিনেতা ও সফল প্রযোজক, অন্যজন ছিলেন স্বর্ণালি যুগের জনপ্রিয় ও প্রতিভাবান নায়িকা। দুজনেই নিজেদের শিল্পকর্মের মাধ্যমে জয় করেছিলেন কোটি দর্শকের হৃদয়।
মাহবুব-উল আলম খান, যিনি চলচ্চিত্রাঙ্গনে ‘মাহবুব খান গুই’ নামে পরিচিত ছিলেন, জন্মগ্রহণ করেন ১৯৫১ সালের ১০ ডিসেম্বর চাঁদপুরে। ১৯৭৪ সালে ‘এখানে আকাশ নীল’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে তাঁর অভিনয়জীবনের সূচনা। এরপর একে একে অসংখ্য চলচ্চিত্রে অভিনয় করে তিনি হয়ে ওঠেন বাংলা সিনেমার পরিচিত মুখ। তাঁর অভিনয়ে ছিল সহজাত প্রাণবন্ততা, সংলাপ উচ্চারণে ছিল স্বতন্ত্রতা এবং চরিত্রের গভীরে প্রবেশ করার অসাধারণ ক্ষমতা।
‘দোস্ত দুশমন’, ‘বারুদ’, ‘ওস্তাদ সাগরেদ’, ‘জনি’, ‘আক্রোশ’, ‘সালতানাত’, ‘শত্রু’, ‘লালু মাস্তান’, ‘গরিবের ওস্তাদ’সহ বহু জনপ্রিয় চলচ্চিত্রে তিনি নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে গেছেন। শুধু অভিনয়েই নয়, চলচ্চিত্র প্রযোজনার ক্ষেত্রেও তিনি ছিলেন সফল। বন্ধু জসিম, আমান ও বাবুলকে নিয়ে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ‘জ্যাম্বস প্রোডাকশন্স প্রাইভেট লিমিটেড’। প্রতিষ্ঠানটির ব্যানারে নির্মিত বহু চলচ্চিত্র সে সময় বাণিজ্যিক সাফল্য অর্জন করে এবং বাংলা চলচ্চিত্র শিল্পকে সমৃদ্ধ করে।
২০০৪ সালের ৮ জুন মাত্র ৫৩ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু চলচ্চিত্রাঙ্গনে গভীর শোকের ছায়া ফেলেছিল। কিন্তু একজন শিল্পীর প্রকৃত মৃত্যু হয় না—তিনি বেঁচে থাকেন তাঁর কর্মে। মাহবুব খান গুইও তেমনি বেঁচে আছেন তাঁর অভিনীত চরিত্রগুলোর মধ্য দিয়ে।
অন্যদিকে চিত্রনায়িকা কবিতা ছিলেন বাংলা চলচ্চিত্রের স্বর্ণালি যুগের অন্যতম উজ্জ্বল মুখ। কাজী জোবেদা খাতুন নামের এই শিল্পী ১৯৫২ সালে করাচিতে জন্মগ্রহণ করেন। শিশুশিল্পী হিসেবে অভিনয়জীবন শুরু করলেও পরবর্তীতে ‘কবিতা’ নামেই তিনি দর্শকদের কাছে পরিচিতি ও জনপ্রিয়তা লাভ করেন।
সত্তর ও আশির দশকের বাংলা চলচ্চিত্রে তাঁর উপস্থিতি ছিল এক বিশেষ আকর্ষণ। সৌন্দর্য, অভিনয় দক্ষতা এবং চরিত্রের সঙ্গে একাত্ম হয়ে যাওয়ার ক্ষমতা তাঁকে সমসাময়িক নায়িকাদের মধ্যে আলাদা মর্যাদা এনে দেয়। ‘আলোমতি’, ‘রূপকুমারী’, ‘চম্পাকলি’, ‘মলুয়া’, ‘বাঘা বাঙালি’, ‘স্বপ্ন দিয়ে ঘেরা’, ‘তীর ভাঙা ঢেউ’, ‘ফান্দে পড়িয়া বগা কান্দে’, ‘ধন্যি মেয়ে’সহ অসংখ্য চলচ্চিত্রে তাঁর অভিনয় আজও দর্শকদের মুগ্ধ করে।
গ্রামীণ কাহিনি থেকে পারিবারিক নাটক—সব ধরনের চরিত্রেই তিনি ছিলেন সাবলীল। তাঁর চোখের ভাষা, মুখাভিনয় এবং সংলাপ উপস্থাপনার ভঙ্গি দর্শকদের আবেগ ছুঁয়ে যেত। তাই সময়ের পরিবর্তনের পরও তাঁর অভিনয় নতুন প্রজন্মের কাছেও সমান আবেদন সৃষ্টি করে।
২০১২ সালের ৮ জুন ৬০ বছর বয়সে তিনি পৃথিবী থেকে বিদায় নেন। কিন্তু তাঁর প্রস্থান ছিল কেবল শারীরিক। চলচ্চিত্রপ্রেমীদের হৃদয়ে তিনি আজও জীবন্ত, যেমন জীবন্ত তাঁর অভিনীত অসংখ্য চরিত্র।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে চলচ্চিত্রের প্রযুক্তি বদলেছে, বদলেছে নির্মাণশৈলী ও দর্শকের রুচি। তবুও বাংলা চলচ্চিত্রের স্বর্ণালি অধ্যায়ের কথা উঠলেই স্মরণ করা হয় মাহবুব খান গুই ও কবিতার মতো শিল্পীদের। কারণ তাঁরা শুধু চলচ্চিত্রে অভিনয় করেননি, তাঁরা নিজেদের মেধা, শ্রম ও ভালোবাসা দিয়ে সমৃদ্ধ করেছেন একটি শিল্পমাধ্যমকে।
তাঁদের মৃত্যুবার্ষিকীতে গভীর শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি বাংলা চলচ্চিত্রের এই দুই প্রিয় মুখকে। তাঁদের শিল্পকর্ম, সংগ্রাম ও সাফল্যের গল্প ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে। রুপালি পর্দার আলো নিভে গেলেও স্মৃতির সেলুলয়েডে তাঁরা চিরকাল বেঁচে থাকবেন—দুটি উজ্জ্বল, অমলিন নক্ষত্র হয়ে।

আপনার মতামত লিখুন