প্রিন্ট এর তারিখ : ০৩ নভেম্বর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ২১ আগস্ট ২০২৬
সৈয়দপুরে চোলাই মদের জমজমাট কারবার
মিজানুর রহমান মহসিন ||
সস্তা নেশা, সহজলভ্যতা আর আড়ালে-আবডালে বিক্রি। এই তিনের সমন্বয়ে নীলফামারীর সৈয়দপুরে চোলাই মদের কারবার নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ।স্থানীয়দের অভিযোগ, পার্বতীপুর ও আশপাশের এলাকা থেকে চোলাই মদ এনে শহরের একটি মহল্লায় নিয়মিত বিক্রি করা হচ্ছে। নারী-পুরুষ মিলিয়ে প্রায় ১৫ জন এ কারবারের সঙ্গে জড়িত বলে দাবি তাঁদের। তাঁদের ভাষ্য, প্রতিদিন প্রায় ৩০০ থেকে ৪০০ লিটার পর্যন্ত চোলাই মদ বিক্রি হয়।তবে প্রতিদিন ৩০০-৪০০ লিটার বিক্রির এই দাবি স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। কিন্তু সম্প্রতি একটি বাস থেকে ১০০ লিটার চোলাই মদ উদ্ধারের ঘটনা শহরে বাইরে থেকে মদ আসার অভিযোগকে নতুন করে সামনে এনেছে। ১৯ আগস্ট সৈয়দপুর-দিনাজপুর মহাসড়কের রাবেয়া মিল বাসস্ট্যান্ড এলাকায় ডিএনসির অভিযানে পাঁচ জারকিনে থাকা ১০০ লিটার চোলাই মদ উদ্ধার এবং রাহুল বাসফোড় (১৯) নামে এক যুবককে আটকের খবর প্রকাশিত হয়েছে। ডিএনসি সূত্রের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়, দিনাজপুরের একটি সাঁওতাল পল্লী থেকে চোলাই মদ এনে সৈয়দপুরে বিক্রির কথা তিনি কর্মকর্তাদের জানিয়েছেন।এক চালানে ১০০ লিটার, তাহলে বাকিগুলো যায় কোথায়?একটি চালানেই ১০০ লিটার চোলাই মদ উদ্ধার হওয়ার পর স্থানীয়দের প্রশ্ন—এটি কি বিচ্ছিন্ন কোনো চালান, নাকি এর পেছনে রয়েছে নিয়মিত সরবরাহব্যবস্থা?স্থানীয়দের দাবি সত্য হলে প্রতিদিন শত শত লিটার মদ শহরে প্রবেশ করছে। তাহলে মদ আসছে কোন পথ দিয়ে? কারা বহন করছে? কোথায় মজুত হচ্ছে? কারা খুচরা বিক্রি করছে? আর এই সরবরাহচক্রের মূল নিয়ন্ত্রক কারা?এসব প্রশ্নের উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত শুধু খুচরা পর্যায়ে অভিযান চালিয়ে চোলাই মদের কারবারের মূল শিকড়ে পৌঁছানো কঠিন।চোলাই মদ সাধারণত স্থানীয়ভাবে গাঁজন ও পাতনের মাধ্যমে তৈরি করা হয়। কিন্তু কোনো পানীয় গাঁজন বা পাতনের মাধ্যমে তৈরি হলেই সেটি নিরাপদ—এমন নিশ্চয়তা নেই।বিশেষ করে অনিয়ন্ত্রিত পরিবেশে উৎপাদনের ক্ষেত্রে কাঁচামালের মান, গাঁজনের অবস্থা, ব্যবহৃত পাত্র, পাতন প্রক্রিয়া এবং সংরক্ষণ—কোনোটিই যথাযথভাবে নিয়ন্ত্রিত না থাকলে চূড়ান্ত পণ্যের রাসায়নিক গঠন ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায় না।এ মদ তৈরিতে অস্বাস্থ্যকর কাঁচামাল কিংবা ক্ষতিকর রাসায়নিক ব্যবহারের নানা অভিযোগ শোনা যায়। কিন্তু কোনো নির্দিষ্ট মদের নমুনায় ইউরিয়া, কীটনাশক, নেশাজাতীয় ট্যাবলেট, মিথানল বা অন্য কোনো বিষাক্ত রাসায়নিক রয়েছে। পরীক্ষাগার বিশ্লেষণ ছাড়া তা নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়।চোলাই মদ তৈরিতে অসুস্থ পরিবেশ কিংবা দীর্ঘদিন পরিষ্কার না করা সরঞ্জাম ব্যাবহার করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। তাি স্বাভাবিকভাবেই এটি জনমনে আতঙ্ক তৈরি করে।