কেন ভালবাসা হারিয়ে যায়, দুখের ঘরে সুখ যদি আসে, এমন শত শত বাংলা সিনেমার কালজয়ী গানের শিল্পি হলেন সুবীর নন্দী। শুধু তাই নয়, কখনও প্রেমিকার সৌন্দর্যের প্রশংসায় আবেদন করেছেন। নানাগুনের মিশেলে ভিন্ন ধাঁচের গায়কীতে তিনি হয়ে ওঠেন বাংলা গানের আকাশে এক বিষণ্ন সুরের নাম।
দেশের এই গুনি শিল্পি সবাইকে কাদিয়ে ২০১৯ সালের ৭ মে, সিঙ্গাপুরের একটি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৬৬ বছর। কিন্তু সময় থেমে গেলেও থেমে যায়নি তাঁর সুর।
এই মাসে গত হয়ে গেছে তার ৭ম মৃত্যু বার্ষিকী। তারপরেও কমেনি তার কন্ঠের গানগুলোর আবেগ। তার শুনলে এখনও মনে হয়, কেউ যেন নিঃশব্দে হৃদয়ের ভেতর জমে থাকা না-বলা গল্পগুলো গেয়ে চলেছেন। মানুষের কান্না, প্রেম, অভিমান আর জীবনের গভীর অনুভূতির প্রতিচ্ছবি ছিল তার গানে। এর কারণে তিনি শুধু একজন শিল্পী নন, বাংলা গানের আবেগের এক চিরন্তন অধ্যায়।
সব শ্রেণীর শ্রোতার কাছে এখনও তিনি প্রিয় একটি নাম। কোনো নির্জন রাতে, পুরোনো রেডিওর ভাঙা শব্দে কিংবা স্মৃতিমাখা একাকী মুহূর্তে ভেসে আসে তাঁর গানগুলো আজও রক্ত ক্ষরণ ঘটায় হৃদয়ে।
তাইতো বাংলা গানের স্বর্নালী সময়ে গানের সম্রাট এন্ড্রু কিশোর, সৈয়দ আব্দুল হাদী, খুরশিদ আলম, মাহমুদ উন নদী, খম্দকার ফারুক আহমেদ, বশির আহমেদ, আব্দুল জব্বারসহ অগনিত মহান শিল্পিদের কাতারে থেকে নিজেকে অন্যন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। তার সময়ে কেটেছে বাংলা গানের এক স্বর্ণালী সময়।
১৯৫৩ সালের ১৯ নভেম্বর, হবিগঞ্জ জেলার বানিয়াচং থানার নন্দী পাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন সুবীর নন্দী। সংগীত যেন জন্ম থেকেই ছিল তাঁর রক্তে মিশে। পিতা সুধাংশু নন্দী ছিলেন চিকিৎসক ও সংগীতপ্রেমী মানুষ। মা পুতুল রানীর কাছেই তাঁর সঙ্গীতে হাতেখড়ি।
পরে ওস্তাদ বাবর আলী খানের কাছে শাস্ত্রীয় সংগীতে তালিম নেন। লোকগানের শিক্ষা নেন বিদিত লাল দাশের কাছ থেকে। খুব ছোটবেলা থেকেই গান ছিল তাঁর জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তৃতীয় শ্রেণীতে পড়ার সময়ই গান গাইতেন তিনি। ১৯৬৭ সালে প্রথম সিলেট বেতারে গান করেন। এরপর ১৯৭০ সালে ঢাকা বেতারে তাঁর প্রথম গান ‘যদি কেউ ধূপ জ্বেলে দেয়’।
সেই গান দিয়েই শুরু হয় বাংলা সংগীতের এক অনন্য যাত্রা। চলচ্চিত্রের গানে সুবীর নন্দী ছিলেন আবেগের আরেক নাম। তাঁর কণ্ঠে প্রেম ছিল কোমল, বিরহ ছিল গভীর, আর বেদনা ছিল অপার্থিব সুন্দর। “আমি বৃষ্টির কাছ থেকে কাঁদতে শিখেছি”, “কতো যে তোমাকে বেসেছি ভালো”, “বন্ধু হতে চেয়ে তোমার শত্রু বলে গণ্য হলাম”, “আমার এ দুটি চোখ পাথর তো নয়”, “হাজার মনের কাছে প্রশ্ন রেখে”—এসব গান শুধু শ্রোতাপ্রিয় হয়নি, মানুষের জীবনের অনুভূতিতে জায়গা করে নিয়েছে।
১৯৭৬ সালে ‘সূর্যগ্রহণ’ চলচ্চিত্রে প্রথম প্লেব্যাক করেন তিনি। এরপর ‘শুভদা’, ‘মহানায়ক’, ‘শ্রাবণ মেঘের দিন’, ‘মেঘের পরে মেঘ’, ‘মহুয়া সুন্দরী’সহ অসংখ্য চলচ্চিত্রে তাঁর কণ্ঠ বাংলা সিনেমার আবেগকে পূর্ণতা দিয়েছে। তাঁর গান মানেই ছিল অনুভূতির গভীরতা, হৃদয় ছুঁয়ে যাওয়ার এক অদ্ভুত ক্ষমতা।
১৯৮১ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম একক অ্যালবাম ‘সুবীর নন্দীর গান’। এরপর ‘প্রেম বলে কিছু নেই’, ‘দুঃখের পর সুখ’, ‘ভালোবাসা কখনো মরে না’, ‘সুরের ভুবনে’, ‘গানের সুরে আমায় পাবে’সহ একের পর এক জনপ্রিয় অ্যালবাম তাঁকে নিয়ে যায় মানুষের হৃদয়ের আরও গভীরে।
সংগীতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ পাঁচবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন সুবীর নন্দী। এছাড়া শিল্পকলায় বিশেষ অবদানের জন্য ২০১৯ সালে পান দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা ‘একুশে পদক’। তবে তাঁর সবচেয়ে বড় অর্জন ছিল মানুষের অকৃত্রিম ভালোবাসা।
শিল্পী হিসেবে যেমন তিনি অসাধারণ ছিলেন, মানুষ হিসেবেও ছিলেন অত্যন্ত বিনয়ী, মিষ্টভাষী ও সজ্জন। সংগীতাঙ্গনের মানুষদের কাছে তিনি ছিলেন এক নিপাট ভদ্রলোক। দীর্ঘদিন ব্যাংকে চাকরি করলেও কখনো সংগীতকে ছেড়ে যাননি। বরং গানকেই নিজের আত্মার ভাষা বানিয়ে নিয়েছিলেন।
দেশের গণ্ডি পেরিয়ে ইংল্যান্ড, সুইডেন, আমেরিকা, জাপান, ভারত, নেপালসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন তিনি। তাঁর কণ্ঠে বিদেশের মঞ্চেও ধ্বনিত হয়েছে বাংলার সুর।
আজ তাঁর মৃত্যুবার্ষিকীতে বাংলা গানের ভুবন যেন আরও একবার শূন্যতার বেদনায় ডুবে যায়। তবুও তাঁর গান রয়ে গেছে মানুষের হৃদয়ে, স্মৃতির গভীরে, সময়ের ওপারে। কারণ কিছু শিল্পী কখনো হারিয়ে যান না। তাঁরা বেঁচে থাকেন তাঁদের সৃষ্টি হয়ে, মানুষের অনুভবে, ভালোবাসার অনন্ত সুরে।
বিনম্র শ্রদ্ধা, সুবীর নন্দী। আজ সুবির নন্দী নেই, তবে তার গান আজও বাংলার হৃদয়ে বাজে, নিভৃত বেদনার এক চিরন্তন সুর হয়ে।

মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৯ মে ২০২৬
কেন ভালবাসা হারিয়ে যায়, দুখের ঘরে সুখ যদি আসে, এমন শত শত বাংলা সিনেমার কালজয়ী গানের শিল্পি হলেন সুবীর নন্দী। শুধু তাই নয়, কখনও প্রেমিকার সৌন্দর্যের প্রশংসায় আবেদন করেছেন। নানাগুনের মিশেলে ভিন্ন ধাঁচের গায়কীতে তিনি হয়ে ওঠেন বাংলা গানের আকাশে এক বিষণ্ন সুরের নাম।
দেশের এই গুনি শিল্পি সবাইকে কাদিয়ে ২০১৯ সালের ৭ মে, সিঙ্গাপুরের একটি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৬৬ বছর। কিন্তু সময় থেমে গেলেও থেমে যায়নি তাঁর সুর।
এই মাসে গত হয়ে গেছে তার ৭ম মৃত্যু বার্ষিকী। তারপরেও কমেনি তার কন্ঠের গানগুলোর আবেগ। তার শুনলে এখনও মনে হয়, কেউ যেন নিঃশব্দে হৃদয়ের ভেতর জমে থাকা না-বলা গল্পগুলো গেয়ে চলেছেন। মানুষের কান্না, প্রেম, অভিমান আর জীবনের গভীর অনুভূতির প্রতিচ্ছবি ছিল তার গানে। এর কারণে তিনি শুধু একজন শিল্পী নন, বাংলা গানের আবেগের এক চিরন্তন অধ্যায়।
সব শ্রেণীর শ্রোতার কাছে এখনও তিনি প্রিয় একটি নাম। কোনো নির্জন রাতে, পুরোনো রেডিওর ভাঙা শব্দে কিংবা স্মৃতিমাখা একাকী মুহূর্তে ভেসে আসে তাঁর গানগুলো আজও রক্ত ক্ষরণ ঘটায় হৃদয়ে।
তাইতো বাংলা গানের স্বর্নালী সময়ে গানের সম্রাট এন্ড্রু কিশোর, সৈয়দ আব্দুল হাদী, খুরশিদ আলম, মাহমুদ উন নদী, খম্দকার ফারুক আহমেদ, বশির আহমেদ, আব্দুল জব্বারসহ অগনিত মহান শিল্পিদের কাতারে থেকে নিজেকে অন্যন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। তার সময়ে কেটেছে বাংলা গানের এক স্বর্ণালী সময়।
১৯৫৩ সালের ১৯ নভেম্বর, হবিগঞ্জ জেলার বানিয়াচং থানার নন্দী পাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন সুবীর নন্দী। সংগীত যেন জন্ম থেকেই ছিল তাঁর রক্তে মিশে। পিতা সুধাংশু নন্দী ছিলেন চিকিৎসক ও সংগীতপ্রেমী মানুষ। মা পুতুল রানীর কাছেই তাঁর সঙ্গীতে হাতেখড়ি।
পরে ওস্তাদ বাবর আলী খানের কাছে শাস্ত্রীয় সংগীতে তালিম নেন। লোকগানের শিক্ষা নেন বিদিত লাল দাশের কাছ থেকে। খুব ছোটবেলা থেকেই গান ছিল তাঁর জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তৃতীয় শ্রেণীতে পড়ার সময়ই গান গাইতেন তিনি। ১৯৬৭ সালে প্রথম সিলেট বেতারে গান করেন। এরপর ১৯৭০ সালে ঢাকা বেতারে তাঁর প্রথম গান ‘যদি কেউ ধূপ জ্বেলে দেয়’।
সেই গান দিয়েই শুরু হয় বাংলা সংগীতের এক অনন্য যাত্রা। চলচ্চিত্রের গানে সুবীর নন্দী ছিলেন আবেগের আরেক নাম। তাঁর কণ্ঠে প্রেম ছিল কোমল, বিরহ ছিল গভীর, আর বেদনা ছিল অপার্থিব সুন্দর। “আমি বৃষ্টির কাছ থেকে কাঁদতে শিখেছি”, “কতো যে তোমাকে বেসেছি ভালো”, “বন্ধু হতে চেয়ে তোমার শত্রু বলে গণ্য হলাম”, “আমার এ দুটি চোখ পাথর তো নয়”, “হাজার মনের কাছে প্রশ্ন রেখে”—এসব গান শুধু শ্রোতাপ্রিয় হয়নি, মানুষের জীবনের অনুভূতিতে জায়গা করে নিয়েছে।
১৯৭৬ সালে ‘সূর্যগ্রহণ’ চলচ্চিত্রে প্রথম প্লেব্যাক করেন তিনি। এরপর ‘শুভদা’, ‘মহানায়ক’, ‘শ্রাবণ মেঘের দিন’, ‘মেঘের পরে মেঘ’, ‘মহুয়া সুন্দরী’সহ অসংখ্য চলচ্চিত্রে তাঁর কণ্ঠ বাংলা সিনেমার আবেগকে পূর্ণতা দিয়েছে। তাঁর গান মানেই ছিল অনুভূতির গভীরতা, হৃদয় ছুঁয়ে যাওয়ার এক অদ্ভুত ক্ষমতা।
১৯৮১ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম একক অ্যালবাম ‘সুবীর নন্দীর গান’। এরপর ‘প্রেম বলে কিছু নেই’, ‘দুঃখের পর সুখ’, ‘ভালোবাসা কখনো মরে না’, ‘সুরের ভুবনে’, ‘গানের সুরে আমায় পাবে’সহ একের পর এক জনপ্রিয় অ্যালবাম তাঁকে নিয়ে যায় মানুষের হৃদয়ের আরও গভীরে।
সংগীতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ পাঁচবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন সুবীর নন্দী। এছাড়া শিল্পকলায় বিশেষ অবদানের জন্য ২০১৯ সালে পান দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা ‘একুশে পদক’। তবে তাঁর সবচেয়ে বড় অর্জন ছিল মানুষের অকৃত্রিম ভালোবাসা।
শিল্পী হিসেবে যেমন তিনি অসাধারণ ছিলেন, মানুষ হিসেবেও ছিলেন অত্যন্ত বিনয়ী, মিষ্টভাষী ও সজ্জন। সংগীতাঙ্গনের মানুষদের কাছে তিনি ছিলেন এক নিপাট ভদ্রলোক। দীর্ঘদিন ব্যাংকে চাকরি করলেও কখনো সংগীতকে ছেড়ে যাননি। বরং গানকেই নিজের আত্মার ভাষা বানিয়ে নিয়েছিলেন।
দেশের গণ্ডি পেরিয়ে ইংল্যান্ড, সুইডেন, আমেরিকা, জাপান, ভারত, নেপালসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন তিনি। তাঁর কণ্ঠে বিদেশের মঞ্চেও ধ্বনিত হয়েছে বাংলার সুর।
আজ তাঁর মৃত্যুবার্ষিকীতে বাংলা গানের ভুবন যেন আরও একবার শূন্যতার বেদনায় ডুবে যায়। তবুও তাঁর গান রয়ে গেছে মানুষের হৃদয়ে, স্মৃতির গভীরে, সময়ের ওপারে। কারণ কিছু শিল্পী কখনো হারিয়ে যান না। তাঁরা বেঁচে থাকেন তাঁদের সৃষ্টি হয়ে, মানুষের অনুভবে, ভালোবাসার অনন্ত সুরে।
বিনম্র শ্রদ্ধা, সুবীর নন্দী। আজ সুবির নন্দী নেই, তবে তার গান আজও বাংলার হৃদয়ে বাজে, নিভৃত বেদনার এক চিরন্তন সুর হয়ে।

আপনার মতামত লিখুন