প্রিন্ট এর তারিখ : ০৩ নভেম্বর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ২২ জুন ২০২৬
পাট ক্ষেতে মিলল শিশুর নিথর দেহ: উত্তর খুঁজছে পরিবার ও প্রশাসন
মিজানুর রহমান মহসিন ||
বিকেলে বাড়ি থেকে বের হয়েছিল খেলতে। বয়স মাত্র নয় বছর। পরিবারের কাছে সেটি ছিল প্রতিদিনের মতোই একটি সাধারণ বিকেল। কিন্তু সেই বিকেলই পরিণত হয় এক বিভীষিকাময় রাতে। আর পরদিন সকালে বাড়ির পাশের একটি পাটক্ষেত থেকে উদ্ধার করা হয় ছোট্ট মাদ্রাসাছাত্রী সানজিদার নিথর দেহ।রংপুরের তারাগঞ্জের এ ঘটনাটি এখন শুধু একটি মৃত্যুর ঘটনা নয়; এটি পরিণত হয়েছে অসংখ্য প্রশ্নের জন্ম দেওয়া এক রহস্যে। ঘটনার দুই দিন পেরিয়ে গেলেও তদন্তকারীদের হাতে আসেনি কোনো দৃশ্যমান ক্লু। ফলে শিশুটির মৃত্যু নিয়ে বাড়ছে কৌতূহল, উৎকণ্ঠা এবং নানা প্রশ্ন।স্থানীয় সূত্র জানায়, ঘটনার দিন বিকেলে বাড়ির আশপাশে খেলতে বের হয় সানজিদা। সন্ধ্যা পেরিয়ে গেলেও সে বাড়ি না ফেরায় উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে পরিবার। শুরু হয় খোঁজাখুঁজি। আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী এবং এলাকাবাসী মিলে রাতভর সম্ভাব্য বিভিন্ন স্থানে অনুসন্ধান চালান।প্রশ্ন উঠছে, যদি শিশুটি বিকেলেই কোনো দুর্ঘটনার শিকার হয়ে থাকে, তাহলে রাতভর অনুসন্ধানের সময় কেন তাকে খুঁজে পাওয়া গেল না? আবার যদি পরে মরদেহটি সেখানে আনা হয়ে থাকে, তাহলে কারা এবং কীভাবে সেটি সেখানে নিয়ে গেল?এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই এখন তদন্তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।ঘটনাস্থল হিসেবে পাটক্ষেতের বিষয়টিও তদন্তে গুরুত্ব পাচ্ছে। স্থানীয়দের মতে, যে স্থানে মরদেহ পাওয়া গেছে, সেটি বাড়ি থেকে খুব বেশি দূরে নয়। ফলে প্রশ্ন উঠছে, শিশুটি কি নিজে সেখানে গিয়েছিল, নাকি অন্য কোনো কারণে তাকে সেখানে নেওয়া হয়েছিল?একজন স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, "আমরা সারা রাত খুঁজেছি। কিন্তু সকালে কাছের পাটক্ষেতে মরদেহ পাওয়া গেল। বিষয়টি স্বাভাবিক মনে হচ্ছে না।"তবে তদন্তকারীরা এখনো কোনো সম্ভাবনাকেই উড়িয়ে দিচ্ছেন না।ঘটনার পর পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে, আলামত সংগ্রহ করেছে এবং স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলেছে। কিন্তু দুই দিন পার হয়ে গেলেও এমন কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয়নি, যা থেকে ঘটনার রহস্যের কোনো সুস্পষ্ট দিক পাওয়া যায়।তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, ময়নাতদন্তের রিপোর্ট এবং ফরেনসিক তথ্যের ওপর অনেক কিছু নির্ভর করছে। তবে এখন পর্যন্ত এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি, যা নিশ্চিতভাবে ঘটনার কারণ বা দায়ীদের দিকে ইঙ্গিত করে।সানজিদার পরিবারের সদস্যরা এখনো বিশ্বাস করতে পারছেন না যে তাদের শিশুটি আর ফিরে আসবে না। পরিবারের দাবি, সানজিদার সঙ্গে কারও শত্রুতা ছিল না। সে নিয়মিত মাদ্রাসায় যেত এবং অন্যান্য শিশুদের মতোই স্বাভাবিক জীবনযাপন করত।এক স্বজন বলেন, "আমরা শুধু জানতে চাই, আমাদের মেয়েটির সঙ্গে কী হয়েছিল। যে-ই দায়ী হোক, তার বিচার চাই।"ঘটনার পর এলাকায় শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। অনেক অভিভাবক এখন সন্তানদের একা বাইরে পাঠাতে ভয় পাচ্ছেন। স্থানীয়দের মতে, ঘটনার দ্রুত রহস্য উদঘাটন না হলে জনমনে আতঙ্ক আরও বাড়বে।একজন অভিভাবক বলেন, "আজ সানজিদা, কাল কার সন্তান—এই ভয়টাই এখন আমাদের তাড়া করছে।"বর্তমানে তদন্তকারীদের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো নিখোঁজ হওয়ার সময় থেকে মরদেহ উদ্ধারের সময় পর্যন্ত ঘটনাপ্রবাহের ফাঁকগুলো পূরণ করা। শিশুটি কোথায় ছিল, কার সঙ্গে ছিল, কীভাবে তার মৃত্যু হলো এবং কেন ঘটনাটি ঘটল—এসব প্রশ্নের উত্তরই তদন্তের মূল কেন্দ্রবিন্দু।তবে এখন পর্যন্ত কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা নির্দিষ্ট কারণের দিকে আঙুল তোলার মতো তথ্য প্রকাশ্যে আসেনি। ফলে গুজব নয়, তথ্যভিত্তিক তদন্তের ফলাফলের অপেক্ষায় রয়েছে সবাই।দুই দিন পেরিয়ে গেছে। পাটক্ষেতের সেই নীরবতা এখনও ভাঙেনি। সানজিদার খালি হয়ে যাওয়া ঘর, কান্নায় ভেঙে পড়া পরিবার আর উৎকণ্ঠায় থাকা এলাকাবাসী একটাই উত্তর খুঁজছে—সেদিন বিকেল থেকে পরদিন সকাল পর্যন্ত ঠিক কী ঘটেছিল ছোট্ট সানজিদার সঙ্গে?আর সেই প্রশ্নের উত্তরই হয়তো নির্ধারণ করবে, এটি কেবল একটি মর্মান্তিক মৃত্যু, নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছে আরও গভীর কোনো রহস্য।
সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ আব্দুর রাকিব
কপিরাইট © ২০২৬ BD State News । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত