প্রিন্ট এর তারিখ : ০৩ নভেম্বর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ২০ এপ্রিল ২০২৬
সৈয়দপুরে গৃহবধূ হত্যা মামলায় স্বামীসহ গ্রেফতার ৩
মিজানুর রহমান মহসিন ||
নীলফামারীর সৈয়দপুরে গৃহবধূ সিমু আক্তারের মৃত্যু প্রথমে ‘বিষপানে আত্মহত্যা’ হিসেবে প্রচার করা হলেও অনুসন্ধানে উঠে এসেছে ভিন্ন চিত্র। ঘটনার ১০ দিন পর স্বামী, দেবরসহ তিনজনের গ্রেপ্তার এই মৃত্যুকে ঘিরে পরিকল্পিত হত্যার সন্দেহ আরও জোরালো করেছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভাষ্য, পারিবারিক নির্যাতনের এই ঘটনা এখন পূর্ণাঙ্গ হত্যাকাণ্ড হিসেবে তদন্তের আওতায়।
৪৮ ঘণ্টায় বদলে যায় গল্প ঘটনার শুরু ৮ এপ্রিল।
অভিযোগ অনুযায়ী, ওইদিন গৃহবধূ সিমুকে বেধড়ক মারধর করে অসুস্থ অবস্থায় ঘরে আটকে রাখা হয়। পরদিন ৯ এপ্রিল হঠাৎ করে পরিবারের পক্ষ থেকে প্রচার করা হয়—সিমু বিষপান করেছে এবং তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
কিন্তু হাসপাতালের শয্যায় থাকা অবস্থায় সিমু নিজেই তার বাবা ও স্বজনদের কাছে দাবি করে যে, তাকে মারধর করে জোরপূর্বক বিষ খাওয়ানো হয়েছে। ১০ এপ্রিল রাতেই তার মৃত্যুর খবর আসে। কিন্তু তখনই দেখা যায়, স্বামী ও তার পরিবারের সদস্যরা হাসপাতাল থেকে গা ঢাকা দিয়েছে। এই পালিয়ে যাওয়া, তদন্তকারীদের মতে, ঘটনার ‘টার্নিং পয়েন্ট’।
দীর্ঘ নির্যাতনের ইতিহাস অনুসন্ধানে জানা গেছে, প্রায় ১৩ বছর আগে বিয়ের পর থেকেই যৌতুকের দাবিতে নির্যাতনের শিকার ছিলেন সিমু আক্তার। দরিদ্র বাবার কাছ থেকে মোটরসাইকেল নেওয়ার পরও থামেনি সেই চাপ। বরং নতুন করে দাবি ওঠে নগদ দুই লাখ টাকার।
অর্থ না পেয়ে নির্যাতনের মাত্রা বাড়তে থাকে। শেষ পর্যন্ত স্ত্রী জীবিত থাকা অবস্থাতেই দ্বিতীয় বিয়ে করেন স্বামী রায়হান আহমেদ রিতু। এরপর দ্বিতীয় স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে ‘সমন্বিত নির্যাতন’ চালানোর অভিযোগ পাওয়া গেছে।
নির্যাতনের নীরব প্রমাণ এই ঘটনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও মর্মান্তিক দিক নিহতের শিশু সন্তান ইফাত (৫)। পরিবারের দাবি, সে তার মায়ের ওপর চালানো নির্যাতনের প্রত্যক্ষ সাক্ষী।
গরম ইলেকট্রিক ইস্ত্রি দিয়ে দগ্ধ করা, স্টিলের পাইপ দিয়ে মারধরের মতো নিষ্ঠুরতা একটি শিশুর চোখে ধরা পড়েছে—যা মামলার গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
কতটা পরিকল্পিত? ঘটনার ধরন বিশ্লেষণ করে কয়েকটি প্রশ্ন সামনে এসেছে। কেন মারধরের পর হঠাৎ ‘বিষপান’ গল্প তৈরি করা হলো? কেন হাসপাতালে নেওয়ার আগে চিকিৎসা দেওয়া হয়নি? কেন মৃত্যুর পরপরই পরিবারের সদস্যরা পালিয়ে গেল?
তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এসব প্রশ্নই ইঙ্গিত করছে এটি তাৎক্ষণিক ঘটনা নয়, বরং একটি পরিকল্পিত ‘কভার-আপ’ প্রচেষ্টা। এটি শুধু পারিবারিক সহিংসতা নয়।
স্থানীয় সূত্র বলছে, অভিযুক্তরা দীর্ঘদিন ধরে নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত রেলওয়ের জমি দখল ও বেচাকেনা জাল দলিল তৈরি করে জমি হাতবদল, মাদক ব্যবসায় সম্পৃক্ততা রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে এলাকায় আধিপত্য। এমনকি ইয়াবা সংশ্লিষ্ট মামলায় পূর্বে কারাভোগের অভিযোগও রয়েছে। অনুসন্ধান বলছে, এই অবৈধ অর্থই তাদের ‘ক্ষমতা’ এবং ‘প্রভাব’ তৈরি করেছে। টাকার প্রস্তাব ও চাপ: বিচার প্রক্রিয়ায় নতুন চ্যালেঞ্জ নিহতের পরিবারের অভিযোগ—মামলা তুলে নিতে ১০ লাখ টাকার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন মহল থেকে চাপ প্রয়োগের কথাও জানিয়েছেন তারা। এতে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে, এই হত্যাকাণ্ড কি শুধু পারিবারিক নয়, বরং প্রভাবশালী চক্রের সুরক্ষায় থাকা একটি অপরাধ?
পুলিশ জানায়, , ঘটনার পর পলাতক থাকা তিন আসামিকে যৌথ অভিযানে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং আদালতে পাঠানো হয়েছে। পলাতক আসামিকেও দ্রুত গ্রেপ্তারের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।
তবে তদন্ত সংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু গ্রেপ্তারেই শেষ নয়। এই ঘটনার পেছনের আর্থিক উৎস, প্রভাবশালী যোগসূত্র এবং পূর্বের অপরাধগুলোকেও তদন্তের আওতায় আনতে হবে। একটি মৃত্যুর চেয়ে বড় প্রশ্ন সিমু আক্তারের মৃত্যু শুধু একটি পারিবারিক ট্র্যাজেডি নয়, এটি যৌতুক, নারী নির্যাতন, অবৈধ অর্থ ও প্রভাবের এক জটিল বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি।
সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ আব্দুর রাকিব
কপিরাইট © ২০২৬ BD State News । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত