দিনাজপুরে চড়কের ঘূর্ণনে গ্রামীন উৎসব
গোধূলির নরম আলোয় যখন দিনাজপুরের ফুলবাড়ী ধীরে ধীরে ঢেকে যায় সন্ধ্যার আবরণে, ঠিক তখনই খয়েরবাড়ীর কিসমত লালপুর কালী মন্দির প্রাঙ্গণে শুরু হয় এক অন্যরকম জাগরণ। ঢাকের তালে, শঙ্খের ধ্বনিতে, আর মানুষের উচ্ছ্বাসে জেগে ওঠে গ্রামবাংলার বহুদিনের চেনা ঐতিহ্য—চড়ক পূজা ও গ্রামীণ মেলা।এ যেন শুধু একটি উৎসব নয়; এ যেন সময়ের বুক চিরে উঠে আসা এক জীবন্ত স্মৃতি। শহুরে ব্যস্ততার ভিড়ে হারিয়ে যেতে বসা সেই গ্রামীণ আবহ হঠাৎ করেই এখানে ফিরে পায় তার পুরনো রূপ। দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে আসে মানুষ—কেউ বিশ্বাসের টানে, কেউ শৈশবের স্মৃতি খুঁজতে, আবার কেউবা নিছকই দেখতে চায় এই শিহরণ জাগানো আয়োজন।মাঠের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা প্রায় ত্রিশ ফুট উঁচু কাঠের দণ্ডটি যেন আকাশ ছুঁতে চায়। সেই দণ্ডের চূড়ায় বড়শিতে ঝুলে এক সাধক ঘুরছেন অবিরাম। তার শরীরের যন্ত্রণা যেন মিলিয়ে গেছে বিশ্বাসের শক্তিতে। প্রতিটি ঘূর্ণনের সঙ্গে সঙ্গে তিনি ছড়িয়ে দেন ফুল, আবির, কলা, বাতাসা ও নকুলদানা—যেন আশীর্বাদের বৃষ্টি নেমে আসে চারপাশে। নিচে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের চোখে বিস্ময়, ভক্তি আর আনন্দের এক অপূর্ব মিশ্রণ।এই চড়ক কেবল একটি আচার নয়; এটি এক সাধনার গল্প, আত্মনিবেদনের এক নিঃশব্দ ঘোষণা।অংশগ্রহণকারী পরিতোষ সরকার তার অভিজ্ঞতা জানাতে গিয়ে বলেন, “প্রায় চার বছর ধরে দেশের বিভিন্ন জায়গায় চড়ক পূজায় অংশ নিচ্ছি। এটি করতে সাধনা লাগে। প্রতি বছর পিঠের ভিন্ন জায়গায় বড়শি লাগানো হয়। এটা করে আমি অনেক আনন্দ পাই—আমাকে দেখে সবাই আনন্দ পায়। এই কাজ করতে আমার ভালো লাগে।”মেলার পথ ধরে হাঁটলে পাওয়া যায় অন্য এক রঙিন পৃথিবী। ছোট ছোট দোকান, রঙিন খেলনা, মিষ্টির গন্ধ, আর শিশুদের উচ্ছ্বাসে ভরা হাসি—সব মিলিয়ে যেন জীবন্ত হয়ে ওঠে এক টুকরো গ্রামবাংলা। এখানে অচেনা মানুষও আপন হয়ে যায়, ভিন্নতার দেয়াল গলে গিয়ে তৈরি হয় এক অনির্বচনীয় মিলনমেলা।চড়ক উৎসব কমিটির সভাপতি ও ইউপি সদস্য সুকুমার রায় পাখি বলেন, “চৈত্র সংক্রান্তিকে ঘিরে চড়ক কালী পূজার আয়োজন করা হয়। দিনব্যাপী মেলা বসে এবং কয়েক হাজার মানুষের সমাগম ঘটে। নিরাপত্তার জন্য স্বেচ্ছাসেবক ও পুলিশ মোতায়েন ছিল।”চৈত্রের শেষ প্রহরে অনুষ্ঠিত এই চড়ক উৎসব যেন এক প্রতীক—পুরনোকে আঁকড়ে ধরে নতুনকে বরণ করার। এটি শুধু ধর্মীয় বিশ্বাসের বহিঃপ্রকাশ নয়; এটি সংস্কৃতির ধারক, মানুষের হৃদয়ের বন্ধন, আর সম্প্রীতির এক উজ্জ্বল উদাহরণ।অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি আনোয়ার হোসেন চৌধুরী বলেন, “বিগত সরকার এই পূজা মণ্ডপের জন্য তেমন বরাদ্দ রাখেনি। এবার আমরা মন্দিরের জন্য বিশেষ বরাদ্দের কথা ভাবছি। প্রতিবছর যাতে গ্রাম-বাংলার ঐতিহ্যবাহী চড়ক পূজা ও মেলা অনুষ্ঠিত হয়, সে বিষয়ে সব ধরনের সহযোগিতা দেওয়া হবে।”ফুলবাড়ীর এই সন্ধ্যা তাই কেবল একটি দিনের গল্প নয়—এটি এক চলমান ঐতিহ্যের প্রতিচ্ছবি। ঢাকের প্রতিটি তালে, মানুষের প্রতিটি হাসিতে যেন উচ্চারিত হয় এক অমোঘ সত্য—শেকড়কে যতই ভুলে যাই না কেন, সে একদিন ফিরে আসে, আমাদের হৃদয়ের দরজায় কড়া নাড়ে।