বাংলা গানের ইতিহাসে কিছু কণ্ঠ আছে, যাদের পরিচয় কোনো বিশেষণ দিয়ে সম্পূর্ণ করা যায় না। তারা কেবল শিল্পী নন, তারা একটি সময়ের প্রতীক, একটি জাতির আবেগের ভাষ্যকার। সাবিনা ইয়াসমিন তেমনই এক নাম। তাঁর কণ্ঠে বাঙালি শুনেছে প্রেমের মুগ্ধতা, বিরহের দীর্ঘশ্বাস, মায়ের প্রতি সন্তানের ভালোবাসা, আর মাতৃভূমির জন্য এক অকৃত্রিম নিবেদন।
বাংলাদেশের সংগীতাঙ্গনে তিনি শুধু একজন সফল শিল্পী নন, তিনি এক জীবন্ত কিংবদন্তি। প্রায় ছয় দশকের দীর্ঘ সংগীতযাত্রায় তিনি এমন এক উচ্চতায় পৌঁছেছেন, যেখানে জনপ্রিয়তা, সম্মান ও শ্রোতাদের ভালোবাসা একাকার হয়ে গেছে। তাঁর গান মানেই স্মৃতির দরজা খুলে যাওয়া, হৃদয়ের গোপন কক্ষে জমে থাকা অনুভূতিরা আবার জেগে ওঠা।
১৯৫৪ সালের ৪ সেপ্টেম্বর এক সাংস্কৃতিক আবহে জন্মগ্রহণ করেন সাবিনা ইয়াসমিন। সাতক্ষীরার মাটির সঙ্গে তাঁর শিকড় জড়িয়ে থাকলেও বেড়ে ওঠা নারায়ণগঞ্জে। পরিবারেই ছিল সংগীতের চর্চা। বড় বোনদের সংগীতশিক্ষার সময় ছোট্ট সাবিনা মুগ্ধ হয়ে শুনতেন সুরের ওঠানামা। সেই শোনা থেকেই শুরু হয় তাঁর অন্তর্জগতের নির্মাণ।
খুব অল্প বয়সেই তাঁর অসাধারণ প্রতিভার প্রকাশ ঘটে। মাত্র ছয় বছর বয়সে অল পাকিস্তান আন্তঃস্কুল সংগীত প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন হয়ে তিনি জানান দেন ভবিষ্যতের এক উজ্জ্বল সম্ভাবনার কথা। শিশুদের বেতার অনুষ্ঠান ‘খেলাঘর’-এ গান গাওয়ার মধ্য দিয়ে শুরু হয় তাঁর শিল্পীজীবনের আনুষ্ঠানিক পথচলা।
ষাটের দশকের শুরুতে চলচ্চিত্রে প্লেব্যাকের মাধ্যমে যে যাত্রা শুরু হয়েছিল, তা পরবর্তীকালে বাংলাদেশের সংগীত ইতিহাসের এক স্বর্ণালী অধ্যায়ে পরিণত হয়। ১৯৬৭ সালে জহির রায়হানের ‘আগুন নিয়ে খেলা’ চলচ্চিত্রে প্রথম পূর্ণাঙ্গ প্লেব্যাকের পর আর তাঁকে পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।
বাংলাদেশের চলচ্চিত্র সংগীতের সঙ্গে সাবিনা ইয়াসমিন নামটি এতটাই ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে যে একটিকে ছাড়া অন্যটিকে কল্পনা করা কঠিন। প্রেম, বেদনা, প্রত্যাশা, হতাশা কিংবা জীবনের গভীর উপলব্ধি—প্রতিটি অনুভূতিকেই তিনি নিজের কণ্ঠে নতুন প্রাণ দিয়েছেন।
“শুধু গান গেয়ে পরিচয়”, “এই মন তোমাকে দিলাম”, “আমি রজনীগন্ধা ফুলের মতো”, “শত জনমের স্বপ্ন তুমি আমার”, “অশ্রু দিয়ে লেখা এ গান”—এসব গান শুধু জনপ্রিয়তার মাপকাঠিতে নয়, শিল্পগুণেও বাংলা সংগীতের সম্পদ হয়ে আছে।
তাঁর কণ্ঠের বিশেষত্ব ছিল আবেগকে সুরের ভেতর এমনভাবে মিশিয়ে দেওয়া, যেন শ্রোতা গান শুনে শুধু সুর নয়, জীবনের কোনো না কোনো গল্পও অনুভব করতে পারেন। এ কারণেই তাঁর গান প্রজন্ম পেরিয়ে আজও সমানভাবে শ্রোতাদের হৃদয় ছুঁয়ে যায়।
দেশাত্মবোধক গানের ক্ষেত্রে সাবিনা ইয়াসমিন এক অনন্য উচ্চতায় অবস্থান করেন। স্বাধীন বাংলাদেশের আবেগ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং দেশপ্রেমের গভীর অনুভূতি তাঁর কণ্ঠে পেয়েছে অসাধারণ প্রকাশ।
“জন্ম আমার ধন্য হলো মাগো”, “একটি বাংলাদেশ তুমি জাগ্রত জনতার”, “সব ক’টা জানালা খুলে দাও না”, “ও মাঝি নাও ছাইড়া দে”, “ও আমার বাংলা মা তোর”—এসব গান শুধু সংগীত নয়; এগুলো বাংলাদেশের মানুষের আত্মপরিচয়ের অংশ।
বিশেষ করে “সব ক’টা জানালা খুলে দাও না” গানটি যেন এক প্রজন্মের স্বপ্ন ও মুক্তির প্রতীক হয়ে উঠেছে। জাতীয় অনুষ্ঠান, সাংস্কৃতিক আয়োজন কিংবা সংকটের মুহূর্ত—বারবার ফিরে আসে এই গান, ফিরে আসে সাবিনা ইয়াসমিনের কণ্ঠ।
সংগীতজীবনে তিনি ১৬ হাজারেরও বেশি গানে কণ্ঠ দিয়েছেন। সংখ্যাটি বিস্ময়কর, কিন্তু তার চেয়েও বড় বিষয় হলো গানের বৈচিত্র্য। আধুনিক গান, চলচ্চিত্রের গান, দেশাত্মবোধক গান, লোকসংগীত, গীতিকবিতা—প্রতিটি ধারাতেই তিনি সমান দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন।
বাংলাদেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও তিনি ছিলেন সমানভাবে সমাদৃত। পাকিস্তানের কিংবদন্তি মেহেদী হাসান ও আহমেদ রুশদী, ভারতের কিশোর কুমার, শ্যামল মিত্র, কুমার শানু, সনু নিগমসহ বহু খ্যাতিমান শিল্পীর সঙ্গে দ্বৈত কণ্ঠে গান গেয়েছেন। বাংলা ছাড়াও বিভিন্ন ভাষায় সংগীত পরিবেশনের মাধ্যমে তিনি তাঁর শিল্পীসত্তার বহুমাত্রিকতা প্রমাণ করেছেন।
পুরস্কার ও স্বীকৃতির ক্ষেত্রেও তাঁর অবস্থান অনন্য। বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বাধিক ১৪ বার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জনের বিরল রেকর্ড তাঁর দখলে। এছাড়া একুশে পদক, স্বাধীনতা পুরস্কারসহ অসংখ্য সম্মাননা তাঁকে অলংকৃত করেছে। তবে সব পুরস্কারের ঊর্ধ্বে রয়েছে সাধারণ মানুষের ভালোবাসা—যা একজন শিল্পীর সবচেয়ে বড় অর্জন।
জীবনের পথচলা অবশ্য সবসময় মসৃণ ছিল না। ২০০৭ সালে তাঁর শরীরে ধরা পড়ে নন-হজকিন লিম্ফোমা। সংবাদটি পুরো দেশের সংগীতপ্রেমীদের ব্যথিত করেছিল। যে কণ্ঠে মানুষ এতদিন আনন্দ ও আশ্রয় খুঁজেছে, সেই কণ্ঠের অধিকারী মানুষটি তখন জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে।
কিন্তু সাবিনা ইয়াসমিন হার মানেননি। দীর্ঘ চিকিৎসা শেষে তিনি সুস্থ হয়ে আবারও ফিরে এসেছেন সংগীতের কাছে। তাঁর এই প্রত্যাবর্তন যেন ছিল এক শিল্পীর অদম্য জীবনীশক্তির প্রতীক।
২০২৪ সালে আবারও শারীরিক অসুস্থতার কারণে তাঁকে চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুর যেতে হয়। কিন্তু প্রতিবারের মতোই তিনি লড়াই করেছেন সাহসের সঙ্গে। তাঁর জীবন আমাদের শেখায়—শিল্পী শুধু মঞ্চে নয়, জীবনযুদ্ধেও একজন যোদ্ধা হতে পারেন।
বর্তমানে তিনি অনেকটাই নিরিবিলি জীবনযাপন করেন। তবে গান থেকে নিজেকে কখনো বিচ্ছিন্ন করেননি। প্রতিদিনের রেওয়াজ, সুরের সঙ্গে নীরব আলাপন এবং সংগীতের প্রতি অবিচল ভালোবাসা এখনও তাঁর জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
আজ যখন বাংলা গানের নতুন প্রজন্ম নিজেদের পথ তৈরি করছে, তখনও সাবিনা ইয়াসমিন এক আলোকবর্তিকা হয়ে আছেন। তাঁর গান নতুন শিল্পীদের অনুপ্রেরণা দেয়, নতুন শ্রোতাদের মুগ্ধ করে এবং পুরোনো শ্রোতাদের ফিরিয়ে নিয়ে যায় স্মৃতির সোনালি দিনগুলোতে।
বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ইতিহাসে সাবিনা ইয়াসমিন কেবল একজন শিল্পীর নাম নয়; তিনি একটি অধ্যায়, একটি ঐতিহ্য, একটি আবেগ। তাঁর কণ্ঠে আমরা খুঁজে পাই বাংলাদেশের আত্মা, মানুষের ভালোবাসা এবং সময়কে অতিক্রম করে বেঁচে থাকার এক অনন্য শক্তি।
সুরের এই সম্রাজ্ঞী সুস্থ থাকুন, দীর্ঘজীবী হোন। তাঁর কণ্ঠের মায়া, তাঁর গানের আলো এবং তাঁর শিল্পীসত্তার মহিমা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়ুক। কারণ কিছু কণ্ঠ কখনো হারিয়ে যায় না—তারা ইতিহাস হয়ে বেঁচে থাকে। সাবিনা ইয়াসমিন সেই ইতিহাসেরই এক উজ্জ্বল নাম।

মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ৩১ মে ২০২৬
বাংলা গানের ইতিহাসে কিছু কণ্ঠ আছে, যাদের পরিচয় কোনো বিশেষণ দিয়ে সম্পূর্ণ করা যায় না। তারা কেবল শিল্পী নন, তারা একটি সময়ের প্রতীক, একটি জাতির আবেগের ভাষ্যকার। সাবিনা ইয়াসমিন তেমনই এক নাম। তাঁর কণ্ঠে বাঙালি শুনেছে প্রেমের মুগ্ধতা, বিরহের দীর্ঘশ্বাস, মায়ের প্রতি সন্তানের ভালোবাসা, আর মাতৃভূমির জন্য এক অকৃত্রিম নিবেদন।
বাংলাদেশের সংগীতাঙ্গনে তিনি শুধু একজন সফল শিল্পী নন, তিনি এক জীবন্ত কিংবদন্তি। প্রায় ছয় দশকের দীর্ঘ সংগীতযাত্রায় তিনি এমন এক উচ্চতায় পৌঁছেছেন, যেখানে জনপ্রিয়তা, সম্মান ও শ্রোতাদের ভালোবাসা একাকার হয়ে গেছে। তাঁর গান মানেই স্মৃতির দরজা খুলে যাওয়া, হৃদয়ের গোপন কক্ষে জমে থাকা অনুভূতিরা আবার জেগে ওঠা।
১৯৫৪ সালের ৪ সেপ্টেম্বর এক সাংস্কৃতিক আবহে জন্মগ্রহণ করেন সাবিনা ইয়াসমিন। সাতক্ষীরার মাটির সঙ্গে তাঁর শিকড় জড়িয়ে থাকলেও বেড়ে ওঠা নারায়ণগঞ্জে। পরিবারেই ছিল সংগীতের চর্চা। বড় বোনদের সংগীতশিক্ষার সময় ছোট্ট সাবিনা মুগ্ধ হয়ে শুনতেন সুরের ওঠানামা। সেই শোনা থেকেই শুরু হয় তাঁর অন্তর্জগতের নির্মাণ।
খুব অল্প বয়সেই তাঁর অসাধারণ প্রতিভার প্রকাশ ঘটে। মাত্র ছয় বছর বয়সে অল পাকিস্তান আন্তঃস্কুল সংগীত প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন হয়ে তিনি জানান দেন ভবিষ্যতের এক উজ্জ্বল সম্ভাবনার কথা। শিশুদের বেতার অনুষ্ঠান ‘খেলাঘর’-এ গান গাওয়ার মধ্য দিয়ে শুরু হয় তাঁর শিল্পীজীবনের আনুষ্ঠানিক পথচলা।
ষাটের দশকের শুরুতে চলচ্চিত্রে প্লেব্যাকের মাধ্যমে যে যাত্রা শুরু হয়েছিল, তা পরবর্তীকালে বাংলাদেশের সংগীত ইতিহাসের এক স্বর্ণালী অধ্যায়ে পরিণত হয়। ১৯৬৭ সালে জহির রায়হানের ‘আগুন নিয়ে খেলা’ চলচ্চিত্রে প্রথম পূর্ণাঙ্গ প্লেব্যাকের পর আর তাঁকে পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।
বাংলাদেশের চলচ্চিত্র সংগীতের সঙ্গে সাবিনা ইয়াসমিন নামটি এতটাই ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে যে একটিকে ছাড়া অন্যটিকে কল্পনা করা কঠিন। প্রেম, বেদনা, প্রত্যাশা, হতাশা কিংবা জীবনের গভীর উপলব্ধি—প্রতিটি অনুভূতিকেই তিনি নিজের কণ্ঠে নতুন প্রাণ দিয়েছেন।
“শুধু গান গেয়ে পরিচয়”, “এই মন তোমাকে দিলাম”, “আমি রজনীগন্ধা ফুলের মতো”, “শত জনমের স্বপ্ন তুমি আমার”, “অশ্রু দিয়ে লেখা এ গান”—এসব গান শুধু জনপ্রিয়তার মাপকাঠিতে নয়, শিল্পগুণেও বাংলা সংগীতের সম্পদ হয়ে আছে।
তাঁর কণ্ঠের বিশেষত্ব ছিল আবেগকে সুরের ভেতর এমনভাবে মিশিয়ে দেওয়া, যেন শ্রোতা গান শুনে শুধু সুর নয়, জীবনের কোনো না কোনো গল্পও অনুভব করতে পারেন। এ কারণেই তাঁর গান প্রজন্ম পেরিয়ে আজও সমানভাবে শ্রোতাদের হৃদয় ছুঁয়ে যায়।
দেশাত্মবোধক গানের ক্ষেত্রে সাবিনা ইয়াসমিন এক অনন্য উচ্চতায় অবস্থান করেন। স্বাধীন বাংলাদেশের আবেগ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং দেশপ্রেমের গভীর অনুভূতি তাঁর কণ্ঠে পেয়েছে অসাধারণ প্রকাশ।
“জন্ম আমার ধন্য হলো মাগো”, “একটি বাংলাদেশ তুমি জাগ্রত জনতার”, “সব ক’টা জানালা খুলে দাও না”, “ও মাঝি নাও ছাইড়া দে”, “ও আমার বাংলা মা তোর”—এসব গান শুধু সংগীত নয়; এগুলো বাংলাদেশের মানুষের আত্মপরিচয়ের অংশ।
বিশেষ করে “সব ক’টা জানালা খুলে দাও না” গানটি যেন এক প্রজন্মের স্বপ্ন ও মুক্তির প্রতীক হয়ে উঠেছে। জাতীয় অনুষ্ঠান, সাংস্কৃতিক আয়োজন কিংবা সংকটের মুহূর্ত—বারবার ফিরে আসে এই গান, ফিরে আসে সাবিনা ইয়াসমিনের কণ্ঠ।
সংগীতজীবনে তিনি ১৬ হাজারেরও বেশি গানে কণ্ঠ দিয়েছেন। সংখ্যাটি বিস্ময়কর, কিন্তু তার চেয়েও বড় বিষয় হলো গানের বৈচিত্র্য। আধুনিক গান, চলচ্চিত্রের গান, দেশাত্মবোধক গান, লোকসংগীত, গীতিকবিতা—প্রতিটি ধারাতেই তিনি সমান দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন।
বাংলাদেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও তিনি ছিলেন সমানভাবে সমাদৃত। পাকিস্তানের কিংবদন্তি মেহেদী হাসান ও আহমেদ রুশদী, ভারতের কিশোর কুমার, শ্যামল মিত্র, কুমার শানু, সনু নিগমসহ বহু খ্যাতিমান শিল্পীর সঙ্গে দ্বৈত কণ্ঠে গান গেয়েছেন। বাংলা ছাড়াও বিভিন্ন ভাষায় সংগীত পরিবেশনের মাধ্যমে তিনি তাঁর শিল্পীসত্তার বহুমাত্রিকতা প্রমাণ করেছেন।
পুরস্কার ও স্বীকৃতির ক্ষেত্রেও তাঁর অবস্থান অনন্য। বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বাধিক ১৪ বার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জনের বিরল রেকর্ড তাঁর দখলে। এছাড়া একুশে পদক, স্বাধীনতা পুরস্কারসহ অসংখ্য সম্মাননা তাঁকে অলংকৃত করেছে। তবে সব পুরস্কারের ঊর্ধ্বে রয়েছে সাধারণ মানুষের ভালোবাসা—যা একজন শিল্পীর সবচেয়ে বড় অর্জন।
জীবনের পথচলা অবশ্য সবসময় মসৃণ ছিল না। ২০০৭ সালে তাঁর শরীরে ধরা পড়ে নন-হজকিন লিম্ফোমা। সংবাদটি পুরো দেশের সংগীতপ্রেমীদের ব্যথিত করেছিল। যে কণ্ঠে মানুষ এতদিন আনন্দ ও আশ্রয় খুঁজেছে, সেই কণ্ঠের অধিকারী মানুষটি তখন জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে।
কিন্তু সাবিনা ইয়াসমিন হার মানেননি। দীর্ঘ চিকিৎসা শেষে তিনি সুস্থ হয়ে আবারও ফিরে এসেছেন সংগীতের কাছে। তাঁর এই প্রত্যাবর্তন যেন ছিল এক শিল্পীর অদম্য জীবনীশক্তির প্রতীক।
২০২৪ সালে আবারও শারীরিক অসুস্থতার কারণে তাঁকে চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুর যেতে হয়। কিন্তু প্রতিবারের মতোই তিনি লড়াই করেছেন সাহসের সঙ্গে। তাঁর জীবন আমাদের শেখায়—শিল্পী শুধু মঞ্চে নয়, জীবনযুদ্ধেও একজন যোদ্ধা হতে পারেন।
বর্তমানে তিনি অনেকটাই নিরিবিলি জীবনযাপন করেন। তবে গান থেকে নিজেকে কখনো বিচ্ছিন্ন করেননি। প্রতিদিনের রেওয়াজ, সুরের সঙ্গে নীরব আলাপন এবং সংগীতের প্রতি অবিচল ভালোবাসা এখনও তাঁর জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
আজ যখন বাংলা গানের নতুন প্রজন্ম নিজেদের পথ তৈরি করছে, তখনও সাবিনা ইয়াসমিন এক আলোকবর্তিকা হয়ে আছেন। তাঁর গান নতুন শিল্পীদের অনুপ্রেরণা দেয়, নতুন শ্রোতাদের মুগ্ধ করে এবং পুরোনো শ্রোতাদের ফিরিয়ে নিয়ে যায় স্মৃতির সোনালি দিনগুলোতে।
বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ইতিহাসে সাবিনা ইয়াসমিন কেবল একজন শিল্পীর নাম নয়; তিনি একটি অধ্যায়, একটি ঐতিহ্য, একটি আবেগ। তাঁর কণ্ঠে আমরা খুঁজে পাই বাংলাদেশের আত্মা, মানুষের ভালোবাসা এবং সময়কে অতিক্রম করে বেঁচে থাকার এক অনন্য শক্তি।
সুরের এই সম্রাজ্ঞী সুস্থ থাকুন, দীর্ঘজীবী হোন। তাঁর কণ্ঠের মায়া, তাঁর গানের আলো এবং তাঁর শিল্পীসত্তার মহিমা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়ুক। কারণ কিছু কণ্ঠ কখনো হারিয়ে যায় না—তারা ইতিহাস হয়ে বেঁচে থাকে। সাবিনা ইয়াসমিন সেই ইতিহাসেরই এক উজ্জ্বল নাম।

আপনার মতামত লিখুন