ঢাকা   মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬
BD State News

বিনোদন

তিন দশক পরও হৃদয়ে বেঁচে আছে হিন্দি চলচ্চিত্র ‘মাসুম’

তিন দশক পরও হৃদয়ে বেঁচে আছে হিন্দি চলচ্চিত্র ‘মাসুম’

সিনেমার ইতিহাসে এমন কিছু চলচ্চিত্র থাকে, যেগুলো শুধু একটি নির্দিষ্ট সময়ের বিনোদন নয়; বরং একটি প্রজন্মের স্মৃতি, আবেগ আর নস্টালজিয়ার অংশ হয়ে ওঠে। নব্বইয়ের দশকের বলিউডে নির্মিত এমনই একটি চলচ্চিত্র ‘মাসুম’। মুক্তির প্রায় তিন দশক পেরিয়ে গেলেও ছবিটি আজও বহু দর্শকের হৃদয়ে একই রকম উজ্জ্বল হয়ে আছে।

১৯৯৬ সালের ২৪ মে মুক্তি পাওয়া ‘মাসুম’ ছিল সেই সময়কার বলিউডি বাণিজ্যিক ধারার একটি সফল উদাহরণ। পরিচালক মহেশ কোঠারে ছবিটিকে এমনভাবে নির্মাণ করেছিলেন, যেখানে পারিবারিক আবেগ, হাস্যরস, সাসপেন্স, অ্যাকশন এবং সুরেলা গান মিলেমিশে তৈরি করেছিল এক পরিপূর্ণ বিনোদনের প্যাকেজ। সেই সময়ের দর্শকরা সিনেমা হলে গিয়ে যেমন হাসতেন, তেমনি আবেগে আপ্লুত হতেন; আবার উত্তেজনায় হাতের মুঠো শক্ত করে বসে থাকতেন পর্দার সামনে।

ছবিটির সবচেয়ে বড় আকর্ষণ ছিল এর সরল অথচ হৃদয়ছোঁয়া গল্প। ছোট্ট কিষাণ, সবার প্রিয় জিমি, ছিল গল্পের কেন্দ্রবিন্দু। এক দুষ্টু, চঞ্চল, বুদ্ধিমান এবং সাহসী শিশুর জীবনকে ঘিরেই এগিয়েছে পুরো কাহিনি। ভয়ঙ্কর অপরাধীদের বিরুদ্ধে তার লড়াই, বিপদের মুখে উপস্থিত বুদ্ধির পরিচয় এবং পরিবারের প্রতি গভীর ভালোবাসা দর্শকদের মুগ্ধ করেছিল। সেই সময়ের শিশু-কিশোরদের কাছে জিমি ছিল যেন এক অনুপ্রেরণার নাম।

জিমি চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন শিশু শিল্পী ওমকার কাপুর। ছবিটি মুক্তির পর তিনি রাতারাতি জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। তার নিষ্পাপ অভিনয়, স্বতঃস্ফূর্ত সংলাপ এবং প্রাণবন্ত উপস্থিতি ছবিটিকে অন্য মাত্রা দিয়েছিল। অনেক দর্শকের কাছে ‘মাসুম’ মানেই ছিল ছোট্ট জিমির হাসিমাখা মুখ।

এই ছবির মাধ্যমেই বলিউডে নায়ক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন ইন্দর কুমার। প্রথম ছবিতেই তিনি নিজের দক্ষতার প্রমাণ দিয়েছিলেন। তার প্রাণবন্ত অভিনয় এবং অ্যাকশন দৃশ্য দর্শকদের নজর কাড়ে। নায়িকা আয়েশা জুলকাও ছিলেন নিজের চেনা মিষ্টি ও সাবলীল রূপে। অন্যদিকে রেণুকা শাহানের মমতাময়ী মাতৃত্ব ছবির আবেগকে আরও গভীর করে তুলেছিল।

ছবিটির অন্যতম শক্তি ছিল এর সহশিল্পীরা। লক্ষ্মীকান্ত বের্দে এবং টিনু আনন্দের কৌতুকপূর্ণ অভিনয় দর্শকদের হাসির খোরাক জুগিয়েছিল। আবার মোহন যোশীর ‘বারুদ’ চরিত্রটি ছিল সেই সময়কার আদর্শ বলিউডি খলনায়কের প্রতিচ্ছবি—নিষ্ঠুর, ভয়ঙ্কর এবং স্মরণীয়। তার উপস্থিতি গল্পে উত্তেজনা বাড়িয়ে দিয়েছিল বহুগুণ।

‘মাসুম’-এর গানগুলোও ছিল ছবির জনপ্রিয়তার অন্যতম কারণ। আনন্দ রাজ আনন্দের সুরে নির্মিত গানগুলো সে সময় রেডিও, টেলিভিশন এবং ক্যাসেটের দোকানগুলোতে নিয়মিত শোনা যেত। বিশেষ করে আদিত্য নারায়ণের কণ্ঠে গাওয়া ‘ছোটা বাচ্চা জান কে হামকো না সমঝানা রে’ গানটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। গানটি শুধু শিশুদের নয়, সব বয়সী দর্শকের কাছেই সমানভাবে প্রিয় হয়ে উঠেছিল। আজও গানটি শুনলে নব্বইয়ের দশকের স্মৃতি চোখের সামনে ভেসে ওঠে।

তবে ‘মাসুম’ শুধু একটি সফল চলচ্চিত্রই নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে কিছু চমকপ্রদ তথ্যও। ছবির জন্য ‘টুকুর টুকুর দেখতে হো ক্যায়া’ নামে একটি গানের শুটিং সম্পন্ন হলেও শেষ পর্যন্ত সেটি সিনেমা হলের সংস্করণে রাখা হয়নি। পরবর্তীতে ডিভিডি সংস্করণ থেকেও গানটি বাদ দেওয়া হয়। ফলে গানটি নিয়ে দর্শকদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে কৌতূহল রয়ে গেছে।

অনেকেই জানেন না, ‘মাসুম’ ছিল জনপ্রিয় মারাঠি চলচ্চিত্র ‘মাঝা চাকুলা’-র হিন্দি রিমেক। মূল ছবিটি যেমন দর্শকদের ভালোবাসা পেয়েছিল, তেমনি হিন্দি সংস্করণও নিজস্ব পরিচয় তৈরি করতে সক্ষম হয়েছিল। বিশেষ করে শিশু চরিত্রকেন্দ্রিক গল্পটি ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের দর্শকদের হৃদয় স্পর্শ করেছিল।

মুক্তির সময় ছবিটি বক্স অফিসেও দারুণ সাফল্য অর্জন করে। মাত্র ১ কোটি ৭৫ থেকে ১ কোটি ৮০ লাখ রুপির বাজেটে নির্মিত ছবিটি বিশ্বব্যাপী প্রায় ৮ কোটি ৯৫ লাখ রুপি আয় করে। ভারতীয় বক্স অফিসেও এটি উল্লেখযোগ্য ব্যবসা করে এবং সে সময়ের অন্যতম সফল চলচ্চিত্র হিসেবে স্বীকৃতি পায়।

চিত্রনাট্যের দিক থেকেও ‘মাসুম’ ছিল নব্বইয়ের দশকের বলিউডি বিনোদনের এক নিখুঁত উদাহরণ। প্রথমার্ধে ছিল পারিবারিক আবেগ, হাস্যরস এবং সম্পর্কের উষ্ণতা। কিন্তু বিরতির পর গল্প মোড় নেয় রুদ্ধশ্বাস অ্যাকশনের দিকে। অপহরণ, ধাওয়া, সংঘর্ষ এবং নাটকীয় ঘটনাপ্রবাহ ছবিটিকে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আকর্ষণীয় করে রেখেছিল।

আজকের দিনে দাঁড়িয়ে ছবিটির কিছু দৃশ্য হয়তো অনেকের কাছে অতিনাটকীয় বা অবাস্তব মনে হতে পারে। কিন্তু ‘মাসুম’ কখনোই বাস্তবতার কঠোর মাপকাঠিতে তৈরি হয়নি। এটি ছিল দর্শকদের আনন্দ দেওয়ার জন্য নির্মিত এক নির্মল বিনোদনের চলচ্চিত্র। আর সেই কারণেই ছবিটি সময়ের পরীক্ষায় টিকে গেছে।

তিন দশক পরও ‘মাসুম’ শুধু একটি সিনেমার নাম নয়; এটি নব্বইয়ের দশকের বলিউডের এক আবেগঘন স্মৃতি। একটি প্রজন্মের শৈশব, কৈশোর আর অসংখ্য সুখস্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এই চলচ্চিত্র আজও দর্শকদের মনে একইভাবে বেঁচে আছে। কারণ কিছু সিনেমা শুধু পর্দায় সীমাবদ্ধ থাকে না, তারা জায়গা করে নেয় মানুষের হৃদয়ে। ‘মাসুম’ ঠিক তেমনই একটি চলচ্চিত্র।

আপনার মতামত লিখুন

BD State News

মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬


তিন দশক পরও হৃদয়ে বেঁচে আছে হিন্দি চলচ্চিত্র ‘মাসুম’

প্রকাশের তারিখ : ০৬ জুন ২০২৬

featured Image

সিনেমার ইতিহাসে এমন কিছু চলচ্চিত্র থাকে, যেগুলো শুধু একটি নির্দিষ্ট সময়ের বিনোদন নয়; বরং একটি প্রজন্মের স্মৃতি, আবেগ আর নস্টালজিয়ার অংশ হয়ে ওঠে। নব্বইয়ের দশকের বলিউডে নির্মিত এমনই একটি চলচ্চিত্র ‘মাসুম’। মুক্তির প্রায় তিন দশক পেরিয়ে গেলেও ছবিটি আজও বহু দর্শকের হৃদয়ে একই রকম উজ্জ্বল হয়ে আছে।

১৯৯৬ সালের ২৪ মে মুক্তি পাওয়া ‘মাসুম’ ছিল সেই সময়কার বলিউডি বাণিজ্যিক ধারার একটি সফল উদাহরণ। পরিচালক মহেশ কোঠারে ছবিটিকে এমনভাবে নির্মাণ করেছিলেন, যেখানে পারিবারিক আবেগ, হাস্যরস, সাসপেন্স, অ্যাকশন এবং সুরেলা গান মিলেমিশে তৈরি করেছিল এক পরিপূর্ণ বিনোদনের প্যাকেজ। সেই সময়ের দর্শকরা সিনেমা হলে গিয়ে যেমন হাসতেন, তেমনি আবেগে আপ্লুত হতেন; আবার উত্তেজনায় হাতের মুঠো শক্ত করে বসে থাকতেন পর্দার সামনে।

ছবিটির সবচেয়ে বড় আকর্ষণ ছিল এর সরল অথচ হৃদয়ছোঁয়া গল্প। ছোট্ট কিষাণ, সবার প্রিয় জিমি, ছিল গল্পের কেন্দ্রবিন্দু। এক দুষ্টু, চঞ্চল, বুদ্ধিমান এবং সাহসী শিশুর জীবনকে ঘিরেই এগিয়েছে পুরো কাহিনি। ভয়ঙ্কর অপরাধীদের বিরুদ্ধে তার লড়াই, বিপদের মুখে উপস্থিত বুদ্ধির পরিচয় এবং পরিবারের প্রতি গভীর ভালোবাসা দর্শকদের মুগ্ধ করেছিল। সেই সময়ের শিশু-কিশোরদের কাছে জিমি ছিল যেন এক অনুপ্রেরণার নাম।

জিমি চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন শিশু শিল্পী ওমকার কাপুর। ছবিটি মুক্তির পর তিনি রাতারাতি জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। তার নিষ্পাপ অভিনয়, স্বতঃস্ফূর্ত সংলাপ এবং প্রাণবন্ত উপস্থিতি ছবিটিকে অন্য মাত্রা দিয়েছিল। অনেক দর্শকের কাছে ‘মাসুম’ মানেই ছিল ছোট্ট জিমির হাসিমাখা মুখ।

এই ছবির মাধ্যমেই বলিউডে নায়ক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন ইন্দর কুমার। প্রথম ছবিতেই তিনি নিজের দক্ষতার প্রমাণ দিয়েছিলেন। তার প্রাণবন্ত অভিনয় এবং অ্যাকশন দৃশ্য দর্শকদের নজর কাড়ে। নায়িকা আয়েশা জুলকাও ছিলেন নিজের চেনা মিষ্টি ও সাবলীল রূপে। অন্যদিকে রেণুকা শাহানের মমতাময়ী মাতৃত্ব ছবির আবেগকে আরও গভীর করে তুলেছিল।

ছবিটির অন্যতম শক্তি ছিল এর সহশিল্পীরা। লক্ষ্মীকান্ত বের্দে এবং টিনু আনন্দের কৌতুকপূর্ণ অভিনয় দর্শকদের হাসির খোরাক জুগিয়েছিল। আবার মোহন যোশীর ‘বারুদ’ চরিত্রটি ছিল সেই সময়কার আদর্শ বলিউডি খলনায়কের প্রতিচ্ছবি—নিষ্ঠুর, ভয়ঙ্কর এবং স্মরণীয়। তার উপস্থিতি গল্পে উত্তেজনা বাড়িয়ে দিয়েছিল বহুগুণ।