কিন্তু একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—ছবি দেখে কোনো তরলের রাসায়নিক উপাদান নির্ধারণ করা যায় না।তাই প্রকৃত অনুসন্ধানের দাবি হওয়া উচিত, উদ্ধার হওয়া চোলাই মদের নমুনা পরীক্ষাগারে পাঠানো হয়েছে কি না। পরীক্ষা হয়ে থাকলে এর ফল কী? এতে মিথানল বা অন্য কোনো ক্ষতিকর উপাদান পাওয়া গেছে কি না?এই তথ্য প্রকাশ পেলেই বোঝা যাবে, উদ্ধার হওয়া মদ শুধু অবৈধ, নাকি একই সঙ্গে গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকিও বহন করছে।অনিয়ন্ত্রিতভাবে তৈরি অ্যালকোহলযুক্ত পানীয়ের ক্ষেত্রে মিথানল (Methanol) দূষণ একটি গুরুতর জনস্বাস্থ্যঝুঁকি। মিথানল শরীরে প্রবেশ করলে মারাত্মক বিষক্রিয়া হতে পারে। গুরুতর ক্ষেত্রে দৃষ্টিশক্তি নষ্ট হওয়া, কোমা এমনকি মৃত্যুও ঘটতে পারে।তবে সৈয়দপুরে উদ্ধার হওয়া চোলাই মদে মিথানল রয়েছে কি - না? এমন দাবি পরীক্ষার ফল ছাড়া করা যাবে না। তাই জনস্বার্থে উদ্ধার হওয়া মদের নমুনা বৈজ্ঞানিকভাবে পরীক্ষা করা হলে ঝুঁকির প্রকৃত চিত্র পরিষ্কার হতে পারে।সৈয়দপুর ১০০ শয্যা হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. নাজমুল হুদা বলেন, অনিয়ন্ত্রিতভাবে তৈরি মদে কী ধরনের ক্ষতিকর উপাদান রয়েছে, তা পরীক্ষাগার বিশ্লেষণ ছাড়া নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়। তবে এ ধরনের পানীয় সেবনে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে।তিনি বলেন, বিষাক্ত উপাদান থাকলে গুরুতর বিষক্রিয়া, দৃষ্টিশক্তির ক্ষতি, অঙ্গহানি এমনকি মৃত্যুও হতে পারে। দীর্ঘদিন অ্যালকোহল সেবনে লিভারসহ শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।চিকিৎসকের এই সতর্কবার্তা চোলাই মদের বাজারকে শুধু আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়, জনস্বাস্থ্যের সংকট হিসেবেও দেখার প্রয়োজনীয়তা সামনে আনে।স্থানীয়দের অভিযোগ, চোলাই মদ সেবনকারীদের মধ্যে শহরের নান পেশাজীবিসহ কিছু পরিচ্ছন্নতাকর্মীও রয়েছেন। অভিযোগটি সত্য হলে বিষয়টি আলাদাভাবে গুরুত্ব পাওয়ার দাবি রাখে। কারণ কঠিন ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে কাজ করা এসব মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকির সঙ্গে অনিরাপদ মদ সেবন যুক্ত হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।তবে কোনো নির্দিষ্ট পেশার মানুষকে সামগ্রিকভাবে মাদকসেবী হিসেবে চিহ্নিত করা ঠিক নয়। অভিযোগের সত্যতা যাচাই করাও জরুরি।চোলাই মদের ক্ষতি শুধু সেবনকারীর শরীরে সীমাবদ্ধ নয়। নিয়মিত নেশার পেছনে অর্থ ব্যয় হলে পরিবারে তৈরি হয় অর্থনৈতিক সংকট। কমে যায় খাবার, শিক্ষা ও চিকিৎসার জন্য বরাদ্দ অর্থ।একজন উপার্জনক্ষম ব্যক্তি নেশাজনিত অসুস্থতায় কর্মক্ষমতা হারালে তার প্রভাব পড়ে স্ত্রী-সন্তানসহ পুরো পরিবারের ওপর। দীর্ঘমেয়াদি নেশা থেকে পারিবারিক অশান্তি, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ও আর্থিক দুরবস্থাও তৈরি হতে পারে।অর্থাৎ সস্তা নেশার মূল্য অনেক সময় দিতে হয় পুরো পরিবারকে।১৯ আগস্টের অভিযানের ঘটনায় দিনাজপুরের একটি এলাকা থেকে চোলাই মদ এনে সৈয়দপুরে বিক্রির অভিযোগ সামনে এসেছে। ডিএনসি সূত্রের বরাতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে ওই তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে।এটি কি একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা, নাকি একটি নিয়মিত ও নিরাপদ রুট?যদি নিয়মিতভাবে পার্বতীপুর, দিনাজপুর বা আশপাশের এলাকা থেকে চোলাই মদ সৈয়দপুরে আসে, তাহলে সেই পরিবহনপথ শনাক্ত করা সম্ভব কি না—সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।একই সঙ্গে জানতে হবে, মদ শহরে ঢোকার পর কোথায় মজুত হয় এবং কারা খুচরা পর্যায়ে তা বিক্রি করে।স্থানীয়দের অভিযোগ অনুযায়ী প্রতিদিন যদি শত শত লিটার চোলাই মদ বিক্রি হয়, তাহলে এটি নিছক বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। এর পেছনে উৎপাদন, পরিবহন, মজুত ও বিক্রির একটি সরবরাহচক্র থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।তাই শুধু একজন বহনকারীকে আটক করলেই অনুসন্ধান শেষ হওয়ার কথা নয়।নীলফামারী মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. আনিছুর রহমান খান বলেন, “চোলাই মদসহ সব ধরনের অবৈধ মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। সৈয়দপুরে চোলাই মদের কারবারের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া গেলে অবশ্যই অভিযান পরিচালনা করা হবে। মাদক কারবারিকে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।”তিনি আরও বলেন, মাদকের উৎস, সরবরাহ ও বিক্রির সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার চেষ্টা করা হবে।মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কেন্দ্রীয় ওয়েবসাইটেও সংস্থাটির মাদক নিয়ন্ত্রণসংক্রান্ত কার্যক্রম ও তথ্য প্রকাশ করা হয়।সৈয়দপুরে চোলাই মদের কারবার বন্ধে বিচ্ছিন্ন অভিযান গুরুত্বপূর্ণ হলেও তা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন উৎসভিত্তিক তদন্ত।উদ্ধার করা মদের নমুনা পরীক্ষাগারে পাঠানো, সরবরাহের রুট শনাক্ত করা, মজুতস্থল চিহ্নিত করা এবং উৎপাদন ও সরবরাহের সঙ্গে জড়িতদের আইনের আওতায় আনা—এই চারটি বিষয় একসঙ্গে এগিয়ে নিতে হবে।কারণ একজন বহনকারী ধরা পড়লে একটি চালান থামতে পারে; কিন্তু সরবরাহের উৎস অক্ষত থাকলে পরের চালান আবারও শহরে ঢোকার সুযোগ থাকে।সৈয়দপুরে চোলাই মদের কারবার নিয়ে স্থানীয়দের অভিযোগ, এক চালানে ১০০ লিটার মদ উদ্ধার, স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে চিকিৎসকের সতর্কতা এবং মাদকবিরোধী অভিযান—সব মিলিয়ে বিষয়টি এখন আর কেবল মাদক উদ্ধারের খবর নয়।এটি একটি জনস্বাস্থ্য, পরিবার রক্ষার ও প্রশাসনিক নজরদারির প্রশ্ন। আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—মানুষ যে তরলটিকে চোলাই মদ হিসেবে পান করছে, সেটিতে আসলে কী আছে?এই প্রশ্নের উত্তর অনুমান দিয়ে নয়, প্রয়োজন বৈজ্ঞানিক পরীক্ষায়। আর কারবার বন্ধ করতে প্রয়োজন শুধু খুচরা পর্যায়ে অভিযান নয়, চোলাই মদের উৎস থেকে ভোক্তার হাত পর্যন্ত পুরো সরবরাহচক্রের অনুসন্ধান।
সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ আব্দুর রাকিব
কপিরাইট © ২০২৬ BD State News । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত