প্রিন্ট এর তারিখ : ০৩ নভেম্বর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ২৫ অক্টোবর ২০২৬
প্রতিরক্ষা শিল্পে স্বনির্ভরতার পথে বাংলাদেশ, খুলনায় লঞ্চ হলো এলসিটি-১০৪
মোঃ হুমায়ুন কবির সাকিব ||
দেশের প্রতিরক্ষা শিল্পে স্বনির্ভরতা অর্জন ও ‘মেইড ইন বাংলাদেশ’ উদ্যোগকে এগিয়ে নেওয়ার ধারাবাহিকতায় নতুন সাফল্য অর্জন করেছে বাংলাদেশ নৌবাহিনী পরিচালিত খুলনা শিপইয়ার্ড লিমিটেড। নৌবাহিনীর জন্য দেশীয় সক্ষমতায় নির্মিত তৃতীয় ল্যান্ডিং ক্রাফট ট্যাংক (এলসিটি) ‘এলসিটি-১০৪’ আনুষ্ঠানিকভাবে লঞ্চিং করা হয়েছে। শনিবার (২৪ অক্টোবর) খুলনা শিপইয়ার্ডে আয়োজিত অনুষ্ঠানে জাহাজটি লঞ্চিংয়ের মধ্য দিয়ে দেশের জাহাজ নির্মাণ ও প্রতিরক্ষা শিল্পের অগ্রযাত্রায় যুক্ত হলো নতুন একটি অধ্যায়।অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে এলসিটি-১০৪ লঞ্চ করেন বাংলাদেশ নৌবাহিনীর সহকারী নৌবাহিনী প্রধান (ম্যাটেরিয়েল) রিয়ার অ্যাডমিরাল মোহাম্মদ মাকসুদ আলম। এ সময় সামরিক ও বেসামরিক বিভিন্ন পর্যায়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।নৌবাহিনীর তত্ত্বাবধানে খুলনা শিপইয়ার্ড লিমিটেডের নিজস্ব সক্ষমতায় এবং কানাডার ভার্ড মেরিনের নকশায় নির্মিত হয়েছে জাহাজটি। এর দৈর্ঘ্য ৭৪ দশমিক ৫ মিটার, প্রস্থ ১৩ মিটার এবং ডিসপ্লেসমেন্ট ১ হাজার ৫০৫ মেট্রিক টন। ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ১৭ মাইল গতিতে চলাচলে সক্ষম এ জাহাজটি সামরিক ও মানবিক—উভয় ধরনের কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।ল্যান্ডিং ক্রাফট ট্যাংক বা এলসিটি এমন এক ধরনের জাহাজ, যা উভচর অভিযানে সেনা ও বিশেষায়িত বাহিনী পরিবহন, ভারী সামরিক সরঞ্জাম ও যানবাহন স্থানান্তর এবং দুর্গম উপকূলীয় ও দ্বীপাঞ্চলে প্রয়োজনীয় রসদ পৌঁছে দিতে ব্যবহৃত হয়। সেনাবাহিনী ও নৌবাহিনীর সমন্বিত অভিযানে এ ধরনের জাহাজের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।এলসিটি-১০৪ শুধু সামরিক কার্যক্রমেই নয়, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, মানবিক সহায়তা, উদ্ধার অভিযান, অনুশীলন ও প্রশিক্ষণ এবং দুর্গম এলাকায় লজিস্টিক সহায়তা প্রদানের ক্ষেত্রেও কার্যকর ভূমিকা রাখবে। বিশেষ করে উপকূলীয় অঞ্চল ও দ্বীপাঞ্চলে জরুরি সরঞ্জাম এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে জাহাজটির বহুমুখী সক্ষমতা কাজে আসবে।বাংলাদেশ নৌবাহিনীর জন্য খুলনা শিপইয়ার্ডে নির্মিত তিনটি এলসিটির মধ্যে প্রথম জাহাজ এলসিটি-১০২ গত ৪ ডিসেম্বর ২০২৫ এবং দ্বিতীয় জাহাজ এলসিটি-১০১ গত ১৫ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে লঞ্চিং করা হয়। এবার তৃতীয় জাহাজ এলসিটি-১০৪-এর লঞ্চিংয়ের মাধ্যমে প্রকল্পের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ সম্পন্ন হলো।জাহাজগুলোতে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন নকশার পাশাপাশি ক্যাটারপিলার ইঞ্জিন, স্বনামধন্য বিদেশি প্রতিষ্ঠানের যন্ত্রপাতি, জেনারেটর এবং আধুনিক বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ব্যবহার করা হয়েছে। দেশীয় শিপইয়ার্ডে এ ধরনের জাহাজ নির্মাণ দেশের প্রকৌশলীদের দক্ষতা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং জটিল নৌযান নির্মাণে ক্রমবর্ধমান অভিজ্ঞতার পরিচয় বহন করে।আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে জাহাজ নির্মাণ ও মেরামতের পাশাপাশি খুলনা শিপইয়ার্ড লিমিটেড বিভিন্ন জাতীয় উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করে আসছে। প্রতিষ্ঠানটি আইএসও সনদপ্রাপ্ত এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের ট্যাক্স কার্ড সম্মাননা ও গ্রিন ফ্যাক্টরি অ্যাওয়ার্ড অর্জন করেছে।প্রতিষ্ঠানটির তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত ৮০০টিরও বেশি জাহাজ ও জলযান নির্মাণ এবং ২ হাজার ৫০০টিরও বেশি জাহাজ ও জলযান মেরামত করেছে খুলনা শিপইয়ার্ড। দেশের প্রতিরক্ষা শিল্প, মেরিটাইম খাত, ব্লু ইকোনমি ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে প্রতিষ্ঠানটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে।দেশীয় সক্ষমতায় সামরিক কাজে ব্যবহৃত জাহাজ নির্মাণের ফলে বিদেশ থেকে জাহাজ সংগ্রহের ওপর নির্ভরতা কমানোর সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে। একই সঙ্গে দেশীয় প্রযুক্তি ও প্রকৌশল দক্ষতার বিকাশ, শিল্প সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং দেশের অর্থ দেশের ভেতরেই রাখার সম্ভাবনা বাড়ছে।
সব মিলিয়ে, খুলনা শিপইয়ার্ডে এলসিটি-১০৪-এর লঞ্চিং কেবল একটি জাহাজের উদ্বোধনী কার্যক্রম নয়; বরং দেশের নিজস্ব জাহাজ নির্মাণ সক্ষমতা বৃদ্ধি, নৌবাহিনীর আধুনিকায়ন এবং প্রতিরক্ষা শিল্পের বিকাশে একটি উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি।
সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ আব্দুর রাকিব
কপিরাইট © ২০২৬ BD State News । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত