ঢাকার ব্যস্ত রাস্তা পেরিয়ে যখন মানুষ ছুটে যেত সিনেমা হলের দিকে, তখন শহরের বাতাসেও যেন মিশে থাকত পোস্টারের রঙ। কোথাও বিশাল ব্যানারে নায়ক হাতে বন্দুক, কোথাও প্রেমে ভেজা চোখে নায়িকা, আবার কোথাও গ্রামীণ জীবনের কান্না আর সংগ্রামের গল্প। নব্বইয়ের শুরুতে বাংলা চলচ্চিত্র ছিল ঠিক এমনই—রঙিন, আবেগঘন, কোলাহলময় এবং প্রাণবন্ত।
১৯৯০ সাল। বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসে এই বছরটি শুধু একটি বর্ষপঞ্জির নাম নয়; এটি ছিল এক রুপালি বিস্ফোরণের সময়। মাত্র এক বছরে মুক্তি পেয়েছিল ৭০টি চলচ্চিত্র। পারিবারিক গল্প, লোককাহিনি, প্রেম, অ্যাকশন, সামাজিক সংকট, প্রতিশোধ, মেলোড্রামা—সব মিলিয়ে যেন পুরো দেশটাই ডুবে ছিল সিনেমার জাদুতে।
সেই সময় সিনেমা মানে শুধু বিনোদন ছিল না; ছিল মানুষের আবেগ, ভালোবাসা, স্বপ্ন আর বেঁচে থাকার গল্প। গ্রামের হাট থেকে শহরের মোড়—সবখানেই চলত সিনেমার আলোচনা। কোন হলে কোন ছবি চলছে, কোন নায়ক নতুন গান এনেছেন, কে কাকে হার মানালেন—এসব নিয়েই ছিল দর্শকের উত্তেজনা।
নব্বইয়ের সেই বছরে একদিকে যেমন পর্দা কাঁপিয়েছেন জসিম, আলমগীর, ইলিয়াস কাঞ্চন, ফারুক ও রজ্জাক; অন্যদিকে দর্শকের হৃদয়ে রাজত্ব করেছেন শাবানা, রোজিনা, ববিতা, চম্পা ও অঞ্জু ঘোষ।
সে সময়ের সিনেমাগুলোতে ছিল সমাজের প্রতিচ্ছবি। “ঘর ভাঙা সংসার”, “গরিবের বউ”, “দুঃখিনী মা”, “অশান্ত সংসার”—নামের মধ্যেই যেন লুকিয়ে আছে বাংলার মধ্যবিত্ত জীবনের দীর্ঘশ্বাস। আবার “বিপ্লব”, “হুংকার”, “বীরযোদ্ধা”, “বজ্রপাত” এর মতো ছবিতে উঠে এসেছে অ্যাকশন আর প্রতিরোধের ভাষা।
নব্বইয়ের চলচ্চিত্রে আরেকটি বড় পরিবর্তন ছিল নতুন অ্যাকশন নায়কদের উত্থান। বিশেষ করে রুবেল তখন তরুণ দর্শকদের কাছে হয়ে ওঠেন এক অন্যরকম আকর্ষণ। মার্শাল আর্টভিত্তিক লড়াই, দ্রুতগতির দৃশ্য আর সাহসী চরিত্র তাকে আলাদা জনপ্রিয়তা এনে দেয়।
একই সময়ে বাংলা চলচ্চিত্রে যৌথ প্রযোজনার ঢেউও দেখা যায়। পাকিস্তান, নেপাল ও শ্রীলঙ্কার শিল্পীদের নিয়ে নির্মিত হয় একাধিক সিনেমা। “লেডি স্মাগলার”, “ভালবাসা ভালবাসা”, “নীল দরিয়া”, “জীবন পরীক্ষা”—এসব চলচ্চিত্র প্রমাণ করে, তখনকার বাংলা সিনেমা আঞ্চলিক যোগাযোগেরও এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছিল।
তবে নব্বইয়ের সিনেমার আসল শক্তি ছিল তার সহশিল্পীরা। এ টি এম শামসুজ্জামান-এর সংলাপ, দিলদার-এর হাস্যরস, জাম্বু-র ভয়ংকর উপস্থিতি কিংবা রাজীব-এর খলচরিত্র—সব মিলিয়ে একটি সিনেমা হয়ে উঠত পূর্ণাঙ্গ।
সেই সময় সিনেমা হলগুলোও ছিল মানুষের মিলনমেলা। ঈদ মানেই নতুন ছবি। টিকিটের জন্য দীর্ঘ লাইন, ব্ল্যাক টিকিট বিক্রি, হলের সামনে মাইকিং—সবকিছু মিলিয়ে সিনেমা ছিল এক উৎসব। পরিবার নিয়ে সিনেমা দেখতে যাওয়া ছিল মধ্যবিত্ত জীবনের অন্যতম আনন্দ।
আজ সময় বদলেছে। অনেক সিনেমা হল বন্ধ হয়ে গেছে, পোস্টারের জায়গা নিয়েছে ডিজিটাল ব্যানার, আর দর্শকের হাতে এসেছে মোবাইল স্ক্রিন। কিন্তু নব্বইয়ের সেই রুপালি পর্দার আবেগ এখনও হারিয়ে যায়নি। পুরনো গান বাজলেই, কিংবা টেলিভিশনে সেই সিনেমাগুলোর কোনো দৃশ্য ভেসে উঠলেই দর্শক ফিরে যান এক অন্য সময়ে—যেখানে সিনেমা মানেই ছিল হৃদয়ের উৎসব।
বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে ১৯৯০ সাল তাই শুধু একটি বছর নয়; এটি ছিল এক উজ্জ্বল অধ্যায়, যখন রুপালি পর্দা সত্যিই মানুষের স্বপ্ন দেখাতে জানত।

মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৮ মে ২০২৬
ঢাকার ব্যস্ত রাস্তা পেরিয়ে যখন মানুষ ছুটে যেত সিনেমা হলের দিকে, তখন শহরের বাতাসেও যেন মিশে থাকত পোস্টারের রঙ। কোথাও বিশাল ব্যানারে নায়ক হাতে বন্দুক, কোথাও প্রেমে ভেজা চোখে নায়িকা, আবার কোথাও গ্রামীণ জীবনের কান্না আর সংগ্রামের গল্প। নব্বইয়ের শুরুতে বাংলা চলচ্চিত্র ছিল ঠিক এমনই—রঙিন, আবেগঘন, কোলাহলময় এবং প্রাণবন্ত।
১৯৯০ সাল। বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসে এই বছরটি শুধু একটি বর্ষপঞ্জির নাম নয়; এটি ছিল এক রুপালি বিস্ফোরণের সময়। মাত্র এক বছরে মুক্তি পেয়েছিল ৭০টি চলচ্চিত্র। পারিবারিক গল্প, লোককাহিনি, প্রেম, অ্যাকশন, সামাজিক সংকট, প্রতিশোধ, মেলোড্রামা—সব মিলিয়ে যেন পুরো দেশটাই ডুবে ছিল সিনেমার জাদুতে।
সেই সময় সিনেমা মানে শুধু বিনোদন ছিল না; ছিল মানুষের আবেগ, ভালোবাসা, স্বপ্ন আর বেঁচে থাকার গল্প। গ্রামের হাট থেকে শহরের মোড়—সবখানেই চলত সিনেমার আলোচনা। কোন হলে কোন ছবি চলছে, কোন নায়ক নতুন গান এনেছেন, কে কাকে হার মানালেন—এসব নিয়েই ছিল দর্শকের উত্তেজনা।
নব্বইয়ের সেই বছরে একদিকে যেমন পর্দা কাঁপিয়েছেন জসিম, আলমগীর, ইলিয়াস কাঞ্চন, ফারুক ও রজ্জাক; অন্যদিকে দর্শকের হৃদয়ে রাজত্ব করেছেন শাবানা, রোজিনা, ববিতা, চম্পা ও অঞ্জু ঘোষ।
সে সময়ের সিনেমাগুলোতে ছিল সমাজের প্রতিচ্ছবি। “ঘর ভাঙা সংসার”, “গরিবের বউ”, “দুঃখিনী মা”, “অশান্ত সংসার”—নামের মধ্যেই যেন লুকিয়ে আছে বাংলার মধ্যবিত্ত জীবনের দীর্ঘশ্বাস। আবার “বিপ্লব”, “হুংকার”, “বীরযোদ্ধা”, “বজ্রপাত” এর মতো ছবিতে উঠে এসেছে অ্যাকশন আর প্রতিরোধের ভাষা।
নব্বইয়ের চলচ্চিত্রে আরেকটি বড় পরিবর্তন ছিল নতুন অ্যাকশন নায়কদের উত্থান। বিশেষ করে রুবেল তখন তরুণ দর্শকদের কাছে হয়ে ওঠেন এক অন্যরকম আকর্ষণ। মার্শাল আর্টভিত্তিক লড়াই, দ্রুতগতির দৃশ্য আর সাহসী চরিত্র তাকে আলাদা জনপ্রিয়তা এনে দেয়।
একই সময়ে বাংলা চলচ্চিত্রে যৌথ প্রযোজনার ঢেউও দেখা যায়। পাকিস্তান, নেপাল ও শ্রীলঙ্কার শিল্পীদের নিয়ে নির্মিত হয় একাধিক সিনেমা। “লেডি স্মাগলার”, “ভালবাসা ভালবাসা”, “নীল দরিয়া”, “জীবন পরীক্ষা”—এসব চলচ্চিত্র প্রমাণ করে, তখনকার বাংলা সিনেমা আঞ্চলিক যোগাযোগেরও এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছিল।
তবে নব্বইয়ের সিনেমার আসল শক্তি ছিল তার সহশিল্পীরা। এ টি এম শামসুজ্জামান-এর সংলাপ, দিলদার-এর হাস্যরস, জাম্বু-র ভয়ংকর উপস্থিতি কিংবা রাজীব-এর খলচরিত্র—সব মিলিয়ে একটি সিনেমা হয়ে উঠত পূর্ণাঙ্গ।
সেই সময় সিনেমা হলগুলোও ছিল মানুষের মিলনমেলা। ঈদ মানেই নতুন ছবি। টিকিটের জন্য দীর্ঘ লাইন, ব্ল্যাক টিকিট বিক্রি, হলের সামনে মাইকিং—সবকিছু মিলিয়ে সিনেমা ছিল এক উৎসব। পরিবার নিয়ে সিনেমা দেখতে যাওয়া ছিল মধ্যবিত্ত জীবনের অন্যতম আনন্দ।
আজ সময় বদলেছে। অনেক সিনেমা হল বন্ধ হয়ে গেছে, পোস্টারের জায়গা নিয়েছে ডিজিটাল ব্যানার, আর দর্শকের হাতে এসেছে মোবাইল স্ক্রিন। কিন্তু নব্বইয়ের সেই রুপালি পর্দার আবেগ এখনও হারিয়ে যায়নি। পুরনো গান বাজলেই, কিংবা টেলিভিশনে সেই সিনেমাগুলোর কোনো দৃশ্য ভেসে উঠলেই দর্শক ফিরে যান এক অন্য সময়ে—যেখানে সিনেমা মানেই ছিল হৃদয়ের উৎসব।
বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে ১৯৯০ সাল তাই শুধু একটি বছর নয়; এটি ছিল এক উজ্জ্বল অধ্যায়, যখন রুপালি পর্দা সত্যিই মানুষের স্বপ্ন দেখাতে জানত।

আপনার মতামত লিখুন