‘মাসুম’-এর গানগুলোও ছিল ছবির জনপ্রিয়তার অন্যতম কারণ। আনন্দ রাজ আনন্দের সুরে নির্মিত গানগুলো সে সময় রেডিও, টেলিভিশন এবং ক্যাসেটের দোকানগুলোতে নিয়মিত শোনা যেত। বিশেষ করে আদিত্য নারায়ণের কণ্ঠে গাওয়া ‘ছোটা বাচ্চা জান কে হামকো না সমঝানা রে’ গানটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। গানটি শুধু শিশুদের নয়, সব বয়সী দর্শকের কাছেই সমানভাবে প্রিয় হয়ে উঠেছিল। আজও গানটি শুনলে নব্বইয়ের দশকের স্মৃতি চোখের সামনে ভেসে ওঠে।

তবে ‘মাসুম’ শুধু একটি সফল চলচ্চিত্রই নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে কিছু চমকপ্রদ তথ্যও। ছবির জন্য ‘টুকুর টুকুর দেখতে হো ক্যায়া’ নামে একটি গানের শুটিং সম্পন্ন হলেও শেষ পর্যন্ত সেটি সিনেমা হলের সংস্করণে রাখা হয়নি। পরবর্তীতে ডিভিডি সংস্করণ থেকেও গানটি বাদ দেওয়া হয়। ফলে গানটি নিয়ে দর্শকদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে কৌতূহল রয়ে গেছে।

অনেকেই জানেন না, ‘মাসুম’ ছিল জনপ্রিয় মারাঠি চলচ্চিত্র ‘মাঝা চাকুলা’-র হিন্দি রিমেক। মূল ছবিটি যেমন দর্শকদের ভালোবাসা পেয়েছিল, তেমনি হিন্দি সংস্করণও নিজস্ব পরিচয় তৈরি করতে সক্ষম হয়েছিল। বিশেষ করে শিশু চরিত্রকেন্দ্রিক গল্পটি ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের দর্শকদের হৃদয় স্পর্শ করেছিল।

মুক্তির সময় ছবিটি বক্স অফিসেও দারুণ সাফল্য অর্জন করে। মাত্র ১ কোটি ৭৫ থেকে ১ কোটি ৮০ লাখ রুপির বাজেটে নির্মিত ছবিটি বিশ্বব্যাপী প্রায় ৮ কোটি ৯৫ লাখ রুপি আয় করে। ভারতীয় বক্স অফিসেও এটি উল্লেখযোগ্য ব্যবসা করে এবং সে সময়ের অন্যতম সফল চলচ্চিত্র হিসেবে স্বীকৃতি পায়।

চিত্রনাট্যের দিক থেকেও ‘মাসুম’ ছিল নব্বইয়ের দশকের বলিউডি বিনোদনের এক নিখুঁত উদাহরণ। প্রথমার্ধে ছিল পারিবারিক আবেগ, হাস্যরস এবং সম্পর্কের উষ্ণতা। কিন্তু বিরতির পর গল্প মোড় নেয় রুদ্ধশ্বাস অ্যাকশনের দিকে। অপহরণ, ধাওয়া, সংঘর্ষ এবং নাটকীয় ঘটনাপ্রবাহ ছবিটিকে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আকর্ষণীয় করে রেখেছিল।

আজকের দিনে দাঁড়িয়ে ছবিটির কিছু দৃশ্য হয়তো অনেকের কাছে অতিনাটকীয় বা অবাস্তব মনে হতে পারে। কিন্তু ‘মাসুম’ কখনোই বাস্তবতার কঠোর মাপকাঠিতে তৈরি হয়নি। এটি ছিল দর্শকদের আনন্দ দেওয়ার জন্য নির্মিত এক নির্মল বিনোদনের চলচ্চিত্র। আর সেই কারণেই ছবিটি সময়ের পরীক্ষায় টিকে গেছে।

তিন দশক পরও ‘মাসুম’ শুধু একটি সিনেমার নাম নয়; এটি নব্বইয়ের দশকের বলিউডের এক আবেগঘন স্মৃতি। একটি প্রজন্মের শৈশব, কৈশোর আর অসংখ্য সুখস্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এই চলচ্চিত্র আজও দর্শকদের মনে একইভাবে বেঁচে আছে। কারণ কিছু সিনেমা শুধু পর্দায় সীমাবদ্ধ থাকে না, তারা জায়গা করে নেয় মানুষের হৃদয়ে। ‘মাসুম’ ঠিক তেমনই একটি চলচ্চিত্র।


BD State News

সম্পাদক: আবদুর রাকিব

কপিরাইট © ২০২৬ BD State News । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত